পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি (প্রথম ভাগ)

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : শংকর
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘পদত্যাগ করব না। আমরা হারি নি।’’ নমমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় কোনো সারবত্তা নেই এমন নয়। বিস্তারিত আলোচনায় এক্ষুনি যাচ্ছি না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪১ শতাংশের মত ভোট, আর বিজেপি পেয়েছে ৪৫ শতাংশের মত ভোট। ফারাক মাত্র ৪ শতাংশের। আর SIR প্রক্রিয়ায় ভোটার লিস্ট থেকে বাদ গেছে ১০ শতাংশ ভোটার। অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি (প্রথম ভাগ) লিখলেন শংকর।

এই বাদ যাওয়া ভোটারদের অধিকাংশই একদম টার্গেটেড —- নিশানা বানিয়ে সরানো। যদিও এর মধ্যে কো-ল্যাটারাল ড্যামেজও আছে। এর আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ আগামী দিনে হবে। কিন্তু একটা আন্দাজ এতে করে পাওয়া সম্ভব। রাহুল গান্ধীও বলেছেন SIR বিরোধীদের হারানোর একটা ছক। 

নির্বাচন কমিশনকে কুক্ষিগত করে কোনো পার্টি তাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগালে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থায় সব কিছুই করা সম্ভব। SIR-এর পরেও বিজেপি নিশ্চিন্ত ছিল না। তারা গণনাতেও ব্যাপক কারচুপি চালিয়েছে। তার বহু নিদর্শন আমরা দেখেছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাউন্টিং এজেন্ট প্রিয়দর্শিনী হাকিমের ভিডিও আমরা সকলেই দেখেছি। অন্য জায়গার কাউন্টিং এজেন্টদের অভিজ্ঞতাও শুনেছি। গণনায় যে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে কমিশন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ যোগসাজসে তা আমরা দেখেছি। 

অনেকে বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্তফা না দিয়ে ছেলেমানুষী করছেন। আমি তা মনে করি না। দাবি সঠিক হলে সিস্টেমের ভেতরে অন্তর্ঘাত চালানো যথেষ্ট ইতিবাচক রাজনীতি। কিছু লোক (বিশেষ করে বামপন্থীদের কথা বলছি) এত নিয়মতান্ত্রিক ভাবনায় আচ্ছন্ন যে, তারা নির্বাচন কমিশনকে প্রবল শ্রদ্ধা করে, সেনাবাহিনী দেখলে মাথা ঠুকে পেন্নাম জানায়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে কোনো অন্তর্ঘাত যে চালানো যায় এবং চালানো উচিৎ তা তারা বিশ্বাস করতেই চায় না। আমাকে একজন বলতে এসেছিলেন বুদ্ধবাবু খুবই ভদ্রলোক ছিলেন, বিকেল ৪.৩০-এ পদত্যাগ করে এসেছিলেন। আমি ওনাকে বললাম, প্রথমত বুদ্ধবাবুর সময়ে এত মারাত্মক অভিযোগ ওঠে নি। দ্বিতীয়ত, আমাদের ভদ্রলোকদের থেকেও কমিউনিষ্টদের দরকার বেশি। উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘'আপনি কি মমতাকে কমিউনিষ্ট বলছেন?’’ আমি বললাম, “একেবারেই নয়। কখনই বলি নি। কিন্তু আপনাকে অকমিউনিষ্ট বলছি।” উনি অবশ্য তাতে রাগ করেন নি। একজন ঘোষিত কমিউনিষ্টকে ‘অকমিউনিষ্ট’ বললে কথাটা আর অশ্রদ্ধাসূচক বলে সম্ভবত তার মনে হয় না। 

যাক সে কথা।

প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। মমতা পদত্যাগ না করার যে সিদ্ধান্তটা নিলেন তার পেছনে মানুষ নেই কেন? এইটা প্রশ্ন। এই যে সিদ্ধান্তটাকে আজ লোকে বেকার নাটক বলে মনে করছে সেটাই যদি রাস্তায় দুর্বার গণ-আন্দোলন দ্বারা সমর্থিত হত তাহলে এই পদক্ষেপটাই ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটা মাইল-ফলক হিসাবে বিবেচিত হত। কিন্তু মুশকিল হল যে, গণ-আন্দোলন করতে গেলে একটা নৈতিক জোর লাগে যেটা আজ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেই। 

কেন নেই?

কারণ, ২০১১ সালের পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধ্বংসযজ্ঞের পুরোহিত হিসাবে কাজ করে এসেছেন। তার নিশ্চয়ই মনে পড়বে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা। ভাঙড়ে পঞ্চায়েত নির্বাচনের নমিনেশন জমা করতে গিয়ে যে মারামারিটা হল তাতে আমি দ্বিতীয়বার জেলে। দ্বিতীয় দফাতেও যখন নমিনেশন জমা করা গেল না তখন শর্মিষ্ঠারা হাইকোর্টে কেস করল। হাইকোর্টের নির্দেশে যখন ডিএম অফিসে গেল নমিনেশন জমা করতে তখন তখন সেখান থেকেই তৃণমূলের দুষ্কৃতিরা ওদের তুলে নিয়ে গেল। নমিনেশন ফর্ম তৃতীয়বারের মত ছিঁড়ে ফেলা হল। শর্মিষ্ঠাসহ কমরেডদের তিন ঘন্টা আটকে রেখে বেধড়ক মারধোর করা হল। জামা-কাপড় ছিঁড়ে দেওয়া হল। নমিনেশনের সময় পার করে ছাড়া হল। সেই অবস্থাতেই ওরা সন্ধ্যেবেলা সেখান থেকে থানায় গিয়ে FIR করে পরের দিন আবার হাইকোর্টে হাজির হলে হাইকোর্ট যাদের নমিনেশন পেপারগুলো আগের দিনের মারধোরের মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেওয়া গেছিল তাদের নাম প্রার্থী হিসাবে বিবেচনা করার কড়া নির্দেশ দেয়। এভাবে আমরা পঞ্চায়েতের ১৬-টা আসনের মধ্যে ৮-টাতে লড়তে পারি। তার মধ্যে ৫-টাতে জিতি, আর ৩-টে আসনের বুথগুলো পুলিসকে সঙ্গে নিয়ে আরাবুলরা দখল করে নিতে হেরে যাই। এই তো ছিল অবস্থা। শুধু আমাদের সাথেই নয়। গোটা রাজ্যে সমগ্র বিরোধীদের ওপরই এই জিনিস হয়েছে। 

কাউন্টিং-এ কী হয়েছিল? 

কাউন্টিং-এ আমাদের কোনো এজেন্ট যেতেই পারে নি। কাউন্টিং-এ যখন দেখা গেল আমরা জিতে গেছি তখন তৃণমূলের লোকেরা চাপ সৃষ্টি করে ফলাফল ঘুরিয়ে দিতে হবে। কাউন্টিং-এ এজেন্ট না থাকলে ওরা তাই করে। কিন্তু এবারে মেশিনারি বেঁকে বসল। কমিশনের লোকেরা বলে দিলেন, ‘'অনেক হয়ে গেছে। আর হবে না।” এই তো অবস্থা। 

এগুলো করেছেন বলেই আজ যখন বড় খিলাড়িরা এসে গেছে তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা অসহায় হয়ে গেছেন। বন্ধুহীন হয়েছেন। সমর্থনহীন হয়েছেন। 

আয়ার্ল্যান্ডের প্রশ্নে মার্কস ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণিকে সতর্ক করেছিলেন এই বলে, “যারা অন্যদের ওপর নিপীড়ন চালায় তারা নিজেদের ওপর চলা নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াই লড়তে পারে না।” 

পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস আগামী ফ্যাসিবাদী শাসনের জমিকে উর্বর করেছে। ফ্যাসিবাদী কায়দাগুলোকে বৈধতা দিয়েছে। তাই আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়দের ক্ষমতা নেই গণ-আন্দোলনের ডাক দেবার। তিনি নাকি আবার সুপ্রীম কোর্টে যাবেন। হায়! 

কোন সুপ্রীম কোর্ট? যে সুপ্রীম কোর্ট বাঙলা দখলের ফ্যাসিবাদী প্রকল্পের এক গুরুতর অংশীদার সেই সুপ্রীম কোর্ট! 

সুপ্রীম কোর্ট পাঁচ মিনিটে ঘর থেকে বের করে দেবে। 

স্ক্রোলের গবেষণা এর মধ্যেই এসে গেছে। ১০৪-টি আসনে বিজেপির জয়ের মার্জিনের থেকে SIR-এ বাদ পড়া লোকের সংখ্যা বেশি। তারপরেও ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকা সুপ্রীম কোর্ট! 

অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি। 

(চলবে)

0 Comments

Post Comment