পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

যেখানে প্রহরী নেই, সেখানেও শাসন: প্যানঅপ্টিকনের নতুন রূপ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
ক্ষমতা আর কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নেই। সে কেন্দ্রহীন। কিন্তু সর্বত্র। জর্জ অরওয়েলের 1984 এর "Big Brother is watching you" ছিল একমুখী নজরদারি। রাষ্ট্রের একচোখ। আজকেরটা উল্টো। "Everyone is watching everyone"। এবং আমরা নিজেরাই দেখাতে চাই। অরওয়েলের টেলিস্ক্রিন ছিল ঘরের কোণে। আমাদের টেলিস্ক্রিন আমরা হাতে নিয়ে ঘুরি।

খাঁচার বাইরে সমুদ্র

১৯৯৮ সাল। পরিচালক পিটার ওয়েয়ারের The Truman Show। ক্লোজ-আপ শট। ট্রুম্যান বারব্যাঙ্ক নৌকা বেয়ে পৌঁছেছে স্টুডিওর দেওয়ালের কাছে। আকাশে লাগানো তারাটা খুলে পড়ছে। ডাই-জেটিক সাউন্ড নেই। শুধু সমুদ্রের শব্দ। সে বুঝে গেছে এতদিন যা ছিল "জীবন", তা ছিল স্ক্রিপ্ট। ক্যামেরা তার মুখের দিকে। গোটা পৃথিবী দেখছে। সে হাসে। বলে, "Good morning, and in case I don't see you, good afternoon, good evening, and good night"। তারপর কাট। দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।

আমরা এখন প্রত্যেকে কম-বেশি ট্রুম্যান। আমাদের সিহেভেন শহরটা পকেটে। নাম তার স্মার্টফোন। আকাশ প্লাস্টিকের নয়, কিন্তু ফিডটা সাজানো। রোদ ল্যাম্পের নয়, কিন্তু অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় আজ কী দেখব। বন্ধু, প্রতিবেশী, আত্মীয় — সবাই আছে। কিন্তু পোস্ট করার আগে আমরা বহুবার ভাবি। এটা বললে কী ভাববে? এটা শেয়ার করলে রিচ কমবে না তো?

তফাত একটাই। ট্রুম্যানকে জোর করে স্টুডিওতে রাখা হয়েছিল। আমরা নিজেরাই দরজা ঠেলে ঢুকেছি। এবং ঢোকার জন্য লাইন দিয়েছি।

রক্ত থেকে রুটিন

ক্ষমতা সবসময় একরকম ছিল না। একটা সময় ছিল যখন সে ছিল খুব সরাসরি, এবং দৃশ্যমান।

মিশেল ফুকো তার Discipline and Punish: The Birth of the Prison ১৯৭৫ বই শুরু করেছিলেন ১৭৫৭ সালের ১ লা মার্চ দিয়ে। প্যারিসের গ্রেভ স্কোয়ার। রাজহত্যার চেষ্টার অপরাধে রবার্ট-ফ্রাঁসোয়া দমিয়াঁ। তার শরীরে লাল গরম শিক, হাতে গলানো সালফার, পায়ে ঘোড়ার দড়ি। হাজার মানুষের সামনে শরীর ছিঁড়ে চেরা হচ্ছে। ফুকো বললেন, এটাই ছিল সার্বভৌম ক্ষমতার ভাষা। ক্ষমতা নিজেকে দেখাত রক্তে। সে শরীরের উপর আইন লিখত। উদ্দেশ্য একটাই — সবাই দেখুক, সবাই ভয় পাক।

কিন্তু এই ভাষা বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ৮০ বছরের মধ্যে সব বদলে গেল।

১৮৩৭ সাল। একটি ফরাসি কারাগার। সকাল ৫ টায় ঘুম ভাঙা। ৯ ঘণ্টা কাজ। ২ ঘণ্টা শিক্ষা। কোনো চিৎকার নেই। কোনো ভিড় নেই। শাস্তি ঢুকে গেল দেওয়ালের ভেতরে। শরীর ছেড়ে সে ধরল মনকে। একে অনেকে "সভ্যতার অগ্রগতি" বললেন। ফুকো বললেন, "না। এটা কৌশল"। কারণ শরীরের যন্ত্রণার সীমা আছে। মনের শাসনের সীমা নেই।

এই নতুন কৌশলের নকশা এঁকেছিলেন জেরেমি বেনথাম, ১৭৯১ সালে। নাম দিলেন Panopticon। গোলাকার জেল। মাঝে উঁচু অন্ধকার টাওয়ার। চারপাশে কালো কাচের ঘর। বাইরে থেকে বোঝা যায় না ভিতরে কেউ আছে কিনা। বন্দি জানে না তাকে দেখা হচ্ছে কিনা। কিন্তু বিভ্রমটা সবসময় থাকে — বন্দী ভাবছে হয়তো তাকেই দেখছে।

আর এই "হয়তো"-টুকুই যথেষ্ট। পাহারাদার না থাকলেও বন্দি নিজেই নিজের প্রহরী হয়ে যায়। বাইরে থেকে লাঠি লাগে না। শৃঙ্খলা ভেতর থেকে জন্মায়।

পকেটের টাওয়ার

বেনথামের ইট-পাথরের জেল আজ আর নেই। তার যুক্তিটা আমাদের পকেটে ঢুকে গেছে।

একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে রাষ্ট্রের লাঠি বদলে হল আধার কার্ড। পুলিশের চোখ বদলে হল সিসিটিভি। হিসাবের খাতা বদলে হল ইউপিআই কোড। ১৯৯১-এর পর বাজার আর রাষ্ট্র হাত ধরাধরি করে আমাদের দুটো নাম দিল। এক: ভোক্তা। দুই: ডেটা।

ক্ষমতা আর কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নেই। সে কেন্দ্রহীন। কিন্তু সর্বত্র।

পশ্চিমবঙ্গের গল্পটা আলাদা করে বলা দরকার। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ , পুরো ৩৪ বছর। এখানে প্যানঅপ্টিকন কাজ করেছে পার্টি অফিস আর পাড়ার ক্লাব দিয়ে। টাওয়ার ছিল পার্টি অফিস। কাচের ঘর ছিল ক্লাব। সবাই জানত কে দেখছে। তাই মানুষ নিজেকে মেপে চলত। কী বলব, কোথায় যাব, কার সাথে মিশব।

২০১১-এ সেই টাওয়ার ভাঙল। কিন্তু শূন্যস্থান ফাঁকা থাকেনি। নতুন টাওয়ার উঠল। তার নাম মোবাইল স্ক্রিন।

স্বেচ্ছার কারাগার

আগের কারাগার আর আজকের কারাগারের তফাত একটাই। আগেরটায় ঠেলে ঢোকানো হত। এখন আমরা নিজেরাই ঢুকি।

Facebook, Instagram, WhatsApp। এখানে আমরা নিজেই পরিচালক, নিজেই অভিনেতা, নিজেই দর্শক। নিজেই পোস্ট করি আজ কী খেলাম, কোথায় ঘুরতে গেলাম, কী বই পড়লাম। আর পোস্ট করার আগে ভাবি: বস দেখবে না তো? আত্মীয় কী বলবে? বিরোধী পক্ষ স্ক্রিনশট নিয়ে কাটাছেঁড়া করবে না তো?

এর ফল একটাই: "গ্রহণযোগ্য আমি"।  
রাগ করলে আনফলো হবে, তাই রাগ কম।  
দ্বিমত করলে ট্রোল হবে, তাই দ্বিমত কম।  
প্রতিবাদ করলে রিচ কমবে, তাই প্রতিবাদ কম

এখানে কাজ করছে অ্যালগরিদমের নীরব শাসন। যে পোস্টে লাইক বেশি, সেটাই "স্বাভাবিক"। যে মত ভিড়ের বাইরে, সে অদৃশ্য। তাই আমরা নিজেরাই ভিড়ের দিকে হাঁটি। কারণ দৃশ্যমান থাকতে গেলে "স্বাভাবিক" থাকতেই হবে।

সিনেমা এই সত্যিটা আগেই দেখিয়েছে। Black Mirror এর "Nosedive" এপিসোডে প্রত্যেক মানুষ একে অপরকে ১ থেকে ৫ রেট করে। রেটিং ভালো না হলে বাড়ি ভাড়া পাবে না, ফ্লাইটে উঠতে পারবে না। ক্যামেরা সবসময় পয়েন্ট-অফ-ভিউ শটে। আমরা নিজেই নিজেকে ফ্রেম করছি।

চার্লি কাউফম্যানের Synecdoche, New York 2008-এ নায়ক একটি গুদামঘরের মধ্যে গোটা নিউইয়র্ক শহরের রেপ্লিকা বানায়। আর সেই রেপ্লিকার মধ্যে নিজের জীবন অভিনয় করায়। আমরাও তাই করছি। নিজের জীবনের রেপ্লিকা বানাচ্ছি ফিডে। আর সেই রেপ্লিকার মধ্যে বন্দি হচ্ছি।

সাহিত্যও পিছিয়ে নেই। জর্জ অরওয়েলের 1984 এর "Big Brother is watching you" ছিল একমুখী নজরদারি। রাষ্ট্রের একচোখ। আজকেরটা উল্টো। "Everyone is watching everyone"। এবং আমরা নিজেরাই দেখাতে চাই। অরওয়েলের টেলিস্ক্রিন ছিল ঘরের কোণে। আমাদের টেলিস্ক্রিন আমরা হাতে নিয়ে ঘুরি।

আরও একটা কাব্যিক প্রতিধ্বনি আছে। রবীন্দ্রনাথের "আমি" কবিতায় আছে — "আমি তোমার সঙ্গে বেধেছি আমার প্রাণ, সুরে সুরে"। আজকের "আমি" বেঁধেছে অ্যালগরিদমের সঙ্গে। সুরে সুরে নয়, লাইকে লাইকে।

ঘৃণার ব্যবসা

এই "স্বাভাবিক" থাকার পেছনে একটা অর্থনীতি কাজ করছে। নাম তার: ঘৃণার অর্থনীতি।

সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির আয় আসে বিজ্ঞাপন থেকে। বিজ্ঞাপনের দাম ওঠে একটার উপর: মানুষ স্ক্রিনে কতক্ষণ থাকল।

মানুষ সবচেয়ে বেশি সময় দেয় কখন? যখন রেগে যায়। যখন ভয় পায়। যখন অন্য কাউকে আক্রমণ করে।  
তাই অ্যালগরিদম শিখে গেছে। শান্তির খবরের চেয়ে, যুক্তির লেখার চেয়ে, একটি সাম্প্রদায়িক ভিডিও বা উস্কানিমূলক মিম দশগুণ বেশি রিচ পাবে। কারণ সেখানে কমেন্ট হবে, ঝগড়া হবে, শেয়ার হবে। এই এনগেজমেন্টই টাকা।

ফলে ঘৃণা উৎপাদন এখন লাভজনক ব্যবসা। রাজনৈতিক দলগুলো তার পার্টনার। তারা বুঝেছে, মানুষ যখন কাজ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা নিয়ে অনিশ্চিত থাকে, তখন তাকে "পরিচয়"-এর নিরাপত্তা দিলে সে ভোট দেয়। সেই পরিচয় ভাষা হতে পারে, জাতপাত হতে পারে, ধর্ম হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গেই দেখুন। যে সমাজ একসময় তেভাগা, নকশাল, গণনাট্য দিয়ে শ্রেণীর কথা বলত, সেই সমাজেই আজ পরিচয়ের রাজনীতি জোরালো। পেটের প্রশ্ন পিছিয়ে গেছে। সামনে এসেছে "তুমি কে"।

বামপন্থা মানে কী আজ?

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা জরুরি। বামপন্থা বলতে এখন কী বুঝব? বামপন্থা কোনো দলের পেটেন্ট নয়। কোনো পুরুষতান্ত্রিক একচেটিয়া ভাবনাও নয়।  বামপন্থা একটি দৃষ্টিভঙ্গি। যে দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের পেট, মাথার ছাদ, কাজ, চিকিৎসা, পড়াশোনা এবং সম্মানকে রাজনীতির কেন্দ্রে রাখে। যে দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রকে শুধু সংবিধানের প্রস্তাবনা হিসেবে নয়, রোজকার অভ্যাস হিসেবে দেখে।  
যে ভাবনা নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ — সবার, এক সমাজবাদের কথা বলে। কারণ শোষণ আর নজরদারি লিঙ্গ দেখে আসে না।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গির তিনটে বড় সমস্যা।  
এক: সাংগঠনিক। পুরনো কাঠামো আর কাজ করছে না।  
দুই: ভাষাগত। "শ্রমিক-মালিক" দিয়ে "ডেটা-পুঁজি" আর "প্ল্যাটফর্ম-শ্রম" বোঝানো যাচ্ছে না।  
তিন: নৈতিক। বামপন্থী মধ্যবিত্ত নিজেই লাইক-শেয়ারের জেলে বন্দি। তাই সে চুপ।

ডেটা সুরক্ষা: আইনই কি শেষ কথা?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল হয়। "ডিজিটাল ডেটা সুরক্ষা" শুনলেই আমরা ভাবি সরকার একটা আইন বানিয়ে দেবে, ব্যাস, সব ঠিক।

বাস্তব অত সোজা নয়। লড়াইটা দুই ফ্রন্টে।

প্রথম ফ্রন্ট: কর্পোরেটের বিরুদ্ধে  
আপনি যখন "Agree" ক্লিক করেন, আপনি বিক্রি করে দেন আপনার মনোযোগ, অভ্যাস, সম্পর্ক, রাজনৈতিক ঝোঁক। এই ডেটা দিয়েই আপনাকে প্রোফাইল করা হয়। আপনাকে কী দেখানো হবে, কী কেনাবেন, কাকে ভোট দেবেন — সব ঠিক হয়।

তাই ডেটা সুরক্ষার প্রথম মানে: আমার ডেটা আমার। কোম্পানি ভাড়া নিতে পারে, মালিক হতে পারে না। আমার অনুমতি ছাড়া ডেটা বিক্রি হবে না। আমি চাইলে মুছে দিতে পারব। অ্যালগরিদম কেন আমাকে এই ভিডিওটা দেখাচ্ছে, তার হিসাব চাইতে পারব।

দ্বিতীয় ফ্রন্ট: এস্ট্যাব্লিশমেন্টের বিরুদ্ধে  
এখানেই ফাঁদ। যে কোনো ডেটা সুরক্ষা আইনের মধ্যেই "জাতীয় নিরাপত্তা", বা, "জনস্বার্থ" নামে জানালাগুলো খোলা থাকে। সেই জানালা দিয়ে রাষ্ট্র, পুলিশ, প্রশাসন ঢুকে পড়ে। কাল যদি বলে "আপনার সব WhatsApp চ্যাট আমরা দেখব", তখন সেই আইনই তাদের ঢাল হয়ে যায়।

তাই আইনকে অন্ধভাবে সমর্থন করা যায় না। সরকারি সমাধানের যে বয়ান তাতে ফাঁদে পা দিলেই তা ক্রীড়ার ক্ষমতার বৃত্তে চলে আসবে ফের। আইন চাই। কিন্তু সেই আইনের উপর নজরদারি করার আইনও চাই। আদালতের অনুমতি ছাড়া ডেটা নেওয়া যাবে না। কী কারণে নেওয়া হল তার হিসাব পাবলিক করতে হবে। অপব্যবহার হলে শাস্তি হতে হবে।

অর্থাৎ, ডেটা সুরক্ষা মানে এস্ট্যাব্লিশমেন্টের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দেওয়া নয়। মানে নাগরিকের হাতে নিজের জীবনের রিমোটটা ফেরত দেওয়া।

ফুকো চমস্কি = আজকের ছবি

এখানে এসে দুজন মানুষের কথা একসাথে মনে পড়ে।

ক্ষমতা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। সে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের অভ্যাসে, ভাষায়, প্রতিষ্ঠানে। এটা ফুকো বলেছিলেন।

আর,এক্ষেত্রে চিন্তাভাবনার সাযুয্য পাওয়া যায় চমস্কির ভাষায়। বলেছিলেন- গণমাধ্যমের কাজ হল "সম্মতির উৎপাদন"। আমাদের এমনভাবে ভাবতে শেখানো হয় যাতে শাসনকে "স্বাভাবিক" মনে হয়।

The Truman Show গল্প দিয়ে দেখায়। ফিকশন। ফুকো-চমস্কি তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করে। নন ফিকশন। দুটো মিলেই আজকের প্যানঅপ্টিকন।

আরেকটা সিনেমা। ডেভিড ফিঞ্চারের The Social Network ২০১০। শুরুই হয় ফেসবুকের জন্ম দিয়ে। কিন্তু শেষে জাকারবার্গ একা বসে রিফ্রেশ বাটন চাপছে। একটা মেয়ে তাকে অ্যাড করেছে কিনা দেখার জন্য। কোটি মানুষের ডেটা হাতে, অথচ নিজেই একটা লাইকের জন্য বন্দি। এটাই নতুন প্যানঅপ্টিকন।

সাহিত্যে এর সমান্তরাল পাই কাফকার The Trial এ। নায়ক জোসেফ কে জানে না তার অপরাধ কী। কিন্তু আদালত সর্বত্র। সে নিজেই নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করে। আজকের আমরাও তাই। জানি না কোন পোস্টে ভায়োলেশন হবে। তাই আগে থেকেই সেলফ-সেন্সর।

মুক্তি? সে কি সম্ভব?

ক্ষমতা যেহেতু কেন্দ্রহীন, তাই তাকে শুধু দখল করে ভাঙা যাবে না। ফুকো নিজেই বলেছিলেন: ক্ষমতা থেকে পুরোপুরি পালানো যায় না। কিন্তু সম্পর্কটা বদলানো যায়।  
কীভাবে?

প্রথম রাস্তা: আলো জ্বালানো। প্যানঅপ্টিকন চলে অন্ধকারে। মানুষ জানে না তার ডেটা কোথায় যাচ্ছে। কেন এই ভিডিওটা আগে আসছে। তাই স্কুলে, লাইব্রেরিতে, পাড়ার ক্লাবে ডেটা সাক্ষরতার ক্লাস দরকার।  মোবাইল ছাড়া মুখোমুখি আড্ডা দরকার। এমন জায়গা দরকার যেখানে কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো অ্যালগরিদম নেই। যেখানে মানুষ ভুল কথা বলতে পারবে, তর্ক করতে পারবে।

দ্বিতীয় রাস্তা: নিরাপত্তার প্রশ্নে ফেরা  
ঘৃণার অর্থনীতি তখনই ফুলেফেঁপে ওঠে যখন পেটে টান থাকে। গরীব মানুষ অসহায় থাকে। কাজের নিশ্চয়তা না থাকলে মানুষ "পরিচয়" কিনতে বাধ্য হয়।  
তাই রাজনীতিকে কথা বলতে হবে 'শ্রম' নিয়ে। গিগ কর্মীর পেনশন, ডেলিভারি বয়ের ইন্সুরেন্স, আইটি-তে ছাঁটাই, AI-এর কারণে কাজ হারানো, এখন এই ক'দিনেই AI এ AI শ্রমিকরাও ছাঁটাইয়ের আগাম সঙ্কেতে ভীত হয়ে পড়েছে। এছাড়াও, শহরের ভাড়া, সরকারি হাসপাতালের বেড, কৃষকের ফসলের দাম। পেট ভরা থাকলে মানুষ সহজে ভয় বিক্রি করে এমন নেতার পেছনে যায় না। তাই, ১৯৫৫-এর ক্লীশে স্লোগান দিয়ে নয়, ২০২৬-এর বাস্তবতা দরকার আন্দোলনে।

তৃতীয় রাস্তা: নিজের মালিকানা ফেরানো  
মহাভারতে একলব্যের গল্প আছে। গুরু শেখায়নি। সে জঙ্গলে মাটির মূর্তি বানিয়ে তির শিখল। যখন সেরা হল, 'ব্যবস্থা' তার বুড়ো আঙুল চেয়ে নিল।  আজও তাই। আমরা নিজের সময়, তথ্য, মনোযোগ দিয়ে প্ল্যাটফর্মকে বড় করছি। তারপর সেই প্ল্যাটফর্মই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে।  
প্রতিরোধ হল বুড়ো আঙুল ফেরানো। সপ্তাহে একদিন স্ক্রিন বন্ধ রাখা। স্থানীয় দোকান থেকে বই কেনা। নিজের কথার দায় নিজে নেওয়া।

চতুর্থ রাস্তা: "অদৃশ্য" জনসমাজ  
প্যানঅপ্টিকন ভাঙে যখন আমরা বলি: আমরা "দেখানোর জন্য" বাঁচব না।  
লাইভে না গিয়েও পাড়ার ক্লাবে বই পড়ব। ইউটিউবে না দিয়েও গান গাইব। পোস্ট না করেও আন্দোলন করব।  ক্যামেরার বাইরে, ডেটা নজরদারির বাইরে একটা জীবন রাখব যার মূল্য "লাইক" দিয়ে মাপা হবে না। মানুষ সমষ্টিগত হলেও ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিগত কথার স্বীকৃতি তৈরি হোক, যা প্রচারধর্মী নয়।

আমাদের এখানে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসেও এমন মানুষ ছিল। সংখ্যায় কম, কিন্তু জোরালো। আজও দরকার ছোট উদ্যোগ: পাঠচক্র, স্বাধীন পত্রিকা, শ্রমিক সমবায়, ওপেন সোর্স সফটওয়্যার। তাতে হয়তো সরকার উল্টে যাবে না। কিন্তু প্রমাণ থাকবে - অ্যালগরিদমের বাইরেও জীবন সম্ভব।

পৃথিবীজুড়ে লড়াই

এই লড়াই শুধু আমাদের নয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৮ সালে GDPR চালু করেছে। নাগরিককে ডেটার উপর অধিকার দিয়েছে। কিন্তু সরকারি ছাড়ও রেখেছে।  
চীন দেখাচ্ছে রাষ্ট্রীয় নজরদারি কতদূর যেতে পারে — Social Credit System।  
আমেরিকায় কোম্পানিগুলো ঠিক করছে কে কী বলবে।  
ভারতে 2023-এর Digital Personal Data Protection Act এসেছে। কাগজে ভালো, পড়তেও স্বাধীন স্বাধীন একটা আমেজ দেয়। কিন্তু কাগজ আর মাটি এক নয়। তাই আইন হলেও লড়াই থামবে না।

অনন্ত অভ্যাস

মুক্তির কোনো ফাইনাল ঠিকানা নেই। আজকের টাওয়ার কাল ভাঙবে। কাল নতুন টাওয়ার উঠবে।

স্থানীয় ও বৈশ্বিক দিকটা মানুষের জন্য জোরালো করতে হলে তবেই মানুষ ক্ষমতাকে প্রতিরোধ করতে পারবে। আর এই অভ্যাসটা অনন্ত চলবে, অনেকটা ম্যাথামেটিক্সের limit x tending to zero but never attend zero-র মতো, কারণ ক্ষমতার অবয়ব কখনোই মুছে যায় না সমাজ থেকে।

কিন্তু মানুষের মধ্যে "কেন" জিজ্ঞাসা করার অভ্যাসটা যদি বেঁচে থাকে, তাহলে কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী হতে পারবে না।

বাঙালি ভদ্রবিত্তের সংকট এখানেই। সে একসাথে ভোক্তা আর পারফর্মার। তাই ভুলে যাচ্ছে সে একজন নাগরিকও।  মুক্তির শুরু সেখান থেকেই। নিজেকে মনে করানো বারবার: আমি শুধু প্রোফাইল নই। আমি মানুষ। আবার ফিরি ট্রুম্যানের কাছে। সে জানে না ক্যামেরা কোথায়। কিন্তু জানে দরজাটা আছে।আমাদেরও তাই। আমরা জানি না ডেটা কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু জানি, বন্ধ করার বোতামটা আছে।  

মোবাইলটা নামিয়ে পাশের মানুষটার চোখে চোখ রাখার সাহস।  
লাইকের জন্য নয়, বোঝার জন্য লেখার সাহস।  
আর বলার সাহস: "এটা কোনো 'নরমাল' বা 'নিউ নরমাল'-এর দশা নয়"।

খাঁচার বাইরে সমুদ্র আছে। আমাদের শুধু দরজাটা খুলতে হবে।

0 Comments

Post Comment