পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অ্যাটলাস সিংহের গর্জন, প্যালেস্টাইনের পতাকা ও একটি স্বপ্নের দৌড়

  • 13 December, 2022
  • 1 Comment(s)
  • 1492 view(s)
  • লিখেছেন : নাফিস আনোয়ার
কেন মরক্কানদের হাতে প্যালেস্টাইনের জাতীয় পতাকা! কী সম্পর্ক দু'দেশের? কেন 'আরব বিশ্ব' এক সুতোয় বেঁধে দেয় আফ্রিকা এশিয়ার ১৮-২০ টা দেশকে? সে কথা জানতে তো ইতিহাস ঘাটতে হবে অনেক পেছনের। অ্যাটলাস পর্বতের ওধারে লাল সিংহের গর্জন কীভাবে 'অন্ধকার মহাদেশ' ( ইউরোপের দেওয়া নাম) পেরিয়ে এশিয়ার ভূখন্ডকে উদ্বেল করে দিতে পারে, সেই সঙ্গে জুড়ে নিতে পারে সারা বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রের দ্বারা অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষকে।

অ্যাটলাস সিংহ। হ্যাঁ, এটাই মরক্কোর জাতীয় ফুটবল দলের ডাকনাম। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী টাইটান যুদ্ধের পর শাস্তিস্বরূপ যাঁকে স্বর্গের ভার নিজের কাঁধে নিতে হয়েছিল, তিনিই অ্যাটলাস। আর বর্তমানে মরক্কো দেশটাকে একেবারে লম্বালম্বি দুভাগে ভাগ করে দিয়েছে যে পর্বত, সেও ওই অ্যাটলাসই। এই অঞ্চলে সি়ংহ এককালে পাওয়া যেত বটে তবে তাদের ডাক থেমে গেছে বেশ কয়েক দশক আগে। একই ভাবে বিশ্বকাপের আঙিনায় এর আগেও অ্যাটলাস সিংহরা পা রাখলেও তাদের গর্জন শোনা যায়নি সে-ভাবে। ১৯৮৬ -তে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠাটাই ছিল এতদিনের সবথেকে বড়ো সাফল্য। ফলে মরক্কো বলতে শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে দু তিনটে মাত্র নাম। যেমন কাসাব্লাঙ্কা।

বাবার মুখে ছোটোবেলায় কাসাব্লাঙ্কা নামটা প্রথমবার শুনেছিলাম। সেটা সিনেমা, ১৯৪২-এ রিলিজ হওয়া হলিউডের অল টাইম এক ক্লাসিক। বিশ্বযুদ্ধের মাঝে সেই বিশ্বযুদ্ধকে ব্যাকড্রপে রেখে, প্রেম আর বিচ্ছেদের চিত্রনাট্য সাজিয়ে, তার সাথে সুক্ষ্ম রাজনীতির মিশেল দিয়ে, হলিউডের অন্যতম এই কাল্ট মুভি বানিয়েছিলেন পরিচালক মাইকেল কার্টিজ। অধিকাংশের মতে কাসাব্লাঙ্কা ইনগ্রিড বার্গম্যানের সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমা। সেই ইনগ্রিড বার্গম্যান, যার থেকে সুন্দর এই পৃথিবীতে হয়তো বা কিছু হয়নি। সঙ্গে হামফ্রে বোগার্ট, হলিউডের আরেক মহাতারকা। আশি বছর পরেও কাসাব্লাঙ্কার হলিউডের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক সিনেমার লিস্টে চিরকালীন উপস্থিতি।

কাসাব্লাঙ্কা। আটলান্টিকের তীরে বন্দর, আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং মরক্কোর সবথেকে বড়ো শহর। এর সাথে হয়তো আবছা মনে পড়বে রাবাত কিংবা মারাকেশ শহরের নামটাও। রাবাত মরক্কোর রাজধানী। মারাকেশ প্রাচীন রাজধানী, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। কিছুদিন আগে থেকে একটা কাজে 'আরব বিশ্বের' সাহিত্য সম্বন্ধে জানতে গিয়ে মোবারক র‍্যাবি, মহম্মদ বেরাদা, আব্দুল আজিজ এরাচিদি, আবদেল্লাহ্ তাইয়া প্রমুখ মরক্কোর লেখকদের লেখার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। তবে তা সামান্যই। যদি বা আরব ওয়ার্ল্ড সম্বন্ধে ধারনা থেকে থাকে তার মাগরেব অঞ্চল সম্বন্ধে জানা হয়নি সেভাবে, এটা যেমন সত্যি, তার চেয়েও বড়ো সত্যি জানার প্রয়োজনও পড়েনি। কিন্তু কাতারের মাঠে, বিশ্বকাপের আঙিনায় এমন এক গর্জন দিলো অ্যাটলাস সিংহরা, আমাদের তড়িঘড়ি প্রয়োজন পড়ে গেল তাদের নিয়ে জানা, পড়া, লেখার...

অবশ্য চোখে চোখ রেখে কথা বলার অভ্যেসটা ধীরে ধীরে সহজাত প্রবৃত্তির মধ্যেই নিয়ে আসছিল মরক্কোর এই টিমটা। ভারতের মাঠে একটি টুর্নামেন্ট খেলে যাওয়া এবং স্পেনের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে জয় এনে নায়ক হয়ে যাওয়া গোলকিপার ইয়াসিন বোনোর কথাই ধরা যাক। কানাডায় জন্ম। দীর্ঘদিন খেলছেন স্পেনে। ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ বলতে পারেন অনর্গল কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে মাতৃভাষা আরবি ছাড়া কথা বলবেন না তিনি। ঔদ্ধত্য? নাকি স্পর্ধা? স্পর্ধা ছাড়া ইতিহাস রচনা সম্ভব নয় যে। আর সেটাই করতে কাতার এসেছে মরক্কোর ফুটবলাররা। ইতিহাসের পাতা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে ইউরোপ আমেরিকার বাঘা বাঘা জাতীয় দলের অফারকে নস্যাৎ করে নিজের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের টানে মরক্কোয় খেলতে ফিরে যাওয়ার মধ্যেও যেন লুকিয়ে আছে সেই স্পর্ধাই।

 ফ্রান্স যখন গতবার বিশ্বকাপ জিতেছিল কেউ জানতে চেয়েছিল এমবাপে, পোগবা, দেমবেলেদের কোন দেশে অরিজিন। বোধহয় না। অথচ গতবারে বিশ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মূলপর্বে ফিরে আসতেই মরোক্কোকে নিয়ে খোঁচা দিতে ভোলেনি ইউরোপিয়ান মিডিয়া। 'ভাড়াটে সৈন্য' বলে মস্করা করেছে। বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে অধিকাংশ মরক্কোর খেলোয়াড়দের জন্ম ইউরোপে। এবারেও তাই। ঘোষণাটা পরিষ্কার— তোমাদের থাকতে দিয়েছি এটা যেমন আমাদের মহানুভবতা, তেমনই তোমাদের ওপরে উঠতে গেলে আমাদের হাতটাই ধরতে হবে, না হলে পারবে না। হ্যাঁ, ঠিক এই কথাটাই সেবার বলেছিলেন মার্কো ভ্যান বাস্তেন। নেদারল্যান্ডে জন্মানো হাকিম জিয়েখ যখন মরক্কো জাতীয় দলে খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন, গুলিত, রাইকার্ডের সঙ্গী বলেছিলেন— 'পাগল নাকি! নেদারল্যান্ডে খেলার সুযোগ ছেড়ে মরক্কো যাবে!' জবাবটা তাই দিতেই হতো হাকিম, রোমাঁ সাইস, হাকিমিদের।

এবং পালেস্তাইন। কেন মরক্কানদের হাতে প্যালেস্টাইনের জাতীয় পতাকা! কী সম্পর্ক দু'দেশের? কেন 'আরব বিশ্ব' এক সুতোয় বেঁধে দেয় আফ্রিকা এশিয়ার ১৮-২০ টা দেশকে? সে কথা জানতে তো ইতিহাস ঘাটতে হবে অনেক পেছনের। অ্যাটলাস পর্বতের ওধারে লাল সিংহের গর্জন কীভাবে 'অন্ধকার মহাদেশ' ( ইউরোপের দেওয়া নাম) পেরিয়ে এশিয়ার ভূখন্ডকে উদ্বেল করে দিতে পারে, সেই সঙ্গে জুড়ে নিতে পারে সারা বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রের দ্বারা অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষকে, সেটা লিখতে খরচ করতে হতে পারে পাতার পর পাতা। আরব জাতীয়তাবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমেরিকা ইসরায়েল পকেটে পুরে নিতে পারে আরব ভূখন্ডের রাষ্ট্রপ্রধানদের কিন্তু আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষ সেটা মানেনি, মানবেও না। মরক্কো জবাবটা দিয়েছে অনেককে অনেকরকম ভাবে, আর সেটাও যাকে বলে একেবারে মোক্ষম জবাব। আর আফ্রিকা আর আরব বিশ্বের ফুটবল মানচিত্রে অভ্যুদয়, এটা মরক্কোর মতো দেশ থেকে হলো, সৌদি আরবের মতো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের হাত ধরে নয়— এটাও অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। সে যতই মরক্কোর নিজস্ব রাজনীতি সকলের জন্য সুখকর না হতে পারে।  

 মাস কয়েক আগে তেল আভিভে খেলতে গিয়েছিল পিএসজি ক্লাব। কিন্তু এমবাপে মেসিদের সাথী নির্ভরযোগ্য ব্যাক আশরাফ হাকিমি নেমেছিলেন শেষবেলায়। মাঠের বাইরে থেকে ভেসে আসা ভয়ঙ্কর বিদ্রুপের শিকার হওয়ার ভয় তাঁকে না নামানোর কারণ কিনা সেটা অবশ্য স্বীকার করেননি কোচ কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিলিস্তিনি পতাকার আগমন কি স্বস্তি দেবে ন্যাটো-ইসরায়েলকে! ফিফা বলছে বটে ফুটবলে কয়েকটা দেশের আধিপত্য কমলেই তারা খুশি তবু বিশ্বকাপের আঙিনায় 'মুর'দের এই দাদাগিরি তাও আবার পরপর বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগালের মতো দেশকে শুইয়ে দিয়ে— এ জিনিস ইউরোপের ভালো লাগবে না একেবারেই।

 তবু আশরাফ হাকিমি ট্যুইট করবেন 'ফ্রি পালেস্ট্যাইন' বলে, ঐতিহাসিক জয়ের পর এক হয়ে যাবে রাবাত থেকে দামাস্কাস হয়ে বাগদাদ। সোফিয়ান‌ বাউফল নাচবে তার জীবনের সেরা নাচটা মায়ের সাথে আর নেদারল্যান্ড জন্মানো আরেক ফুটবলার সোফিয়ান‌ আমরাবাতে বলবে— 'এটা আমার বাবা-মায়ের দেশ, এটা আমার দাদু-ঠাকুরদারও দেশ। এটাই আমার বাড়ি। নেদারল্যান্ডও আমার বাড়ি কিন্তু মরক্কোর জন্য আবেগটাই অন্যরকম।' আমাদের আবেগটাও তাই এবার অন্যরকমই। সেমিফাইনালে দাঁড়িয়ে বাকি তিনটে দেশ— আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া। ধারে ভারে কোনো অংশেই মরক্কো তাদের সমকক্ষ নয়। নেই মেসি এমবাপে মদ্রিচের মতো এই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ কোনো তারকাও। যা আছে সেটা একমাত্র লড়াই, দাঁতে দাঁত চেপে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তীব্র লড়াই, এক ইঞ্চি জমিও না ছাড়ার লড়াই। তাই ফ্রান্স জিতবে এটা ধরে নিয়েও চিরকালীন ডেভিড ভার্সেস গোলিয়াথের লড়াইয়ে কোথাও যেন আরেকবার অ্যাটলাস সিংহের গর্জনের আশায় বুক বাঁধছি আমরাও।

1 Comments

Rouf molla

13 December, 2022

দারুন লেখা।ইতিহাস,ভূগোল,সমকালীন রাজনীতি,সব ছুঁয়ে গেছে এই লেখার মধ্য দিয়ে।বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষনাও যথেষ্ট মননশীলতার পরিচয়।

Post Comment