জর্জ অরওয়েলের '১৯৮৪'-তে একটা শব্দ আছে—'আনপারসন'। পার্টির চোখে যে মানুষটা আর কাম্য নয়, তাকে গ্রেফতার করা হয় না, খুন করাও হয় না প্রকাশ্যে। তার বদলে তাকে ইতিহাস থেকেই মুছে ফেলা হয়—পুরনো খবরের কাগজ পালটে ফেলা হয়, ছবি থেকে তার মুখ সরিয়ে দেওয়া হয়, নথিপত্র থেকে নামটাই উধাও হয়ে যায়। এমনভাবে, যেন লোকটা কোনওদিন ছিলই না।
আজকের বাস্তবতায় কেউ কাউকে ইচ্ছে করে খাতা থেকে মুছে দিচ্ছে, এমন অভিযোগ তোলা তাড়াহুড়ো হবে। কিন্তু ফলাফলের দিক থেকে দেখলে একটা অস্বস্তিকর মিল চোখ এড়ায় না—একটা মানুষ একের পর এক সরকারি তালিকা থেকে বাদ পড়তে পড়তে এমন এক জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে রাষ্ট্রের চোখে তার অস্তিত্বটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। নাম মুছে যায় নিঃশব্দে, একটা বিশাল প্রশাসনিক যন্ত্রের ভেতর দিয়ে, ধাপে ধাপে নয়—বরং একটা ধারাবাহিকতায়, যার শুরু ভোটার তালিকায়, আর শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
নাম
ভোটাধিকার গণতন্ত্রে নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রমাণ। সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ সেই সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তি তৈরি করেছে। অথচ Special Intensive Revision (SIR)-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, এই প্রক্রিয়া সবার জন্য সমান নয়। বিহারে SIR-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পরই প্রায় পঁয়ষট্টি লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে যায়। উত্তরপ্রদেশে সেই সংখ্যাটা আরও বিশাল—দুই কোটিরও বেশি নাম মুছে যায় তালিকা থেকে। প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা মানুষ, একটা পরিবার, একটা জীবনের গল্প লুকিয়ে।
একটা কথা স্পষ্ট রাখা দরকার—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব হারানো নয়। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী SIR-এর লক্ষ্য তালিকা সংশোধন, আর বাদ পড়া নামের জন্য claims/objections দাখিলের সুযোগও রাখা আছে। কিন্তু বাস্তবে, একটা নথি-নির্ভর ব্যবস্থায় যাঁর হাতে প্রয়োজনীয় কাগজ নেই, তাঁর জন্য এই "সুযোগ" কতটা সুযোগ, আর কতটা আরেকটা বাধা—সেটাই আসল প্রশ্ন।
মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে এমনই এক নারীর ছবি, যার অস্তিত্ব রাষ্ট্রের খাতায় কোনওদিন ঠিকমতো লেখাই হয়নি—আদিবাসী, ভূমিহীন, স্বামীর ঘর থেকে বিতাড়িত কিংবা নিজের নামে একটুকরো জমিও নেই এমন এক নারী, যাকে প্রমাণ করতে হয় নিজের অস্তিত্বই। SIR-এর বাস্তবতাতেও একই ছবি ফিরে আসে। বিয়ের পর পদবি বদল, বাবার বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্নতা, স্বামীর পরিবারের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া পরিচয়, নিজের নামে সম্পত্তি না থাকা—এসব মিলিয়ে একজন নারীর কাছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে ওঠে। প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌন পরিচয়ের মানুষদের ক্ষেত্রেও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে নথিহীনতার সংকট একই রকম গভীর।
আর নাম বাদ যাওয়াটা এখানেই থেমে থাকে না। বিহার আর পশ্চিমবঙ্গের সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, SIR-এ যাঁদের নাম বাদ গেছে তাঁরা আর কোনও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য থাকবেন না। একটা তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া তাই কেবল ভোটাধিকার হারানো নয়—রেশন, পেনশন, স্বাস্থ্য প্রকল্প, সব কিছুর দরজাই একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
দস্তয়েভস্কির 'আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান' নিজেকে বলেছিল একটা 'ইঁদুর'—রাষ্ট্রযন্ত্র আর সমাজের কাছে এত তুচ্ছ যে তার অভিযোগ, তার ক্ষোভ, এমনকি তার অস্তিত্বই কারও কাছে গুরুত্ব রাখে না। আর যাঁরা তালিকায় থেকেও এই একই অবজ্ঞার শিকার, তাঁদের অবস্থাও কিছু কম করুণ নয়। আইসিডিএস-এর মাধ্যমে শিশুদের জন্য বরাদ্দ অর্থের অপব্যবহার, নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ আর ফাঁকফোকরের কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পুষ্টি পৌঁছয় না। এনএফএসএ-র অধীনে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য কালোবাজারে চলে যাওয়া বা ওজনে কম দেওয়ার মতো ঘটনা খাদ্য সুরক্ষার প্রচেষ্টাকেই দুর্বল করে দেয়। ফল যা হওয়ার তাই—২০২৫ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০২, স্কোর ২৫.৮, যা 'সিরিয়াস' বা গুরুতর ক্ষুধা-শ্রেণিতে পড়ে। পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের মধ্যে ওজন-ঘাটতির হার প্রায় ১৮.৭ শতাংশ, বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
নারীদের ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা আরও তীব্র। নিয়মিত বেতনভুক্ত কাজে একজন নারী পুরুষের আয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশ পান, দৈনিক মজুরির কাজে সেটা প্রায় ৬৯ শতাংশ, আর স্বনিযুক্তির ক্ষেত্রে সেটা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৬ শতাংশে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাম্প্রতিক লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে ভারতের স্থান ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১৩১, সামগ্রিক সমতার স্কোর মাত্র ৬৪.১ শতাংশ। যে নারী এমনিতেই মজুরিতে বঞ্চিত, নথির অভাবে যদি তাঁর নাম তালিকা থেকেও বাদ যায়, তাহলে তাঁর সামনে আর কোনও পথই খোলা থাকে না।
সংখ্যা
জনগণনা কেবল মাথা গোনা নয়। এই সংখ্যার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের নীতি, বাজেট, পরিকল্পনা আর ভবিষ্যতের পরিষেবা কাঠামো। যে মানুষ ইতিমধ্যেই নথি ও তালিকার বাইরে চলে গেছেন, রাষ্ট্রের পরিকল্পনাতেও তাঁর জায়গা সংকুচিত হতে থাকে। আর এই মুহূর্তে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দৃষ্টান্ত হল—Census 2027-এ 'beggars and vagrants'-কে আলাদা শ্রেণি হিসেবে আর নথিভুক্ত করা হচ্ছে না বলে খবর সামনে এসেছে। যে মানুষগুলো ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ, যাঁদের হাতে সরকারি সুবিধা পৌঁছয় না, তাঁদেরই একটা বড় অংশ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আসেন। অথচ জনগণনার খাতাতেও তাঁদের জন্য আলাদা কোনও ঘর থাকছে না।
র্যালফ এলিসনের বিখ্যাত উপন্যাসের নামহীন কথক নিজেকে বলেছিলেন 'অদৃশ্য মানুষ'—কারণ তিনি সত্যিই অদৃশ্য নন, মানুষ তাঁকে দেখতে অস্বীকার করে বলেই তিনি অদৃশ্য। রাষ্ট্রও ঠিক তাই করে—দেখতে পায় না, কারণ দেখার ইচ্ছেটাই নেই। অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও পরিসংখ্যানের আয়নায় কোনও প্রতিফলন পড়ে না।
অস্তিত্ব
মুন্সি প্রেমচাঁদের 'কফন' গল্পের ঘিসু আর মাধবের কথা মনে পড়ে। এতটাই দরিদ্র সেই বাপ-ছেলে যে বৌয়ের মৃত্যুর পর তার সৎকারের জন্য জোগাড় করা টাকাটুকু দিয়েও তারা কাফনের কাপড় না কিনে খিদের জ্বালায় খেয়ে-পান করে ফেলে। দারিদ্র্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছয় যেখানে শেষকৃত্যের ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না—ক্ষুধা তখন সব সামাজিক নিয়ম, সব লজ্জা, সব আচারের ঊর্ধ্বে উঠে যায়।
শ্রমবাজারের সাম্প্রতিক ছবিও এই একই দিকে ঠেলে দিচ্ছে মানুষকে। শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাড়ে সাত শতাংশে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সেই হার আরও বেশি, প্রায় ষোলো শতাংশ। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও কমছে, অর্থাৎ কাজ খুঁজতে গিয়ে হতাশ হয়ে অনেকেই বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। যাঁর নাম তালিকায় নেই, যাঁর সরকারি প্রকল্পের সুবিধাও বন্ধ, তাঁর জন্য এই সঙ্কুচিত শ্রমবাজারে জায়গা পাওয়াটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
যে দেশে ক্ষুধা, বেকারত্ব আর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এখনও কোটি কোটি মানুষের রোজকার বাস্তবতা, সেখানে রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত ছিল জীবিকার অধিকারকে শক্ত করা। কাজের সুযোগ তৈরি করা। খাদ্য আর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। প্রান্তিক মানুষকে আরও প্রান্তে ঠেলে দেওয়া নয়। কিন্তু নাম হারানো, সুবিধা হারানো আর সংখ্যা থেকে মুছে যাওয়ার এই ধারাবাহিকতায়, শেষ পর্যন্ত অনেকের সামনে খোলা থাকে একটাই পথ—রাস্তায় বসে হাত পাতা। ঘিসু-মাধবের মতোই, যখন বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় লড়াই, তখন মর্যাদা, পরিচয়, এমনকি রাষ্ট্রের খাতায় নিজের নামটুকু থাকা—সবই বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।
একটা প্রশ্ন থেকে যায়
সেই ভিক্ষুক হয়ে যাওয়া মানুষটার অস্তিত্বটুকুও কি পরিসংখ্যান থেকে মুছে যাবে? Census 2027-এ যখন 'beggars and vagrants'-এর আলাদা কোনও ঘর থাকছে না, তখন উত্তরটা এড়িয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। ভোটার তালিকা থেকে যে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল, সেটা এসে ঠেকেছে এমন এক জায়গায়, যেখানে একটা মানুষকে আলাদা করে গোনার প্রয়োজনটাই আর কারও মনে হচ্ছে না।
সাদাত হাসান মান্টোর 'টোবা টেক সিং' গল্পের সেই পাগলটার কথা এখানে বারবার ফিরে আসে, যে দেশভাগের পাগলাগারদে দাঁড়িয়ে জানতে চেয়েছিল—তার দেশ কোনটা, ভারত না পাকিস্তান? শেষ পর্যন্ত সে দুই দেশের সীমান্তরেখার ঠিক মাঝখানে, কাঁটাতারের ফাঁকে না-ভারত না-পাকিস্তানের একফালি জমিতে পড়ে থাকে—কোনও দেশই যাকে নিজের বলে স্বীকার করে না। আজকের গল্পটা তার চেয়েও নিষ্ঠুর, কারণ এখানে দাঁড়ানোর মতো কোনও সীমান্তরেখাও নেই। ভোটার তালিকায় নেই, সরকারি সুবিধার আওতায় নেই, জনগণনার খাতায় নেই—এই মানুষটা তাহলে দাঁড়াবে কোথায়?
আব্বাস কিয়ারোস্তোমির একটা ছবিতে সাত-আট বছরের একটা ছেলে, আহমেদ, জানত—বন্ধুর হোমওয়ার্কের খাতাটা যদি পরদিন স্কুলে জমা না পড়ে, তাহলে বন্ধুকে বহিষ্কার করা হবে। তাই আহমেদ একা, অচেনা পথ পেরিয়ে, দূরের গ্রামে বন্ধুর বাড়ি খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিল। কারণ ছেলেটা জানত—স্কুলের রেজিস্টার থেকে একটা নাম বাদ পড়া মানে একটা গোটা ভবিষ্যৎ আটকে যাওয়া, আর সেই মুছে যাওয়া আটকাতে একটা মানুষ পাহাড়-জঙ্গল ভাঙতেও রাজি।
আজ একটা গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নিঃশব্দে একের পর এক তালিকা থেকে মানুষের নাম কেটে দেয়, তখন কাউকে পাহাড় ডিঙিয়ে সেই নাম ফিরিয়ে আনতে ছুটতে দেখা যায় না। আর যেদিন সেই মানুষটার আর কোনও নাম অবশিষ্ট থাকবে না, সেদিন হয়তো একটা সংখ্যা না-থাকার কারণেই একজন মানুষও থাকবে না বলে ধরে নেওয়া হবে।