পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লকডাউনের রাত

  • 10 September, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 610 view(s)
  • লিখেছেন : অর্ণব সাহা
প্রায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে চলতে জীবন কখন থমকে যায়, কখন সমস্ত গতি জট পাকিয়ে যায় সময়ের ছোট্ট কুঠুরিতে, কে-ই বা জানে সেটা ? এখন রাত সাড়ে নটা । উপরের ঘরের দেরাজ খুলে প্রায় রোজদিনের মতোই সে ফের বের করে এনেছে সেই বহুবার পড়া মলিন ডায়েরি । তার মায়ের ডায়েরি । ছোটো ছোটো মুক্তোর দানার মতো অক্ষরে মা লিখে রেখে গিয়েছিল নিজের কথা । লকডাউন চলছে । এইসময় থেকেই রাত-কার্ফু জারি হয় । চলে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত ।

এটাই সেই সময় যখন নগরীর সমস্ত নিষিদ্ধ মানুষেরা নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায় । সে অবশ্য কেবল নিষিদ্ধ নয়, সে আসলে একজন অবৈধ না-মানুষ । এই বিশাল দোতলা বাড়িতে মাত্র দুটো প্রাণী তারা । পুরো দোতলার একটা দিকে সে থাকে । একা । নীচে ডাক্তারের চেম্বার আর একটা রেসিডেন্সিয়াল অংশ । একতলাতেই, বাড়ির থেকে বের-করা একটা অংশে আউটহাউজ । সেখানে প্রত্যেকদিন বিশেষ সময়ে অজস্র মানুষের ভিড় । কেউ কৃপাপ্রার্থী, কেউ উমেদার, কেউ বা বাহুবলী । সেখানেই প্রথম ভজন সিং-এর প্যান্টে গোঁজা নাইন-এমএম পিস্তল দেখেছিল সে । ডাক্তারের চেম্বার সপ্তাহে তিনদিন বসে । ফ্রিতে দেখানোর সুযোগ মেলে এলাকার গরিব মানুষের । তাই ওই তিনটে সন্ধে বাড়িতে থাকা যায় না । অবশ্য বাড়িতে এমনিতেও থাকতে পারে না সে । এই পঁচিশ বছর বয়স অব্দি একদিনও তার ইচ্ছে করেনি এই বাড়িতে থাকতে । এটা এমন একটা বাড়ি যেখানে একলা বসে থাকলে, টিভির পর্দায় চোখ রাখলে, মোবাইল ঘাঁটলে অথবা খবরকাগজ পড়লে বা গল্পের বইয়ের পাতা উল্টোলেও মাথার ভিতর অবিরত ডাকতে থাকে তক্ষক । তার মাথা ফেটে আসে । মনে হয় গোটা পৃথিবী আসলে উলটো করে ঝুলছে । ব্রহ্মাণ্ড পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে । কতো কতোদিন সে এই একলা ঘরের বিছানায়  কাটিয়ে দিয়েছে শরীর-পুড়িয়ে-দেওয়া জ্বর নিয়ে । এই বাড়িতে কতো অসংখ্য লোক দু’বেলা আসত, এখনও আসে, তারা কোনওদিন তার শরীরের খোঁজ নেয়নি । তার মনের ভিতরের খোঁজ নেয়নি । যেখানে জট পাকিয়ে থাকা নিউরোনগুচ্ছ তাকে অদ্ভুত আকর্ষণে ডাকে ।  তাকে বলে এই পৃথিবীটাকে  খুবলে নিতে । যেভাবে ভাড়াটে মেয়েদের শরীরের মাংস খুবলে খেয়ে তৃপ্তি বা অতৃপ্তির উদ্‌গার তোলে মূর্খ, স্থূল পুরুষ । যেমন এখন । অবসাদ তার গোটা দেহকে ঘিরে নিয়েছে । তাকে এক আশ্চর্য স্বেচ্ছাবন্দিত্বে বেঁধে ফেলেছে । সে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না । অথচ কাজটা তাকে আজই করতে হবে । আজই । এই রাতের কার্ফুর মধ্যেই । যখন রাস্তায় থাকবে না কোনও লোক । নীচের গ্যারেজেই রাখা আছে তার ‘বাজাজ পালসার’ মোটর বাইক । ওইটা নিয়েই বেরোবে সে । একটু বাদে । তার আগে বাড়ির একতলার সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট কাজটা সেরে ফেলতে হবে তাকে । ওটা না সেরে বাড়ির বাইরে বেরোবে না সে । রাত্রি আরও  একটু চেপে বসবে এই আদিম শহরের বুকে । সে এই শহরের ভূগোল ফালাফালা করে পৌঁছবে নিজের গন্তব্যে ।

দেয়ালের ঝাপসা হয়ে-যাওয়া ধুসর লেনিনের ছবির আড়াল থেকে মুখ বাড়ায় বুড়ো টিকটিকি । পাঁশুটে, হোঁৎকা, গা-ঘিনঘিনে চেহারার এই টিকটিকিকে সে বহুদিন ধরে চেনে । টিকটিকিটা রোজ একইরকম ভাবে বেরিয়ে আসে । তার মুখের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকায় । তারপর ভিতরে ঢুকে যায় । মানে, ছবির আড়ালে । সেই ছোট্টবেলায় যখন সে মলিনামাসীর কাছে খেয়ে, গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ত, সেই অসম্ভব হাহাকার আর বেদনাময় দিনগুলো থেকে শুরু করে আজ থেকে দেড়বছর আগে মলিনামাসীর মৃত্যু তাকে ভিতর থেকে  নিঃস্ব আর একলা করে দিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সে এই ঘরের প্রত্যেকটা আসবাবপত্র আর দেয়ালের গায়ে কোথায় কোন রং খেলা করে তার হালহদিশ সম্পূর্ণ মুখস্থ বলতে পারে । এখন একঝলকের জন্য ওই ডায়েরির পাতার বহুবার-পড়া লেখা পৃষ্ঠাগুলোর উপর অভ্যস্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে যায় সে । এই ডায়েরি তার মায়ের । যখন তার চোদ্দ বছর বয়স, সেটা ২০০৯, মা তাকে ছেড়ে চলে যায় । অন্য এক পুরুষের সঙ্গে । কিন্তু মানুষ, যেকোনও মানুষ নিজের সংগঠিত ক্রাইমের একটা বাস্তব, গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সাজিয়ে রাখতে ভালোবাসে । মা-ও তার ব্যতিক্রম নয় । এই ডায়েরির পাতায় পাতায় রয়ে গেছে মায়ের আত্মপক্ষ সমর্থনে লেখা সেই নথি । যা সে এর আগেও বহুবার পড়েছে । এখন, এইমুহূর্তে আরও একবার পড়ছে ।

 

“...রোহিতাশ্ব, তুমি যেদিন বড়ো হবে, আমি নিশ্চিত নিজের মা-কে তুমি ঘেন্না করবে । স্বাভাবিক । তোমার জায়গায় আমি থাকলেও ঘেন্না করতাম । কিন্তু, বিশ্বাস করবে কীনা জানি না, আমার সামনে এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না । তুমি ছোটো থেকেই দেখে এসেছ নিশ্চয়ই, তোমার বাবার সঙ্গে আমার কোনও মানসিক বা শারীরিক  সংযোগ নেই । আমি কোনওদিনই তোমার যত্ন নিইনি । মলিনার মতো মেয়েকে পেয়েছিলাম বলে আমার নিজের যাবতীয় মাতৃত্বের দায়িত্ব আমি তার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বাইরের কাজে মন দিয়েছিলাম । আমি জানি তুমি প্রত্যেকদিন আমার জন্য অপেক্ষা করতে । তারপর ঘুমিয়ে পড়তে । আমি সেই সকালে বেরোতাম । প্রথমে কলেজ, তারপর সন্ধেয় আমার  থিয়েটার গ্রুপের মহড়া থাকত প্রত্যেকদিন । সোম থেকে শনি একই রুটিন । তার মাঝেই সিনেমার শুটিং থাকলে কলকাতার বাইরে নয়তো বিভিন্ন আউটডোরে যেতেই হত । রোহিতাশ্ব, আমি আর পাঁচটা সাধারণ মা হবার জন্য এই পৃথিবীতে  আসিনি । না । তুমি আমার অবাঞ্ছিত সন্তান নও । কিন্তু প্রথমদিন থেকেই তোমার বাবার সঙ্গে আমার বনিবনা হয়নি । যেটা বিয়ের আগে আমরা কেউই বুঝিনি । আমি ঘৃণা করতাম তোমার বাবার মিথ্যে, ফ্যাসিস্ত রাজনীতিকে । আমি মনে করি চরিত্রের দিক থেকেও তোমার বাবা একজন পুরোদস্তুর ফ্যাসিস্ত । এবং নির্বোধ । গোঁয়ার । ওদের পুরো দলটাই ফ্যাসিস্ত । ওরা চলে যাবে এই রাজ্যের ক্ষমতা থেকে । এটা ২০০৯-এর জুলাই মাস । লোকসভা নির্বাচনে ওদের দলের ভাঙন আর বিদায়বার্তা প্রকট হতে শুরু করেছে । আমি, আমরা বেশ কয়েকজন এখন এই সরকার-বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে অ্যাক্টিভ মুখ । সন্ধেবেলা টিভি  খুললে তুমি আমাকেই দেখতে পাও । আমি অবশ্য মলিনার কাছে শুনেছি, আমায় টিভিতে দেখালেই তুমি টিভি বন্ধ করে দাও । একবার নাকি টিভির দিকে পেপারওয়েটও ছুঁড়ে মেরেছিলে । বেশ করেছিলে । ভাগ্যিস ভাঙেনি টিভিটা । কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার জীবন অনেক বড়ো কিছুর জন্য তৈরি হয়েছে । আমার সন্তানপালন, ঘরসংসার—এইসব কোনওদিনই ভালো লাগত না । আর যখন তোমার বাবার মুখের দিকে তাকাতাম,  বিশ্বাস করো, নিজের উপর ঘেন্না হত । সেই অক্ষম ক্রোধ থেকে আস্তে আস্তে আমি বেরিয়ে এলাম । বিয়ের  সদ্য পরে ছেড়ে-দেওয়া গ্রুপ-থিয়েটারের কাজ ফের আরম্ভ করলাম । আর নিজেকে তোমাদের এই পুরো সংসার থেকে আমি অনেক আগেই বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলাম । হয়তো তুমি বলবে, আমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলে না কেন, মা ? রোহিতাশ্ব, একজন মানুষ জীবনে একবারই বাঁচে । আর সকলের বাঁচার পদ্ধতি একরকম হয় না কোনওদিন । তোমার বাবা, একজন আপাদমস্তক লম্পট, দুশ্চরিত্র পুরুষ, তাতে আমার আপত্তি ছিল না । কিন্তু লোকটা দাবি করত ওর জীবনের যাবতীয় ভোগ, সাফল্য আর সিদ্ধি হবে আমার বিনিময়ে । আমি সেটা হতে দিইনি । আমি  বেরিয়ে এসেছি । আমি বেরিয়ে আসছি তোমায় ফেলে । ওই অভিশপ্ত বাড়িটাকে ফেলে । আমার সর্বস্ব অতীত ফেলে । কী করব বলো ? আমার আর কোনও রাস্তা ছিল না । আমি তোমার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা মলিনার হাত দিয়ে পাঠাব । জানি,  বাবাও তোমার জন্য পর্যাপ্তের বেশি খরচ করবে । কিন্তু, আজ তোমায় বলি, তোমার বাবা আদৌ চায়ই নি, তুমি এই পৃথিবীতে  জন্মাও । আর আমি তোমার বাবাকে শাস্তি দেব বলে, প্যাঁচে ফেলব বলে তোমার জন্ম দিয়েছিলাম । আমাদের কারও জীবনেই তোমাকে কোনও প্রয়োজন ছিল না । কিন্তু তোমার জীবনে আমাদের প্রয়োজন ছিল । খুব । খুব বেশি মাত্রায় প্রয়োজন ছিল । কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে গেলে তুমি আজ যে সেলিব্রিটি, পেজ-থ্রি মা-কে দেখছ, তাকে দেখতে পেতে না । আর, বিশ্বাস করো, আমি ঠিক এটাই হতে চেয়েছিলাম সারাজীবন । যখন থেকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল, প্রত্যেক বিকেলের মেট্রো চ্যানেলের সভায় আমার এবং আমার মতো কয়েকজন  মানুষের উপস্থিতি রীতিমতো জরুরি হয়ে উঠল, তোমার বাবার পার্টির বিরুদ্ধে ওই অমোঘ সত্যি কথাগুলো বলার পর ওই লোকটার বাড়িতেই গিয়ে ফের ওঠাটা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠতে শুরু করেছিল আমার পক্ষে । তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে তার বছরদুয়েক আগে থেকেই আমি প্রায়-দিনই বাড়ি ফিরতাম না । তোমার চোখের জল আমি কোনওদিনই মোছাইনি রোহিতাশ্ব । আমি আসলে তোমায় ফেস করতে, তোমার মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পেতাম । মলিনার সামনেও দাঁড়াতে লজ্জা পেতাম । এটাই ভালো হয়েছে । আমি আমার অতীত পুড়িয়ে দিয়ে আজ বেরিয়ে যাচ্ছি এই বাড়ি থেকে । ফোন নম্বর রেখে গেলাম । মলিনা আমার নতুন ঠিকানা জানে । তোমার যখন ইচ্ছে, একটা ফোন করে যোগাযোগ রেখো । চলে এসো আমার কাছে । আমি তোমায় ছেড়ে আসছি ঠিকই । কিন্তু তোমায় ছেড়ে যেতেও পারছি না । ভবিষ্যৎ এটা বলবে আমি ঠিক কাজই করেছিলাম । কারন, আমি বিশ্বাস করি, একটা বড়ো কাজের জন্য অন্য কয়েকটা ছোটো কাজকে হাত থেকে বেরিয়ে যেতে দিতে হয় । একসঙ্গে তিনটে জীবন নষ্ট হবার চেয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকের জীবনের সার্থকতা খুঁজে নেওয়া ভালো । সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা । তুমি টিউটরদের কথা মেনে পড়াশুনো কোরো । তোমার যাবতীয় খরচের মধ্যে আমার ভাগটুকু মাসের গোড়ায় পৌঁছে দেব আমি । তোমার বাবার সঙ্গে আমার সেরকমই চুক্তি হয়েছে । ভেবো না আমাদের আর কোনওদিন দেখা হবে না । আমি সত্যিই তোমায় মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না । নিশ্চয়ই জীবনের কোনও এক আকস্মিক বাঁকে আবার তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে । এটা আমার বিশ্বাস । ভালো থেকো । শক্ত থেকো । এটা কেবল তোমার নয়, আমারও দুর্ভাগ্য । কিন্তু এটা মেনে নেওয়াই নিয়তি বলে বিশ্বাস করি । তুমিও মেনে নাও । ইতি, তোমার মা...”।

 

বাবার ডাক্তারি চেম্বারটা কিছুদিন আগেও গমগম করত । বাইরের আউটহাউজ আসলে ছিল পার্টি-অফিস । সে কোনওক্রমে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উতরে গেল । কিন্তু নামী স্কুলে হায়ার-সেকেন্ডারিতে ভর্তি হলেও বারো  ক্লাসের গণ্ডি পেরোতে তার লেগে গেল বাড়তি দুটো বছর ।  হ্যাঁ । বাড়ির কাছের একটা কলেজেও ভর্তি হয়েছিল সে । কিন্তু কলেজের হার্ডল আর ডিঙোনো হয়নি তার । ২০১১ সাল । পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে  মা-কে আরও অনেক অনেক বিশিষ্ট কমিটির মাথায় বসতে দেখল সে । লেখাপড়া না করতে পারলেও মাথা বরাবরই পরিষ্কার তার । প্রায় গোয়েন্দার মতো নিষ্ঠায় মায়ের প্রত্যেকটা কাজ, খবরকাগজ, নিউজচ্যানেলের সাক্ষাৎকার ফলো করত সে । কোনও এরকম একটা দিনও যেত না যেদিন সে মায়ের সম্পর্কে কোনও একটাও নতুন তথ্য জোগাড় করত না । তারপর একদিন খুব কঠিন অসুখ হল তার । সে, কোনও কিছু মনে রাখতে পারত না । সে নাকী, ভুল বকত ঘুমের ঘোরে । আর তাকে পরম মমতায় সুস্থ করে তোলার জন্য রাতদিন এক করে নিজের ঠাকুরের ছবির সামনে বসে কান্নাকাটি করত মলিনামাসী । কী যেন বলে অসুখটার নাম । অ্যাকিউরেট প্যারানইয়া । বাবা বলেছিল । তার সর্বক্ষণ মনে হত এই গোটা পৃথিবী আসলে তাকে খুন করতে চায় । কতো কতোদিন সে বালিশের নীচে ছুরি নিয়ে ঘুমোতে যেত । সে ঘুমোত খাটের উপরে । মলিনামাসি তারই ঘরে, মেঝেতে । বাবা, সে গুনে দেখেছে, মা চলে যাবার পর থেকে বোধহয় মাত্রই কয়েকবার তার সঙ্গে কথা বলেছে আজ পর্যন্ত । লোকটা ২০১১ সাল অব্দি ছিল পার্টির বিধায়ক । কলকাতার জেলা-সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ।  ছিল নাম-করা ডাক্তার । অঢেল পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী । তাই বিনা-পয়সায় গরিব লোকের ডাক্তারি  আর দিবারাত্রি পার্টির কাজ করা—এটাই ছিল তার কর্মসূচি । তার শোবার ঘরে আজও লেনিনের পাশে আরও দুটো ছবি টাঙানো আছে । একটা সে জানে  মুজফফর আহমেদ । আর একটা  নাম্বুদিরিপাদের ছবি । এরা কারা, তা জানার ইচ্ছেও হয়নি অবশ্য তার । কোনওদিন । সে শুধু জানত, সারাদিনের কাজকর্ম সেরে বাবা নীচেরতলার ছোটো ঘরটায় মদের বোতল নিয়ে বসে । একটি বছর তিরিশের মেয়ে আসত নিয়মিত । বাবাকে ম্যাসাজ করতে । আজ থেকে প্রায় আট বছর আগের কথা । তখন বাবার পার্টি সদ্য ক্ষমতা হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলায় । তার তখন সতেরো বছর বয়স । এক মধ্যরাতে তার ঘুম ভেঙে যায় । অথবা হয়তো ঘুমই হয়নি তার সেই রাতে । সে,  মলিনামাসীকে ডিঙিয়ে পা টিপে টিপে নীচে নেমে আসে সিঁড়ি বেয়ে । অন্ধকার হাতড়ে পৌঁছয় বাবার ঘরে । দরজা ভেজানো ছিল । ভিতরে সামান্য আলো জ্বলছে । দরজা ফাঁক করে সে । ওই একচিলতে ফাঁক থেকে সে দেখতে পায় নিজের বাবার লোমশ নগ্ন চেহারা । পিছনদিক থেকে বাবার ঈষৎ ফোলা, ঝুলে-পড়া নিতম্ব । আর সামনের একফালি সরু খাটে দু’পাশে ছড়িয়ে দেওয়া ওই মেয়েটার দুটো ঠ্যাং । মেয়েটার নাম দেবযানী । পার্টির এক গরিব সদস্যের বউ সে, যার জন্য বাবা হয়তো এককালে সামান্য কোনও উপকার করেছিল । সে উপকারের মাশুল দেবযানী আজও দিয়ে চলেছে তার বাবাকে । খাটটায় বিকট একটা ফ্যাঁসফেসে শব্দ হচ্ছিল । আর তার মাথার ভিতর দুলে উঠছিল নিজের ঘরের দেয়ালে আজন্ম দেখতে-পাওয়া লেনিনের ছবি । হায়ার সেকেন্ডারিতে তার এক প্রাইভেট টিউটর ছিল । সৌমিকদা । বিচিত্র বিষয়ে গল্প করত সে তার সঙ্গে । সৌমিকদাই তাকে বেশ কিছু সিনেমা দেখায় । তার মধ্যে একটা, আজও মনে আছে তার । ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’। তাতে একটা দৃশ্য ছিল । ‘ওডেসা স্টেপস’। সেই সৈন্যবাহিনী এগিয়ে আসছে আর একটা বাচ্চা প্যারাম্বুলেটরে করে গড়িয়ে পড়ছে । বাবাকে পিছন থেকে নগ্ন অবস্থায় ওই মেয়েটার শরীরে প্রবেশ করতে দেখে কেন ওই দৃশ্যটাই তার মনে পড়েছিল, তা আজও এক রহস্য । তখন মাঝরাত । সামনে বাবার ওই বীভৎস উলঙ্গ চেহারা । মাথার ভিতর উদ্যত সঙ্গিনের সামনে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়া শিশু ।

 

পীযুষ সোনকার । বাবার পার্টিরই উঠতি ছেলে । সেই তাকে ড্রাগের নেশায় জড়িয়ে নেয় । এখন ফাঁকা ঘরে টেবিলের উপর একটা মসৃণ মাসিক পত্রিকা রেখে সে সাজিয়ে নিচ্ছে সাদা কোকেন পাউডার । একটা জয়েন্ট পাকিয়ে নিয়ে টেনে নেবে নাক দিয়ে । যতোটা সম্ভব । বিগত এগারো বছর সে মাকে দেখেনি । কিন্তু তার মায়ের প্রত্যেকটা খবর তার কাছে চলে আসে খবরকাগজ নয়তো টেলিভিশন মারফত । এমনকী ফেসবুক নোটিফিকেশনেও । ঠিক দু’বছর আগে শাসকদলের সঙ্গেও তীব্র দূরত্ব তৈরি হয় তার মায়ের । শাসক-পার্টিরই এক বর্ষীয়ান নেতা, যার প্রায় ষাট বছর বয়স, তার সঙ্গে মায়ের নাম জড়িয়ে টেলিভিশনের মোস্ট সেনসেশনাল খবরে পরিণত হয় । কেচ্ছায় ঢি-ঢি পড়ে গেছিল গোটা শহরে । যে কমবয়সী অধ্যাপকের সঙ্গে লিভ-ইন করত, তাকে ছেড়ে এই বয়স্ক নেতার সঙ্গে জড়িয়ে যায় মা । এই নেতা ছিল পার্টির কলকাতা জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা । দুই সন্তান ও স্ত্রীর সঙ্গে বহুবছরের সংসার তার । মেয়ে কলেজে পড়ে । ছেলে প্রতিষ্ঠিত । বি.টেক করে পার্টিরই যুব-সংগঠন দেখে । তাদের ছেড়ে, ডিভোর্স করে লোকটা মায়ের সঙ্গে থাকতে এসেছে । প্রচুর টাকা লোকটার । নিজের বউকে ক্ষতিপূরণই দিয়েছে কয়েক কোটি টাকা । দক্ষিণ কলকাতার সবচেয়ে নামী হাউজিং কমপ্লেক্সে তার সঙ্গে এখন থাকে মা । শোনা যাচ্ছে বাংলায় দ্রুত বেড়ে-চলা সর্বভারতীয় পার্টির রাজ্যপরিষদে মা আর ওই নেতা দুজনকেই জায়গা দেওয়া হবে শিগগির । এইমুহূর্তে দরকষাকষি চলছে । ষাটের কাছাকাছি পৌঁছেও লোকটার স্পেকুলেশন-বুদ্ধি কম । তুলনায় মায়ের ভবিষ্যৎ পড়ার ক্ষমতা অনেকগুণ বেশি । লোকটাকে মা-ই চালায় । লোকটা এখন মায়ের বশংবদ পুতুল মাত্র । আর কিছু নয় । তার ডিভোর্স-মামলার খবর রেগুলার ফলাও করে বেরোত কাগজে আর মিডিয়ায় । মা আর ওই লোকটা প্রত্যেকটা শুনানির দিন ম্যাচিং শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে কোর্টে যেত ।   তা নিয়েও লেখালেখি কম হয়নি কাগজে । একটা চ্যানেল এই ম্যাচিং-পোশাক নিয়ে আলাদা প্যানেল-ডিসকাশনও করেছিল । রাত্রি আটটায় । মা যতোদিন এই বাড়িতে ছিল, টিভিতে মা-কে দেখালে অসম্ভব ঘেন্নায় টিভি বন্ধ করে দিত সে । আর আজ মা যখন তার জীবনের কোথাও নেই, সে মায়ের প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি খবরের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে । টিভি, নিউজপেপার আর মোবাইল নোটিফিকেশন তার নিত্যসঙ্গী ।  

কোকেনের পাতার পাশেই ড্রয়ার খুলে সদ্য হাতে আসা পিস্তলটা রাখে সে । এটা একটা নতুন মডেল । গ্লক-১৭ । পীযুষই এনে দিয়েছে তাকে । আপন মনে পিস্তলের নলটার গায়ে হাত বোলায় সে । সামান্য কিছুটা  গুঁড়ো কোকেন পাউডার ওই নলের উপর রাখে । তারপর জিভ দিয়ে চাটে । চাটতেই থাকে । শরীর গরম হয়ে ওঠে তার । লিঙ্গোত্থান হয় যেন । খুব আলতো উদ্যোগে, কোথাও কোনও তাড়াহুড়ো না করে, নিশ্চিন্তে সে এইবার উঠে পড়ে । পিস্তলটা জিনসের পকেটে ঢোকায় । মুখে একটা থ্রি-লেয়ার্ড মাস্ক পরে নেয় । মাথায় বেঁধে নেয় একটা বড়ো রুমাল । ঘরের লাইট, ফ্যান সুইচড অফ করে দেয় । দরজাটা ভেজিয়ে দেয় । সিঁড়ির আলো নেভানো । কিন্তু তাতে তার কোনও অসুবিধে হয় না । প্রায় হায়েনার ভঙ্গিতে পা টিপে টিপে সে নেমে আসে একতলায় । মাঝখানের প্যাসেজটুকু পেরিয়ে যায় । চেম্বারের ওপাশের ঘরে বাবা রয়েছে । ঘরের দরজা ভেজানো । একটা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সিডি বাজছে । সে সন্তর্পণে ঘরের দরজায় ঠেলা দেয় । দরজা খুলে যায় । বাবা ইজিচেয়ারে বসে আছে । ঘর আবছা আলোয় ভরা । বাবার হাতে দামী মদের গ্লাস । সে এইবার বাবার সামনে এসে দাঁড়ায় ।

 

বাবা চমকে উঠে তাকায় । একটু বিব্রত, থতমত অবস্থা তার । “রোহিত, তুমি ?”

--কেন ? আসা বারণ ?

--তা বলিনি । শরীর ঠিক আছে তো ?

--পুরো ঠিক আছে ।

--কিছু বলবে ?

 

সে কিছুই বলে না । নিঃশব্দে পিস্তলটা বের করে বাবার ঠিক বুক আর মাথা লক্ষ করে পরপর দুটো বুলেট গেঁথে দেয় । একটাও শব্দ না করে লুটিয়ে পড়ে বাবা । কাটা কলাগাছের মতো । প্রথম অপারেশন সাকসেসফুল । ডাক্তার সুমন রায়চৌধুরী খতম ।

 

এবার সে বেরোয় । গ্যারেজ থেকে বাইকটা বের করে রাস্তায় নামে । রুবি থেকে গড়িয়াহাটের দিকে ফাঁকা রাস্তায় চালিয়ে দেয় বাইক । সে জানে মা আজ ওই দামী হাউজিং কমপ্লেক্সে নেই । এখন কিছুদিন যাবৎ মা আর ওই লোকটা রয়েছে গোলপার্কের একটা ফ্ল্যাটে । এই ফ্ল্যাটটাও ওই লোকটারই । বিজন সেতুতে ওঠার মুখে পুলিশ আটকায় তাকে । বাবার পার্টির মেম্বারশিপ করিয়ে দিয়েছে তাকে বুড়ো ভজন সিং । কসবা থানার ওসি তার বাবার নিয়মিত ক্লায়েন্ট । তার নাম বলে সে । বলে বাবার জন্য ওষুধ আনতে যাচ্ছে । শিশুমঙ্গলে । পুলিশ ছেড়ে দেয় তাকে । সে পক্ষীরাজের মতো উড়িয়ে দেয় তার বাইক । বিজন সেতু থেকে নেমেই বাঁ-হাতে বাঁক নেয় । ঢুকে পড়ে গোলপার্কের দিকে । কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই ঝটিতি বৃষ্টি নামে । ভিজতে থাকে সে । ভিজতেই চায় । একবার মনে হয় বাইকটা সাইড করে কোনও একটা পুরোনো বাড়ির শেডের নীচে দাঁড়ানোর কথা । কিন্তু নামে না । এগিয়ে যায় সে । আকস্মিক ভাবে তার মনে পড়ে জীবনে  একবারই বাবা-মায়ের সঙ্গে সে বাইরে বেড়াতে গিয়েছিল । তার পাঁচবছর বয়সে । দার্জিলিং । খুব ভোরবেলা, মা তাকে ডেকে তুলেছিল । নিজে হাতে পরিয়ে দিয়েছিল গরম জামা, মোজা । ভোরবেলার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে গাড়ি চেপে তারা পৌঁছেছিল টাইগার হিল । সে অবাক হয়ে গিয়েছিল, তার চোখ ঘুমে ঢুলে আসছে, অথচ সেই মুহূর্তেও টাইগার হিলের সামনে বিশাল ভীড় । বিশাল জটলা ।

 

‘মৌচাক’ দোকানের ঠিক কয়েকটা বাড়ি আগেই সেই ফ্ল্যাট । লকডাউনের এই রাতে প্রায় কোনও লোক বাইরে নেই । লোহার গেট আলগা করে খোলা । বাইকটা মেইন গেটের সামনে রেখে ভিতরে ঢোকে সে । সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে । সেকেন্ড ফ্লোরে ওই লোকটার ফ্ল্যাট । পায়ে নাইকির জুতো কোনও শব্দ তোলে না । নিঃশব্দে সে গিয়ে দাঁড়ায় নির্দিষ্ট দরজার সামনে । সে আগে এইখানে আসেনি । কিন্তু আজ অকুস্থলে পৌঁছে গেছে কোনও প্রাক্‌-পরিকল্পিত রেইকি ছাড়াই । সে মনে করে কেউ যদি বহুবছর ধরে অস্বাভাবিক ঘৃণা অথবা অস্বাভাবিক ভালোবাসা কারও জন্য বাঁচিয়ে রাখে, তবে সেই অনুভূতির বাস্তবায়ন ঘটতে দেরি হলেও, সেটা ফলপ্রসূ হয় । মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর দিন, সে প্রথম নিজের বাবাকে খুন করতে চেয়েছিল । সেই অসম্ভব প্রয়োজনীয় এবং নিয়তি-নির্দিষ্ট ঘটনাটা ঘটার জন্য এই ২০২০-র জুন মাসে আজকের লকডাউনের রাত অব্দি অপেক্ষা করে থাকতে হল তাকে ।  বাবার মাথার ঘিলুটা বেরিয়ে এসেছিল । প্রায়  কোনও শব্দ করার সুযোগই পায়নি লোকটা । এখন কী হচ্ছে, বাড়িতে, সে জানে না । জানতে চায়ও না...

 

ডোরবেল বাজার শব্দে ঢোলা পাজামা আর ফতুয়া-পরা লোকটা দরজা খুলল নিজেই । জীবনে প্রথমবার লোকটাকে মুখোমুখি দেখল সে । এতোদিন টিভিতে দেখে যেরকম লাগত, এখন ওকে তার চেয়েও ঢের নিরীহ আর নির্বোধ মনে হল তার । সে কোনও কথা বলল না । পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে দুটো গুলিই চালিয়ে দিল লোকটার মাথা আর চোখের মণি লক্ষ করে । ওই বিশাল চেহারা আর ভুঁড়ি সমেত উলটে পড়ল লোকটা । হ্যাঁ, এইবার ঠিক সিনেমার দৃশ্যের মতো ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সাধনা মুখার্জি । তার মা । সেলিব্রিটি সাংস্কৃতিক কর্মী, পোলিটিশিয়ান মিসেস মুখার্জি । আজ কতোদিন বাদে নিজের মা-কে দেখল সে । আঃ! এখনও কী অপূর্ব সুন্দরী আর টানটান ফিগার তার মায়ের । এই ৫২ বছর বয়সেও । বিস্ফারিত ও আতঙ্কিত চোখে আলুথালু গাউন সামলে ছুটে আসে মিসেস মুখার্জি । ততোক্ষণে মৃত লোকটাকে টপকে  ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়েছে সে । পা দিয়ে ঠেলে বন্ধ করে দিয়েছে ভারী কাঠের দরজা ।  আর্ত, অসহায় জন্তুর মতো তার দিকে তাকিয়েছিল মা । প্রাণ ভিক্ষা চাইছিল কী ? মায়ের জীবনে এখনও বহু কিছু হবার বাকি আছে, তাই কী নিজের অমূল্য জীবনের অবশিষ্ট অংশটুকু ভিক্ষা চাইছিল সে তার কাছে ? নিজের ছেলের কাছে ? লোকটার পাশেই মায়ের উল্টোনো লাশ টপকে সে বেরিয়ে এসেছিল ওই ফ্ল্যাট থেকে । নিঃশব্দে নীচে নেমে বাইকে স্টার্ট দিয়েছিল । তখন বৃষ্টি থেমে গেছে । আকাশে হালকা জ্যোৎস্না । আধখাওয়া মাড়ির মতো চাঁদ । একটা-দুটো ফুলের মতো তারার কুচি । তার টি-শার্টে কাঁচা রক্তের দাগ ।

 

গড়িয়াহাট থানার স্পেশাল ডিউটি অফিসার সুদীপ চোংদার একমনে মাথা নীচু করে নিজের টেবিলে বসে রিপোর্ট লিখছিল । গেটের পুলিশ অফিসারকে বলে ঘরের ভিতরে ঢুকে আসে সে । কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে । ডিউটি অফিসার মুখ তুলে তাকায়...

 

--হ্যাঁ । বলুন । এতো রাতে...

--আমি সারেন্ডার করতে এসেছি অফিসার ।

--সারেন্ডার ? কী করেছেন আপনি ?

--মার্ডার । তিনটে । এইমাত্র...

--হোয়াট ডু ইউ মিন ? কোথায় ?

--একটা রুবিতে । আর দুটো গোলপার্কে...

--মাই গড !

--আমায় অ্যারেস্ট করুন । নিজের নাইন এমএম পিস্তলটা বের করে অফিসারের টেবিলে শুইয়ে রাখে সে । পিস্তলটা শুয়ে থাকে কাজ শেষ হবার পর নির্জীব লিঙ্গের মতো...সে নিজেই সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে । পুলিশসের আগাম অনুমতির অপেক্ষা না করেই ।  সে জানে এইবার থানার ওসি থেকে শুরু করে অন্যান্যরা এই ঘরে এক্ষুনি ভীড় জমাবে । শহরের সবচেয়ে সেনসেশনাল ব্রেকিং নিউজ-হেডলাইনটা উপহার দেবার মতো একটা বিশেষ কাজ করে ফেলেছে সে । তার মা কলকাতার পেজ-থ্রি সেনসেশন । বাবাও কম কেউকেটা নয় ।  আর দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে একঝাঁক ওবি ভ্যান আর অজস্র বুমের সামনে তাকে স্পেশাল ভ্যানে তোলা হবে । হয়তো নিয়ে যাওয়া হবে লালবাজারে । কিন্তু তার তখন এইসব কিছুই  মনে হচ্ছিল না । তার কেবল মনে পড়ছিল, মা-কে সেকেন্ড গুলিটা ছোঁড়ার পর তার লিঙ্গ শক্ত হয়ে উঠেছিল । আরেকবার । বাবাকে খুন করার সময় যেরকম হয়েছিল । অবিকল সেইরকমই । চরম যৌনসুখ পাবার মতোই কাজ একটা করেছে সে । স্বর্গীয় অর্গাজম । চরম সুখ । সে টের পায় ছোট্ট ঘরটায় একে একে  এসে জড়ো হচ্ছে অসংখ্য লোক । তার শরীর অবশ হয়ে আসে । আর কিছু ভাবতে পারে না । ভাবতে চায়ও না সে । কে যেন তাকে টেনে তোলে চেয়ার থেকে ।

 

বাইরে রাত বাড়ে । দ্রুত । আরও একপশলা বৃষ্টির মতো মেঘ নামে । আর তার খুব ঘুম পায় । ঘুম...  

 

 

0 Comments

Post Comment