হালিমার ফোন নম্বর, আধারকার্ড সবকিছুই তার কাছে জমা। উপরন্তু ঘরটাও দেখে এসেছে। কোথাও লোকাবার জায়গা নেই। তবু সে তাদের কিছু না জানিয়ে পালাল।
অয়নকে ফোন করতে সেও অফিস থেকে দ্রুত রওনা দিল।
তাদের গাড়িটা হালিমাদের বস্তির সামনে দাঁড় করিয়ে তারা দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল। প্রথমে অয়ন ভেবেছিল সে ঠিক চিনে নিতে পারবে। কম বার তো এখানে আসেনি। কিন্তু প্রতিবারের মতো আবার হারিয়ে ফেলল হালিমাদের ঘর। মীরার তর সইছিল না। সে যাকেই দেখা পাচ্ছিল হালিমার ঘরের কথা জিজ্ঞাসা করছিল। অবশেষে অয়নকে নিয়ে সে ঠিক দরজাটার সামনেই দাঁড়াল।
তাদের দেখে অনেকেই উঁকি দিচ্ছে। একজন মহিলা বালতি নিয়ে ফিরছিল। সে যেন মীরাকে দেখে ফিচকে হাসি দিল।
দরজায় বেশ কয়েকবার কড়া নাড়াতে যে দরজা খুলল সে হালিমা না। মীরা তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। গিয়ে দেখল আরও দু-জন মহিলার সঙ্গে হালিমা মেঝেয় বসে চা-মুড়ি খাচ্ছে। সকলেই গর্ভবতী।
হালিমা চমকে উঠেছিল।
ওরা যে এখানে চলে আসতে পারে তা অনুমান করতে পারেনি। তাছাড়া তার প্লান ছিল সন্ধের মধ্যেই ফ্লাটে ঢুকে যাওয়ার। মীরা আগে ফিরে সব গোলমাল পাকিয়ে দিয়েছে।
সে মীরাকে কিছু বলতে না দিয়েই বলে উঠল, আমার খালাত বোন এসছে গো দিদি। তাই খবর পেয়ে চলে এসছিলুম।
মীরা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। রাগে আর ভয়ে কষকষ করছিল। অয়ন তাকে সামলে নিয়ে বলল, আমাদেরই তো বলতে পারতে। আমি নিজে গাড়ি করে নিয়ে আসতাম। তুমি বাসে করে এতোদূর না এলেই পারতে। নিজেই তো শুনেছ ডাক্তার কী বলেছেন।
মীরা বেরিয়ে গেছিল।
ফেরার পথে ওরা তিনজন কেউ কোনো কথা বলেনি।
রাতে শুয়ে মীরা অয়নকে বলল, একটা জিনিস লক্ষ করেছ?
- সবার পেটে বাচ্চা?
- , ওটা তো এদের বিজনেস। ওটা বলছি না।
- ?
- তুমি অস্ট্রেলিয়া থেকে যে শো-পিসটা নিয়ে এলে সেবার...
- ?
- ব্রোঞ্জের ক্যাঙারু। ওটা ওখানে দেখলাম। তখন কিছু বলিনি। যে-ভাবে হোক আর একমাস কাটিয়ে দিতে পারলেই বাঁচি। উফ।
অয়ন পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, ভালোই করেছ কিছু না বলে। এসময় ও টেনশান খেলে আমাদেরই ক্ষতি।
সারারাত ঘুম হল না মীরার। আজকাল ওষুধেও কাজ হচ্ছে না তার। ভোরের দিকে সে দেখতে পেল তাদের বেডরুমে নাইটি পরে হালিমা ঘুরছে। হালিমার গর্ভ, যেখানে তাদের সন্তানটি বড়ো হচ্ছে, সেই গর্ভটি যেন প্রতিমুহুর্তে তাকে বিভিন্ন উপায়ে বিব্রত করতে চাইছে।
ভোরের আলো সামান্য ঢুকছিল ঘরে। পার্দায় আবার তা ঢেকে যাচ্ছিল – তখন অন্ধকার। মীরা উঠে বসতেই হালিমা সরে পড়ল।
অয়ন ঘুমোচ্ছিল। সে জানতে পারেনি।
হালিমাকে চুজ করা সহজ ছিল না। তার গর্ভ সন্তান ধারণের জন্য তৈরি থাকলেও রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ছিল মাত্র ৯। ডাক্তারের পরামর্শে যেসব ওষুধ ও খাবারের তালিকা দেওয়া হয়েছিল সেসব অয়ন নিজে কিনে হালিমার হাতে দিয়ে আসত। কিন্তু কিছুতেই তার রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ছিল না। সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছিল নিম্ন রক্তচাপের উপদ্রব।
ডাঃ সুবিনয় বসু অয়নের ক্লাসমেট। ওরা যখন সন্তান নেবার প্লান করছিল, তখনি সুবিনয় জানিয়ে দিয়েছিলেন মীরার জরায়ু সন্তানধারণের জন্য সক্ষম নয়। অগত্যা সারোগেসি। হালিমার বয়েস কম। প্রথম সন্তানটি জন্মাবার কিছুদিনের মধ্যেই নিমোনিয়ায় মারা গিয়েছে। স্বামীর নির্দিষ্ট কোনো ইনকাম নেই। কাজের সূত্রে ভিনরাজ্যে পারি জমায়।
পদ্ধতিটা জানানোর দরকারই পড়েনি। হালিমা নিজে থেকেই জানিয়েছিল সে সব জানে।
অবাক হয়ে গিয়েছিল মীরা।
সুবিনয় জানিয়েছিলেন, এটা এখন অনেকেই করছে। সবসময় যে লিগাল দিকটা দেখা হচ্ছে তাও না।
- হালিমা মিথ্যা বলছে না তো? এটাই ওর প্রথম সারোগেসি?
- -ব্যাপারে নিশ্চিত থাকো। ওর সন্তানটির ক্ষেত্রে নর্ম্যাল ডেলিভারি হয়েছিল। আর কোনো ইস্যু নেই।
তবু সন্দেহ যায় না মীরার। সে বলল, আমার মনে হয় ও খাবার আর ওষুধগুলো বাইরে বিক্রি করে দেয়। সেজন্যই হিমোগ্লোবিন বাড়ছে না।
হালিমার সঙ্গে কথা বলে সুবিনয় তাকে রাজি করিয়েছিল। কিছুদিন মীরাদের ফ্লাটে থাকবার পরেই তার শরীরে দ্রুত উন্নতি লক্ষ করা গেল। তারপর ভ্রূণ যখন তার পেটের ভেতর জায়গা করে নিল, তার কালো গড়নে খানিক গোলাপি আভা দেখা দিল।
মীরা ওর সঙ্গে বন্ধত্ব পাতাবার চেষ্টা করেছে। ফ্লাটে হালিমার অবাধ গতায়াত। একদিন সে দেখল হালিমা তাদের পুরনো এলবমটা নিয়ে সোফায় বসে রয়েছে। বিরক্ত হয়েছিল মীরা। কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না।
ছবিটা মাদুরাই-এর ক্যাম্পাসের। এম-টেকের ফাইনাল ইয়ার তখন। অনেকের মধ্যে হালিমা অয়ন আর মীরাকে ঠিক চিনতে পেরেছে।
সে জিজ্ঞাসা করল, দাদা আর তুমি একসঙ্গে পড়তে?
মীরা জোর করে হাসল। তার ভেতর সেই ভয়ানক সময়টা আবার ফিরে আসছে।
- তোমাদের খুব মজা হত, না?
হালিমার প্রশ্নে সে যেন নিজের চিৎকার শুনতে পেল। ফাইনাল পরীক্ষার মাসখানেক আগের ঘটনা। সে প্রেগনেন্ট হয়ে পড়েছিল। সুবিনয় তখনো এমবিবিএস পাশ করেননি। তবু তাঁকেই ফোন করেছিল অয়ন। অয়ন রাজি ছিল না। কিন্তু মীরা সুবিনয়কে অনুরোধ করে ট্যাবলেটটা জেনে নিয়েছে। আলট্রা সোনোগ্রাফি করতে বলা হয়েছিল। মীরা ঝোঁকের মাথায় সেসব না করেই পিল খেয়ে নিয়েছিল রাত্রে। মিফেপ্রস্টোন আর মিসোপ্রস্টোল এখন যৌথভাবে তার পাকস্থলীতে। সে অপেক্ষা করতে থাকে। এই যৌথ রাসায়নিক এবার তার দেহে প্রজেস্টেরন হরমোন ব্লক করবে। ক্রমে প্লাসেন্টা থেকে ছিঁড়ে পড়বে ভ্রূণ। সারারাত পেটে হাত দিয়ে চেপেছিল। মাথার ভেতরটা ভারি হয়ে আসছিল। ভোরের দিকে তলপেটে প্রবল যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় কাতর হলে সে যেন শান্তি পেল। এবার রক্তপাতের মাধ্যমে ছোট মাংসপিণ্ডটি কোমোডের জলে পড়ে যাবে। ফ্লাশ করলেই সব বিপদ থেকে মুক্তি। কিন্তু রক্তপাত ঘটলই না। উপরন্ত যন্ত্রণা বাড়তেই থাকল।
শেষে হাসপাতাল। তারপর আধোঘুমের ভেতর সে টের পেয়েছিল তার তলপেটের নিচে আঁকশির মতো টান পড়ছে। কপালে ঘাম। কাছে অয়ন নেই। সে কথা বলতে পারছিল না। ঘুম চলে আসছে। ক্লান্ত...
বিকেলে অয়ন এলে জিজ্ঞাসা করেছিল, ক্যাম্পাসে কেউ জানে না তো!
অয়ন চুপ করে থেকেছিল কিছুক্ষণ।
হালিমা জিজ্ঞাসা করল, তোমরা হোস্টেলে একই সঙ্গে থাকত?
- তা আবার হয় নাকি। মেয়েদের হোস্টেল আলাদা।
মীরা হালিমার থেকে এলবমটা নিয়ে আবার আলমারিতে রেখে দিল। রান্নার মাসি রান্না করে চলে গিয়েছিল। মীরা হালিমাকে খাবার বেড়ে দিল।
হালিমা বলল, এই দেখো পেটে লাথি মারল।
মীরার মুখটা গম্ভীর। সে কোনো কথা না বলে চলে যাচ্ছিল। হালিমা আবার বলল, দিদি, তুমি বাচ্চাটাকে মানুষ করতে পারবে?
সেইদিন রাতে ফেরেনি মীরা। তাপসীর ফ্লাটে চলে গিয়েছিল। তাপসী তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে সে বাধা দিল না। সকালে তাপসীর উঠবার আগেই ঘরে ফিরে এসেছিল।
সুবিনয়ের কাছ থেক ডেট নেওয়া হয়েছে। সকালে মীরা হালিমাকে বলল, স্নান করে নাও।
হালিমা বাথরুমে ঢুকতে সে তোয়ালে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ওখান থেকে সরল না। তার কেন জানি মনে হচ্ছিল হালিমা শেষপর্যন্ত কিছু ঘটনা ঘটাবে। হঠাৎ কিছুর পড়ে যাবার শব্দ। হালিমা কি বাথরুমে আছাড় খেল? মীরা চেঁচিয়ে উঠল। দরজায় ঠকঠক করতে শুরু করে দিল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। ম্যাক্সি ছুটে এলো। মীরাকে দেখে ডাকতে শুরু করে দিল। অয়ন ছিল গ্যারাজে। সে ফিরে এসে দেখল মীরার মুখ ঘামে ভিজে। ম্যাক্সি তার কামিজ ধরে টান দিচ্ছে।
অয়নকে দেখে মীরা কেঁদে উঠল, মাগো...
অয়ন তখনো কিছু বুঝতে পারেনি। সে মীরার পিঠে হাত দিয়ে বলল, কী হয়েছে?
- আমাদের বাচ্চাটা...
- কী হয়েছে?
আর কথা বলতে পারছিল না সে। অয়নকে আঁকড়ে ধরল। ইতোমধ্যে হালিমা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার মুখে অদ্ভুত হাসি। মীরা দেখল হালিমার কাপড় রক্তে ভিজে যাচ্ছে। সে অয়নকে আঙুল উঁচিয়ে সেটা দেখাতে চাইছিল।
হালিমা বলল, আমি রেডি।
মীরা ভয়ে তার দিকে তাকাচ্ছিল না।
অয়ন তাগাদা দিল, কী হয়েছে হয়েছে মীরা? হালিমা তো রেডি! চলো এবার।
মীরা তবু তাকাল না।
হালিমাকে OT-তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সুবিনয় জানিয়েছেন, বাচ্চা আর হালিমা দু'জনাই সুস্থ। কোনো চিন্তার কারণ নেই।
তাও মীরা তটস্থ হয়ে পড়ছিল। অয়ন যখন ওর জন্য কফি নিয়ে এসেছিল তার হাত দুটো কাঁপছে। অয়ন মীরার হাত ধরে বলল, তুমি আবার ওষুধগুলো ডিসকন্টিনিউ করছ কেন? ওগুলো না খেলে তুমি তো নিজেই জানো কী ভীষণ সমস্যায় পড়তে হয় তোমাকে। এখন আমাদের বাচ্চা আসবে। এখন এমন অবহেলা কোরো না। প্লিজ।
মীরা কফিতে চুমুক দিয়ে কাতর গলায় বলল, আমি মা হতে পারব?
- খুব ভালো মা হবে তুমি।
- সত্যি বলছ?
আধাঘণ্টার মধ্যেই সুবিনয় বেরিয়ে এলেন। তিনি জানালেন ছেলে জন্ম দিয়েছে হালিমা।
অয়ন মীরাকে জড়িয়ে ধরেছিল। মীরা ভয় পাচ্ছিল ভবিষ্যতের জন্য।
পাঁচদিন পর হালিমাকে ছাড়া হল। কথামতো সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া অব্দি হালিমা ওদের সঙ্গেই থাকবে।
গাড়িতে ফেরবার পথে মীরা তার ছেলেকে কোলে নিয়েছিল। নরম ঘাড়। মাথার তালু সামান্য নরম। সে কাঁথাতে ঢেকে বাচ্চাটার দিকে খানিক তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। কিছুতেই থামছে না। বাধ্য হয়ে সে হালিমাকে দিতেই বাচ্চাটি থেমে গেল তৎক্ষণাৎ।
মীরা আর অয়নের নাম থেকে ছেলেটির নাম রাখা হয়েছে অমিয়। সেই নাম মুহুর্তেই অমুতে পরিণত হয়ে গেছে।
অমুর শোবার জন্য ছোট খাট-বিছানা, দোলনা, হাজার রকমের খেলনায় ঘর ভরে গিয়েছে। মীরা তাকে কোলে নিয়ে কতো কথা বলে। গান গায়। খেলনা নিয়ে খেলতে যায়। কিন্তু অমু যেন তাকে সহ্যই করতে পারে না। সারাক্ষণ কান্না। আবার হালিমার কোলে উঠলেই চুপ।
সেদিন শুতে যাবার সময় সে দেখল হালিমা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে অমুকে। কালো স্তন। তাতে ফোঁড়ার দাগ। সেটাতেই মুখ গুঁজে দুধ খাচ্ছিল অমু। গা গুলিয়ে উঠেছিল তার। সকালেই কিনে আনল ব্রেস্ট পাম্প। হালিমাকে সে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে পাম্প করে অমুর জন্য দুধ সংগ্রহ করে রাখতে হবে।
হালিমা তাই করল। বোতলে সেই দুধ নিয়ে অমুকে খাওয়াতে গেল মীরা। কিছুতেই সে খাবে না। ঠোঁট বন্ধ করে আছে। চেয়ারে বসে মীরাকে দেখে হাসি পাচ্ছিল হালিমার। মীরা থামবার পাত্রী নয়। জেদ চেপে গেছে। সে দুধটুকু না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়বে না অমুকে। এদিকে অমু কান্না থামায় না। তার চীৎকার সারা ঘর তছনছ করে দিচ্ছে। একসময় বুঝি অমু হাঁপিয়ে উঠেছিল। মীরা তবু বাচ্চাটাকে ছাড়ল না। না খেয়েই শুয়ে পড়েছিল অমু। দোলনায় দোলা দিতে দিতে মীরাও ঘুমিয়ে পড়ল।
অয়ন কখন তাকে বেডরুমে নিয়ে গেছে সে টের পায়নি। কীসের শব্দে তার ঘুম ভাঙল আবার। অমু নেই। একটা ছায়া যেন ঘরের কোণায় বসে রয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি। অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে বুঝল ওটা ম্যাক্সি। কিন্তু ম্যাক্সি কী চিবোচ্ছে? মেঝেতে রক্ত কেন? অমু কোথায়? হাতের কাছে ছিল একটা বই। সেটাই ছুঁড়ে মারল ম্যাক্সিকে। ম্যাক্সি কুঁই কুঁই করতে করতে বাইরে বেরিয়ে গেল। এবার ধীর পায়ে সেদিকে যেতে সে দেখল একটা ছোটো হাড় মেঝেতে পড়ে। হাড়টাতে তখনো কিছু মাংস লেগে রয়েছে। কাঁচা রক্ত চারদিকে।
অমু?
অমু?
মীরা ছুটে চলে গেল হালিমার ঘরে...
সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারছিল না মীরা। অয়ন অফিসের জন্য তৈরি হয়ে তাকে ডাকলে সে বলল, ম্যাক্সি...ম্যাক্সি...
অয়ন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, তুমি কেন ওষুধগুলো খাচ্ছ না? আবার সমস্যায় পড়লে এখন আমি সামলাব কীভাবে!
- ... অমু কোথায়?
- বাইরে বেরিয়ে দেখো।
মীরা বাইরে বেরিয়ে দেখল অমু হালিমার কোলে শুয়ে রয়েছে। বারান্দায় সকালের রোদ। রোদে অমু যেন ভেজা কাপড়ের মতো আরামে ঘুমোচ্ছে।
সে একটা বল ছুঁড়ে দিতেই ম্যাক্সি সেটা মুখে নিয়ে দ্রুত ফিরে এলো। ম্যাক্সির জন্য খাবার বানিয়ে খুব আদরের সঙ্গে তাকে খাওয়াল। খেয়ে নিয়ে ম্যাক্সি তার গা ঘেঁষে শুয়ে থাকল খানিকক্ষণ।
মীরা স্নান করে নিয়েছে। এখন তাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। সে জিন্সের উপর নতুন টপটা চাপিয়ে ম্যাক্সিকে নিয়ে বেরল। নিউটাউন ছাড়িয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছিল গাড়ি। ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসে রয়েছে ম্যাক্সি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে।
সামনে খোলা মাঠ দেখে সে গাড়িটা থামাল। ম্যাক্সিকে নামিয়ে মাঠেই ঘুরতে থাকল। সে বলটা ছুঁড়ে দিচ্ছিল। ম্যাক্সি ছুটে গিয়ে বলটা মুখে নিয়ে আবার ফিরে আসছিল।
মীরা ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে সরছিল। আর বলটা ছুঁড়ছিল আরও জোরে। একসময় যখন বুঝল ম্যাক্সি পোঁছবার আগেই সে গাড়িতে স্টার্ট দিতে পারবে, সে উঠে পড়ল। কিন্তু ম্যাক্সি ফিরে এসেছিল দ্রুত। বন্ধ জানলায় পা আর মুখ দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছিল।
মীরা সেদিকে তাকাল না। গাড়িটা দ্রুত ব্যাক করে মুহুর্তে রোডে উঠে সটান বেরিয়ে গেল।
তাপসীর ফ্লাটে গিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। তাপসী তখনি কিছু জানতে চাইল না। এই তার গুন। সে মীরাকে কাঁদতে দিল। কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু পাশে বসে থাকল। কান্না থামলে একটা পেগ বানিয়ে বলল, খা।
মীরা এক চুমুকে সেটা শেষ করে আবার গ্লাস ভরে দিতে বলল।
অয়ন যখন তাপসীর ফ্লাটে এলো মীরা শুয়ে রয়েছে। ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছে না। তবু সে জেদ ধরল ম্যাক্সিকে খুঁজতে বেরবে।
রাত হয়ে এসেছে। মীরার নির্দেশ মতো গাড়ি ছুটছিল। কিন্তু যে মাঠের কথা সে বলছিল সেটার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া গেল না।
তাপসী তাকে বেশ কিছুদিন ধরে বোঝালে সে রাজি হল। ডাঃ অরুনিমা এতোদিন ধরে তাকে দেখছিলেন। তাঁর কাছেই গেল অয়নের সঙ্গে।
অরুনিমা নিজেই বললেন, তোমাকে আগে কোনোদিন বলিনি। আমার প্রথম সন্তানটি ছিল প্রি-ম্যাচিওর বেবি। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে ওকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। একসময় তো প্রায় মনে হত চেম্বার থেকে বাড়ি ফিরে হয়ত আমি দেখব সব শেষ হয়ে গেছে। তখন ফোন বাজলেই বুকটা ছ্যাঁক করে উঠত। এই বুঝি খারাপ খবরটা এলো।
মীরা চুপচাপ শুনছিল।
অরুনিমা বললেন, তোমার ভয়টা খুবই স্বাভাবিক। বরঞ্চ আমি বলব এই ভয় না থাকলে তুমি হয়ত ভালো মা হতে পারতে না।
মীরা অরুনিমার দিকে তাকাল, কিন্তু...
- আমি ওকে সামলাতে পারছি না। ও আমাকে পছন্দ করে না। ও যাদের পছন্দ করে তারা কিন্তু ওর ক্ষতি করবে।
- ও কাদের পছন্দ করে?
- আমাকে করে না।
অরুনিমা চুপ থেকে মীরাকে সময় দিলেন।
মীরা বলল, আমি না... আমি সব গুলিয়ে ফেলছি। ম্যাক্সির ঘটনাটা এখন আমি বুঝতে পারছি। বিশ্বাস করুণ ম্যাক্সিকে আমি আমার বাচ্চার মতো ভালোবাসি... ভালোবাসতাম। কিন্তু...ও তো পশু...তাই না?
অরুনিমা মাথা নাড়লেন।
মীরা আবার শুরু করল, যদি সত্যিই ও অমুর কোনো ক্ষতি করত। তখন তো কিছু করার থাকত না। আমি অনেক দূরের জিনিস ভেবেই কাজটা করেছি।
- নিশ্চই। অরুনিমা মীরাকে আশ্বস্ত করলেন, আমি এখানে কিন্তু তোমাকে জাজ করতে বসে নেই।
মীরা বলল, কিন্তু অমু তো আমাকে পছন্দ করে না। আমি কিছুই পারি না। আমি ওকে খাওয়াতে গেলে ও খায় না। ঘুম পাড়াতে গেলে ঘুমোয় না।
- তাতে কী হয়েছে?
- এর থেকে কোনো মায়ের কাছে আর বড়ো শাস্তি কী?
অরুনিমা বললেন, সব মা-ই নিজের সবটুকু দিয়ে তার বাচ্চাকে রক্ষা করে। তুমিও তাই করেছ।
- কিন্তু আমার ডিসিশনগুলো কি ভুল? এখন আমি নিজেকেই সন্দেহ করি। মনে হয় যেটা ভাবছি সেটা ঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু যদি সেটাই ঠিক হয়? আমার কাছে তো অন্য কোনো অপশন নেই।
- তোমাকে একটা গল্প বলি, অরুনিমা পায়ের উপর পা তুলে বললেন, একটা নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন অনেক মানুষ পার হয়। এটা ভাবাই যেতে পারে যে সাঁকোটা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু সেটা বছরের পর বছর সেইভাবেই রয়ে যাচ্ছে। অনেকে পার হচ্ছে। এখন তুমি সেটাকে দেখে কি ভয় করবে? সাঁকোটায় উঠবে না? নাকি বাকি সকলের সঙ্গে তুমিও সাঁকোয় চড়বে? তুমি চারদিকে তাকিয়ে দেখো। কতো মা কতো কষ্টে তাদের বাচ্চাদের মানুষ করছে। হ্যাঁ, দুর্ঘটনা কি ঘটছে না - অবশ্যই ঘটছে। কিন্তু সেটাই একমাত্র সত্য না।
- কিন্তু আমি যে হতভাগ্য হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
অরুনিমা হাসলেন, তুমি একজন ব্যাঙ্কের ডেপুটি ম্যানেজার। সমাজের উঁচুতলার মানুষ। তুমি কেন হতভাগ্য হতে যাবে? এই কথা চিন্তাতেই এনো না। আমি লিথিয়ামের ডোজটা বাড়িয়ে দিচ্ছি। কিছুদিন অসুবিধা হতে পারে। ধীরে ধীরে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
মীরা নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলছিল। সে ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল তার মাথার মধ্যেই আসলে সেই মনস্টারটা বসবাস করছে - এটা কল্পনা। এর কোনো ভিত্তি নেই। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্তনযুগলকে দেখছিল। মনে হচ্ছিল এর ভেতর হয়ত দুধ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেহ সে কোনো সাদাটে তরল বার করতে পারল না। অবশেষে ব্লেড দিয়ে বৃন্তটা খানিক চীরে দিল। চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত বেরতে থাকল। টিপে ধরতে আরও একটু রক্ত। কিন্তু সাদাটে তরলের কোনো চিহ্ন পেল না। সে তুলো দিয়ে বুক মুছে ব্রা পরে নিল।
হালিমা চলে গিয়েছে। একজন আয়া এসেছে অমুকে সারাক্ষণ দেখবার জন্য। এছাড়া অয়নের মাও একদিন হাজির হল।
অয়নের মায়ের সঙ্গে অমুর ভাব জমে গেছে। বয়স্ক মানুষটার কোলে গিয়ে সে স্বস্তি পায়। অয়নের মা বললেন, অমু পুরো অয়নের জেরক্স কপি। একটুও খিদে সহ্য করতে পারে না। সামান্য দেরি হলেই পাড়া মাথায় তুলবে।
মীরা আয়াটির দিকে চাইল।
রত্না তার দিকে চেয়ে হাসছে, এদিকে মায়ের মতো খুঁতখুঁতে। সামান্য ঠান্ডা হয়ে গেলে আর মুখে তুলবে না।
- তুমি ওকে ঠান্ডা দুধ দাও কেন? মীরা চেঁচিয়ে উঠল।
অয়নের মা তাকে থামিয়ে বলল, বৌমা আমি তো দেখছি সারাক্ষণ। রত্না ওর ঠিকই খেয়াল রাখে।
- যদি খেয়াল রাখে তো ঠান্ডা দুধ দেয় কেন? আমি তো ওকে সারাক্ষণ মোবাইলে কথা বলতে দেখি। সেদিন দেখলাম অমু বিছানার ধারে চলে এসেছে, এদিকে ওর কোনো খেয়াল নেই। ভাগ্যিস আমার চোখে পড়েছিল।
- আবার তুমি উল্টোপাল্টা ভাবছ বৌমা।
মীরা শাশুরির উপর ক্ষেপে গেল, আমি পাগল নই মা। ওভার প্রোটেক্টিভও নই। যেটা দেখেছি, সেটাই বলছি।
- আমরা কেউ তোমাকে পাগল বলছি না।
- হ্যাঁ আপনারা সেটাই বলছেন। আপনি আর আপনার ছেলে... দুজনাই চান যাতে আমি পাগল হয়ে যাই... শোনো রত্না...
রত্না এতক্ষণ কী করবে বুঝতে পারছিল না। বলতে চাইল, দিদি আমি কিন্তু এতোসব ভেবে কিছু বলিনি।
- আমার কী মনে হয় জানো... তুমি কিছুই আর ভেবো না। আজকে ২০ তারিখ... আমি তোমাকে পুরো মাসের মাইনেটাই দিয়ে দিচ্ছি। কাল থেকে আর এসো না।
- ...
- আপনি আমার ঘর আমাকে সামলাতে দিন। প্লিজ।
- কী বলছ কী তুমি!
অয়নের মা চেঁচিয়ে উঠেছিল। তখনি কলিং বেল। অয়ন চলে এসেছে। ছেলেকে দেখেই অয়নের মা বলল, তুই ব্যবস্থা কর। আমি আর এখানে থাকতে পারব না। কালকের মধ্যেই ব্যবস্থা করবি!
অয়ন সাতসকালে অফিসে বেরিয়ে যায়। অমুর যাবতীয় দায়িত্ব এখন মীরার উপর। ঘর মোছার মাসিও কাজ ছেড়ে দিয়েছে। মেঝেতে পা দিলে পা চটচট করে। ওয়াশিং মেশিন থেকে জল উপছে পড়ল। বাথরুম থেকে সেই জল চলে এলো বসবার ঘর পর্যন্ত। এদিকে অমু থামে না কিছুতেই। কোনো খেলনাতেই সে দু-মিনিটের বেশি মনোযোগ দেয় না। অফিসে কিছু জরুরি মেইল করতে হত। কিন্তু ল্যাপটপ খোলার সঙ্গে সঙ্গে অমুর চীৎকার। খাওয়া নেই। নাওয়া নেই। মীরা পাগলের মতো নিজের চুল ছিঁড়তে থাকে। চোখের নিচে কালো দাগ। গরম তেল ছিটকে এসে সেদিন পড়ল ঠোঁটের উপর। জায়গাটায় চামড়া উঠে গিয়ে ঘায়ের মতো হয়ে আছে।
সে ল্যাপটপটা সজোরে বন্ধ করে দিল। অমুকে কোলে নিয়ে বারান্দায় বেরিয়েছে, দেখল একজন লোক তাদের ঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
মীরাকে দেখতে পেয়েই লোকটা বলল, দিদি এমন কাজটা করতে পারলেন?
মীরা কিছু বুঝতে পারছিল না।
লোকটা বলল, রত্নার নামে সেন্টারে কমপ্লেইন করলেন কেন? আমাদেরও বাচ্চা আছে। রত্নার এখন কোনো কাজ নেই। দিদি... ও দিদি...
মীরা তাড়াতাড়ি বারান্দা থেকে ফিরে এলো। দোলনায় অমুকে শোয়াতে যেতেই তার সেই কান্না। তীক্ষ্ণ শব্দে যেন মীরার কান দিয়ে রক্ত বেরোবে এবার। সে কান চেপে ধরেও রেহাই পেল না। কান্নার স্বরটা বাড়তেই থাকল। সূচের মতো তার মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। এখুনি মনে হচ্ছে স্ক্রু-ড্রাইভার কানের ভেতরে ঢুকিয়ে দিই। ফালাফালা হয়ে যাক মগজ।
সে দেয়ালে মাথা ঠুকতে থাকল।
অয়ন ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে ঘরে ফেরে। দু-একটা কথার পরেই তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়।
তাপসী এলো। তাকে জড়িয়ে ধরল মীরা। তাপসী বুঝতে পারল মীরা বহুদিন স্নান করেনি। চারদিকে অমুর কাপড় ছড়ানো। বেশিরভাগ খেলনা ভাঙা। গ্যাস-ওভেনে পুরু তেলচিটে দাগ।
সে মীরাকে স্নান করিয়ে দিল। নিজের হাতেই রান্না করল। অমু কিছুক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। আবার জেগে উঠে চেঁচাতে শুরু করলে তাপসী বলল, চল্। অমুকে নিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসি। কিছু কেনাকাটাও করা যাবে।
তাপসী অমুকে নিয়ে ঘুরছিল। অমুকে দেখে মনে হচ্ছে সে বাইরে বেরোতে পেরে বেশ খুশি হয়েছে। আর কাঁদছে না। কিন্তু ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটায় ঢুকে মীরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কী কিনতে এসেছে, কেন এসেছে - সব যেন মাথা থেকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। তাপসী কিছু চকোলেট কিনেছিল। সেদিকে তাকিয়ে মীরা নিজেও চকোলেটের র্যাকের দিকে এগোল। কিচ্ছুতে হাত দিতেও ইচ্ছা করল না তার। শেষে একটা মাংস কাটার চপার কিনল।
তাপসী বলল, ওয়াইন শপের দিকে যাবি?
বাচ্চা মেয়ের মতো মাথা নাড়ল মীরা। বলল, সাবান নেই। আর টুথপেস্ট। কাপড় শুকানোর ক্লিপ। জানিস তো অমুর সব কাপড় সারাদিন মেঝেয় গড়াগড়ি খায়। ক্লিপ কিনতে হবে। মনে রাখিস কিন্তু। খুব দরকার। ক্লিপ। ক্লিপ কিনব। মনে থাকবে তোর?
তাপসী ওর গালে হাত দিলে ঝরঝর করে জল পড়তে থাকল। রুমাল আনেনি। তাপসী নিজে রুমাল দিয়ে মীরার চোখ মুছিয়ে দিল।
গাড়িতে উঠবার আগেই সেই ভয়ানক ডাকটা শুনতে পেল সে - দিদি... ও দিদি।
মীরা পেছনে ফিরলে দেখল রত্নার বর তার দিকে চেয়ে হাসছে। হাতে একখানা লোহার রড।
দ্রুত গাড়িতে উঠেই দরজাটা বন্ধ করতে চাইছিল সে। কিন্তু লোকটা দরজাটা বাইরে থেকে টেনে ধরেছে। সে কিছুতেই দরজা টানতে পারছে না। আচমকা লোহার রডটা এসে পড়ল তার আঙুলের ডগায়। যন্ত্রণায় হাত সরিয়ে নিতেই তাপসী কোনোরকমে গাড়িটা চালাতে শুরু করল। লোকটি তখনো পেছনে দাঁড়িয়ে। মীরা বারবার পেছন ফিরে লোকটাকে দেখছিল।
তাপসীকে বলল, থানায় চল্। তাড়াতাড়ি।
তাপসী কিছু বুঝতে পারল না।
মীরা বলল, এদের কাছ থেকে আমি অমুকে বাঁচাব কীভাবে?
গোল চাঁদ আচমকা ঢেকে গিয়েছিল মেঘে। মুহুর্তে আকাশটা কালো হয়ে এলো। একটা প্যাঁচা তাদের বারান্দায় নিঃশব্দে নেমে এসে রেলিং-এর কোণায় এসে বসল। এখান থেকে বেডরুমের কিছুটা দেখা যায়।
কুকুরের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল মীরার। অমু দোলনায় শোয়। সেখান থেকে চাপা কান্নার শব্দ আসছে। অয়ন ঘুমোচ্ছে। কোনোদিকে তার খেয়াল নেই।
মীরা অমুকে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। সে গান গাইতে পারে না। কিন্তু আজকে হঠাৎ যেন তার গলা দিয়ে সুর বেরিয়ে আসছে -
ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি / মোদের বাড়ি এসো, / খাট নাই পালং নাই / চোখ মেলে বসো।
মীরার গান শুনে অমু চুপ করে গেল। এই প্রথম সে ছেলেকে চুপ করাতে পারল। সে অমুকে টেবিলে শুইয়ে দুধ বানাচ্ছিল - বাটা ভরে পান দিবো / গাল ভরে খেয়ো, / খোকার চোখে ঘুম নাই /
ঘুম দিয়ে যেয়ো...
সসপ্যান থেকে বোতলে দুধ ঢালতে গিয়ে সসপ্যানটা পড়ে গেল মেঝেয়। মেঝেতে বাচ্চার দুধ ছড়িয়ে। ওদিকে অমুর কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে তাকিয়ে দেখল টেবিল ফাঁকা।
বাইরে তুমুল হাওয়া দিচ্ছে। বারান্দার দরজাটা খুলে গেল। ওখানে রত্নার বর দাঁড়িয়ে। পাশে রত্না। রত্নার কোলে অমু চুপ করে রয়েছে।
চেঁচাতে পারছে না মীরা। তার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। রত্না গুনগুন শুরু করল - ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি / মোদের বাড়ি এসো।
মীরা হাতের কাছে কিছুই খুঁজে পেল না।
সে রত্নার দিকে এগিয়ে যেতেই রত্না অমুকে ছুঁড়ে দিল।
হালিমা অমুকে নিয়ে সেই একভাবে গাইতে থাকল - ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি / মোদের বাড়ি এসো...
রত্নার বর মীরার দিকে এগিয়ে আসছে। মীরা পিছু হঠছিল। হালিমা আবার অমুকে ছুঁড়ে দিল। কিন্তু এবার রত্না অমুকে ধরল না। অমু সপাটে আছাড় খেল মেঝেয়। অমুর আর কোনো নড়াচড়া নেই। কান্না নেই। চীৎকার নেই। শুধু মৃদু সুরে কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে - ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি / মোদের বাড়ি এসো...
পিছু হঠতে হঠতে সদ্য কেনা চপারে হাত ঠেকল মীরার। রত্নার বর লাফিয়ে রডটা দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই সে চপারটা চালিয়ে দিতে পারল। রক্ত ছিটিয়ে পড়ল তার মুখে। হালিমা আর রত্না এদিকে আসার সাহস পেল না। কিন্তু অমু? অমুর দিকে ছুটতে গিয়ে পড়ে গেল মীরা। রত্নার বর তখনো মরেনি। এক হাত দিয়ে মীরা পা টেনে ধরেছে। মীরা লাথি কষাচ্ছে। কিন্তু তাও হাতটাকে ছাড়াতে পারছে না। রক্তে ভিজে যাচ্ছে মেঝে। অমু একই রকম নিথর।
অবশেষে টান খানিক আলগা হতেই সে আবার চপারটা নিল। এবার এলোপাথারি চপারটা দিয়ে রত্নার বরের মাথায় আঘাত করতে শুরু করে দিল। আঘাতে আঘাতে মানুষটার করোটি্র ভেতর থেকে সাদা অংশ বেরিয়ে এলো। একটা চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে বাইরে ঝুলছে। ঠোঁট কাটা। ফলে নাকের নিচ থেকে মাড়ি আর দাঁত দেখা যাচ্ছে।
ক্লান্তিতে ওখানেই বসে পড়ল মীরা।
কাকের ডাকে সকাল হল। বিছানায় মীরা নেই। অমুও নেই। অয়ন মীরাকে ডাকল। কোন সাড়া পেল না। সে বসবার ঘর পেরিয়ে রান্নাঘরে গেল। রান্নাঘরে ঢুকতেই তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো।
মেঝেতে বসে রয়েছে মীরা। তার গায়ে পিঁপড়ে উঠছে। হাতে ধারাল চপার।
সে এগিয়ে যেতেই মীরা মুখ তুলল। রক্তাভ চোখ।
কাছে যেতে সাহস পেল না অয়ন। টেবিলে অমু শুয়ে ছিল। সে অমুকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
---
সাদিক হোসেন
পপুলার হাউস
মাগুরা মোল্লাপাড়া
মহেশতলা
কলকাতা ৭০০১৪১
ফোন- ৯০৫১৭১৮৬২৮