পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লাল পলাশের ভোর

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : রাজকুমার শেখ
বাঁক নিতেই গাড়িটা থেমে গেল। মুনির বেশ বিরক্ত। ও গাড়ির গ্লাস খুলে দূরের খেতি জমি দেখছিল। শরতের নীলাকাশ। চারপাশে রোদ ঝলমল করছে। এবার ছুটিটা কাটাবে শান্তিনিকেতনের কাছাকাছি বঙ্গছত্রে। তার এখানে থাকতে খুব ভাল লাগে। সেই কবে এসেছিল ও। এখানে থাকে তার ফুপুর জামাই ইসরুপ দোলা ভাই। দারুণ মানুষ।

মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকে। মুনির যা বলবে তাতেই হ্যাঁ।  দু'জনে মিলে সারা মাঠঘাট ঘুরে বেড়ানো। সেই কবেকার সব কথা। মুনির নিয়ম করে তার দোলা ভাইকে ফোন করে। মুনির আসছে মানে সব কাজ বন্ধ। ক'টাদিন এর জন্য তার আসা। কি ভাবে যে সময় কেটে যায় তা টের পাওয়া যায় না। সারাদিন পুকুরে মাছ ধরা।  বিকেলে বাহিরি, নতুন হাট, বাসাপাড়া অথবা অন্য কোন জায়গায় মুনিরকে আর ইসরুপকে দেখা পাওয়া যাবে। কোন দোকানে বসে চা খাচ্ছে।  কত মানুষজনের সাথে আলাপ হয়। মুনির তাদের কথা শোনে। তাদের চাষাবাদ ছাড়া তেমন কাজ নেই। সারা বছর এমনি করেই চলে। অবশ্য এ সনয় অনেকে বাইরে কাজে চলে যায়। বছরের ধানটা এখানে ভাল ফলে। অজয়ের জল চাষের কাজে লাগে। বরষার ধান খুব ভালো হয়। এখন চারপাশে সবুজ হয়ে আছে গোটা মাঠ। চোখ ধরে যা সবুজ মাঠ দেখতে দেখতে। মুনির গাড়িতে বসে ভাবছে। ডাইভার নিজেই গাড়িটা ঠিক করল। আর কিছুটা গেকে নতুন হাট। নতুন হাটের গা ঘেঁষে অজয় নদ বয়ে গেছে। সুন্দর লাল বালু চর। এখানে এলেই ও অজয়ের পাশে চায়ের দোকানে চা খায়। এখানকার চায়ের স্বাদই আলাদা। একটু দূরে চপের দোকান। মুড়ি। ঘুগনি।  মুনির লোভ সামলাতে পারে না। মাঠের মুনিসরা ওই সময় টিফিন করে। ওদের সাথে মুনিরও খায়। ওদের কথা শোনে। কত কথা।  মুনির ভাবে মানুষের সমস্যা ছাড়া বাঁচে না। এখানে খেটে খাওয়া মানুষের ভিড় বেশি। একটু মুড়ির সাথে ঘুগনি। তাই কত আনন্দ করে খায়। মুনির অবাক হয়ে ওদের দেখে। এমন জীবন তারা মেনে নিয়েছে। অল্পতে তারা  খুশি।  অনেক আনন্দ।  মুড়ি খেয়ে বিড়ি ধরিয়ে টান দেয় সুখের। বিকেলে ছুটি করে লাইন দিয়ে বাড়ি ফেরে। ওদের সঙ্গে আদিবাসী মেয়েরাও থাকে। ধান পোঁতা কাজ করে। ওরাও লাইন দিয়ে মাঠ থেকে বাড়ি  ফেরে। মুনির এ সব পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে দেখে। ও এক গভীর ভাবনায় ডুবে যায়।  এখানে সুখ আছে। মানুষ মানুষের সাথে সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়। এই অজেয় এর বাঁকে কবি  কুমুদরঞ্জন এর বাড়ি। অজয়ের কাছে এলেই কবির কথা মনে পড়ে যায়।  এই সুন্দর লালমাটির  দেশে থেকে যেতে মন করে।

গাড়ি আবার ছুটে চলেছে। দুপাশের গাছ গাছালী দেখছে।  সবুজ গন্ধ।  খাল বিলে পদ্ম ফুল ফোটে আছে।  টলটল করছে জল। জলজ গন্ধ বাতাসে মিশে ভেসে আসছে।  মুরাদ দারুণ গাড়ি চালাচ্ছে। ওকে নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসবে। রবীন্দ্র সংগীত চালিয়ে দিয়েছে। মুনির মন দিয়ে গান শুনছে। আজ রেশমি এলে ভাল হত। ওর কলেজের কাজ আছে। ওর সঙ্গে বহুদিনের বন্ধুত্ব। রেশমি ওর সাথে অনেক জায়গায় বেড়াতে গেছে। রেশমি এখনো বিয়ে করেনি। চাকরি করে। নিজের মতো করে থাকে। ওর সুন্দর বাড়ি। ওর ঘরে চারপাশে থরে থরে বই রাখা। ও পড়তে খুব ভাল বাসে। মুনির কখনো কখনো ওর চায়ের নিমন্ত্রণে যায়। বসে গল্প করে। কাজের লোক আছে। সেই-ই চা করে আনে। সঙ্গে এটা সেটা। রেশমি এত সুন্দরী হয়েও তাকে ছেড়ে গেছে মবিন হক। তার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা ছিল। কিন্তু মবিনকে সে আর বিয়ে করেনি। কেননা মবিন আর একজনের সঙ্গে তার ভাব ছিল। রেশমি আগেই জানতে পারে। মবিনকে সে বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই রেশমী আর ওই পথে হাঁটেনি। মুনিরের সাথে তার দেখা হয় একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে।  মুনিরের কবিতা শুনে এসে আলাপ করে। তারপর ওর সঙ্গে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। সময় অসয়ম চলে যায় রেশমীর বাড়ি। রাত অবধি চলে আড্ডা।  মুনির এখনো বিয়ে থা করেনি। বেশ আছে ও। জীবনটাকে উপভোগ করছে। মন গেলে দু একটা গল্প লিখে ফেলে। ছাপা হয় কোন না কোন কাগজে। রেশমী কদর করে ওর লেখাকে। রেশমী বই কেনে অনেক।  নতুন বইয়ের গন্ধ নাক ডুবিয়ে নেয় ও। কথায় কথায় মুনির একদিন বলে,' বইয়ের গন্ধে মনটা কেমন করে না'?
' আমারও করে'।
' তাই'!
'হুম'।
রেশমী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।  কিছু বলে না। রেশমী যেন তার মধ্যে কিছু একটা খুঁজছে। মুনির হা করে তাকিয়ে ওকে দেখে। সুন্দরী রেশমী আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। ওর টিকালো নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। ও শাড়ির আঁচল দিয়ে মোছে। ওর গালে রক্তের ছোপ। যেন ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে। ওরা চুপ করে দাঁড়িয়ে। কেউ কথা বলছে না। 
হঠাৎ গাড়িটা শব্দ করে দাঁড়িয়ে গেল। মুনিরের চমক ভাঙে। দেখছে সামনে গরু। আর একটু হলে মনে হয় গরুটাকে লেগে যেত।  
' সাবধানে চালারে মুরাদ'।
' আরে দাদা, হঠাৎ গরুটা চলে আসে সামনে'।
' মুরাদ,  নতুন হাটে থামবি। ওখানে চা খাব। আর বেশি পথ না'। 

ওরা আবার এগোতে থাকে। ফাঁকা রাস্তা।  দুধারি বাবলা গাছের সারি। ধানিজমি। সবুজ গন্ধ। গাড়ি যেন সবুজের সমারোহর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে।  মুনির আবার ভাবনায় ডুবে যায়।  রেশমীর মধ্যে ও নিজেকে খুঁজে পায়। কিন্তু সব কথা তো বলা যায় না। ভেবেছিল এখানে এলে তাকে সব খুলে বলবে। কিন্তু সে তো এলো না। 
মুনির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শব্দ করে। বলা হবে না আর কোন দিনই। কেন না এখানে তার আসবার একটা কারণও তো আছে। বাহিরিতে একটি মেয়েকে দেখতে যাওয়ার  কথা। মেয়েটি কলেজে পড়ছে। ইসরুপ ভাই সে রকমই বলেছেন। পছন্দ হয়ে গেলে সে বিয়ে করে নেবে। বাড়িতে আর কতদিন বলবে যে পরে করবে বিয়ে।  আর নয়। সত্যি সে বিয়ে করবে। 
এমন সময় গাড়ি শব্দ করে দাঁড়িয়ে পড়ে। দেখছে ওরা নতুন হাট চলে এসেছে।  মুনির মুরাদকে বলে নামতে। ওরা চা খায়। অজয় নদে এখন অনেক জল। বয়ছে আপন নিয়মে। একটা কাটোয়ার বাস এসে থামল। কিছু লোক নামল বাস থেকে। মুনির চা শেষ করে মুরাদকে বলে, ' চল এবার যাওয়া যাক'। অজয়ের শীতল বাতাস উঠে আসে।  মন জুড়িয়ে গেল।  মুনির নদী দেখছে। কত ভাল লাগা জায়গা।  মুনির আজ অজয়কে ছুঁয়ে দেখবে। তার শীতল জলে তার মন আজ ডুবিয়ে দেবে। কত কষ্ট তার মনে।  সে সব দিয়ে দেবে অজয়কে।

২. 

লদুচাচার সাথে মুনিরের দেখা হয়ে গেল। এখনো মাঠে চাষাবাদ করেন। জমিই তার কাছে মা। সেই ছোট বেলার কথা এখনো তার মনে আছে। মেলাতে নিয়ে গেছিল লদুচাচা ঘাড়ে করে। মা বার বার বলেন,' লদুভাই,ও হারিয়ে যাবে। তুমি ওকে ছেড়ে দিও না যেন'!
' ভাবি, তুমি  খুব ভীতু। মুনির আমার ভাইপো। ওকে মেলাতে গরম গরম জিলিপি খাওয়াব। আরও কর কি'।
মা খুব ভয় পেতেন। আর মুনির চাচার সঙ্গে মেলাতে যাবেই।  সে শুনবে না। মুনিরকে ঘাড়ে বসিয়ে চলল। কে কার কথা শোনে। 
' বাপ, কবে এলি'?
' চাচা, কেমন আছো '?
' আর বাপ! শরীরে নানা রকম বেরাম জড়িয়ে গেছে।  আর ভাল কি'?
':চাচা, মা নেই বলে কি তুমি  আমাদের বাড়ি যাওয়া না'?
' ভাবির মতো কজন হয়রে মুনির! কত তার হাতের ভাল মন্দ খেয়েছি। কত সিনেমা গেছি দল গুছিয়ে।  সারারাত গল্প উঠেনে বসে। সব হারিয়ে গেল বাপরে! সব'!
লদুচাচার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে।  আর কথা বলতে পারে না। তার গা থেকে এখনো খেতের মাটির গন্ধ আসছে। মানুষটি সারাজীবন  মাটির সঙ্গে কাটিয়ে দিল। মুনিরের মন খারাপ হয়ে গেল। লদু চাচা ওকে বাড়িতে আসতে বলে চলে গেল খেতের আল ধরে। মুনির তাকিয়ে থাকে মানুষটির দিকে। তার কত ভাল চাচা। মুনিরের চোখ দুটোও জলে ভিজে ওঠে আপনা থেকে। ভাল লাগা মানুষ গুলো তার জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।  আজও মনে হয় এই তো সেদিন লদুচাচার ঘাড়ে চেপে সিনেমা দেখতে গেছে। খেতের আল ধরে হাঁটা পথ। পা ডুবে যেত ঘাসে। 

মুনির ফিরে আসে ইসরুপ ভাই এর বাড়ি। এখন অনেক বেলা। ইসরুপ ভাই ছিপ ঠিক করছে। আজ টালা পুকুরে মাছ ধরবে ওরা। তারপর বিকালে বাহিরি যাবে মেয়েটিকে দেখতে। মুনিরকে বলেছে ওর বাড়ির লোকজন মেয়েটির ছবি পাঠাতে। মোবাইল এ তুলে ও পাঠিয়ে দেবে। 

দুপুরের খাবার খেয়ে ওরা ছিপ নিয়ে চলল মাছ ধরতে। সুন্দর পুকুর। অনেক বড়ো জলা। গোটা পুকুরে পদ্ম গাছ। পদ্ম ফুলের গায়ে বাতাস লেগে টলছে। টলটলে জলে দারুণ লাগছে। কি তার সৌন্দর্য।  মন ভরে গেল মুনিরের।  ইসরুপ চার করে। গভীর জলে ছিপ ফেলে ওরা বসে। মাছের ঘাই এ জল তোলপাড় করে ওঠে।  এখানে বড়ো মাছের আনাগোনা।  ওরা ছিপ ফেলে বসে থাকে। এমন সময় হঠাৎ সুতোতে টান লাগে। ইসরুপ খফ করে ছিপ ধরে। আর বড়ো রুই লাগে ছিপে। সে কী আনন্দ মুনিরের। কিন্তু অত বড়ো মাছ ইসরুপ ভাই তুলতে পারে না। সুতো ছিঁড়ে পালিয়ে যায়।  সে কি মন খারাপ ইসরুপ ভাইয়ের। তারপর ওরা অনেকটা সময় বসে থাকে। কিন্তু আর কেন মাছে টোপ আর ধরে না। হতাশ হয়ে ওরা বাড়ি ফেরে। 

৩.

বাহিরি থেকে ওরা ফিরে আসে বেশ রাত করে। ইসরুপ ভাই ওকে নিয়ে গেছিল বেড়াতে। সময় মতোই ওরা মেয়ের বাড়ি পৌঁছে যায়।  সে বিরাট খাতির। ইসরুপ ভাইকে ওরা সকলে চেনেন।   খুব সুন্দর পরিবেশ।  মুনিরকে সকলে দেখছে। এ বাড়ির জামাই হবে। ওরা বসে বাইরের ঘরে। দামি সোফা। দামি সব আসবাবপত্র। ঘরে একটি মেয়ের ছবি টাঙানো। বেশ দেখতে। তবে কি এই মেয়েটিই?  যাকে ওরা দেখতে এসেছে। মুনির চুপচাপ বসে আছে। যা বলার তার ইসরুপ ভাই বলছে। চা খেয়ে ওরা মেয়ে দেখা কাজটা সেরে ফিরতে চায়। কিন্তু মেয়ের বাপ কোন কথা শুনলেন না। খাইয়ে তারপর মেয়ে দেখালেন। মুনির দেখে। বেশ দেখতে।  সুন্দর টিকালো নাক। ঘন চুল।  সুন্দরী দেখতে। মুনির পছন্দ করে। 

ইসরুপ ভাই ওকে জিগ্যেস করে, মেয়ে পছন্দ কি না? মুনির বলে, পরে জানাব। ওর মনটা আজ কপমন যেন করছে। কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে নিজেকে। ও গোটা রাস্তা আর কোন কথা বলে না। রাতে খেয়ে ও শুয়ে পড়ে। গোটা আকাশ জুড়ে চাঁদের আলো।  শিশির ঝরছে। দূরে কোথায় যেন একটা পেঁচা ডেকে উড়ে পালালো।  ওর বুক কেমন যেন করে ওঠে।  চারপাশে চাঁদের আলে্াতে থকথক করছে। মুনির তাকিয়ে আছে। কেন যে তার এত মন ভার তা সে বলতে পারবে না। ও যেন কাছের কাউকে হারিয়ে ফেলছে। তার জন্য কি মন খারাপ?  রাত বয়তে থাকে। অজয়ের ডাক শোনা যায়। দূরের খেতি জমিতে শেয়াল ডাকছে।  আর একটু পরেই ভোর হবে। ফজরের আজান দেবে। মুনির কিছুতেই ঘুমোতে পারছে না। বার বার মোবাইল দেখছে। কারো কি ম্যাসেজের অপেক্ষা করছে ও? কিন্তু কি হচ্ছে মনে তা বুঝিয়ে বলতে পারবে না পাঁচ জনকে। কিন্তু কিছু একটা চলছে মাথার ভেতর।  এমন সময় দূরে কোথায় মসজিদে ফজরের আজান দিচ্ছে।  মুনির পাশ ফিরে শোয়। পুবের আলো ফুটবে আর একটু পরেই।  বুকের ভেতর আনচান করছে। শূন্য শূন্য লাগছে নিজেকে। 
ওর চোখটা কেবলে এঁটে এসেছে। এমব সময় হঠাৎ ওর ফোনটা রিনরিন করে বেজে ওঠে।  মুনেরর ঘুম টুটে গেল। দেখছে রেশমীর কল। মুনির সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে। 
' এত ভোরে রেশমী?  তুমি ঠিক আছো তো? কি হল বলো'?
' মুনির, আজ সারা রাত ঘুমায়নি। তুমি কখন ফিরবে'?
' কাল'।
' আজ ফেরা যায় না'?
' কেন?  কি হল তোমার'?
' এমনি'!
' তুমি কিছু বলতে চায়ছো? বলো '?
' আমার শরম লাগছে বলতে'।
মুনির আর কিছু জিগ্যেস করে না।  ও বুঝে গেল যা বোঝার। রাত জাগরণের কথা ও ভুলে গেল। তার এই ভাল লাগা ভোরে পলাশ ফুটেছে রেশমীর মন জুড়ে।

0 Comments

Post Comment