পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নির্বাচনের আগে ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরির কৌশল কি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ?

  • 13 July, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 979 view(s)
  • লিখেছেন : আফরোজা খাতুন
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে বাধা দিচ্ছে মুসলিম নেতাদের বিরোধিতা, এমন বার্তা সংখ্যাগুরুদের মজ্জায়-মননে প্রবেশ করাতে পারলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। খ্রিস্টান, পার্সি, জনজাতি, এমনকি সংখ্যাগুরু হিন্দু সকলেই কি চাইছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি? সবার এক আইন— ভাবলে ভাল লাগে। কিন্তু কী সেই আইন? মনুসংহিতা যাদের জীবনের সঙ্গী, তারা দেশকে কোন আইন উপহার দেবে?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে দেশের সমস্ত নাগরিকদের একই আইনের আওতায় আনার কথা বলছে মোদি সরকার। স্বাধীন ভারতে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংবিধানে যে নির্দেশমূলক নীতি রয়েছে তার ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করবে কি না। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও 'বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য'র সুরে ফাটল ধরাবে কি না। দেওয়ানি আইনের মধ্যে পড়ে বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকার, দত্তক গ্রহণ। এদেশে দেওয়ানি আইন প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইন। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও পার্সিরা নিজ নিজ পারিবারিক আইনে চলে। হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধরা হিন্দু সিভিল কোড আইনের আওতায় পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ২০০ জনজাতির নিজস্ব ব্যক্তিগত আইন রয়েছে। নাগাল্যান্ড বা মিজোরামের মত খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যের নাগরিকরাও তাদের ধর্ম অনুযায়ী নয় বরং সংস্কৃতি অনুযায়ী স্থানীয় আইনে চলে। তাহলে মূল প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কোন উৎসকে ভিত্তি করে তৈরি হবে?

আমাদের সামনে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কোন খসড়া এখনো আসেনি। বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির মানুষের এই ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তৈরি যে অসম্ভব সেটা এ যাবত পূর্ববর্তী সরকার ও সংবিধান প্রণেতারা টের পেয়েছেন। তাই আইন কমিশন ২০১৮ সালে বলেছে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার নেই, এদেশে এটা কাম্যও নয়। কিন্তু বিজেপি সরকার তা মানবে কেন? ২০১৪ সালে লোকসভার নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি তিনটি অঙ্গীকার করেছিল। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। প্রথম দুটি শর্ত পালন করেছে। এবার তৃতীয় শর্ত-জাল নিয়ে আগামী নির্বাচনের মুখে ভোট ধরার খেলা শুরু হয়েছে। আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক দল বিজেপি, উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভাবধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার প্রচার শুরু করেছে। এই রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত আমাদের বোঝা দরকার।

৯ ডিসেম্বর ২০২২ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে রাজ্যসভায় প্রাইভেট বিল পেশ হয়েছে। এই বিলটি পেশ করেন রাজস্থানের বিজেপি সাংসদ কিরোডিলাল মিনা। ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করবে বলে বিরোধী সাংসদরা এই বিলের বিরোধিতা করেন। ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি আগেই তুলেছেন বিজেপি নেতারা। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, মুসলিম মহিলাদের স্বার্থেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা উচিত। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে মুসলিম পুরুষদের বহুবিবাহ রোধ করা যাবে। বিজেপি নেতাদের মূল উদ্দেশ্য মুসলিম পারিবারিক আইনের কিছু অংশ প্রচারের আলোয় ফেলে সংখ্যাগুরুদের মনে বিদ্বেষ সংক্রমিত করা। মুসলিম মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ থেকে রাষ্ট্র অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করতে চাইছে তেমনটা একদমই নয়। মুসলিম পুরুষরা বহুবিবাহ করে। ফলে সন্তানের সংখ্যা প্রচুর। তাই ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রচার ইতিমধ্যেই দেশের সংখ্যাগুরু বহু মানুষের মনে বিষের হাওয়া ঢুকিয়েছে। অথচ সমীক্ষা মতে, মুসলিমদের মধ্যে বহুবিবাহের হার অনেক কম। তবে বহুবিবাহের আইন বন্ধ করা উচিত এটা অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের দাবি। এবং সেটা পারিবারিক আইন সংস্কার করেই লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে হবে এই দাবিতেই নারীবাদীরা সোচ্চার। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি যে লিঙ্গবৈষম্য দূর করবে সেই আশ্বাস কোথাও নেই, ভরসাও করা যায় না। বিজেপি শাসিত গোয়াতে, গোয়া সিভিল আইন অনুসারে হিন্দু পুরুষদের সেখানে দুটো বিয়ে করার অনুমতি রয়েছে। স্ত্রী যদি ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তান ধারণে অক্ষম হয় এবং স্ত্রী যদি ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারে। বিজেপি প্রণীত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, গোয়া সিভিল আইনের মত লিঙ্গবৈষম্যের এই আইনকে ধারণ করবে না তো? হিন্দু মেয়েদের শাঁখা সিদুরের সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতেই তো তাঁরা বেশি আগ্রহী। মুসলিম পুরুষ হিন্দু মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করলে লাভ জিহাদ হয় হিন্দুত্ববাদীদের ভাষায়। তাহলে তো এমনটা আশঙ্কা থেকেই যায়, অন্য ধর্মের মানুষকে বিয়ে করলে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার আইন প্রণয়ন করা।

বিজেপি নেতারা মনে করছেন মুসলিম মেয়েদের তাৎক্ষণিক তিন তালাকের সমস্যা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মুসলিম নারী অধিকার দিবস, মুসলিম নারীর ক্ষমতায়নের দিন হিসেবে তাই তাঁরা ১ আগস্ট উদযাপন করা শুরু করেছেন। ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। কত শতাংশ মুসলিম মেয়ের মধ্যে সেই ক্ষমতায়ন তৈরি হয়েছে? দেশের শিক্ষানীতি প্রশ্নের মুখে, কর্মসংস্থানে ধ্বস নেমেছে। জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে উন্মাদনা তৈরি করতে সংখ্যালঘু ইস্যু তাই একটা বড় কৌশল। তাৎক্ষণিক তিন তালাক বন্ধের আইন মুসলিম মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। তাৎক্ষণিক তিন তালাক অসংবিধানিক এবং অবৈধ যদি হয় তাহলে সেই তালাক দেওয়ার অপরাধে স্বামীকে গার্হস্থ্য হিংসা আইনে শাস্তি দেওয়া যেত। ফৌজদারি আইন কেন? যে স্ত্রীর উপার্জন নেই তিনি তাৎক্ষণিক তিন তালাক দেওয়ার অপরাধে স্বামীকে জেলে পাঠালে তাঁর ও সন্তানের আর্থিক সুরাহা কিভাবে হবে সে ব্যাপারে স্বচ্ছ কোন রূপরেখা এই আইনে নেই। মুসলিম মেয়েদের ক্ষমতায়ন যদি তাদের আন্তরিক উদযাপনের বিষয় হয় তাহলে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি 'বুল্লি বাই' অ্যাপে স্বাধীনচেতা, প্রতিবাদী, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর মুসলিম মেয়েদের ছবি দিয়ে নিলামে তোলার সাহস হলো কীভাবে? যে মুসলিম নারী সাংবাদিকরা বিজেপির কাজের সমালোচনা করে সংবাদ নিবেদন করেছেন, যে মুসলিম নারী দিল্লি দাঙ্গার প্রতিবাদ জানিয়েছেন, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরুদ্দেশ ছাত্রের মা প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়েছেন- এইরকম সক্রিয় ভূমিকায় থাকা মুসলিম মেয়েদের নিলামে তোলা হয়েছে এই অ্যাপটির মাধ্যমে। মুসলিম মেয়েদের নিলাম করার জন্য ১ জানুয়ারি ২০২২ তারিখটি ছিল 'ডিল অফ দ্য ডে'। একই রকম অ্যাপ শুল্লি ডিলস ২০২১ - এ সক্রিয় স্বাধীনচেতা মুসলিম মেয়েদের নিলামে তুলেছিল। অভিযোগ দায়ের করার পর শুল্লি ডিলস বন্ধ হয়। ২০২২- এ এলো বুল্লি বাই। অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর এটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে অ্যাপ -এর নির্মাতাদের একজন ধরা পড়েও নাবালকত্বের অজুহাতে ছাড়া পায়। মুসলিম মেয়েদের অধিকার, ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা তৈরি করা যদি সরকার বাহাদুরের সদিচ্ছা থাকে তাহলে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না কেন? কেন হিজাব পরার অজুহাতে কর্নাটকের কোনও কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়?

লিঙ্গ সাম্যের আইন তৈরি করতে হলে প্রত্যেক ধর্মের পারিবারিক আইনের সংস্কার দরকার। লিঙ্গ সাম্যের জন্য এদেশে হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কার করে হিন্দু কোড বিল তৈরি হয়েছে। মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সী বা জনজাতিরা সংস্কারের মধ্যে দিয়ে আইনের লিঙ্গ বৈষম্য দূর করবে। মোদি সরকারের হাতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লিঙ্গ সাম্য তৈরি করবে না লিঙ্গ বৈষম্য প্রকট করবে সে নিয়ে সন্দেহ তো রয়েই যায়।  সিএএ, এন আর সি- নিয়ে দেশকে যেমন উত্তাল করে তুলেছিল বিজেপি সরকার সেই একই অভিসন্ধি রয়েছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করার প্রচারের মধ্যেও। ধর্মীয় মেরুকরণের জাল বিস্তার করে সংখ্যাগুরু ভোট নিশ্চিত করা বিজেপি নেতাদের মূল উদ্দেশ্য।

0 Comments

Post Comment