পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আগুন দেখেছি আমি

  • 05 August, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 1242 view(s)
  • লিখেছেন : সুপ্রিয় চৌধুরী
"মানুষ যত চুপ করে থাকে, যত অন্যায় মেনে নেয়ে তত বাড়তে থাকে রাক্ষসদের হম্বিতম্বি ও রাক্ষসদের কর্তাভজা ক্ষোকসদের বিকট কোরাস। ঐ সময় যাঁরা লালকমল, নীলকমল হতে চাইবে তাদের বিবেক সবল ও তরতাজা থাকা দরকার। কোন কোন মানুষের কথা ভাবলে কাজটা করে ফেলা অসম্ভব নয় । সেরকমই একজন মানুষ ছিলেন সরোজ দত্ত। নিজের প্রাণ দিয়ে তিনি জায়গায় করে নিয়েছিলেন জুলিযাস ফুচিক বা গাবরিয়াল পেরীর পাশে"। -----নবারুণ ভট্ট্যাচার্য । কিছু কথা চিরন্তন। ঠিক অর্ধ শতাব্দী আগে আজকের দিনটিতে সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী "নিখোঁজ" হয়ে গিয়েছিলেন কবি, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক কর্মী সরোজ দত্ত। মজে যাওয়া পুকুরের মত নিস্তরঙ্গ সামাজিক রাজনৈতিক মননে প্রবল আলোড়ন আনা সরোজ দত্ত রাষ্ট্রের কাছে ক্রমাগত বিপদের কারণ হয়ে উঠছিলেন। সুতরাং তাঁকে "নিখোঁজ" করে দেওয়া ছাড়া রাষ্ট্রের হাতে আর কোন রাস্তা ছিল না। আজ ৫ই আগস্ট, ২০২১ তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা লিখলেন সুপ্রিয় চৌধুরী।

I dreamed I saw you last night,

Alive as you and me,

Says I, but Joe you are ten years dead,

I never died, says he,

I never died, says he..

The copper bosses killed you Joe,

They shot you Joe, says I,

Take more than guns to kill a man,

Says Joe, i Didn’t die,

Says Joe, I didn't die

And standing there as big as life,

And smiling with his eyes,

Says Joe, what they forgot to kill,

Went on to organise,

Went on to organise.

কেন জানিনা, এই গানটা শুনলেই আপনার কবিতা সংকলনের বইটার মলাটের ওপর ছাপা আপনার ওই সাইড ফেসওয়ালা ছবিটার কথা খালি মনে পড়ে যায় আমার। ১৯৩৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটা অঞ্চলে তামা খনির শ্রমিক নেতা ছিলেন জো হিল। শ্রমিকদের ওপর যে কোন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই, আন্দোলনে সর্বদা নেতৃত্ব দিতেন। ফলস্বরুপ এক রাতে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে তামা খনির মালিকদের ঘাতকরা। এই চির বিদ্রোহী মানুষটির স্মরণে পরবর্তীতে গানটি বেঁধেছিলেন সে দেশের কৃষ্ণাঙ্গ চারণকবি পল রোবসন। আপনিও তো অবিকল সেই জো হিলের মত। তফাৎ শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে আমাদের এই ভারতবর্ষ। জো হিলের মতই আপনার চোখের কোনে লেগে থাকা অমলিন মৃদু, চির অপরাজেয় সেই হাসি ! রোবসনের গানের ভাষায় - ‘অ্যান্ড স্মাইলিং উইথ হিজ আইজ’ !;

সেটা ৭০ দশক। দ্রোহের দশক। নিরাপদ বুদ্ধিজীবীর অবস্থান শরীর থেকে এক লহমায় ঝেড়ে ফেলে আপনিও ঝাঁপ দিয়েছিলেন সেই মহাদ্রোহের আগুনে। প্রতিদিন সে আগুন উগরে দিচ্ছিল আপনার কলম। আপনার কলমকে ভয় পেতে শুরু করেছিল শাসক। এদিকে সারা বাংলা জুড়ে জ্বলছে সেই মহাদ্রোহের আগুন। এরকমই এক আগুনে দিনে সমগ্র উত্তর কলকাতা স্কুল কলেজ ছাত্র কমিটির মিটিং।হয়েছিল কুমোরটুলিতে, ওই অঞ্চলের অগ্রণী যুবনেতা গোপালীদার আয়োজন করা এক গোপন শেল্টারে। বহু ঘুরপথে রাষ্ট্রের পাহারাদার কুত্তা আর খোঁচড়দের চোখ এড়িয়ে সবাইকে পৌঁছতে হয়েছিল সেই গোপন সভায়। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল দুজনের। আমার স্কুলের সিনিয়ার দাদারা দুজনের মধ্যে একজন হিসেবে ক্লাস নাইনের চোদ্দ পনেরোর এই অধমকে কেন বেছেছিলেন সেটা আজও এক অপার রহস্য আমার কাছে। আজো মনে আছে মিটিঙে বক্তব্য রাখতে আসার কথা ছিল অন্য এক নেতার। শেষ মুহূর্তে তাঁর বদলে এসেছিলেন আপনি। ছোটখাট সৌম্যদর্শন চেহারা। মলিন ধুতি পাঞ্জাবি। ঠোঁটের কোনে সেই বিখ্যাত মৃদু হাসি। বাঁ হাতের বদলে ডান হাতে ঘড়ি। পিঠে বড়সড় একটা আব মত। কথা বলার সময় মুখ তোলেন, শোনার সময় মাথা নীচু আর চোখ বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে শোনেন। এই ছিল আপনার ট্যাগমার্ক। মিটিঙয়ে আলোচনার মূল বিষয় ছিল - ‘এই সময়ে ছাত্র সমাজের কর্তব্য।। দীর্ঘ সেই সভায় কি আলোচনা হয়েছিল সেটা এই প্রতিবেদনের উপজীব্য নয়।

সভা শেষে কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন আপনি। মেঝেয় পাতা শতরঞ্চি ছেড়ে। সবাইকে লাল সেলাম জানিয়ে বেড়িয়ে গেছিলেন ঘর ছেড়ে। আপনি অর্থাৎ আগুনের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা !

তারপর তো সেই ঝোড়ো দু-একটা বছর। বোমা বুলেট বন্দুক অ্যাকশন এনকাউন্টার অ্যাম্বুশ নিষিদ্ধ ইস্তেহার আর দেওয়াল লিখন...বারুদের গন্ধ সারা গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ানো শেল্টার থেকে শেল্টারে। অবশেষে আজকের এই দিনটা। রাজা বসন্ত রায় রোডের গোপন আশ্রয় থেকে কালো ভ্যানে সোজা তুলে নিয়ে গিয়ে কাকভোরের ময়দানে। পিছন থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে ছুটে আসা রাষ্ট্রপালিত ঘাতকের বুলেট। চিরকালের মত বুজিয়ে দিতে চাওয়া এক কবির চির স্বপ্নদর্শী চোখজোড়া !

আচ্ছা ? সত্যিই কি আপনার চোখদুটো বন্ধ করে দিতে পেরেছিল ঘাতকরা ? নাকি সেই ফিনিক্স নামের পাখিটার মতই আগুন ফুঁড়ে উঠে আরেক আগুনের সন্ধানে উড়ান দিলেন আপনি ? ফের মনে পড়ছে রোবসনের গানের শেষ লাইন চারটে।

From Sun Diego up to Maine

In every mine and mill

Where Working Men defend their rights

It’s there you’ll find Joe Hill

!t’s there you’ll find Joe Hill !

লাইনগুলো চিরন্তন। অমোঘ সত্য সর্বত্র। আমাদের এই পোড়া দেশেও। তাই নকশালবাড়ি থেকে শ্রীকাকুলাম, দন্ডকারন্য থেকে বস্তার, তেভাগা থেকে তেলঙ্গানা, সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম, নিয়মগিরি থেকে কাকদ্বীপ, জেহানাবাদ থেকে সিওয়ান হয়ে ভোজপুর, জে এন ইউ থেকে প্রেসিডেন্সি হয়ে যাদবপুর, যেখানেই জ্বলে উঠবে প্রতিবাদ প্রতিরোধ আর বিদ্রোহের দাউ দাউ লাল আগুন, সেখানেই আপনাকে খুঁজে পাওয়া যাবে আগুনপাখি কমরেড সরোজ দত্ত।

0 Comments

Post Comment