পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পৃথিবীর ইতিহাসে অদ্যাবধি সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় - এপস্টেইন ফাইলস

  • 12 February, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 315 view(s)
  • লিখেছেন : সোমা চ্যাটার্জী
জেফরি এপ্সটেইন এবং ঘিলেইন ম্যাক্সওয়েল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উচ্চ প্রোফাইলের মামলাগুলির মধ্যে অন্যতম যা যৌন শোষণ, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা এবং আইনি, রাজনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায় । বিশ্বব্যাপী স্বচ্ছতা ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এপ্সটেইন ফাইল ফাঁস এযাবতকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

স্কুলশিক্ষক থেকে ধনকুবের যৌন নিপীড়ক – পৃথিবীর ইতিহাসে অদ্যাবধি কলঙ্কিত অধ্যায় - জেফরি এপস্টেইন। ঘটনাটি নিছকই  পুলিশ হেফাজতে এক অপরাধীর আত্মহত্যার। কিন্তু ঘটনার শেষ এটা নয় বরং শুরু এখানেই।


নিবন্ধ শুরুর আগে বরং সময়কালটা একটু দেখে নেওয়া যাক, ২০০৫ – ২০০৮ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়  নাবালিকাদের সাথে  শ্লীলতাহানির  ও যৌন ক্রিয়াকলাপের জন্য জেফ্রি এপস্টেইন নামে এক ব্যাক্তির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়ে । ২০০৮-  এফবিআই "অপারেশন লিপ ইয়ার" নামে তদন্ত শুরু করে কিন্তু সমাজে প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগের কারনে মাত্র ১৩ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেই  এপস্টেইন খালাস পান এবং পুরো তদন্তটি সিল করা হয় যাতে কেউ এপস্টেইনের অপরাধের পুরো পরিধি জানতে না পারে। ২০১৫ -  ভার্জিনিয়া রবার্টস (৩৫ বছর বয়সী) অভিযোগ করে যে  ১৫ বছর বয়স থেকে ইংল্যান্ডের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এপস্টেইন তাকে ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি আরও কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে মায়ামি হেরাল্ডের সাংবাদিক জুলি ব্রাউন এপস্টেইন এবং তার বান্ধবী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের  যৌন পিরামিড স্কিমের মাধ্যমে ২০০২ থেকে ২০১০  পর্যন্ত কয়েক ডজন নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করে। ২০১৯ -৬ই জুলাই এপস্টেইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারাধীন অবস্থায়  ১০ই আগস্ট তাকে তার কারাগারের কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিরাপত্তা রক্ষীর গাফিলতি,সি সি  টি ভি ফুটেজ না থাকা ইত্যাদি কারনে এটিকে হত্যা বা ষড়যন্ত্র বলা হয়  কারন এই  মৃত্যু  নাড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকার  তথা সমগ্র পশ্চিমি সমাজকে এবং হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে চর্চিত বিষয়। ২০১৯ এ  এপস্টেইনের মৃত্যুর পর থেকে এপস্টাইন এর কুকীর্তি ফাঁস করার জন্য  রিপাবলিকান ও ডেমোক্রাট  দুই দলই আমেরিকার Department of Justice কে চাপ দেয়, এমনকি ট্রাম্প নিজেও ক্ষমতায়  এসে এই ফাইল প্রকাশ করবেন কথা দিলেও বাস্তবে তা করেননি, কিন্ত ২০২৫ সালের নভেম্বরে আমেরিকার কংগ্রসে বিপুল চাপের মধ্যে  Epstein Files Transparency Act  পাশ হয় এবং গত ৩০শে জানুয়ারি এপস্টেইনের সমস্ত অপরাধমূলক তদন্তের ফাইল প্রকাশ্যে আসে। এখন পর্যন্ত ত্রিশ লাখের বেশি পৃষ্ঠা , দেড় হাজার ভিডিও ও এক লাখ আশি হাজার ছবি সামনে এসেছে, এপস্টেইনের এই ক্রিয়াকলাপে উঠে এসেছে সমাজের তাবড় তাবড় ব্যাক্তিদের নাম, তাদের কেচ্ছা কেলেঙ্কারির কাহিনি। তার মধ্যে আছেন ব্রিটেনের রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্রান্সন, আমেরিকার পূর্ব রাষ্ট্রপতি  বিল ক্লিনটন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড  ট্রাম্প  থেকে   এলন মাস্ক , মার্ক জুকেরবার্গ ।  তা ছাড়াও  দেখা যাছে  লিঙ্কডইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান,মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক , বিশিষ্ট সমাজবিদ নোয়াম চমস্কিকে , এমনকি খ্যাতনামা পদার্থবিদ স্টিভেন হকিংকেও ।

 দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে এই ঘৃণ্য অপরাধ  চালানো এপস্টেইন সমাজের চোখে ছিলেন একজন অত্যন্ত ধনী আন্তর্জাতিক অর্থদাতা, কিন্তু কিভাবে তিনি ধনকুবেরদের এত কাছের মানুষ হয়ে   উঠলেন, তাদের এতটা বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তবে নিউ ইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় একাধিক বাড়ি, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে বিলাসবহুল দ্বীপ, এপস্টেইনের এই সব ব্যাক্তিগত সম্পত্তি যে আদতে ছিল ধনকুবেরদের  নিরাপদ অভিসার কেন্দ্র,  তা বোঝা যায় ফাইলে অভিযুক্ত ব্যাক্তিদের অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও দেখলে যা অনেকের মতে ব্ল্যাকমেইল  করার লক্ষ্যে সংগ্রহ করা হয়ছিল। জেফরি এপস্টাইন সারা বিশ্বে রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক সহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে  এমন সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, যা তাকে দেশে এবং বিদেশে  অভিজাত ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলিতে অ্যাক্সেস দেয়। বোঝা যায় প্রত্যেক শক্তিশালী  এবং বিত্তশালী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত করাটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। যদিও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ অধরা রয়ে গেছে, তবুও এপস্টেইনের নিকটতম সহযোগী, গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের বাবা মিডিয়া টাইকুন রবার্ট ম্যাক্সওয়েল মোসাদ—ঘনিষ্ঠ  হওয়ায় ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে জল্পনাও জোরালো হয়েছে। 

এপস্টেইনের এই নতুন প্রকাশিত নথিতে জড়িয়েছে কমপক্ষে দশটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক বা আমলাদের নাম। নরওয়েজিয়ান সিংহাসনের আপাত উত্তরাধিকারী ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মেরিট এর সাথে  এপস্টেইনের বেশ কয়েকটি ইমেলও নজরে এসেছে।  অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড ২০১৪ সালের  জুন মাসে  এপস্টেইনের সাথে তার ব্যক্তিগত দ্বীপ সেন্ট জেমস থেকে নিউইয়র্কে যান বলে অভিযোগ। ৩০শে জানুয়ারীর নথিতে প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটেনের লেবার পার্টির অন্যতম মুখ ও প্রাক্তন মন্ত্রী পিটার মেন্ডেলসন এর  যৌন কেলেঙ্কারির ছবি। প্রথমে এপস্টেইনের সাথে সবসম্পর্ক অস্বীকার করলেও নথিতে প্রকাশ যে এপস্টেইন ২০০৩ এবং ২০০৪ সালে তিনটি পৃথক লেনদেনে ম্যান্ডেলসনকে $৭৫০০০ দিয়েছিলেন।  যার ফলে ম্যান্ডেলসন তার পদ থেকে  ইস্তফা দিয়েছেন। সম্মানহানির ভয়ে  বেশ কয়েকটি দেশে ইতিমধ্যেই  শীর্ষ ব্যক্তিদের পদ থেকে অপসারিত করা হয়েছে। অপসারিত হয়েছেন নরওয়ের আম্বাসডার মোনা জুল , স্লোভাকিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাজকাকও।  বৃটিশ  রাজ পরিবার থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন প্রিন্স আন্ড্রুও, তার ডিউক উপাধি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রসংগত ভার্জিনিয়া রবার্টস যিনি প্রথম আন্দ্রুর বিরুদ্ধে যৌন দাসত্বের কথা প্রকাশ্যে আনেন এবং এপস্টেইনের কুকীর্তি ফাঁস করেন তিনি গত বছর মে মাসেই আত্মহত্যা করেন। বস্তুত, তার মৃত্যুই এপস্টেইন বিতর্ককে আর উস্কে দেয়। 

বিতর্কে  সাঙ্ঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে  মাইক্রোসফট এর প্রাক্তন অধিকর্তা বিল গেট্‌স এর ভাবমূর্তিও। কারন নথিতে  বিল গেট্‌স এর সাথে রুশ তরুণীর ছবি, যৌন সংসর্গ এমনকি  বিল গেট্‌স এর যৌন রোগের আক্রান্ত হবার উল্লেখও আছে। বিল গেট্‌স এর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ  তার মুখপাত্র সম্পুর্ন মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিলেও ২০১৯ সালে বিল ও মেলিন্ডা গেট্‌স এর ডিভোর্সে র কারন হিসেবে এপস্টেইনের এর নাম বহুবার উঠে এসেছে স্বয়ং মেলিন্ডা গেট্‌স এর ভাষায়। নথিতে বলা হয়েছে বিল গেট্‌স বিভিন্ন সময়  এপস্টেইনের সাথে যোগাযোগ করেছেন, ব্যাবহার করেছেন তার প্রাইভেট জেটও, শুধুই তাই নয়, ওই নথিতে মেলিন্ডাকে গোপনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার কথা যেমন আছে আবার একটি মহামারীর উল্লেখও আছে যার সময়সীমা বা বিবরণ  কোভিড-১৯ এর সাথে মিলে যায় এবং সন্দেহ হয় ওই  কোভিড-১৯ মহামারী পুরোটাই মনুষ্যসৃষ্ট ঘৃণ্য এক চক্রান্ত।  বিল গেটসের মত একজন মানবদরদী সমাজ কল্যানমূলক কাজের ফান্ড সংগ্রহের জন্য একজন যৌন কেলেঙ্কারির অভিযুক্তের সাথে কি কারনে দেখা করেতে পারেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সব স্তরেই। 

এপস্টেইনের  নথি প্রকাশের  আগে  ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে  বহু বছরের বন্ধুত্ব থাকলেও  এপস্টেইনের প্রথম গ্রেপ্তারের কয়েক বছর আগে থেকেই  এপস্টেইনের সাথে  তার কোন যোগাযোগ রাখেননি।  কিন্তু সম্প্রতি এই নথিতে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ হয়েছে ৫৩০০ বার , এবং তিনি  এপস্টেইনের বিলাসবহুল দ্বীপ, ম্যানহাটানের বাড়ি এবং তার প্রাইভেট জেট 'লোলিটা এক্সপ্রেসে' বহুবার সফর করেছেন, ফ্লোরিডায় তার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ট্রাম্পের সাথে  ১৪ বছর বয়সী নাবালিকার ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে যা আমেরিকার মত দেশে এই ধরনের  অভিযোগে ইম্পিচমেন্ট এর সম্ভাবনা উস্কে দেয়। মজার বিষয় হল এলন মাস্ক যিনি গত বছর ট্রাম্পকে এপ্সটেইন ইস্যুতে কোণঠাসা করে এপ্সটেইন ফাইল আইন পাস করাতে চাপ দিয়েছেন, নতুন নথিতে প্রকাশ পেয়েছে এপ্সটেইনের সাথে তার বিলাসবহুল দ্বীপে উদ্দাম বন্য পার্টির কথা। অতএব সিলিকন ভ্যালিই হোক বা জাতীয় রাজনীতিক, এপস্টেইনের এই ঘৃণ্য অন্তর্জালে পা জড়িয়েছেন সবাই। বিশ্বের দরবারে ইরান ও অন্যান্য মুসলিম দেশগুলির নারী নির্যাতন  ও নিরাপত্তার জন্য  প্রতিবাদ যে কতটা ফাঁকা বুলি আওড়ানো ও লোক দেখানো, এপস্টেইনের এই ফাইলে সমাজের হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের দ্বারা যৌন নিপীড়িত মহিলাদের  ছবি দেখলেই সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

এপস্টেইনের পরামর্শে  ২০১৭ সালে ইসরায়েলে সফরে গিয়ে সেখানে নাচ , গান করেছেন   বলে উল্লেখ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামও। যদিও নাম থাকা মানেই অপরাধ নয়  কিন্তু    পররাষ্ট্রমন্ত্রক মোদীর এই নাম জড়ানো ভিত্তিহীন ও নিন্দনীয় বলে বিবৃতি দিলেও কংগ্রেস সহ বিরোধী শিবির মোদীর নাম সংযুক্ত হওয়াকেই জাতীয় লজ্জা বলে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী ছাড়াও ভারতীয়দের মধ্যে বর্তমান পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর নাম  বেশ কয়েক বার এসেছে নথিতে, এবং বেশি করে জড়িয়েছে অনিল আম্বানির নাম, নথিগুলি  অনুযায়ী  ২০১৭ সালের শুরু থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অনিল আম্বানির সাথে এপস্টেইনের কথোপকথন উদ্ধৃত হয়েছে, এবং অনিল আম্বানি এপস্টেইনের মাধ্যমে  ভারত সরকারের ( প্রধানত মোদী সরকারের) সাথে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য কাছে দরবার করেছেন। বলা হছে  ভারতের রাষ্ট্রীয় মহাকাশ এবং প্রতিরক্ষা সংস্থা  হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (সংক্ষেপে- হ্যাল) কে সরিয়ে  রাফায়েল  যুদ্ধবিমান কেনার পিছনেও  ভারতের তৎকালীন সরকার, এপস্টেইনের  মধ্যে চুক্তি করা হয়েছে, যদিও ঘটনার সত্যতার এখন প্রমান মেলেনি।  সর্বশেষ নথিতে প্রকাশিত আরেকটি কথোপকথনে, এপস্টেইন ২০১৯ সালে ভারতের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাত্র কয়েক ঘন্টা পরে মোদী এবং হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপরে এপস্টেইন ব্যাননকে লিখেছিলেন "মোদী অন বোর্ড"। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ব্যানন এবং ভারতীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনও বৈঠকের কোনও প্রকাশ্য রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

 

জেফরি এপস্টেইন এবং গিলাইন ম্যাক্সওয়েল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উচ্চ প্রোফাইলের  মামলাগুলির মধ্যে অন্যতম যা যৌন শোষণ,  রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা এবং আইনি, রাজনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায় । বিশ্বব্যাপী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এপস্টেইন ফাইল ফাঁস এযাবতকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । ব্যক্তি এপস্টেইন রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ব্যাক-চ্যানেলের প্রবাহে এতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে প্রাক্তন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাককে প্রধানমন্ত্রীত্বের পরে কীভাবে অর্থ উপার্জন করা যায় সে সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া, অনিল আম্বানিকে জারেড কুশনারের সাথে বৈঠক করতে সহায়তা করা বা ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে দেখা করার জন্য ক্রেমলিনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা এইসব "কূটনীতি" পরিচালনা করার জন্য রাষ্ট্রদূত নিয়োগ ব্যাতিরেকই তিনি সেগুলি অবলীলায় করে গেছেন বছরের পর বছর। এমনকি একজন দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও পুঁজিবাদের প্রিয় সমালোচক বামপন্থী শিক্ষাবিদ নোয়াম চমস্কিকে ব্যক্তিগত বিমানে এপস্টেইনেকে ব্যবসায়িক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত করেনি। নিজেদের ভাবমূর্তি বাঁচাতে গত ৭ই ফেব্রুয়ারী নোয়াম চমস্কির স্ত্রী ভ্যালেরিয়া চমস্কি একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে ২০১৫ সালে একটি বিশেষ সম্মেলনে এপস্টেইনের আতিথ্য গ্রহন করলেও নোয়াম এবং তিনি দুজনের কেউই এপস্টেইনের এই অপরাধের বিষয়ে অবগত ছিলেননা এবং তারা এর জন্য আন্তরিক ভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।

কলেজের গন্ডি না পেরোনো একজন সামান্য স্কুলশিক্ষক যে  অভিজাত শক্তিশালী ব্যক্তিদের ছায়ায় থেকে অপকর্ম করে ত্রিশ বছর  ধরে এফ বি আই  এর নজরে থেকেও সুরক্ষিত থাকতে পারে তার একটি ক্লাসিক কেস এপ্সটেইন যার গতিবিধি নির্বিঘ্ন ছিল বাকিমহাম প্যালেস থেকে হোয়াইট হাউসে। ভিক্টোরিয়া সিক্রেট এর মালিক লেসলি ওয়েক্সমার যাকে সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় বিনামূল্যে প্রাসাদপম বাড়ি দান করতে পারেন , তার উত্থান আমাদের বুঝিয়ে দেয় এই সমাজে আইনি, রাজনৈতিক এবং গণমাধ্যম ব্যবস্থা কীভাবে ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে আছে , বুঝিয়ে দেয় ক্ষমতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে প্রকৃতপক্ষে কাজ করে।।এটি আঙ্গুল তুলে দেখায় যে ন্যায়বিচার আসলে জনসাধারণের চাপ, মিডিয়া এবং অনমনীয় আইনি মান।   

এপ্সটেইন ফাইলের এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল আজ পর্যন্ত এই মামলায় এপ্সটেইনের সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েল ছাড়া আর কারো কোন সাজা হয়নি। অন্যদিকে এই  মামলায় ভুক্তভোগীদের প্রদত্ত আইনি সুরক্ষার দিকটিও  অধরাই থেকে গেছে, গুরুত্ব পায়নি ব্যক্তিগত শনাক্তকারীর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও।তাই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ যখন বলেন এপস্টেইনের ফাইল প্রকাশের পর আর কোনও দায়িত্ব প্রশাসনের নেই , সেটি ভুক্তভোগীদের  জন্য চিন্তার ও হতাশার উদ্রেক করে। এখন পর্যন্ত নথিতে যা প্রকাশ পেয়েছে তার ভিত্তিতে এপ্সটেইন ফাইলের এর অভিযুক্তেরা আগের মতই বেকসুর খালাস পাবেন নাকি তাদের জন্যও আইন ঠিক পথে চলবে সেটাই এখন দেখার বিষয় ।

0 Comments

Post Comment