পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ব্রিটিশ মাফিয়াদের পক্ষে থেকে কি দেশপ্রেমিক হওয়া যায় ?

  • 30 March, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 822 view(s)
  • লিখেছেন : উপল মুখোপাধ্যায়
এমনিতে শ্রীমতী মহুয়া মৈত্রকে বিজেপি তাঁর তীক্ষ্ণ ভাষণের জন্য দুচোক্ষে দেখতে পারে না। তাঁকে লোকসভা থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েও তাঁদের সাধ মেটেনি, ইডি সিবিআই লেলিয়ে জেলে না পুরলে শান্তি নেই আর সে কথা ওই টেলিফোন বাৰ্তালাপেও শুনিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই তাঁর মতো জোরালো প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয়হীন কোথাকার এক রাজপরিবারের না জানি কতপুরুষের প্রতিনিধিকে খাড়া করতে গেলে যে একটা এড অন ন্যারেটিভের ঠেকনো তো দরকারই। নইলে শ্রীমতী মহুয়া মৈত্রর ড্যাং ড্যাং করে জেতা দাঁড়িয়ে দেখতে হয় যে।

সম্প্রতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের শ্রীমতী অমৃতা রায় লোক সভায় বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন কৃষ্ণনগর কেন্দ্রে তৃণমূলের শ্রীমতী মহুয়া মৈত্রর বিরুদ্ধে আর রাজ পরিবারের সিরাজ বিরোধিতা ও ব্রিটিশের তেল বাজির কলঙ্ক ঢাকতে নামতে হয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে। এই কাজটি করতে গিয়ে শ্রীমতী রায়ের করা একটা মন্তব্য ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ওনার মন্তব্য আর তার পক্ষে সওয়াল করতে প্রধানমন্ত্রীর রাম মন্দিরের প্রসঙ্গ তোলা বিজেপির আভ্যন্তরীণ বিষয় নয় তাকে পাবলিক ডোমেনে আনা হল, একটা হিন্দুত্বের ন্যারেটিভকে প্রমোট করার জন্য। এটা  বিজেপির পরিচিত  কৌশল।  তার রাম মন্দিরের বড় ন্যারেটিভের সঙ্গে একটা আঞ্চলিক ন্যারেটিভকে গুঁজে দেওয়ায় দড়। কথায় বলে একা রামে রক্ষে  নেই সুগ্রীব দোসর। তেমনি শ্রীমতী অমৃতা রায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথন প্রসঙ্গে :  কেন কেষ্টনগরের রাজপরিবার অত্যাচারী ম্লেচ্ছ নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে গিয়ে, ইংরেজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে সনাতন ধর্ম রক্ষার গুরু দায়িত্ব পালন করেছিল- সে সব কথা এতদিন বাদে আজ মনে পড়িয়ে দেওয়ার বিশেষ দরকার পড়ল আরকি !   

এমনিতে শ্রীমতী মহুয়া মৈত্রকে বিজেপি তাঁর তীক্ষ্ণ ভাষণের জন্য দুচোক্ষে দেখতে পারে না। তাঁকে লোকসভা থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েও তাঁদের সাধ মেটেনি, ইডি সিবিআই লেলিয়ে জেলে না পুরলে শান্তি নেই আর সে কথা ওই টেলিফোন বাৰ্তালাপেও শুনিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই তাঁর মতো জোরালো প্রার্থীর  বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয়হীন  কোথাকার এক রাজপরিবারের না জানি কতপুরুষের প্রতিনিধিকে খাড়া করতে গেলে যে একটা এড অন ন্যারেটিভের ঠেকনো তো দরকারই। নইলে শ্রীমতী মহুয়া মৈত্রর ড্যাং ড্যাং করে জেতা দাঁড়িয়ে দেখতে হয় যে।

এই করতে গিয়ে কিন্তু বিজেপি বাঙালি জাতিসত্তার মূল একটা আবেগগত জায়গা নাড়া দিয়েছে সেটা হল একটা মোটা দাগের পক্ষ বিপক্ষের প্রশ্ন। জাতীয়তাবাদের উষালগ্ন থেকে বাঙালি ব্রিটিশের দালালি মোটে পছন্দ করেনা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রাথমিক পরিচয় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব হিসেবে।  তিনি কতটা ব্যভিচারী বা মদ্যপ ছিলেন এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়না। যদিও সবাই জানে সিরাজের চালচলন এখনকার মানদন্ডে তো বটেই, তাঁর রিয়াসতের মুর্শিদকুলি খান বা আলিবর্দি খানের মত জাঁদরেল সুবেদার, সেপাইসালার, নবাবদের তৈরি করা মানদন্ডের ধারেকাছেও আসেনা। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে বাঙালি বরাবর সিরাজকে শহীদ বলেই মান্যতা দিয়েছে, মেনে নিয়েছে সেই বাঙালিদের একজন হিসেবে যাঁদের পবিত্র খুনে রাঙা হয়ে ছিল ক্লাইভের খঞ্জর। কখনই ধর্মাধর্ম বিচারে বসেনি সিরাজের ।

হিন্দু মহাসভার নেতারাও সিরাজকে মুসলমান বলে চিহ্নিত করতে খুব চেষ্টা করেছিলেন বলে তো মনে হয় না।  তাঁরাও হয়ত বাঙালি জাতিসত্তার আবেগের প্রশ্নটাই মনে রেখেছিলেন যার পেছনের আর্থিক জাতীয়তাবাদী  যুক্তিও কম শক্তিশালী নয় । তার কারণ তাঁরা জানতেন মোঘল আমলেই, ঔরঙ্গজেব আলমগীরের আমলেই  বাংলা হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর ধনীতম অঞ্চল, যার কেন্দ্রে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দশ লক্ষ মানুষের  শহর ঢাকা আর তার সংলগ্ন অঞ্চল.  তা  গমগম করত উন্নত হস্তশিল্পভিত্তিক অর্থনীতির এক সুদৃঢ় বুনিয়াদের ওপর। কী ছিল না সেই উৎপাদন প্রক্রিয়ার আওতায় বস্ত্রশিল্পে বাংলার তাঁতির গরিমার কথা আমার সবাই জানি , জানি মসলিনের কথা কিন্তু এই বাংলায় তৈরি  হতো পৃথিবীর সেরা জাহাজ, উন্নত ধাতু বা  তার থেকে তৈ রি নানা সামগ্রী সেটা কি ভুলিয়ে দেওয়া যায়! এই বাংলায় বিশেষ ব্যবসায়িক সুবিধে আদায়ের জন্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দরবার করে। ঔরঙ্গজেব আলমগীর এই মাফিয়া বাহিনীকে বাংলার মাটিতে জায়গা দিতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। ষোলশ অষ্টাশি থেকে নব্বইয়ের মধ্যে  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামক মাফিয়া দঙ্গলের  তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জোসায়া চাইল্ড যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন মোঘল রাজশক্তির বিরুদ্ধে। ঔরঙ্গজেব আলমগীর ছাড়ার পাত্র ছিলেন না।  তিনি সারা ভারতে ওদের যত কুঠি-কারখানা সব বাজেয়াপ্ত করেন। মোঘল এডমিরাল সিদ্দি ইয়াকুবের নৌবহর গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ মাফিয়াদের তথাকথিত উন্নত নৌবহরের বজ্জাতি। মুম্বাই আর চেন্নাইয়ে ব্রিটিশ মাফিয়াদের দুটো কেল্লা ছিল তা অবরোধ করে গুঁড়িয়েও দেওয়া হয়। দিল্লির দরবারে পিছমোড়া করে বেঁধে আনা হয় জোসায়া চাইল্ডকে, সেখানে প্রকাশ্যে নাকখত আর বিপুল জরিমানা দিয়েই তবে আবার ব্যবসার অনুমতি পায় মাফিয়ারা। মোঘল কেন্দ্র দুর্বল হলেও,  বাংলার মোঘল সুবেদার মুর্শিদকুলি খান ও আলিবর্দি খান প্রশাসনিক রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নিলেও এই বাংলার এই ঢাকা শহর ভিত্তিক শক্তিশালী হস্তশিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অটুট ছিল।  দিল্লির দুর্বল মুঘল কেন্দ্রের সনদ নিয়ে  পরে পৃথিবীর সবচাইতে সমৃদ্ধ অঞ্চল এই বাংলা লুট করতে আসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর এসে নবাব  সিরাজউদ্দৌলার ফৌজেরই মোকাবিলা করতে হয়েছিল ইংরেজের । 

এই আবেগের সন্তান আমরা, সেটা কি বিজেপি জানে না ? উত্তরটা হল এটা বিজেপি ইচ্ছে করেই করেছে। খুঁজেখুঁজে সামন্ত ঐতিহ্যের ধারকবাহকদের রাজনীতির ময়দানে নামানোর সময় সে যাবতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী, সনাতনী, উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিদের সামনে রেখে বাংলার জাতীয়তাবাদী, সমন্বয়বাদী জাতিসত্তার আবেগের পাল্টা মুসলিম  বিরোধী ন্যারেটিভের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ওরা ভুলে যায় বাঙালি কেষ্টনগরের রাজপরিবারের কথা বললে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে প্রবাদপ্রতিম গোপাল ভাঁড়ের জন্যই মনে রাখে আর সে মনে রাখা সনাতন ধর্মের উদ্ধারে গিয়ে ব্রিটিশ মাফিয়াদের দালালির জন্য নয় বরং বিদূষক চূড়ামনির তীক্ষ্ণ শ্লেষের জন্যই। প্রসঙ্গত এই তীক্ষ্ণ শ্লেষের জন্যই মহুয়াকে লোকসভা থেকে দূর করে দেওয়া হয়। তবে একটা কথা বাঙালির মন থেকে কিছুতেই ভুলিয়ে দেওয়া যাবে না সেটা হল পলাশীর যুদ্ধের কথা। সে যুদ্ধে ঘটনাচক্রে সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন ব্রিটিশ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে আর ঔরঙ্গজেব আলমগীর থাকলে কী হতো, তা আর যেই ভুলুক, ব্রিটিশরা ভোলেনি। আমরা বাঙালিরাও তাই বিজেপির তথাকথিত সনাতন ধর্মের জিগির তোলা ন্যারেটিভের পেছনে না ছুটে প্রাক পলাশী স্বাধীন বাংলার গৌরবময় অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের কথা কেন স্মরণ করব না। ওপার বাংলায় যদি নতুন করে মসলিন তৈরি করাটা ঐতিহ্যের, ইতিহাসের, জাতিসত্তার উদযাপন হতে পারে, এই বাংলায় পলাশীর গৌরবময় লড়াইয়ে কেন কলংকের কালিমা লেপন করার চেষ্টা করা হবে ?

মানুষ অতীতে বাঁচে না। তার কাছে ইতিহাস মানে ন্যারেটিভ নয়, অতীতের সত্যি। পলাশীতে বাঙালি ধর্মের, সম্প্রদায়ের জন্য লড়েনি, লড়েছিল লুটেরাদের আটকাতে। নিজেদের আর্থিক অবস্থানকে সংহত করতে, রক্ষা করতে। ব্রিটিশ মাফিয়ারা আর সেসময়ের দালালরা কী ভেবেছিল সে ব্যতিরেকে বস্তুগত মূল্যায়ন এই শিক্ষাই দেয়। তা আরো শিক্ষা দেয় ব্রিটিশ মাফিয়ার পক্ষে থেকে দেশপ্রেমিক বা গণতান্ত্রিক  হওয়া যায় না ।

0 Comments

Post Comment