পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি (তৃতীয় ভাগ)

  • 20 May, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 343 view(s)
  • লিখেছেন : শংকর
বাস্তব হল বিজেপি বিরোধী দলগুলি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, কোনো রাজ্যেই ঐক্যবদ্ধ নয়। এর পেছনে তাদের নিজস্ব স্বার্থ আছে। বিজেপিকে হারানোটা যেমন তাদের স্বার্থ তেমনি নিজেকে সামনে এগিয়ে রাখাও তাদের স্বার্থ। এই দুটি স্বার্থ একে অন্যের সাথে এমনভাবে জুড়ে আছে যে, একটা থেকে অন্যটাকে পৃথক করা অসম্ভব। অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি (তৃতীয় ভাগ) লিখলেন শংকর। আগের লেখার সূত্র এই লেখার শুরুতে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত করার আদর্শ উপায় কী হতে পারে? অবশ্যই বিজেপি বিরোধী অফ্যাসিবাদী এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তিগুলির মহাজোট গঠন এবং একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থীর ভিত্তিতে নির্বাচন লড়া। এতে বিজেপি বিরোধী ভোট বিভাজনের কোনো সুযোগ থাকবে না। বিজেপি অনেক ক্ষেত্রেই এই বিভাজনের হাত ধরেই নির্বাচনে জিতে থাকে তা আমরা জানি। সুতরাং বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ করো না —- এই দাবি আমরা অনেক সময়েই করে থাকি। কিন্তু বাস্তবটা কী?

বাস্তব হল বিজেপি বিরোধী দলগুলি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, কোনো রাজ্যেই ঐক্যবদ্ধ নয়। এর পেছনে তাদের নিজস্ব স্বার্থ আছে। বিজেপিকে হারানোটা যেমন তাদের স্বার্থ তেমনি নিজেকে সামনে এগিয়ে রাখাও তাদের স্বার্থ। এই দুটি স্বার্থ একে অন্যের সাথে এমনভাবে জুড়ে আছে যে, একটা থেকে অন্যটাকে পৃথক করা অসম্ভব। যারই একটু জোর বেশি সে-ই মনে করে যে, আমি একার জোরেই বিজেপিকে আটকে দিতে পারব। বিজেপি বিরোধী একাধিক দলের মধ্যে অনেক সময়েই দেখা যায় যে, দুটি দল যদিও বা একজোট হবার সিদ্ধান্ত নিল, তৃতীয়টি নিল না। ফলে সার্বিক জোট হল না। নিজের ক্ষমতা এবং শত্রুর ক্ষমতার ফারাক বা ভারসাম্য নিয়ে বিষয়ীগত ধারণা (subjective understanding) বা মনমর্জিগত ধারণাই এর জন্য দায়ি। আবার সব সময়ে বিষয়টি এত সরলও নয়, বেশ জটিল। একটা উদাহরণ নেওয়া যাক।

রাহুল গান্ধী সর্বভারতীয় বিজেপি বিরোধী নেতাদের মধ্যে আদর্শগতভাবে যারা বিজেপি-আরএসএসকে বিরোধিতা করেন তাদের একজন। তিনি বেশ সুন্দর সুন্দর কথাও বলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কংগ্রেসকে তিনি বামেদের সাথে জোট গঠন না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কেন? কারণ তার কাছে পালস্ রিডিং ছিল এবারে কংগ্রেস কেরালায় জিততে পারে। কেরালায় কাদের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের লড়াই? বামেদের বিরুদ্ধে। সুতরাং কংগ্রেস যদি পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সাথে জোটে থাকে তাহলে কেরালায় বামেদের বিরুদ্ধে অল আউট আক্রমণে যেতে তাদের অসুবিধা হবে। কংগ্রেসের সাথে তৃণমূলেরও জোট হবে না, তৃণমূলই সেটা করবে না। ফলে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস একলা লড়ল। 

ফল ঘোষণা হতে দেখা গেল কেরালায় কংগ্রেস জিতে গেল। তাহলে বলতেই হবে যে, রাহুল গান্ধীর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এখন প্রশ্ন হল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ না করা (বা যথাসম্ভব অটুট রাখার চেষ্টা করা) নাকি অন্য আর একটা রাজ্যে ক্ষমতায় আসার সুযোগ থাকলে তাকে আঁকড়ে ধরা  কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কেউ বলতেই পারেন বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ না করাটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ। একদিক থেকে কথাটা সঠিক। আমাদের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেটাই কাম্য। কিন্তু প্রশ্ন হল এই তিনি নিজে যদি কোনো পার্টি করতেন তাহলে তার নিজের পার্টি কি তাই করত? পার্টিহীন অ-পার্টি ব্যক্তিরা এমন কথা বলতেই পারেন কিন্তু কোনো পার্টিই কি তাই করবে? বক্তা যদি পার্টি করতেন তাহলে তিনি কি নিজেই তা করতেন? বিষয়টি জটিল। 

আবার দেখুন তামিলনাড়ুতে কী হল! ডিএমকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। স্তালিন নিজেই হেরে গেলেন। থালাপতি বিজয়ের সদ্যজাত অরাজনৈতিক পার্টি (party without ideology — AAP এর মত) তরুণ ভোটারদের ওপর ভর করে বৃহত্তম পার্টি হল কিন্তু তারাও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। এবারে হল মজার ঘটনা। যে কংগ্রেস ডিএমকের সাথে জোট বেঁধে নির্বাচনে লড়ল তারা মন্ত্রীসভা গড়ার জন্য বিজয়কে সমর্থন করলেন। বামেরাও তাই করল। এতে ডিএমকে ভয়ানক চটে গেলেন INDIA জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। ডিএমকের যুক্তি কী? তারা বললেন কংগ্রেস অনৈতিক কাজ করেছে। নির্বাচনে ডিএমকের সাথে একসাথে লড়লেও যেই সরকারে যাবার সুযোগ এল অমনি ডিএমকের হাত ছেড়ে দিতে তারা দ্বিধা করল না। তাদের ক্ষোভ সঙ্গত। আবার কংগ্রেসের যুক্তি কী? কংগ্রেসের যুক্তি হল বিজয়কে সরকার গড়তে যদি বিজেপি বিরোধী দলগুলি সাহায্য না করে তাহলে বিজেপি সঙ্গী এআইডিএমকে এগিয়ে আসবে এবং তামিলনাড়ুর সরকারে ঘুরপথে হলেও বিজেপির একটা কব্জা তৈরি হয়ে যাবে। এটাও ফেলে দেবার মত কথা নয়। সুতরাং, বিষয়টা জটিল। 

আবার পশ্চিমবঙ্গের কথায় আসুন। এখানে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২১৫ টি আসন এবং ৪৮ শতাংশ ভোট। সিপিআইএম এবং কংগ্রেস কোনো আসন পায় নি। এখন, এবারের নির্বাচনে ধরা যাক বিজেপি বিরোধী সমস্ত দলগুলো বৈঠকে বসল একসাথে নির্বাচনে লড়াই করার জন্য। প্রথমত এই জোটে তৃণমূল যোগ দেবে কেন? তারা একমাত্র যোগ দিতে পারে এই শর্তে যে, সমস্ত দলগুলো আগেরবার যে যে আসনে জয়লাভ করেছিল এবারেও তারা সেই সেই আসনেই লড়বে। আর যে ৭৭টি আসনে বিজেপি জিতেছিল সেখানে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ের স্বার্থে যারা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এই শর্তে। গতবার ৪টি আসনে সিপিএম দ্বিতীয় হয়েছিল আর ৭টি আসনে কংগ্রেস দ্বিতীয় হয়েছিল। সিপিএম যাদবপুর, রাসবিহারী, বালি এবং কামারহাটিতে দ্বিতীয় হয়েছিল। কিন্তু এই চারটি কেন্দ্রেই জিতেছিল তৃণমূল, বিজেপি নয়। আবার কংগ্রেস যে সাতটি কেন্দ্রে দ্বিতীয় হয়েছিল যেমন সমসেরগঞ্জ, সুতি, ডোমকল, ভরতপুর, রেজিনগর ইত্যাদি সেখানেও জিতেছিল তৃণমূল, বিজেপি নয়। বিজেপির জেতা আসনগুলিতে সবকটাতেই দ্বিতীয় স্থানে ছিল তৃণমূল। তাহলে গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা অনুযায়ী এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে সিপিএম এবং কংগ্রেস কোনো আসনেই লড়তে পারত না। ভাবুন, তারা গোটা রাজ্য জুড়ে জানপ্রাণ দিয়ে খাটবে কোনো আসনেই না লড়ে। এটা সোনার পাথরবাটি নয় কি? 

দ্বিতীয়ত, ধরুন কোনো এক জাদুবলে সেটাই হয়ে গেল। এভাবে একটা নির্বাচনে বিজেপিকে হারানো গেল।পাঁচ বছর পর পরের নির্বাচনে কী হবে? সেই একই জিনিস হবে। বিজেপিকে হারানোর জন্য আপনাকে তৃণমূলের ওপরই নির্ভর করতে হবে। আর তৃণমূল বিজেপি-RSS কে খোলা ময়দান ছেড়ে দেবে। তাদের নীতিগুলিই রাজ্যে লাগু করে চলবে। আর বিজেপি বিরোধী সকল শক্তিকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সেই তৃণমূলের ওপরই নির্ভর করতে হবে বিজেপিকে হারানোর জন্য। এভাবে দশকের পর দশক কেটে যাবে। তাই তো? 

কেউ বলতে পারেন, তা কেন? এর মধ্যে অন্যান্য দলগুলি তাদের শক্তি বাড়াবে। সে তো হতেই পারে কিন্তু কথা হল আপনার শক্তি বা সংগঠনের ওপর তো ঠিক হচ্ছে না আপনি বিজেপি বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে কতগুলো আসনে লড়বেন। ঠিক হচ্ছে আগের নির্বাচনে কতগুলি আসনে আপনি জিতেছিলেন বা দ্বিতীয় হয়েছিলেন তার ওপর। এ ছাড়া আর কোনো গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তো নেই। সুতরাং, যে পার্টি জোট তৈরি হবার পর প্রথম নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রেই লড়ে নি সে আর কোনো নির্বাচনেই কোনো কেন্দ্রে লড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। কিন্তু আশা করতে হবে যে, তার সংগঠন বজায় থাকবে, বাড়বেও, আবার বছরের পর বছর, নির্বাচনের পর নির্বাচন সে জানপ্রাণ দিয়ে খাটবে তৃণমূলকে জেতানোর জন্য —- বিজেপিকে হারানোর স্বার্থে! এ জিনিস হয়? কেউ রাজি হবে?

আবার সংগঠন বাড়াতে গেলে, রাজনৈতিকভাবে এগোতে গেলেই তৃণমূলের সন্ত্রাসের সামনে পড়তে হবে। তারা মেরে পিটে উলটো করে ঝুলিয়ে সিধে করে দেবে। দুটি নির্বাচনের মধ্যবর্তী পাঁচ বছরে আপনাকে সেই তৃণমূলের বিরুদ্ধেই একটার পর একটা লড়াই লড়তে হবে। কখনও কামদুনি, কখনও আরজিকর, কখনও চাকরি চুরি, কখনও শিক্ষা, কখনও স্বাস্থ্য and so on. 

কিন্তু পাঁচ বছর পর এই পর্ব শেষে আবার যখন নির্বাচন আসবে তখন আপনাকে আবার তৃণমূলকেই জেতানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এই যুক্তিতে যে, যত যাই হোক, তৃণমূল মারুক, ধরুক, ধর্ষণ করুক, দুর্নীতি করুক, শিক্ষা স্বাস্থ্য জীবিকা সব বেহাল করে দিক, তারা তো আর যাই হোক ফ্যাসিবাদী নয়। সুতরাং, ফ্যাসিবিরোধী সকল শক্তির ঐক্য করতে অসুবিধা কোথায়! 

এবারে বলুন এটা কেউ মেনে নেবে? আমি (মেকি বাম) সংশোধনবাদী সিপিএমের কথা বলছি না, কোনো (প্রকৃত বাম) কমিউনিষ্ট বিপ্লবী শক্তিই কি এটা মেনে নিতে পারবে, না মেনে নেওয়া উচিৎ? এটাকেই কি ফ্যাসিবিরোধী ঐক্য বলে? এটাই কি ডিমিট্রভের লাইন? সুতরাং, ভেবে কথা বলুন। কথা কম বলুন ক্ষতি নেই, কিন্তু ভেবে বলুন। 

সুতরাং, আমরা যে নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগ না হওয়ার দাবি করছি, আমাদের মাথায় রাখতে হবে এটা একটা ইউটোপীয়া। এটা একটা ideal reality কিন্তু imaginary reality। concrete reality নয়। তাহলে আমরা এই imaginary reality দাবি করছি কেন? কারণ, সমস্ত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই একটা আদর্শ অবস্থা ধরে না নিলে বাস্তব রাজনীতিতে প্রয়োজনের খাতিরে আপনি কতটা deviate করবেন, কতটা deviate করাটা অনুমোদনীয় তা বোঝার জন্য। কিন্তু সেই ideal reality টাকে ধরে নিয়ে আপনি রণকৌশল নির্ধারণ করতে পারেন না। আপনাকে রণকৌশল তৈরি করতে হবে concrete realityর ওপর দাঁড়িয়েই। 

বিমূর্ত আলোচনায় বিষয়টা অনেকের কাছে দুর্বোধ্য লাগতে পারে। তাই আমাদের বাস্তব জীবনের একটা উদাহরণ দিই। ধরুন আপনি যে বাইকটা চালাচ্ছেন আদর্শ পরিস্থিতিতে তার এক লিটারে ৬০ কিলোমিটার যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সে চলে ৫০ কিলোমিটার। ফলে আপনাকে পেট্রোল ভরতে হবে ঐ ৫০ কিলোমিটারের হিসাবেই। ৬০ কিলোমিটারের হিসাবে পেট্রোল কিনলে আপনি একটা বোকা ছাড়া আর কিছু নন। তাহলে কোম্পানী ঐ ৬০ কিমি মাইলেজের আদর্শ লাইনটা draw করেছে কেন? কারণ বাস্তবে আপনি কতটা ডেভিয়েট করছেন তার মাপজোখের জন্য। আপনি যদি ৫০ -এ থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই ঘাবড়াবেন না, কিন্তু যদি সেটা ২৫-এ নেমে যায় তাহলে নিশ্চয়ই বাইকটাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। যদি ঐ আদর্শ মাইলেজের হিসাবটা না থাকত তাহলে আপনার বিপদ সম্পর্কে কোনো হুঁশই থাকত না। সকল বিজ্ঞান এভাবেই চলে, রাজনীতিও এভাবে চলে। 

সুতরাং, বিরলতম মূহুর্ত ছাড়া ফ্যাসিবিরোধী ভোট নির্বাচনে ভাগ হবেই। আপনাকে তার ওপর দাঁড়িয়েই অঙ্ক কষতে হবে। 

(চলবে)

আগের পর্বের সূত্র

অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি (দ্বিতীয় ভাগ)

0 Comments

Post Comment