পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কাফেরের কুরবানি

  • 21 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 828 view(s)
  • লিখেছেন : অরুণ সিরাজ
এবার মৌলভীর ফতোয়াতে নিজের জন্য নয়, বাড়িতে মা কোনও বিড়ম্বনায় পড়বে কিনা ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি। আমার জন্য মায়ের জানাজা-কবর গাঁয়ের লোকে হারাম করে দেবে না তো? মায়ের যে বড় সখ! হ্যাঁ, সখই। আমার আব্বা যেখানে শায়িত আছেন, সেই কলাপুকুরের পাড়ে বেলগাছের ছায়ায়, মাত্র তিন বাই সাত ফুট মাটি।

বছরের এই বিশেষ দিনটাতে আমি মিথ্যে বলে থাকি।

কি জানি মনে হয় এবার বোধহয় ধরা পড়ে যাব। মিথ্যে বলে আর পার পাব না।

আমি আজান আলি। সরকারি চাকুরে, তরুণ সার্জেন, কাটোয়া হাসপাতালে। বাড়ি উত্তর দিনাজপুরের এক গ্রামে। বাড়িতে মা আর ছোটভাই। মা কোয়াটার-জীবনে অভ্যস্ত নন, তাই আমি হাসপাতালের কোয়াটারে একা থাকলেও মা বেশিদিন আমার কাছে থাকতে পারেন না। বলেন, কোয়াটারে থাকলে হোটেল হোটেল মনে হয়। আসলে গ্রামের বাড়ির চোহদ্দি বড়। উঠোন, খামার, গাছগাছালি- সব খোলামেলা ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা কোয়াটারে কথা বলার সুযোগ কম। গ্রামের বাড়িতে বসেই সব বাড়ির খোঁজ পাওয়া যায়। কোয়াটারে তা হয়ে ওঠে না।

এবার গাঁয়ের মৌলভীসাহেব ফতোয়া দিয়েছেন, ইব্রাহিম নবী যেমন নিজ হাতে আপন সন্তানকে কুরবানি দিয়েছিলেন তেমনি আমাদের সবাইকে নিজের পশু নিজেকেই কুরবানি দিতে হবে। এ তো বেশ ঝামেলায় পড়া গেল দেখছি।

ডাক্তার হিসেবে রুগীর পেট ফানা ফানা করে কেটে কুটে, ফেড়েফুঁড়ে আবার তা জোড়া লাগিয়ে দিই। পেটের ভেতর ঘরের মধ্যে ঘর। অলিগলি তস্য গলি। এ ঘর সে ঘর, ছুরি কাঁচি নিয়ে নিপূণ হাতে কত ভাঙাগড়া! আর সামান্য পশুর গলায় ভর ভর করে ছুরি চালানো- এ আর কঠিন কী?

কুরবানির পশুর গলার চারটে নালি কাটতে হয়। খাদ্যনালী, শ্বাসনালী ও গলার দু-পাশে দুই বড় ধমনী, যা ব্রেনে রক্ত বহন করে, কাটলেই কেল্লা ফতে! মৌলবি সাহেব বলেন, আল্লার রাহে পশুর রক্তমাংস পৌঁছায় না কিন্তু আত্মত্যাগ ঠিক পৌঁছে যায়! সুভান আল্লা !

কুরবানিতে, আমি আজান আলি বাড়ি যাই না। গাঁয়ের দুস্থ মানুষের জন্য পোশাক আশাক আর টাকা পাঠিয়ে দিই মাকে। মা বিতরণ করে দেয় সব। বাড়ি যেতে না পারায় গ্রামের চাচাতো ভাইরা ফোনে জিজ্ঞেস করে, ঈদমুবারক ডাক্তার ভাই! ঈদে এলে না তো!

- হাসপাতালে ভীষণ চাপ ভাই। যেতে পারলাম না।

মিথ্যে বললাম। আদৌ সেদিন আমি হাসপাতালে নেই। আমার ছুটি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আরও দু-তিনদিন ছুটি মঞ্জুর করে বেরিয়ে পড়ি। কোনোবার পুরুলিয়া তো কোনোবার সুন্দরবন। কোনও পরিকল্পনা না থাকলে নিদেন পক্ষে শান্তিনিকেতন। বেড়াতে যাওয়া যেটাকে বলে তা কিন্তু নয়। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে চলে ওই সময়টাকে অতিবাহিত করা।

এদিকে আবার আমার হাসপাতালের সহকর্মী জানে আমি কুরবানিতে গ্রামে গেছি। ফোন করে কুশল জিজ্ঞাসা করে, আলিদা, ঈদমুবারক! তা গোস্ত কতটা হল?

- কুড়ি কেজি। কিছু না ভেবে আন্দাজে একটা বলে দিই।

- আপনি যে বললেন, গরু কুরবানি দেবেন?

- হ্যাঁ, গরুই তো দিয়েছি।

- তাহলে এত কম গোস্ত কেনে?

ব্যাপার গোলমাল করে ফেলেছি বুঝতে পেরে সামলে নিয়ে বলে, না না- বখরা ভাগের পর এই টুকু পেয়েছি।

- তাই বলেন। আমার তিনটে খাসি ছিল। দাদাজানের নামেরটা ৩৩ কেজি। আব্বাজানেরটা ২৮ কেজি। আর আমারটা ৩০ কেজি।

পরিচিত এক রুগীর বাড়ির লোক মাংস নিয়ে হাসপাতালের কোয়াটারে হাজির হয়। আমাকে না পেয়ে ফোন করে, স্যার- পরবের গোস্ত নিয়ে এসেছিলাম। উটের। এবার আব্বা ডাকবাংলার হাট থেকে উট কিনেছিলেন। এর আগে আমাদের গ্রামে কেউ উট কুরবানি দেয়নি। আমরাই প্রথম স্যার!

আগে যারা ধনী ছিল তারাই কুরবানি দিত। গরীব মিসকিনদের গোস্ত দান করত। তাদের থেকে এখন গরীব মানুষ কি কম যায়? এখন ধনী-গরীব সবাই কুরবানি দেয়। এদের অসুখ বিসুখ শিক্ষার জন্য টাকার অভাব থাকলেও কুরবানির পশু কেনার জন্য টাকার অভাব হয় না। আল্লার কী রহমত! এই তো ব্যাপারীপাড়ার রুস্তম পরের জমিতে দিনমজুরি করে। সে বলে, অ্যাঁঃ গোফুর কুরবানি দিবে আর আমার ছেল্যাগুলান তাকিন তাকিন দেখবি?

গোফুরের অবস্থাও ভাল নয়। সে বলে, ছামাদ যদি দেমাগ দেখিন কুরবানি দেয়- আমি দুবো না কেনে?

অতএব প্রতিযোগিতা।

সবাই কুরবানি আর মাংস নিয়ে বেশ মশগুল। আমি আজান আলি কেবল মিথ্যার পর মিথ্যা বলে চলেছি। কুরবানি নিয়ে এতবড় মিথ্যা বলাটা কি ঠিক হচ্ছে?

আমার ভেতরের দুর্বল লোকটা নতজানু হয়। নিমীলিত চোখে দু-হাত তোলে খোদার আরসে, ক্ষমা কর। আমি পারব না।

- কী পারবে না আমার বান্দা? ঈশ্বর প্রশ্ন করেন।

- পশু জবাই করতে। বান্দা বলে।

- কেন পারবে না? তোমার ইব্রাহীম নবী ছেলে জবাই করলো । তুমি পশু জবাই করতে পারবে না ?

- তোমার, সত্যিই এত রক্তের দরকার?

বান্দার প্রশ্ন শুনে ঈশ্বর চুপ করে যান।

দুই

এবার কুরবানির দিন ভোর হতে না হতেই একটা লোকাল ট্রেনে উঠে পড়ি। কোথায় যাব জানি না। টার্মিনাল স্টেশন পর্যন্ত টিকিট কেটে নিয়েছি। ট্রেনের জানালার বাইরে দৃশ্যপট যেমন পরিবর্তন হচ্ছে, আমার মনের ভেতরেও নানান চিত্র আবছায়িত হচ্ছে।

তখন আমার বয়স দশ। ক্লাস ফোরে পড়ি। আমাদের বাড়িতে একটা খাসি ছিল। ধবধবে সাদা রঙের। কেবল দাড়িটা কালো। সে ছিল আমার বড্ড ন্যাওটা। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা সবাই চা-মুড়ি খেতাম। খাসিটাকেও পেয়ালায় চা দিতে হত। পুকুরপাড় থেকে আমি বাঁশপাতা, আমপাতা, কাঁঠালপাতা, কখনও বা বটপাতা এনে খাওয়াতাম। তা বাদেও স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলে খাসিটা আমার সঙ্গে ভাত খেত। সন্ধ্যায় যখন হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসতাম আমার গা ঘেঁষে বসে আদরখাকি বেড়ালের মতো আদর খেতে চাইত। আমি তার সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিতাম। কখনও কখনও সার্কাশের মতো খেলা শেখাতাম তাকে।

সেই খাসিটা হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ল। পেট ফুলে ঢোল। মুখ দিয়ে লালঝোল। চোখে নাকে জল। দ্রুত শ্বাস পড়ছে। খায় না কিছু। সবসময় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে আর করুন দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকে।

গ্রামের হাতুড়ে পশু চিকিৎসক এল। খাসিটার দু-পাটি চোয়াল ফাঁক করে কুলপাতা সহ কী যেন একটা ওষুধ তার মুখে পুরে দিল। একটা ইঞ্জেকশনও দিল। কিন্তু কাজ হল না, খাসিটা আরও নেতিয়ে পড়ল।

আমাদের বাড়ির পাশে আমার নানার বাড়ি। খবর পেয়ে নানা একটা ছুরি নিয়ে এসে হাজির। সেই ছুরি দেখে আমার শুধু ভয় হল না, তীব্র ভয় হতে লাগল। এই বুঝি নানা খাসিটাকে জবাই করবে।

আমার আশঙ্কাটা সত্য। খাসিটাকে জবাই করা হল। গলাকাটা খাসিটা জিভ বের করে তখনও জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বাড়ির সবার মন খারাপ। আমারও। বিকেলে খেলতে গেলাম না। সন্ধ্যায় পড়তে বসলাম না। রাতে খাবার খেতে ডাকল মা, অনিচ্ছা সত্বে খেতে বসলাম। দু-এক মুঠ ডালভাত মুখে দেবার পর মা একটা কাঁসার বড়বাটি ভর্তি মাংস বাড়িয়ে দিল। মাংসের বাটি দেখে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আমার। ওটা যেন মাংসের বাটি নয়, আমার মনে হল আস্ত আমার সেই খাসিটায় আদর খেতে এসেছে আমার কাছে। মায়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললাম, তোমরা খাও। আমি খাব না। তারপর একটু থেমে নিজের মনে গজগজ করে বলে উঠলাম, নিজের শরীরের মাংস কেটে খাও তো দেখি! পারবা?

মায়ের চোখে জল দেখলাম।

আমি সেই থেকে মাংস খাই না। শুধু মাংস খাওয়া নয়, তারপর থেকে কুরবানির দিনে আমি বাড়ি দূরে দূরে পালিয়ে বেড়াই।

আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে যে হাইওয়ে গেছে, সেখানে পাতুলালের ‘ভরেশ হোটেল’। দুপুরে ওখানে খেতে যাই। কুরবানির দিনে হোটেলে ভাত খাঁওয়া দেখে পাতুলাল মানে পাতুকাকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি লোহা’র ব্যাটা না?

পাতুকাকার সঙ্গে আমার আব্বা লোহা’র বেশ সখ্যতা। আমাদের পাশের গ্রামে বাড়ি। একই মাঠে চাষবাস। লোহা’র মা মানে আমার দাদির পরপর বেশ কয়েকটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মারা যায়। আমার আব্বার যখন জন্ম হয়, দাইমা একখণ্ড লোহার বিনিময়ে নবজাতককে দাদির হাতে তুলে দেয়। আর বলে, শুন জারিয়া- তোর ব্যাটার নাম রাখবি লোহা। দেখবি তোর আর কোল খালি হবে না। হলও তাই।

পরবের দিন ক্ষীর-সামুই-বিরিয়ানি মাংস’র মতো লোভনীয় খাবার ছেড়ে আমি হোটেলে খেতে এসেছি। পাতুকাকা ভাবল, নির্ঘাত বাড়িতে অশান্তি করে পালিয়ে এসেছে। পাতুকাকা পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, পরবে নতুন জামা দেয়নি তোর বাপ?

- দিয়েছে।

- বাবা বকেছে?

- নাহ্

- লোহা তো প্রতিবার এই পরবে আমাকে মাংস পাঠায়। তৃপ্তির সঙ্গে খায়। আর তুই...!

ভাল ঠেকছে না পাতুলালের। সে হাঁক ছাড়ে হোটেলের কর্মচারী দীনুকে, এক প্লেট মাংস লিয়ে আয় তো বাপ!

আমি হাত তুলে বলি, কাকা আমি মাংস খাব না।

- মাংস খাবি না?

- না।

- মোছলমানের ছেলে হয়ে মাংস খাস না?

পাতুকাকা আশ্চর্য হয়।

তিন

আমি আজান আলি, মুসলমানের ছেলে। মাংস না খেয়ে ডাক্তার হয়ে এখন এই হাসপাতালে।

এবার মৌলভীর ফতোয়াতে নিজের জন্য নয়, বাড়িতে মা কোনও বিড়ম্বনায় পড়বে কিনা ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি। আমার জন্য মায়ের জানাজা-কবর গাঁয়ের লোকে হারাম করে দেবে না তো? মায়ের যে বড় সখ! হ্যাঁ, সখই। আমার আব্বা যেখানে শায়িত আছেন, সেই কলাপুকুরের পাড়ে বেলগাছের ছায়ায়, মাত্র তিন বাই সাত ফুট মাটি।

সকাল গড়িয়ে দুপুর। ট্রেনটা ধিক ধিক করে এগিয়ে চলেছে সিঙ্গেললাইনে। দু-পাশে ছোট ছোট গ্রাম, মাঠঘাট, কোথাও ধূ ধূ প্রান্তর। গাছপালাও খুব কম। কোথাও কোথাও কেবল তালগাছের সারি। ট্রেনের কামরা যেমন জরাজীর্ণ, যাত্রীদের অবস্থাও তেমনই। ভোকা ভোকা। সরল মুখ। চোখের পিচুটিতে জীবনের অহংকার। তাদের কোনও তাড়া নেই। কোনও বিরক্তি নেই। কোনও ক্ষোভ নেই। সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছে। সবাই সবার খাবার ভাগ করে খাচ্ছে। সবার দেহে ক্লান্তি আছে। তবে ক্লান্তির কাছে আত্মসমর্পন নেই। শহরের প্যাসেঞ্জারদের দেখেছি সিটে বসা নিয়ে যুদ্ধ করতে।

স্যুটবুট পরা আমিই যেন ওদের মাঝে বেমানান এক যাত্রী। ওরা কেউ কেউ আমাকে আড় চোখে দেখছে। কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। আমি আলাপ করলাম আমার সামনের সিটে বসা এক যাত্রীর সঙ্গে। লোকটির নাম ঈশ্বর। পরিযায়ী শ্রমিক। গ্রামে কাজ নেই তাই বাইরে কাজ করতে গিয়েছিল। ছুটিতে বাড়ি ফিরছে।

ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ক্রমশ কমছে। নামছে বেশি, উঠছে কম। হঠাৎ ছোট একটা স্টেশনে ট্রেনটা কঁকিয়ে কঁকিয়ে যেন ঢুকল। হল্ট স্টেশন। কামরাটা প্রায় খালি হয়ে গেল। আমিও ইতস্তত করতে করতে নেমে পড়লাম। স্টেশনের বোর্ডে লেখা নাম ‘হাড়পোড়া’।

বিদঘুটে নাম তো! এমন নাম কোনোদিন শুনিনি। কে কার হাড় পোড়ায়? মাস পোড়ায় তা জানি, কিন্তু হাড় পোড়া! ভিড়ের মধ্যে আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি।

স্টেশন চত্বর যত দ্রুত ভিড় ভাট্টায় ভরে গেছিল ঠিক ততটায় দ্রুত খালি হয়ে গেল। পরবর্তী ট্রেনের জন্য যেমন প্যাসেঞ্জার অপেক্ষা করে, সেরকম কিছু নেই।

প্লাটফর্মে আমি একরকম একা দাঁড়িয়ে। এদিক অদিক দুএকটা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্লাটফর্মের বকুলগাছ থেকে কী একটা পাখি মন-খারাপ করা ডাক ডাকছে। পাখিটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখতে পেলাম না।

অগত্যা স্টেশন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দু-একটা চা-পান-বিড়ি আর মিস্টির দোকান। তখন ট্রেনের প্যাসেঞ্জারদের কাছে বিক্রিবাটা শেষ করে ওইসব দোকান বন্ধের প্রস্তুতি চলছে। দুপুরের খাবারের সময়, কিন্তু তেমন খাবারের দোকান নেই। যদিও আমার খেতেও ইচ্ছে করছে না। ভাটির বিস্কুট আর কাঁচের ছোটো গ্লাসে চা খেলাম।

দুপুর হেলে পড়ছে বিকেলের গায়ে। সামনে একটা লাল ধুলার সরাণ। হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার দু-ধারে ছোট ছোট মোড়ামের টিলা। টিলার মাথায় ছোট ছোট কাঁটাগাছ। লাল ধুলার সরাণ ছেড়ে বাঁ-দিকে একটা টিলার কাছে এগিয়ে গেলাম। টিলার ওপরে উঠে আবার নীচে নামার পথ বেয়ে নামলে আবার একটা টিলা। আমি সেই রাস্তায় উঠছি, নামছি। তাহলে কি ক্ষমতাবাজ মোড়াম-মাফিয়ারা এখনও এই জায়গার খোঁজ পায়নি? কিন্তু তা তো হওয়ার কথা নয়!

দূরে স্বচ্ছ জলের বড় একটা পুকুর। সেখানে কালো কালো মেয়েরা জল নিতে এসেছে।

আমি বেশ আশান্বিত হলাম। কেন হলাম জানি না, ওই পুকুরের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, পুকুরের পাড়ে অনেক বাচ্চাকাচ্চা, নারীপুরুষ। এতক্ষণ টিলার আড়ালে ছিল তাই চোখে পড়েনি। আমার ক্লান্ত পা, কিন্তু কৌতুহলে শক্তি অর্জন করে সেই ভিড়ের দিকে এগোতে লাগলাম। দেখি, বেশ কয়েকজন দৌড়ে আসছে আমাকে লক্ষ্য করে। তাদের মধ্যে একজন ‘বাবুমশাই’-‘বাবুমশাই’ বলে ডাকছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, আরে এ তো সেই ঈশ্বর! ট্রেনে দেখা হয়েছিল। আমি পাশের জনকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার নাম?

বলল, ঈশ্বর।

আরেক জনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার?

- ঈশ্বর।

- ধ্যাৎ! তাই হয় নাকি? তোমরা সবাই আমার সঙ্গে মজা করছ?

আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ওরা আমাকে একটা জমায়েতের মধ্যে নিয়ে গেল। সেখানে দেখলাম, বিশাল বিশাল কয়েকটি উনুন। কেউ কাঠ আনছে। কেউ আনছে মাটির বড় বড় হাড়ি। কেউ বা জল। কেউ আবার হ্যাচাক জ্বালবার চেষ্টা করছে। কথা বলে জানলাম, কর্মস্থল থেকে গ্রামে ফিরে সবাই মিলে এই মাঠে রান্না করে খায়। এটাই এদের রেওয়াজ। খাওয়া বলতে খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা। আমি ওদের মাংসের কথা বললাম। ওরা সবাই মুখ চাওয়া-চাইয়ি করতে লাগল। বুঝলাম, মাংস ওদের কাছে বিলাসিতা!

ওদেরই একজনের সাইকেল চেয়ে নিলাম। সঙ্গে চোদ্দ-পনেরো বছরের এক তরুণ। তার নামও ঈশ্বর। বেশ ধন্দে পড়ে গেলাম। ওকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, চার কিমি দূরে একটা পোল্ট্রি ফার্ম আছে।

- জানো ঈশ্বর, আজ আমার কুরবানি হয়নি। আমি কুরবানি দিতে যাচ্ছি। কুরবানির মাংস দিয়ে তোমাদের ভাত খাওয়াব।

ঈশ্বরের নিস্প্রভ চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমি সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলাম। চাকাটা গড়তে শুরু করল।

এই গল্পটি খোঁজ পত্রিকায় প্রকাশিত

0 Comments

Post Comment