ভারতে প্রতি ঘণ্টায় ১৫-১৮ জন ব্যক্তি আত্মঘাতী হন। হকারেরাও এর মধ্যে রয়েছেন। পশ্চিমবাংলায় বিজেপি সরকারের ছয় মাসের ঘুরপথের শাসন ও দুই মাসের সরাসরি শাসনামলে প্রায় কয়েক'শ নাগরিক আত্মঘাতী হয়েছেন। কিন্তু, সেই নিয়ে আওয়াজ নেই। সংবাদমাধ্যমগুলো দেখিয়ে চলেছে যে, সাধারণ জনগণ বা নাগরিক আসলে সকলেই ‘অবৈধ দখলদার’। তাই বিজেপি সরকার যার সাথে যা খুশি তাই করতে পারে, তাদের করা সকল ধরনের 'উচ্ছেদ' বৈধ। হকার উচ্ছেদও তেমনি। বিজেপির উচ্ছেদ প্রকল্প আমাদের সামনে তিনটে বিষয় আবারও প্রমাণিত করেছে; এক, রাষ্ট্রই সব থেকে বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী; দুই, রাষ্ট্র সবসময়েই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের জন্যে; তিন, রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের স্তম্ভ হিসেবে যে যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখানো হয়, তা সম্পূর্ণভাবে শাসক শ্রেণিগুলোর অধীনস্থ।
কেন এই উচ্ছেদ
রেল স্টেশনের অধিকাংশ হকার'রা এখন বলছেন, আর.এস.এস ও বিজেপি পুঁজিপতিদের সরকার, আমাদের নয়। যে রাজনৈতিক দল বা সেই দলের যাঁরা হকার উচ্ছেদ নিয়ে বিরোধিতা করে এখন সামনের দিকে উঠে আসতে চায়, বিজেপির প্রধান বিরোধী দল হিসেবে। সেই দলগুলো ক্ষমতায় থাকাকালীন একই কাজ করেছে। তবে সেই সময় ও এসময়ের মধ্যে গুণগত তফাৎ রয়েছে। প্রত্যেকেই পুলিশ-প্রশাসন ব্যবহার করে হকারদের উচ্ছেদ করতে চেয়েছে। কিন্তু, বিজেপি রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে পকেটে পুরে, আধা সেনা ও বুলডোজার নিয়ে সংগঠিত সন্ত্রাস নামিয়েছে। পাশাপাশি চলছে, বিজেপি নেতা-মন্ত্রী ও ক্যাডারদের অফুরন্ত মিথ্যে ভাষণ ও মিথ্যে তথ্য ছড়ানোর প্রতিযোগিতা। এই যেমন — সজল ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে তদন্ত ছাড়া, তথ্যহীনভাবে বলেন, হকার’রা অনেক বড়লোক। আসলে এস.আই.আর থেকে হকার উচ্ছেদ — পশ্চিমবাংলার নাগরিকদের বিরুদ্ধে সর্বস্তর থেকে নীরবে যুদ্ধ ঘোষণা থেকে সরবে যুদ্ধ যাত্রার শুরুয়াতের সূচনা। এই গোটা পদ্ধতিকে ফ্যাসিবাদ বা শাসক শ্রেণিগুলোর সব থেকে ভয়ানক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার কর্মকাণ্ড বলা যেতে পারে। এখানে এর প্রধান কারণ, দেশের সমস্ত সম্পদ ও সম্পূর্ণ বাজার বিদেশি, বড় পুঁজির হাতে সঁপে দেওয়া। তাই হকারকে সরিয়ে দিয়ে রেল স্টেশনগুলোতে ব্যাপক পরিমাণে বিদেশি, বড় পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এই নিষ্ঠুরতম অমানবিক, দানবীয় আইন, রেওয়াজগুলোকে নব্বই দশকের এল.পি.জিতে স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। আর.এস.এসের শাহ-মোদির বিজেপি সরকার সেটিকেই আরও অনেকখানি সম্প্রসারিত করেছে। ফলে, ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং পলিসি(২০১৭) অনুযায়ী, রেল স্টেশনে ফুড প্লাজা অনুমোদিত হয় ও হকারেরা অবৈধ দখলদার হয়ে পড়েন এবং, 'উচ্ছেদ' সরকারি উন্নয়ের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পায়। ২০১৬ সালে ইউ.এন স্পেশাল রাপোর্টার লেইলানি ফারহা এখানকার সমস্ত প্রকারের উচ্ছেদগুলোকে প্রত্যক্ষ করেন। বলেন, ভারতে জোরপূর্বক উচ্ছেদ প্রায়ই যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। ভারত সরকারকে উচ্ছেদ আটকাতে কঠোরতম আইন করতে হবে।
আইন কী বলে
ভারতীয় আইন স্ববিরোধী, একটার ঘাড়ে আরেকটা চাপানো। যা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক, বৈরিতা তৈরি করে এবং শেষ পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের পক্ষেই সমস্ত অধিকার তুলে দেয়। এই যেমন — সংবিধানের ২১নং, ১৪নং, ১৯(১)ছ ধারা জীবন-জীবিকা থেকে উচ্ছেদের বিপক্ষে। কিন্তু, এইগুলোকে খন্ডন করে রেল স্টেশনে বড় পুঁজির ফুড প্লাজা বানানোর আইনগুলো তৈরি করা হয়েছে। অথবা, বিচার ব্যবস্থাও অনেক সময় নাগরিককে বাস্তুভূমি ও জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করবার ক্ষমতা প্রদান করে। হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রয়েছে, 'স্ট্রিট ভেন্ডার অ্যাক্ট'(২০১৪)। এই আইনে বলা হয়েছে — উচ্ছেদের আগে সম্পূর্ণ তদন্ত (সার্ভে রিপোর্ট) করবার ও ভেন্ডিং সার্টিফিকেট দেওয়ার এবং হকিং ও নন-হকিং জোন চিহ্নিত করবার কথা। বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটাই চলছে। কোনো কিছুই হয়নি হকারদের জন্যে, পুনর্বাসন অনেক দূরে। কোর্টের স্থগিতাদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই বিজেপি সরকার আইনিভাবে বুলডোজার চালাচ্ছে। সরকারপক্ষের সিংহভাগই এই ভয়াবহ উচ্ছেদ প্রকল্পকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে যুক্তি হিসেবে খাড়া করছে ১৪৪ ধারাকে। বলছেন, অননুমোদিত হকারি নিষিদ্ধ। তাই সরকারি উচ্ছেদ বৈধ। হকারেরা অবৈধ দখলদার।
হকার উচ্ছেদের অর্থনৈতিক ফলাফল
হকাররা নানা জায়গা থেকে আসেন। তাঁরা মূলত কম দামী ক্ষুদ্র পণ্য বিক্রি করেন। যা এই বিশ্বায়ন পরর্বতী ভারতে একদিকে আঞ্চলিক ছোট কোম্পানিগুলোর বা দেশীয় পুঁজির বাজার ধরে রেখেছে, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবীদের জন্য কম পয়সার খাদ্য সামগ্রী ও অন্যান্য নানা পণ্য নিয়ে এসেছে। হকারদের নানা ধরনের অতীব ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে যুক্ত রয়েছে— খুচরো, পাইকারি, রিটেল ও ছোট ব্যবসার ডিস্ট্রিবিউটর হাউজগুলোও। তাই এই উচ্ছেদের ফলে শ্রমজীবী নাগরিক, নিম্নমধ্যবিত্ত ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং মধ্যবিত্তরা আরও ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিকে এগোবেন। এমনটা আশঙ্কা করা কী ভুল হবে? আসলে বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারগুলো হকারি ও ক্ষুদ্র, ছোট, পাইকারি ব্যবসায়ীদের খতম করে, তাঁদের বাজার দখল করে তা বিদেশি বড় পুঁজির অধীনস্থ করতে চাইছে। সেই জন্য অঞ্চলে ছোট ব্যবসায়ীদের রিটেল শপের বদলে জায়গা করতে পারছে — জিও মার্ট, ব্লিঙ্কিট, বিগ বাস্কেট, ইনস্টামার্ট এবং অনলাইন রিটেল চেইনগুলো। তথ্য বলছে, এদের ব্যবসা ৬০-৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং, ছোট ব্যবসায়ীরা ঋণের জ্বালায় আটকা পড়ছেন, অনেককে নিজেদের ঘর, সোনা, জমি ও অন্যান্য সম্পত্তিও বন্দক রাখতে হচ্ছে। অনেকে বিক্রি করে দিচ্ছেন। সরকারগুলো এদেরকে আরও বিপদে ঠেলতে ঋণের নিত্যনতুন স্কিম(ফাঁদ) নিয়ে আসছে, চারিদিকে চড়া সুদের হারে ক্ষুদ্র ঋণ গোষ্ঠীগুলোকে চাঙা করতে তৎপর হচ্ছে। অর্থাৎ, বিদেশি, বড় পুঁজি একচেটিয়া দখলদারিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বলা বাহুল্য, হকার উচ্ছেদ সম্পূর্ণ হলে শ্রম বাজারেও এর প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়বে। সস্তার শ্রমিকের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। ফলে, স্বাভাবিকভাবে আগামীদিনে ব্যাপক আকারে শ্রমিকের মজুরির মান কমবে এবং কাজের চাপ আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি ঘটবে।
হকার উচ্ছেদের রাজনৈতিক ফলাফল
ভারতের হকারী ব্যবস্থা প্রধানত প্রাক-পুঁজিবাদী স্তরের। হকার'রা অনেকেই সরাসরি উৎপাদনের সাথে যুক্ত(যেমন - চা, রুটি, তরকারি ইত্যাদি উৎপাদনকারী হকার)। আবার, অনেকেই ছোট কোম্পানির থেকে উৎপাদিত পণ্য কিনে তা বাজারে বেচেন বা সরবরাহ করেন(যেমন - বাদাম, চিপস, আচার ইত্যাদি বিক্রেতা)। যাঁরা সরাসরি উৎপাদনের সাথে যুক্ত তাঁরা উৎপাদনের উপকরণগুলো নিজেরা কেনেন। এবং, এর থেকে যা লাভ(পড়ুন, মুনাফা নয়, যেহেতু হকার'রা নিজেরাই মালিক ও শ্রমিকের ভূমিকা পালন করছেন।) হয় তার বেশিরভাগটাই তাঁরা পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের পেছনে খরচ করেন। অর্থাৎ, এখানকার হকারদের উৎপাদন সম্পর্ক প্রধানত, ভোগের উপরে দাঁড়িয়ে। ভারতের বাজারের সিংহভাগ হকারদেরই ব্যবসা বাড়ানোর উপায় নেই, তাই বাস্তবিকভাবে ব্যবসায়ীক লক্ষ্য তৈরি হয়নি। উল্টে, তাঁরা এরই সাথে আরও নানা জায়গার কাজে নিযুক্ত হন। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে পরিবার, ঘর-সংসার প্রয়োজন মত চালানোর জন্য।
এই হকার'রা মূলত, আসেন, কৃষি জমি থেকে বা কৃষি জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে, কারখানার কাজ থেকে ছাঁটাই হয়ে এবং পূর্বে চুরি-ডাকাতি করার কাজকর্ম পরিত্যাগ করে। হকারদের প্রধানত তিনটে ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন— এক, রানিং হকার, যাঁরা নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করেন; দুই, প্ল্যাটফর্মের উপরে স্টল পেতে বসা হকার; তিন, প্ল্যাটফর্মের বাইরে স্টল বা টেবিল পেতে বসা বা রাস্তার ফুটপাতে বসা হকার। হকারদের মধ্যে এতো ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রকৃতি মেশানো আছে বলেই, এখানে নানা প্রকৃতির চরিত্র বিদ্যমান। উদাহরণ স্বরূপ — লুম্পেন চরিত্র, প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র, চরম প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ও সৎ, নিষ্ঠাবান প্রগতিশীল চরিত্রের ব্যক্তিত্ব আছেন(খুব কম সংখ্যক)।
সরকার বা রাষ্ট্রের উচিৎ ছিল হকারদের ব্যবসা বৃদ্ধি করবার সুযোগ করে দেওয়া। তা না করে সরকারগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে অলিখিতভাবে রেলের কর্মকর্তা, জি.আর.পি, পুলিশ-প্রশাসন, নেতা-মন্ত্রী এঁদের উপার্জনের টাকা চুরি করেছে, এঁদের মধ্যকার অনেককে নানা অপকর্মে ব্যবহার করেছে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ মেটাতে। এখন হকার উচ্ছেদ করার ফলে নানা ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন করে জেগে উঠবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। হকার উচ্ছেদের ফলে সমাজে যেমন, চুরি-ডাকাতির ভয় বাড়বে, তেমনি অঞ্চলে অঞ্চলে বাজার বহির্ভূত ব্রাহ্মণ্যবাদী-সামন্ত শোষণ আরও ভয়ানক, জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। একই সাথে সমাজের বড় পুঁজির একচেটিয়া দখলদারিত্বের লক্ষ্যে কেন্দ্রের আর.এস.এস ও বিজেপি সরকারের সমস্ত কিছুর উপরে অধিগ্রহণ — ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদী রাজনীতির চূড়ান্ত উত্থান ঘটাবে, যেইখানে অনেক হকার’রাও হয়ে উঠতে পারেন ফ্যাসিবাদী রাজনীতির রাজা-মন্ত্রীদের বোড়ে। আবার, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আন্দোলন, বিদ্রোহ বাড়ারও প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হবে।
হকার আন্দোলন কোন পথে
হকারদের মধ্যে কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলেরই শক্তিশালী সংগঠন নেই। বরং, তৃণমূল সরকারের আমলে হকারেরা সেই সরকার দ্বারাই প্রভাবিত ও পরিচালিত হতেন। এই সরকারের শেষ সময়ে হকারদের অনেকেই কেন্দ্রের আর.এস.এস ও বিজেপি সরকারের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করেন। তবে, বিজেপি সরকার আসবার পরে হকারদের উপরে বুলডোজারের সিদ্ধান্ত অনেককেই বিজেপির থেকে দূরে সরিয়েছে। কিন্তু, তাঁদের মধ্য থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শের প্রভাব কেটে যায়নি, তবে কিছুটা কমলেও কমতে পারে। তাই আর.এস.এসও ঠেকায় পড়ে অনেক জায়গাতেই হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে পোস্টার(লোক দেখানোl) মারতে বাধ্য হয়েছে। এখন হকারেরা অনেকটাই সিপিআইএম ও কংগ্রেসের সংস্পর্শে এসেছেন। হকার আন্দোলনকে সিপিআইএম সম্পূর্ণভাবে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে, রাজ্যে বিজেপির প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসতে। সিপিআইএম ও কংগ্রেস সম্মিলিতভাবে হকার আন্দোলনকে বেপথে পরিচালিত করছে, হকারদের আইনের উপর নির্ভরশীল বানিয়ে রেখে। এই দলের প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়নগুলোর নামে আগের সময় থেকে নানা অভিযোগ আছে হকারদের মধ্যে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগই হলো — তোলা তোলা, স্টল বসাতে মোটা টাকা নেওয়া। এই অভিযোগ হকারদের একাংশের। তাই হকার’রা দিশাহারা হয়ে পড়ছেন, কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁরা অনেকেই চাইছেন রেল অবরোধ করতে। কিন্তু, এই প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়নের নেতাদের চাপে এবং প্ররোচনায় তা করতে পারছেন না —
এমনটা অনেক হকারেরা বলছেন। সিপিআইএম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব বিজেপি সরকারের বুলডোজার আসবার আগে স্টেশনের রেলের কর্মকর্তাদের সাথে হকারদের কথা বলতে পাঠানোর বদলে নিজেরা বলতে যাচ্ছেন। এবং, বেরিয়ে এসে হকারদের একটা জায়গায় জটলা বা জমায়েত করতে বলছেন। আর, রেল কর্তৃপক্ষ অন্যত্র ধরে ভাঙ্গার কাজ শুরু করছে — রেল পুলিশ, সিআরপিএফ ও অঞ্চলের পুলিশ-প্রশাসনিক শক্তিকে ব্যবহার করে। অথবা, সিআরপিএফ জমায়েতটিকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখে, হকারদের ওখান থেকে পালানোর বা বেড়ানোর সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বেধড়ক মারছে এবং সেইখানকার সমস্ত কিছু ভাঙছে। যতগুলো রেল স্টেশনে উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে, সব ক'টিতে এই একই ধরনের অবস্থা দেখা যাচ্ছে। তাই এখন হকার আন্দোলন ক্রমশ থিতিয়ে পড়ছে, হকারদের অসহায় করে তুলছে। তাঁরা আশা হারিয়ে অনেকেই অন্যান্য জায়গায় কাজের খোঁজে চলে গেছেন। অথবা, আরএসএস ও বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের সংস্পর্শে যাতায়াত শুরু করছেন। কিছু হকার আত্মঘাতী হয়েছেন। সিপিআইএমের সংস্কারবাদী ও সংশোধনবাদী নেতৃত্ব তা নিয়ে চুপ রয়েছেন। ফলে, পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় এ মুহূর্তে এই আন্দোলন খুব বেশি দূর এগোবার নয়। তাই এখন হকারদের ব্যবসায়ীক অধিকার বাঁচানোও ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে এবং প্রতিদিন চোখের সামনে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে ও তার তীব্রতা বাড়িয়ে চলেছে।
এই পর্যায়ের প্রাথমিক কাজ
রাষ্ট্র যে সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে এবং চলমান হকার আন্দোলনের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে — সেই বাস্তবিক অবস্থা দেখাচ্ছে যে, অন্যরকম কিছু করার প্রয়োজন আছে। শুধু আইনি লড়াই এই আন্দোলনকে খুব বেশী আশা দিতে পারবে না। তাহলেই হকার আন্দোলন, গুমড়ে থাকা ভীত সমাজের বুকে নতুন ধরনের প্রগতিশীল, সাহসী দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে। যা ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত দম্ভ ও ভয়াবহ আস্ফালনকে সাময়িকভাবে রুখে দিয়ে, আন্দোলনের নেতৃত্ব স্থানে কব্জা করে থাকা সংস্কারবাদী ও সংশোধনবাদীদের চারিদিক থেকে আঘাতপ্রাপ্ত করবে। তবেই হয়তো সকল হকারেরা পুনঃরায় ব্যবসা করবার অধিকার ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ সুযোগ পেতে পারেন।