একবিংশ শতাব্দী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আলোড়ন তোলা কিছু উদ্ভাবনের সূচনা করেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হল সেইরকম দুটি উদ্ভাবন যাদের ক্ষমতা আছে "খেলা ঘোরানোর" অর্থাৎ পৃথিবীর বৈপ্লবিক পরিবর্তনের। এই মূহূর্তে দুই বিষয়েই উন্নত দেশগুলি অনেক এগিয়ে থাকলেও, উন্নয়নশীল বিশ্ব চেষ্টা করছে এক টেবিলে জায়গা পাওয়ার। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলে এসেছে ভারতবর্ষের মূলধারার ভাষ্যে। অর্থাৎ এই বিষয় নিয়ে আলোচনা, এবং আশাবাদ কেবল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষক, গবেষক, আমলাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ছে আম জনতার মধ্যেও। এর পিছনে অবশ্যই আছে সরকারী প্রচার, আছে কল্পিত অতীতকে - যখন এ ভূমি ছিল “বিশ্বগুরু" - ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন, আছে ঔপনিবেশিক খোঁয়াড়িজনিত “রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে" মানসিকতা। এসবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষকদের মধ্যেও। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন শাখার গবেষণাপত্র বা অনুদান পাওয়ার সিংহভাগ প্রস্তাবনাতেই কোন না কোন উপায়ে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা" শব্দগুচ্ছ।
ভারতবর্ষের মত উন্নয়নশীল দেশে উন্নত বিশ্বের মত প্রযুক্তি আয়ত্ব করার স্বপ্ন দেখার পিছনে বিগত শতাব্দীর শেষ দশকের ভুবনীকরণের বড় ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভুবনীকরণ আমাদের শিখিয়েছিল “গোটা পৃথিবীটাই আসলে একটা গ্রাম”। কিন্তু তিন দশক পর ফিরে দেখছি এই গ্রামের ধারণা থেকে মানুষ পরিত্যাজ্য। মানুষের অধিকার নেই এই গ্রামের এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায় নির্ভার ঘুরে বেড়ানোর। গোটা বিশ্ব জুড়েই চলছে “অবৈধ” অভিবাসী অর্থাৎ বে-পাড়ার লোক খুঁজে তাকে পাড়ার চৌহদ্দির বাইরে পাঠানোর নয়া নয়া কৌশল। এই শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে মানুষের বৈধতা হয়ে ঊঠেছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই আবহে মাসখানেক আগে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন তাঁর সরকার বোম্বে শহরে লুকিয়ে থাকা অবৈধ বাংলাদেশী নাগরিকদের খুঁজে বের করার কাজে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে। ভারতবর্ষের সর্বোত্তম প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র আই আই টি বম্বের সাহায্যে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে একজন মানুষের বাচনভঙ্গীমা, স্বরক্ষেপণ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করবেন একজন বাংলাভাষী ভারতীয় না বাংলাদেশী। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উল্লম্ফনে উল্লসিত হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু এই খবরটি উল্লাসের বদলে খানিক সন্দেহের উদ্রেক করছে। এর কারণ কিছুটা বৈজ্ঞানিক আর কিছুটা মানবিক। বলাই বাহুল্য দুটি একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকারিতা নির্ভর করে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পদ্ধতির উপর। এই প্রশিক্ষণের জন্য আছে পরিসংখ্যান ভিত্তিক মডেল এবং সেই মডেলে ব্যবহার করা তথ্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্ধারিত কোন সূচকের বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে আছে মডেল এবং তথ্যের ত্রুটিহীনতার উপর। যদি প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত তথ্য বিস্তৃত, নিরপেক্ষ ও নির্ভুল না হয়, তবে মডেল সেই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে যে ফলাফল দেবে তা নিরপেক্ষ হবে না। ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনায় দেখা যায় চাকরির আবেদনপত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ৮৫ শতাংশ সাদা চামড়ার আবেদনকারীকে বেছে নিচ্ছে ১। সংখ্যাতত্ত্বের প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী এই ফলাফলের উৎস হিসেবে তাঁরা চিহ্নিত করেছেন ব্যবহৃত মডেল এবং তথ্যভান্ডারকে । একই মতামত উঠে এসেছে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় ২। ২০২৪ সালেই প্রকাশিত কাজে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলেই লুকিয়ে আছে বর্ণ বৈষম্যের বীজ। তাঁদের গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে উচ্চারণের ভঙ্গীমা এবং আঞ্চলিক টান নির্ভরশীল এই মডেলগুলি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের প্রতি বিরূপ। আমেরিকার একটি আইনি সংস্থা, Buckley Bala Wilson Mew LLP, তাদের রিপোর্টে দেখিয়েছে কীভাবে পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কবলে পড়ে অভিবাসী, ভাষা প্রতিবন্ধী এবং ইংরেজি ব্যতীত অন্য ভাষাভাষী মানুষেরা চাকরির প্রতিযোগিতায় সমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ৩।
উপরের উদাহরণগুলি ইংরেজি ভাষার সাপেক্ষে। ভাষা সংক্রান্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক গবেষণার অন্যতম মূল শাখা হল Speech Recognition। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই শাখায় যে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা হয় তা হল মুখ নিঃসৃত ভাষাকে একটি বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করে তার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছে পরিবর্তন করা। এর উপর যদি বক্তার বাচনভঙ্গী, শব্দের ব্যবহার, স্বর প্রক্ষেপণ ইত্যাদি তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর ভৌগলিক উৎস নির্ধারণ করতে হয় তবে তার জন্য ব্যবহৃত হয় অতিরিক্ত মডেল। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে ইংরেজি এবং আরবীর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই কাজে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ নির্ভুল। কিন্তু স্প্যানিশ ভাষার ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে ৭৩ শতাংশে ৪। সদ্য প্রকাশিত আর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে আরও চমকপ্রদ তথ্য। সিলেটির মত স্বল্প প্রচলিত ভাষার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম মডেলেও ভুলের হার ইংরেজির চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ বেশি ৫। বস্তুত ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাগুলির ক্ষেত্রে তথ্যভাণ্ডারের অপ্রতুলতা এবং আঞ্চলিক বুলির ধারাবাহিক পরিবর্তন, বিভিন্ন আঞ্চলিক বুলির মিশ্রণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকারী হবার পথে বড়সড় বাধা। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার মধ্যে বাচনভঙ্গী সহ ভাষান্তরের গবেষণায় আই আই টি বম্বের অধ্যাপক গণেশ রামকৃষ্ণণ স্বীকার করে নিয়েছেন যে যথেষ্ট তথ্য না থাকলে বা বলা ভাল বাচনভঙ্গি, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, স্বরক্ষেপের বৈচিত্র্যের প্রতিফলন তথ্যভান্ডারে না থাকলে এই গবেষণায় সাফল্যের সম্ভাবনা সীমিত ৬ ।
এই পটভূমিকায় বাংলার মত বৈচিত্র্যময় ভাষার আঞ্চলিক প্রভেদ ও অন্যান্য সূক্ষতা এবং সেইসঙ্গে দুই বাংলার বিশেষত সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের বাচনভঙ্গী, শব্দ চয়ন, স্বর প্রক্ষেপের অভিন্নতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে আত্মস্থ করতে পারবে তা নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন থাকছে। এছাড়া বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য রাজ্য, যেমন ত্রিপুরা, আসাম, উড়িষ্যা, আন্দামানে বাংলাভাষীর সংখ্যা যথেষ্ট। এই বাংলাভাষীদের কথ্য ভাষায় ঐতিহাসিক কারণেই অধুনা বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের ছাপ। উদাহরণস্বরূপ আসামের করিমগঞ্জের বাংলাভাষীদের বুলি সিলেটি ঘেঁষা । ফলত কেউ যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলকে সিলেটি শব্দ ও বাক্য দিয়ে প্রশিক্ষিত করে তবে সে করিমগঞ্জের বাঙালীকেও সিলেটের বাঙালী ঠাওরাতে পারে। এই সীমিত সামর্থ্যের প্রযুক্তি প্রান্তিক মানুষের উপর প্রয়োগের ফল হতে পারে মারাত্মক। অবৈধ অভিবাসী তকমা একটি মানুষ, তার পরিবারকে মুহুর্তে অস্তিত্বহীন করে দিতে পারে । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহারে সমাজের নীচের তলায় থাকা মানুষ বিপন্ন হলে তার দায় আমার মত বিজ্ঞানের ছাত্রের উপরেও বর্তায়। বর্তমান ভারতবর্ষে যে আবহ তাতে অবৈধ বাংলাদেশী খুঁজে বের করা একপ্রকার লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া গবেষণা অর্থাৎ যেন তেন প্রকারেণ নির্দিষ্ট সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী দেখানই উদ্দেশ্য। প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যে পৌঁছলে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মত অভিনব খেলনা যে এই অপপ্রয়োগ চাপা দেওয়ার কাজে যথাযথ তা বুঝতে রকেট বিজ্ঞানী হবার প্রয়োজন পড়ে না। যে বিজ্ঞানীরা এই রাজনৈতিক খেলায় স্বেচ্ছায় অথবা না বুঝে অংশগ্রহণ করছেন তাঁদের বুঝতে হবে যে রক্তের দাগ তাঁদের জামাতেও লাগবে। হতে পারে তাঁরা সত্যই বিজ্ঞান প্রযুক্তির একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে এই প্রকল্পের অংশ হয়েছেন। হতে পারে তাঁরা কেবল মাত্র বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে, প্রযুক্তির জগতে নতুন দিগন্তের দিশারী হবার প্রত্যাশায় এই উদ্যোগে সামিল হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের বুঝতে হবে আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞান প্রযুক্তির একচ্ছত্র দখলদার রাষ্ট্র এবং তাদের চালক কর্পোরেটরা । তাঁদের আর্থিক, রাজনৈতিক লাভের বড় হাতিয়ার বিজ্ঞান প্রযুক্তির জগতে মোড় ঘোরানো আবিষ্কারগুলি । সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চর্চা ভীষণভাবেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ।
বিজ্ঞানী লিসা মাইটনার সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের তালিকায় চলে গেছিলেন নিউক্লিয়াসের বিভাজন আবিষ্কার করে। এই আবিষ্কার ছিল পরমাণু বোমার ভিত্তি। নাৎসি জার্মানী বানিয়ে ফেলতে পারে এই আশঙ্কায় আইনস্টাইন সহ বহু প্রথিতযশা বিজ্ঞানী আমেরিকান সরকারকে রাজি করান পরমানূ বোমা তৈরির প্রকল্প ম্যানহাটান প্রজেক্টে। লিসা মাইটনার সেই প্রকল্পে সামিল হবার আহবান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল যে নিজের আবিষ্কারকে সভ্যতা ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হতে আটকানোর ক্ষমতা না থাকলেও তাতে অংশগ্রহণ তাঁর নৈতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। উনি বুঝতে পেরেছিলেন একবার রাষ্ট্র দখল দিলে ফেরার রাস্তা নেই, বিজ্ঞানীর বক্তব্যের আর কোন দাম নেই। হাজার হাজার জাপানীর প্রাণের বিনিময়ে এই কঠিন সত্য অনুধাবন করেছিলেন আইনস্টাইন এবং অন্যেরা। যে বিজ্ঞানীরা আধখেঁচড়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবন – জীবিকা – অস্তিত্বের সিদ্ধান্তের অংশীদার হচ্ছেন এই ইতিহাস যেন তাঁরা মাথায় রাখেন। ইতিহাসের কোনদিকে থাকবেন সে সিদ্ধান্তের দায় একান্তই তাঁদের । কেবল বিজ্ঞান প্রযুক্তি চর্চার দোহাই দিয়ে ইতিহাসের আবর্জনায় জায়গা পাওয়া এড়ানো যাবে না।
তথ্যসূত্র ঃ
১. Proceddings of the seventh AAAI/ACM Conference on AI, 2024, page 1578
২. Nature, 2024, volume 633, page 147
৩. https://www.linkedin.com/pulse/ai-job-interviews-may-discriminate-against-accent-studysteier-3yumf/
৪. Heliyon, 2024, volume 10, page e36460
৫. National High School Journal of Science, 26th December,2025 (https://nhsjs.com/2025/evaluating-the-accessibility-of-automatic-speech-recognition-technology-across-accents/)
৬. https://arxiv.org/pdf/2505.04639