স্কুলে যখন অঙ্কের খাতায় পরপর দুবার শূন্য পেয়েছিল, বাবা হেসে বলেছিলেন, ’বাপধন, সর্তক থাকিস এই শূন্য না একদিন তোর জীবনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।’
তখনও সে হাসতে পেরেছিল, মাকে মুখ টিপে হাসতে দেখে ধরে নিয়েছিল বাবা স্রেফ ঠাট্টা করছেন। কিন্তু পরবর্তী পঁচিশ বছরে কাজল বুঝে গেল, বাবার কথাগুলো মোটেও ঠাট্টা ছিল না। দিব্যদৃষ্টিতে তিনি ওর ভবিষ্যৎ দেখে ফেলেছিলেন।
কাজল বর্তমানে বেকার ফ্রিল্যান্সার। মানে, স্বাধীনভাবে কাজের ইচ্ছা ষোলোয়ানা, কিন্তু ক্লায়েন্ট নেই। ক্লাইন্ট জোগাড়ে সে যে খুব উৎসাহী তাও নয়। লিংকডইনে তার প্রোফাইল আছে। তাতে ডাটিয়াল এবং ভারীশব্দের কিছু লেখাজোখা ঝুলছে, ‘ক্রিয়েটিভ কনসালটেন্ট। থিঙ্কার। বিলিভার ইন জাস্টিস অ্যান্ড লাভ। ডগ লাভার। ড্রিমার।’
কাজলের স্ত্রী সেতু স্বামীর প্রোফাইল পরিচিতি দেখে ভ্রু’তে ভাঁজ ফেলে বলেছিল. ‘তুমি ডগ লাভার জানা ছিল না!’ খোঁচাটার পেছনে একটা কাহিনি আছে। সেতুর বড় ভাবির কুকুর পালার শখ। হেঁজিপেঁজি কুকুর নয়। তার পোষ্য দুটোর একটি জার্মান শেফার্ড, অন্যটি গোল্ডেন রিট্রিভার। গোল্ডেন রিট্রিভারের ভীষণ আদুরে ক্ষুদে ক্ষুদে ছানাদের দেখে সেতুরও কুকুর পোষার শখ জেগেছিল। একটা নেওয়ার জন্য ভাবিকে রাজিও করে ফেলেছিল। কিন্তু কাজল তাতে বাধা হলো।
কুকুরে তার ভয়, ভয়ের চেয়ে ঘেন্না বেশি। বাড়িময় একটা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে, এখানে সেখানে মুখ দিচ্ছে, বাবাগো! ভাবতেই তার না কি গা গুলায়, বমি পায়। সেতুর বাড়িতে কুকুর আনা মানে তার খাওয়া দাওয়ার রুচিই শুধু নয়, সেইসঙ্গে তার মানসিক শান্তি ঘুচে যাওয়া। ক্রিয়েটিভ মানুষের জন্য মেন্টাল পিস অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া কুকুর থেকে রেবিস, সালমোনেলা, রিংওয়ার্ম, ব্রুসেলোসিস ইত্যাদি নানান রোগ ছড়ায়।
রোগগুলো কীভাবে ছড়ায় সবিস্তারে বলবার জন্য সে টেবিল থেকে সবুজ রঙের একটা নোটবুক টেনে নিয়েছিল। নানান বিষয়ের ওপর নোট টুকে রাখার জন্য ওরকম কয়েকটা নোটবুক আছে তার। ‘এই দেখো, এখানে বলেছে রেবিস ভাইরাসজনিত প্রাণঘাতী রোগ। যেটা কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। সালমোনেলা, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যা কুকুরের…’
‘ঠিক আছে, বুঝেছি।’
ওই তিনটে শব্দে কুকুর পোষার কাহিনিতে দাঁড়ি টেনে দিয়েছিল সেতু। কোনোরকম অশান্তি করেনি। পরিস্থিতি বিশেষে সেতু ভীষণরকমের মিতবাক। এবং তার ধৈর্য রীতিমত বিস্ময়কর। তার ওপর স্বামীকে নিয়ে সে যেন এক গোপন বাজি ধরে বসে আছে। বিয়ের আগে কাজল প্রথম সারির একটা প্রাইভেট ব্যাংকে খুব ভালো মাইনের চাকরি করতো। ওদের পরিচয় সেখানেই। গড়পড়তা মানুষের চাইতে আলাদা মনে হয়েছিল কাজলকে তার। সেই স্বভাবই এখন ওর ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে গোপন চ্যালেঞ্জে তাকে হারিয়ে দিতে উদ্যোত।
ফ্রিল্যান্স ফিনাইন্স কনসালটিঙের সিদ্ধান্ত নিয়ে হুট করে একদিন চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল কাজল। সেই থেকে ঘরে বসে আজগুবি নানান চিন্তাভাবনার জগতে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। সেতুর চাকরি আর শ্বশুর -শাশুড়ির রেখে যাওয়া এই ফ্ল্যাট বাড়ির ভাড়া না থাকলে স্বামীর খামখেয়ালিপনা অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে কতটা সম্ভব হতো সে জানে না।
ছুটির দিন বাদে খুব সকালে উঠে দুবেলার রান্না সেরে সেতুকে অফিস যেতে হয়। কাজের লোকের রান্না কাজল মুখেও তুলবে না। ছুটা বুয়া প্রতিদিন সেতু বাড়িতে থাকতে থাকতেই ঘরের কাজ সেরে বেরিয়ে যায়। সেতু অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কাজলকে বিছানা ছাড়ার তাগাদা দিতে থাকে। এই রুটিনই চলে আসছে দিনের পর দিন। স্ত্রীর যন্ত্রণায় কাজল উঠে বসে বটে, কিন্তু সেতু বেরিয়ে যেতেই আবার সে আয়েশি ঘুমে তলিয়ে যায়। দুপুরে বিছানা ছাড়ার পর সে রেফ্রিজারেটর থেকে খাবার নিয়ে গরম করে খায়। কফিতে চুমুক দিতে দিতে অনলাইনে মোটিভেশনাল নানা ভিডিও দেখে।
“বিলিভ ইন ইউরসেল্ফ,”
“ইউর টাইম ইজ কামিং”,
“ফেলিওরস আর স্টেপিং স্টোনস টু সাকসেস!”
কথাগুলো ওকে একধরনের আরামে ডুবিয়ে রাখে। তৃপ্তি নিয়ে ভিডিও দেখা শেষ করে সে প্রমাণ সাইজের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়নায় প্রতিফলিত জনের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘তুই পারবি কাজল। সাফল্য বেশি দূরে নয়, একদিন তুইও…’
নীরব নিস্তব্ধ আয়না চুপচাপ প্রতিদিন একই কথা শুনে যায়। একদিন হঠাৎ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে গেল।
আয়না হেসে উঠল শব্দ করে।
‘উফ আবারও! কতদিন ধরে এই এক জিনিস শুনছি ব্রো। তোমার ফাঁপা আত্মবিশ্বাসের রেকর্ড শুনতে শুনতে কান যে পেকে গেল। হ্যাভ সাম মার্সি ম্যান।’
কাজল চমকে ওঠে। আয়নাকে লক্ষ্য করে বলে,
‘আমি কি ঠিক শুনছি, তুমিই কথা বললে?’
আয়নার কাজল চোখ মটকায়।
‘ভবিষ্যত সিইও’র বুলি কপচানো কাহাতক একতরফা শোনা যায় বস্! তাছাড়া আমি তো তোমার সোলমেট, কিংবা ধরো ব্রেনমেট। একটুআধটু রিয়্যাকশন না দিলে তোমার উৎসাহের মুখ থাকে বলো! হা হা হা…’
সেদিন সন্ধ্যায় সেতু বাড়ি ফিরে দেখে কাজল ঘর আন্ধকার করে বসে আছে। বাতি জ্বেলে কাজলের লালচোখ, গোমড়া মুখ দেখে জানতে চায়,
‘কি হলো তোমার? শরীর খারাপ করলো নাকি!’
‘আয়নাও আমাকে নিয়ে মজা শুরু করেছে। আপমানজনক কথা বলেছে।’
সেতু রেগে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। সংক্ষেপে বলে ,
‘তাই বুঝি!’
‘তোমার কি আমাকে পাগল মনে হচ্ছে?’
‘সেকথা কখন বললাম!’
‘মুখে বললে না ঠিকই কিন্তু না বলার ভেতরের অর্থটা বোঝার মতো বোধবুদ্ধি আমার আছে।’
‘সে তো খুব ভালো। ওই বোধবুদ্ধি যদি কাজে লাগানোতে মনোযোগ দিতে, সবদিক থেকে ভালো হতো।’
কাজল আর কথা বাড়ায় না। চুপ করে যায়। মনে মনে ভাবে এই বাড়ির ঘরে ঘরে আযনা রাখা ভুল সিদ্ধান্ত। পরদিন সেতু অফিস চলে যেতেই সে মিস্ত্রি ডেকে বেডরুমের আয়না বাদে বাড়ির বাকি আয়নাগুলো খুলে ফেলে। তারপর যেন তার স্বস্তি হয়। সেদিন আর কাজ নিয়ে তার ভাবতে ইচ্ছা করে না। সিদ্ধান্ত নেয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবে। কিন্তু তার অধিকাংশ বন্ধুই কর্মজীবী, ছুটির দিন ভিন্ন ওরা কেউ কি তাকে সময় দেবে! যে দুজন বন্ধু কাজ সত্ত্বেও তাকে সঙ্গ দিতে পারতো, তাদের একজন শিমুল এখন কারাগারে আর বদি ফেরার। শিমুলের নামে হত্যা মামলা হয়েছে। ধরা পড়লে বদির নামেও তাই হবে নিশ্চিত। বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন রাখার জন্য এই শাস্তি বর্তমানে দেশের প্রচলিত আইন। রাজনীতির ভাবনা তার ভেতর বিরক্তি ছড়ায় । হতাশ হয়ে সে সিদ্ধান্ত বদল করে। কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে কাপড় পালটে বেরিয়ে পড়ে। এমন ডাস্কি আফটারনুনে সে কোথায় যেতে পারে? রাস্তার ওপাড়ে জমজমাট একটা ক্যাফের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ আকাশ পাতাল ভাবে। তারপর রাস্তা পেরিয়ে ক্যাফেতে গিয়ে ঢোকে। উপচে পড়া ভিড় ভেতরে। এসব জায়গাতে এলে বোঝা যায় দেশের বিপুল সংখ্যক লোকের কাজকর্ম নেই। অলস বসে বসে একপাল মানুষ দিব্যি গালগপ্পো করছে। ওকে দেখে একজন চটপটে ছোকরা বেয়ারা এগিয়ে এসে জানতে চাইল সিঙ্গেল না ডাবল? ডাবল বলে চারপাশে তাকালো সে। একা বললে অপরিচিত কারো সঙ্গে ভিড়িয়ে দেবে।
অর্ডারকৃত কফি, এগরোল সামনে নিয়ে বসে থাকে সে। মুখে তোলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা জাগে না। বরং আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করে ওর ঠিক পাশের টেবিলের লোকজনের আলাপ শোনার আগ্রহ নিয়ে সে কান পেতেছে। লোকগুলো রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে। একে অন্যের আয়নায় অনেককিছুর হিসাব খোঁজায় হন্য যেন। উত্তপ্ত কণ্ঠে একজন বলে উঠল, ‘আমারে আগে এইটা বোঝাও ল্যান্ডলক না, এইরকম একটা দেশরে কেন করিডর দেওন লাগে?’ বয়স্ক একটা কণ্ঠ তার জবাবে বলে ওঠে, ‘জাতিসংঘের হুকুম, দেওন লাগবে।’ উত্তেজিত কণ্ঠটি টিপ্পনি কাটে, ‘হুকুম জাতিসংঘের না কি শান্তির পায়রার বাপ আমেরিকার!’ কৌতুকভরে একজন বলে বসলো, ‘কিন্তু সবজির দাম কম।’ উত্তেজিত কণ্ঠটি আরেক পরত চড়লো, ‘তামশাতেই ডুবে থাকেন মিয়া। দেশটা যখন সত্য সত্য আক্রান্ত হইবো তখন বুইঝেন মজা। চিটাগাং যাইতেও তখন আমাদের ভিসা লাগতে পারে।’ টেবিলের চতুর্থজন মুখ খোলে, ‘আরেহ নাহ দেশে যুদ্ধ হইবো না। আরাকান বাহিনী এই পর্যন্ত আইবো মনে হয় না। আর ইন্ডিয়া পাকিস্তানের দৌড় কাশ্মীরের মাটি পর্যন্তই।’ বয়স্কের কণ্ঠে আফসোস ঝরে। ‘ইউনুস যখন গদিত বসলো ভাবছিলাম দেশের মানুষ শান্তিতে থাকবে। আয় উন্নতি বাড়বে। হইল উলটা। হাসিনার বদলে আমরা ভালো একজন শাসক চাইছিলাম। পাইছি তারও অধিক খারাপ। চিটাগাং পোর্টের দায়িত্ব যে বিদেশি কোম্পানিরে দেওয়া হইতেছে তার জন্য জনগণের মতামত নেওয়া হইছে?’ উত্তপ্ত কণ্ঠ ফস্ করে ওঠে, ‘‘অথচ শেখ মুজিবের জন্মদিন পালন হবে কি হবে না তা নিয়ে ফালাফালি কম দেখি নাই। ইউনুচ হইল ফ্যাসিস্টের বাপ।’ কৌতুকপছন্দ কণ্ঠটা এবার বলে, ‘তারেক ভাই আইস্যা পড়লে সব সমস্যার সমাধান হয়া যাবে ভাইসব। শুনছি তার কাছে জাদুর লাঠি আছে।’ ‘হ ওই লাঠি যখন পুন্দে ঢুকবো তখন বুঝবা জাদুগরের ক্ষেমতা…’
কাজল জানে এই মুহূর্তে দেশ নানা চড়াই উতরাই পেরোচ্ছে। কিন্তু সেসব নিয়ে ওর কোনো মাথা ব্যথা নেই। গত বছরের জুলাই আগস্ট জুড়ে কাজলের নির্লিপ্ততায় একটা পর্যায়ে সেতু বিরক্তি চেপে রাখতে পারেনি, প্রচণ্ড রাগ নিয়ে সে বলেছিল, ‘অন্তত প্রোফাইলটা লাল করে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাও।’ কাজল তাতেও ভ্রুক্ষেপ করেনি। দেশের বর্তমান কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিত্রিয়া নেই। আন্দোলনের পক্ষে থাকায় সেতু যে এখন বিস্তর অনুশোচনায় ভোগে, ইদানীং ওর আলাপে সেটা বোঝা যায়। গত পরশু ফোনালাপে সেতুকে বলতে শুনেছে, ‘ভাবতে পারছি না আমি, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নারীর প্রতিকৃতি বানিয়ে জুতোপেটা করা হচ্ছে। ভিডিওটা দেখে রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি জানিস! এই বাংলাদেশের জন্য তো আমরা আন্দোলন সমর্থন করিনি বকুল! অথচ দেখ সেটা নিয়ে মিডিয়া যথারীতি চুপ! আফগানিস্তান হতে দেরি নেই দেশের।’
কিছুক্ষণ ওপাশের কথা শুনে আবারও সেতু সরব হয়েছিল, ‘হ্যাঁ দেখলাম খবরটা– শিরক আর বেদা’ত আখ্যা দিয়ে শতবর্ষী একটা গাছ কেটে ফেলা হলো। হাসান ভাইয়ের কথাই হয়তো সত্যি বকুল, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, ধানমন্ডি বত্রিশ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ইত্যাদি ধ্বংসে নীরব থাকার অনিবার্য অভিঘাত এগুলো। আমরা আসলেই অভিশপ্ত জাতি…’
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার মুখে ক্যাশকাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর আলাপ থেকে গড়িয়ে আসা একটা নিরেট স্বীকারোক্তি কাজলের বুকে ধাক্কা দেয়। ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না, যুদ্ধ বুঝবো কেম্নে।’ কাজল গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, একাত্তরের মতো সর্বগ্রাসী যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যে জাতি ভুলে যায় তার কপালে শনির আসন স্থায়ী।
সেদিন সরাসরি বাড়ি না ফিরে কাজল এদিক ওদিক এলোমেলো হেঁটেছিল বহুক্ষণ। ভাবনাহীন, লক্ষ্যহীন হাঁটাহাঁটি। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ন’টা বেজে গিয়েছিল। ফেরার পর সেতু কিছুটা আশ্বস্ত ভাব নিয়ে জানতে চায়, ‘অনেকদিন পর বের হলে। কাজ ছিল বুঝি?’ সেতুকে আহত করতে ইচ্ছে হলো না। ছোট্ট একটা ‘হু’ ছুড়ে দিয়ে সে ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকেছিল।
পরদিন বেলা অবধি ঘুমিয়ে উঠে ব্রাঞ্চের পর ওর কেমন ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতি হলো। আয়নাগুলো নেই। স্লাইডডোরের কাচে নিজের ঝাপসা প্রতিচ্ছবিটা ঘুরে ফিরে স্পষ্ট দেখার চেষ্টায় সুবিধা হলো না। টেবিলে গিয়ে বসলো, নতুন অ্যাপ বানানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া যাক বরং। প্রকল্পের নাম সে ঠিক করে ফেলেছে, ‘মিররলেস মোটিভিশন।’ এর মাধ্যমে মানুষ আয়না ছাড়াই আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কৌশল শিখতে পারবে। কিন্তু তার প্ল্যানটা শুরু না হতেই হোঁচট খায়। অ্যাপ যে বানাবে, সে তো কোডিং দূরে থাক, Java, Kotlin অথবা Swift এর মাথামুণ্ডু কিছুই জানে না। হাল না ছেড়ে ভাবে, একটা বই লিখলে কেমন হয়! বইয়ের শিরোনামও চটজলদি মনে উঁকি দেয়। ‘ভাবুকের অন্তর্জগৎ ভ্রমণ।’ বিপুল উৎসাহে দু’পাতা লেখার পর তার মনে হয়, এই বই কি কেউ পড়বে?
কাজলের অন্যান্য পাগলামির মতো আয়না সংক্রান্ত পাগলামিও চুপচাপ মেনে নিয়েছে সেতু। ড্রেসিং ক্লজেটে নিজের জন্য সে একটা বড়সড় আয়না ঝুলিয়েছে। তা সত্ত্বেও ওর ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি ক্রমশ জমাট হতে থাকে। এভাবে চলতে পারে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা দরকার। কাজল ঘুমিয়ে পড়লে প্রায় রাতে সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়নাটা ওকে দেখলে আনন্দে কেমন খলবল করে ওঠে। মুখে যেন তার খই ফোটে। কাজলকে নিয়েও ওদের আলাপ হয়।
‘তোমার স্বামী আসলে অতটা খারাপ নয়। শুধু নিজের ওপর তার এক বিন্দুও বিশ্বাস নেই। কাজলের ধারণা আমিই ওর সর্বনাশ করেছি।’
সেতু ম্লান হাসে।
‘তুমি তো স্রেফ কাচ, কিন্তু তুমিই ওকে সবচেয়ে পরিষ্কার দেখতে পেয়েছো।’
দিন কয়েক পর এক সকালে ঘুম ভেঙে কাজল দেখে বেডরুমের আয়নাও উধাও। উধাও ক্লজেটেরটাও। বাড়ির কোথাও সে সেতুকে খুঁজে পায় না। নাইটস্ট্যান্ডের ওপর পায় সেতুর হাতে লেখা চিরকুট।
‘নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে বড় ক্লান্ত হয়ে গেছি। আয়নাগুলোও ক্লান্ত। কাজল, নিজের গন্তব্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করো, আয়না ছাড়া।’
কাজল চুপচাপ খাটে বসে থাকে। নিজেকে দেখতে না পাওয়াটা তার কেমন অদ্ভুত লাগে। সে আপন মনে বিড়বিড় করে, ‘তুই পারবি কাজল, দেখিস একদিন তুইও…’
কেউ আশ্বাস দেয় না, হেসেও ওঠে কেউ।