পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

হিন্দুধর্মের ইতিহাস, হিন্দুত্বের রাজনীতি দ্বিতীয় পর্ব

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
দেবদেবীর উপাসনার একটা ইতিহাস থাকে। কোনও একটি দেবতার উপাসনা আজ ব্যাপকভাবে প্রচলিত বলেই সেই উপাসনা সমগ্র হিন্দুধর্মের শুরু থেকেই একই রূপে ছিল—এমন দাবি করা যায় না। স্থানীয় দেবতা, আঞ্চলিক বিশ্বাস এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপাসনার ধারা দীর্ঘ সময় ধরে বৃহত্তর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশেছে। এই জায়গা থেকেই হিন্দু ধর্মের ইতিহাস এবং হিন্দুত্বের রাজনীতিকে বুঝতে হবে।

গত ১১ জানুয়ারি ২০২৬-এ কলকাতার ক্যালকাটা ডিবেটিং সার্কলের আয়োজিত বিতর্কের প্রস্তাব ছিল, “হিন্দুধর্মকে হিন্দুত্বের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া দরকার।” দ্য টেলিগ্রাফ-এর ১৪ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিতর্কে ড. রুচিকা শর্মা হিন্দুধর্মের ইতিহাসের দিকে ফিরে গিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন যে এর কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য বহুত্ববাদ। তাঁর বক্তব্য ছিল, হিন্দুত্বের কেন্দ্রে রয়েছে বর্জনমূলক পরিচয় নির্মাণ; এই কারণেই হিন্দুত্ব হিন্দুধর্মের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। এখানে ‘বহুত্ববাদ’ বলতে শুধু বিভিন্ন দেবতার অস্তিত্ব বোঝানো হয় না। এর অর্থ, ধর্মীয় বিশ্বাস, উপাসনা, দর্শন ও সামাজিক চর্চার একাধিক ধারা একই বৃহত্তর ঐতিহ্যের মধ্যে থাকতে পারে, অথচ তাদের সবাইকে একই নিয়মে চলতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

ড. রুচিকা শর্মার যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেবদেবীর উপাসনার ইতিহাস। কোনও একটি দেবতার উপাসনা আজ ব্যাপকভাবে প্রচলিত বলেই সেই উপাসনা সমগ্র হিন্দুধর্মের শুরু থেকেই একই রূপে ছিল—এমন দাবি করা যায় না। স্থানীয় দেবতা, আঞ্চলিক বিশ্বাস এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপাসনার ধারা দীর্ঘ সময় ধরে বৃহত্তর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশেছে। জগন্নাথের উপাসনার ইতিহাসে আঞ্চলিক ও স্থানীয় ঐতিহ্যের ভূমিকা, বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষ্ণের উপাসনার স্বতন্ত্র রূপ এবং দেবী-উপাসনার বহুবিধ ধারাই দেখায় যে হিন্দুধর্মের বিকাশ একটি জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। কোনও একক কেন্দ্র থেকে একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় ব্যবস্থা তৈরি হয়ে পরে গোটা উপমহাদেশে একইভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—এমন সরল ব্যাখ্যা এই ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। ড. শর্মার আলোচনার মূল তাৎপর্য এই যে, ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভিতরে পরিবর্তন ও সংমিশ্রণকে স্বীকার না করলে সেই ঐতিহ্যকে বোঝাই সম্ভব নয়।

বাংলার প্রসঙ্গে ড. শর্মার বক্তব্য আরও নির্দিষ্ট। দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন, বাংলার নিজস্ব হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য দেবীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে ছিল হিন্দুত্বের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত পৌরুষ ও শক্তি প্রদর্শনের ধারণার সমালোচনা। এই বক্তব্যের অর্থ এমন নয় যে বাংলার সব ধর্মীয় ঐতিহ্য একরকম, কিংবা হিন্দুধর্মের অন্য অঞ্চলে দেবী-উপাসনা নেই। বরং তিনি বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যকে সামনে এনে দেখাতে চেয়েছেন যে হিন্দুধর্মের পরিচয়কে একমাত্রিক পুরুষালি শক্তির ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মনসা বা অন্যান্য দেবীকে কেন্দ্র করে বাংলায় যে উপাসনা, উৎসব, সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা হিন্দু ধর্মীয় জীবনের স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক মাত্রা। এই ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পৌরুষকে হিন্দুধর্মের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

ড. শর্মার বক্তব্যের সঙ্গে ইতিহাসবিদ মৃদুলা মুখোপাধ্যায়ের আলোচনারও যোগ রয়েছে। একই বিতর্কে মৃদুলা মুখোপাধ্যায় হিন্দুত্বের পক্ষে বক্তব্য রাখা বক্তাদের ঐতিহাসিক যুক্তির কয়েকটি দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি ও ড. রুচিকা শর্মা বিরোধী পক্ষের বক্তব্যে ঐতিহাসিক অসংগতি চিহ্নিত করেন। এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ও অরবিন্দ ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বকে আধুনিক হিন্দুত্বের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার সমস্যা বোঝা দরকার। কারণ কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিন্দুধর্ম, ভারতীয় সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা বা জাতীয় জাগরণ নিয়ে কথা বলেছেন বলেই তাঁকে পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের সমর্থক বলে ঘোষণা করা যায় না। তাঁদের বক্তব্যকে তাঁদের নিজের সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পড়তে হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক ধারণাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নামে বসিয়ে দেওয়া ইতিহাসের নিরপেক্ষ পদ্ধতি নয়।

এবার হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্বের ধারণাগত পার্থক্যটি দেখা যাক। হিন্দুধর্ম বলতে ধর্মীয় বিশ্বাস, উপাসনা, দর্শন, আচার, পুরাণ, সামাজিক রীতি এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্যের বিস্তৃত পরিসরকে বোঝানো হয়। আধুনিক রাজনৈতিক অর্থে হিন্দুত্ব একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয়ের ধারণা। এই পার্থক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিলগুলির একটি হল বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘এসেনশিয়ালস অব হিন্দুত্ব’ গ্রন্থ। সাভারকর নিজেই সেখানে হিন্দুত্ব ও হিন্দুধর্মকে এক বলে দেখেননি। তিনি লিখেছিলেন, হিন্দুত্ব কেবল আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ইতিহাস নয়; তাঁর ধারণায় এটি একটি বৃহত্তর জাতীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়। তাঁর যুক্তিতে, হিন্দুত্বের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, জাতীয়তা, পূর্বপুরুষ ও ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং হিন্দুত্বকে নিছক ধর্মীয় উপাসনার অন্য নাম হিসেবে ব্যাখ্যা করা সাভারকরের নিজের বক্তব্যের সঙ্গেও মেলে না।

সাভারকরের এই ধারণার রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে দেখতে হবে, তিনি ধর্মীয় পরিচয়কে বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে একাধিক দর্শন ও উপাসনা-পদ্ধতি থাকতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে তিনি এমন একটি ঐক্য নির্মাণের চেষ্টা করেন, যার ভিত্তি হবে অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার ধারণা। এখানেই হিন্দুত্বের সঙ্গে হিন্দুধর্মের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। হিন্দুধর্মের মধ্যে কেউ নিরাকার ব্রহ্মে বিশ্বাস করতে পারেন, কেউ কোনও নির্দিষ্ট দেবতার উপাসনা করতে পারেন, কেউ একাধিক দেবতার উপাসনা করতে পারেন, আবার কেউ ধর্মীয় আচারের চেয়ে দর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকল্প যখন এই বিভিন্ন পরিচয়কে একটি একক জাতীয় পরিচয়ের অধীনে সংগঠিত করতে চায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই ঐক্যের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? কোন ঐতিহ্যকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে রাখা হবে? কোন বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা বা সামাজিক রীতিকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা হবে? এবং যাঁরা সেই সংজ্ঞার সঙ্গে একমত নন, তাঁদের অবস্থান কী হবে?

কলকাতার বিতর্কে হিন্দুত্বের পক্ষে বক্তব্য রাখা জে. সাই দীপক যুক্তি দিয়েছিলেন, হিন্দুত্ব হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার একটি রাজনৈতিক উপায় এবং ঔপনিবেশিক আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা শক্তি। স্বপন দাশগুপ্ত খাদ্যাভ্যাসের উদাহরণ দিয়ে দেখান, হিন্দুদের মধ্যে নিরামিষ ও আমিষ—দুই ধরনের ঐতিহ্যই রয়েছে; একটি অন্যটির তুলনায় বেশি প্রকৃত হিন্দু নয়। এই যুক্তির মধ্যে ধর্মীয় বৈচিত্র্য স্বীকার করার দিকটি রয়েছে। তবে এই সত্য থেকে কীভাবে প্রমাণিত হয় যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ সেই সমস্ত ধারার একমাত্র রক্ষক? কোনও ধর্মীয় সমাজের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করা এবং সেই সমাজের ওপর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এক কথা নয়। হিন্দুত্বের পক্ষে যুক্তি দিতে গেলে তাই শুধু হিন্দুদের ইতিহাসে আক্রমণ বা বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা বললেই হবে না; এটাও ব্যাখ্যা করতে হবে, রাজনৈতিক হিন্দুত্ব কীভাবে ধর্মীয় বহুত্বকে রক্ষা করে, এবং কোন পরিস্থিতিতে সেই বহুত্বকে একটি অভিন্ন পরিচয়ের অধীনে সীমাবদ্ধ করে।

বিতর্কে মহুয়া মৈত্রর খাদ্যাভ্যাস-সংক্রান্ত মন্তব্যও এই সমস্যার একটি বাস্তব দিক সামনে আনে। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য ছিল, খাদ্যাভ্যাসের মতো ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে যদি কোনও রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের ওপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে ধর্মীয় বৈচিত্র্য কেবল তাত্ত্বিক বিষয় হয়ে থাকে না; তা মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে পরিণত হয়। খাবার কী হবে, কে কী খেতে পারবেন, কোন খাদ্যাভ্যাসের কারণে কাউকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে—এসব প্রশ্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সহাবস্থানের সঙ্গে যুক্ত। একটি বহুত্ববাদী সমাজে কারও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই অন্যের খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা হলে এই দুই অধিকারের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

এখানে আরেকটি পার্থক্য জরুরি। হিন্দুধর্মের ইতিহাসে বহুত্ব রয়েছে বলেই তার মধ্যে কোনও সামাজিক বৈষম্য ছিল না, এমন দাবি করা যায় না। জাতিভেদ ও বর্ণভিত্তিক বৈষম্য বহু মানুষের জীবন ও অধিকারকে সীমাবদ্ধ করেছে। নারীশিক্ষা, বিধবা-বিবাহ, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সামাজিক সংস্কারের ইতিহাস দেখায় যে সমাজের ভিতরে প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম হয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্যের নামে কোনও প্রথাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা হলে সেই প্রথার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা অস্বীকার করা হয়। আবার ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে থাকা প্রতিটি বিশ্বাসকে একইভাবে নিপীড়নের উৎস বলে ধরে নিলেও ইতিহাসের বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়। তাই কোনও ধর্মীয় প্রথাকে বিচার করতে হলে তার নির্দিষ্ট ইতিহাস, সামাজিক প্রভাব এবং মানুষের অধিকার—এই তিনটি দিকই দেখতে হয়।

সতীদাহের বিরোধিতা বা বিধবা পুনর্বিবাহের পক্ষে আন্দোলনকে এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এগুলি কেবল আইন পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এগুলি ছিল সামাজিক প্রথার বৈধতা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং নারীর অধিকার নিয়ে সংঘাত। এই ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভিতরে কী গ্রহণযোগ্য এবং কী পরিবর্তন করা দরকার, তা নিয়ে বিতর্ক ভারতীয় সমাজের নিজস্ব ইতিহাসেরই অংশ। সামাজিক সংস্কারকে শুধু বাইরের আক্রমণ বলে দেখালে এই অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও সংগ্রামকে অস্বীকার করা হয়।

হিন্দুধর্মের ইতিহাসে বিভিন্ন দেবতা, দর্শন, আচার ও সামাজিক প্রথার সহাবস্থান রয়েছে। হিন্দুত্ব একটি আধুনিক রাজনৈতিক ধারণা, যা সেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে সংগঠিত করতে চায়। এই সংগঠনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যেতে পারে, তার বিরোধিতাও করা যেতে পারে; কিন্তু দুটিকে একই জিনিস বলে ধরে নিলে আলোচনার ভিত্তিই নষ্ট হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনা করার স্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। কোনও ব্যক্তি হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী হয়েও হিন্দুত্বের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্পের সমালোচনা করতে পারেন; আবার কেউ হিন্দুত্বের সমর্থক হয়েও হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের কোনও নির্দিষ্ট ধারার অনুসারী হতে পারেন। এই দুই পরিচয়ের সম্পর্ক বাস্তবে জটিল, তাই তাদের এক করে দেখা বিশ্লেষণকে দুর্বল করে।

হিন্দুধর্মের ইতিহাসকে বুঝতে হলে তার বহুত্ব, পরিবর্তন, সামাজিক বৈষম্য, শাস্ত্রের নানা ব্যাখ্যা এবং সংস্কার আন্দোলন, সতীদাহের বিপক্ষে ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রের ব্যবহার কিংবা রামায়ণে মাংসের উল্লেখ কোনও একক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য যথেষ্ট নয়; কিন্তু এই উদাহরণগুলি দেখায় যে ধর্মীয় গ্রন্থের পাঠ, ব্যাখ্যা এবং সামাজিক ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনও একটি ব্যাখ্যাকে চিরন্তন ও একমাত্র বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলে অন্য ঐতিহাসিক ধারাগুলি আড়ালে চলে যেতে পারে। একইভাবে, হিন্দুত্বকে হিন্দুধর্মের আরেকটি নাম বলে চালালে একটি আধুনিক রাজনৈতিক মতাদর্শের ইতিহাস ও উদ্দেশ্য আলাদা করে বিচার করার সুযোগ নষ্ট হয়।

এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ মূল প্রশ্নটি, হিন্দুধর্মের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যকে কি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হবে? আর যদি সেই পরিচয়ই হিন্দুধর্মের একমাত্র স্বীকৃত রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভিন্ন উপাসনা, ভিন্ন দর্শন, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস এবং ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার অনুসারীদের জায়গা কোথায় থাকবে? হিন্দুধর্মের ইতিহাস দেখায়, এর ভিতরে বহু মত ও প্রথা জন্মেছে, পরিবর্তিত হয়েছে এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। হিন্দুত্বের ইতিহাস দেখায়, এই বিস্তৃত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একটি আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা হয়েছে। এই দুই ইতিহাসের পার্থক্য স্বীকার করাই বিতর্কটির মূল ভিত্তি। হিন্দুধর্মকে বোঝার জন্য যেমন তার বহুত্বকে অস্বীকার করা যায় না, তেমনই হিন্দুত্বকে বোঝার জন্য তার রাজনৈতিক চরিত্রকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

তাই কোনও রাজনৈতিক শক্তির সংকীর্ণ সংজ্ঞার মধ্যে হিন্দুধর্মের বিশালতাকে বেঁধে ফেলা মানে তার শত শত বছরের বহুমাত্রিক ইতিহাস, বৈচিত্র্য ও মানবিক অনুসন্ধানকে অস্বীকার করা। ধর্মের শক্তি কোনও আরোপিত ঐক্যে নয়, বরং তার বৈচিত্র্য, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের নিরন্তর ধারায়। আর এখানেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী চিন্তার মৌলিক পার্থক্য। এই লড়াই রাম বনাম বাম, কিংবা ভালো এসআইআর বনাম খারাপ এসআইআরের সরল সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হল, নাগরিকের অধিকার, গণতন্ত্র ও বহুত্বকে রক্ষা করার লড়াইয়ে আমরা কোথায় দাঁড়াচ্ছি। সারা দেশে জেন-জি-সহ বিভিন্ন অংশের মানুষের যে প্রতিবাদ ও গণআন্দোলন গড়ে উঠছে, তাকে কোনও সংকীর্ণ দলীয় পরিচয়ের মধ্যে আটকে না রেখে যুক্তি, তত্ত্ব ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। রাস্তায় নামার পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা, ইতিহাসবোধ এবং ক্ষমতার কাঠামোকে বোঝার ক্ষমতা। কারণ, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কোনও একক রাজনৈতিক দলের নয়; তা আমাদের প্রত্যেকের। আসুন, সেই দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিই।

0 Comments

Post Comment