পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পিএম কিষাণ : শাসক-রাজনীতির ট্র্যাপিজে রিলিফের ঠমক

  • 02 January, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 265 view(s)
  • লিখেছেন : মনসুর মন্ডল
কৃষি ও কৃষকের উন্নতি যতটুকু সম্ভব, তা রিলিফ বা অনুদানের ব্যাপার নয়। তার জন্য কৃষিতে কৃষক-স্বার্থবাহী সংস্কার প্রয়োজন। কৃষি-উৎপাদন থেকে কৃষিপণ্যের বিপণন মায় কৃষকের ফসলের যথার্থ লাভজনক মূল্যের নিশ্চয়তা পর্যন্ত কৃষক-স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার চাই।

পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের কৃষক বন্ধু নামে প্রকল্পটির সঙ্গে কেন্দ্র সরকারের প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি যোজনা, বহুল চর্চায় পিএম কিষাণ-এর ভালোই গণ্ডগোল চলছে, কারণ, এ রাজ্যের কৃষকরা নাকি তার সুযোগ পাচ্ছে না। তবে এরাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনী ইস্যুতে পিএম কিষাণ-এর ভারী কদর হবে, এটা অবধারিত। কিন্তু দিল্লি অভিমুখী কৃষক আন্দোলনের ধকল সামলাতে তারা কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো এ নিয়ে ইস্যু পাকানোর কসরত শুরু করে দিল। খোদ মন কি বাত-এ এরাজ্যে পিএম কিষাণ বরবাদ হওয়ার কথা তুলে হাহুতাশ ও রাজ্য সরকারের বদনাম শোনা গেল। আর শুরু হয়ে গেল কেন্দ্র-রাজ্য বাগযুদ্ধ।

কৃষক-প্রীতির রাজনীতিটা জনতার মন্দ লাগে না, যখন তা কিছুটা অন্তত ‘রিলিফ’ কৃষকদের ঘরে পৌঁছে দেয়। সেই সুবাদে কেন্দ্র-রাজ্য দ্বৈরথে এটা বোঝানোর কসরত ঠাসা যে, কৃষকদের হাতে টাকার ওপর সিকিটা চাপাতে উভয়ে বড়ই উৎসুক।

পিএম কিষাণ—বছরে তিনটি সমান কিস্তিতে মোট ৬ হাজার টাকা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের দেওয়ার প্রকল্প। কৃষিজমির ঊর্দ্ধসীমা ২ হেক্টর পর্যন্ত। প্রকল্পে ষাটোর্দ্ধ বয়সকালে মাসিক ৩ হাজার টাকা পেনশন (PMKMY) দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ভারতে প্রায় ৮৬.২ শতাংশ কৃষিজোত ২ হেক্টরের মধ্যে। স্বভাবতই ভারী সংখ্যক কৃষকের হাতে প্রকল্পের অর্থ পৌঁছনোর কথা। ফলে এ নিয়ে প্রচারে জেল্লা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী নিজে অনলাইন ডিসবার্সে হাত লাগাচ্ছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে পিএম কিষাণ-এ কোটি কোটি টাকার (এক তামিলনাড়ুতেই ১১০ কোটি ) দুর্নীতির খবর বের হয়ে আসা শুরু হয়েছে। পিএম কিষাণ-এ আধার যোগ বাধ্যতামূলক। এটাই দুর্নীতির আসল জায়গা অথচ খবরের কাগজের সম্পাদকীয় থেকে বিরোধী কোনও রাজনৈতিক দল এই আধার দিয়ে যে পিএম কিষাণের দুর্নীতি হচ্ছে তা নিয়ে একটা শব্দও বলছে না। ট্রাই এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান বা অন্য অনেক মানুষের অ্যাকাউন্টে এই পিএম কিষাণের টাকা ঢুকেছে এটা কিন্তু দিনের আলোর মতো সত্যি। আরও বড় সমস্যা হল, বহু কৃষক এই প্রকল্পে ঢুকতে পারছে না। প্রকল্পটির সুবিধা পেতে আধার ছাড়াও লাগে ভোটার আইডি, নিজ নামে জমির পরচা ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। মুশকিল জমির কাগজ নিয়ে। সব রাজ্যেই বহু কৃষকের দখলিকৃত জমির কাগজ নেই। সমস্যাটা বেশি দেখা যায় আদিবাসী ও অতি গরিব কৃষকদের ক্ষেত্রে। বহু কৃষক উত্তরাধিকার সূত্রে জমি চাষাবাদ করে থাকে। কিন্তু জমির রেকর্ড (পরচা) পূর্বপুরুষের নামেই রয়ে গেছে। জমি কিনে চাষ করছে, কিন্তু বকেয়া খাজনা বা অন্য জটিলতায় জমির রেকর্ড সম্পন্ন হয়নি, এমন কৃষকও কম নেই। ফলে এইসব কৃষকদের পিএম কিষাণ-এ আবেদন করার সুযোগ থাকছে না। এজন্য ১২.৫ কোটি কৃষক পিএম কিষাণ পাবে বলে সরকারি ঘোষণা সত্ত্বেও নাম নথিভুক্ত হয়েছে ৯ কোটির কৃষকের । কৃষক বন্ধু-র ক্ষেত্রেও এরকম জমির সমস্যায় বহু কৃষক প্রকল্প-ছুট হয়ে আছে। অতি সম্প্রতি রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির পরচা পূর্বপুরুষের নামে থাকলেও কৃষক বন্ধু মিলবে। এরপরও কিন্তু জমির কাগজের সমস্যার পুরোপুরি নিষ্পত্তি হচ্ছে না। প্রচারের জাঁকজমকে এসব আড়ালে থেকে যাচ্ছে। শাসক-অভিপ্রায়ে রিলিফ-অনুদানের বহর সতত এরকমই হয়ে থাকে।

কৃষক বন্ধু-তে সমস্ত স্তরের কৃষকদেরই সমান দু’টি কিস্তিতে অনুদান দেওয়া হয়-- মোট ন্যূনতম ২ হাজার টাকা (১ থেকে ৩৯ শতক পর্যন্ত জমির ক্ষেত্রে) থেকে শতকে ৫০ টাকা হিসেবে সর্বোচ্চ ১০০ শতক ( ১ একর) পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা। সেইসঙ্গে আছে ২ লক্ষ টাকা মৃত্যু বিমা। কৃষক বন্ধু-তে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কোনো অগ্রাধিকার নেই, কৃষক সহায়তার প্রশ্নে এই শ্রেণির কৃষকদের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্র সরকারও সমস্ত স্তরের কৃষকদের পিএম কিষাণ-এর আওতায় আনবে বলে সাম্প্রতিক খবর। আগে হোক বা পরে, শ্রেণি-ভাবনাকে গুলিয়ে দিতে শাসক-ভাবনার বিশেষত্ব থাকবে না, তা হবার নয়। পিএম কিষাণ পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা যে পাচ্ছে না, এও শাসক-ভাবনার এক অদ্ভুত রঙ্গ।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অসহযোগিতার ফলে এখানে কৃষকরা পিএম কিষাণ-এর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রাজ্য সরকারের ভাব-গতিক থেকেও পরিষ্কার, কেন্দ্রীয় প্রকল্পটি নিয়ে সরকারের অনীহা আছে। পিএম কিষাণ-এর নিয়ম অনুসারে রাজ্য সরকার একজন নোডাল অফিসার নিয়োগ করা এবং নোডাল অফিসার ও ব্লক-ভিত্তিক রাজস্ব আধিকারিকের কাছে কৃষকদের নাম নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়নি। পক্ষান্তরে কেন্দ্র সরকার এ নিয়ে কতটা আগ্রহী, সে প্রশ্নেরও অবকাশ থেকে যায়। পিএম কিষাণ-এর জন্য কেন্দ্র সরকারের অনলাইন পোর্টাল আছে। এই পোর্টালের মাধ্যমেই সমস্ত কৃষকের আবেদন নথিভুক্ত করা হয়। রাজ্যের নোডাল অফিসার ও রাজস্ব অধিকারিক ছাড়াও কমন সার্ভিস সেন্টার (CSC)-তে কৃষকরা প্রয়োজনীয় তথ্যাদিসহ সরাসরি নাম নথিভুক্ত করতে পারে। সব ক্ষেত্রেই নাম নথিভুক্তির পর রাজ্য সরকারের মাধ্যমে আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও যর্থাথতা নিরূপণ (Identification & Authentication)-এর পর আবেদন মঞ্জুর করা হয়।

এক্ষেত্রে অন্তত কৃষকরা যদি সরাসরি নাম নথিভুক্ত করতে পারত, তা হলে রাজ্য সরকারের ওপর সেটা চাপের ব্যাপার হত। (কোথাও কোথাও কেউ কেউ সিএসসি-তে নাম নথিভুক্ত করেছে, এ দৃষ্টান্ত আছে। বিষয়টা প্রায় সবারই জানা না থাকার ফলে সংখ্যাটা অতি নগণ্য।) কিন্তু কেন্দ্র সরকারের থেকে পিএম কিষাণ নিয়ে সঠিক প্রচারে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে না। মন কি বাত-এ পিএম কিষাণ নিয়ে শুধু বাতেলাই চলতে পারে। মানে এখানেও সেই অনীহা। অনীহার কী বা কারণ, খুঁজতে গেলে দেখব রিলিফের রাজনীতির ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ’।

বাস্তবিক, পিএম কিষাণ নিয়ে কেন্দ্ররাজ্যের মধ্যে দড়ি টানাটানির কারণ যত না পিএম কিষাণ রূপায়ণ, তার থেকে বেশি কৃষক বন্ধু। চলতি ব্যবস্থায় সরকারের ভালোমন্দের বিচারে অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে পিএম কিষাণ বা কৃষক বন্ধু-র মতো প্রকল্প-কর্মসূচি। তখন পিএম কিষাণ হলে কৃষক বন্ধু-র আলাদা জায়গাটা থাকবে না। ভোটের বাজারে তার কদর থাকবে না। উল্টো দিকেও ব্যাপারটা এরকমই। কৃষক বন্ধু সাপেক্ষে পিএম কিষাণও ক্ষমতার অঙ্কে টাকার ওপর সিকি চড়াতে পারবে না। বরং দড়ি টানাটানিতেই রাজনীতির চমক আছে।

সরকার থেকে কৃষকদের রিলিফ দেওয়া প্রকারান্তরে কৃষিতে কৃষকদের কোনো রকমে টিকে থাকার নিয়তিতে বেঁধে রাখার রাজনীতি। সেখানে অভাবি কৃষকদের আয় বৃদ্ধির নামে আধাখেঁচড়াভাবে দৈনিক ১৬ টাকা ৬৬ পয়সার পিএম কিষাণ-এর মতো প্রকল্পই সার। চলতি ব্যবস্থার মধ্যে কৃষি ও কৃষকের উন্নতি যতটুকু সম্ভব, তা রিলিফ বা অনুদানের ব্যাপার নয়। তার জন্য কৃষিতে কৃষক-স্বার্থবাহী সংস্কার প্রয়োজন। কৃষি-উৎপাদন থেকে কৃষিপণ্যের বিপণন মায় কৃষকের ফসলের যথার্থ লাভজনক মূল্যের নিশ্চয়তা পর্যন্ত কৃষক-স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার চাই। এই দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের পরিণামে দেশের কৃষিতে নেমে এসেছে গতিরুদ্ধতা ও বিরাট শূন্যতা। এই অবস্থার একটা বিপদ এই যে, কৃষির এই ভগ্নদশাকে সুযোগ হিসাবে কাজে লাগিয়ে মোদি সরকার কর্পোরেট-মুখী তিনটি নতুন কৃষি আইন লাগু করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।

এই যখন বাস্তবতা, তখন নিতান্ত অনুদান নিয়ে মানুষ সরকারের কাছে সদিচ্ছাটুকু আশা করেই থাকে। কিন্তু সে-আশার মুখে ছাই দিতে শাসক-রাজনীতির বিচিত্র বাহাদুরি চলছেই।

0 Comments

Post Comment