পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অতি-উৎসাহী সমাজ ও পরিবেশচর্চার কুফল সংক্রান্ত নোটবই হারজিত

  • 12 May, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 2016 view(s)
  • লিখেছেন : অংশুমান দাশ
আমার রাস্তা হচ্ছে মানুষ তৈরি করা। মানুষ, যে শুধুমাত্র আবেগে নয়, বুদ্ধি দিয়েও কাজ করবেন। কাজে কর্মে প্রফেশনাল হবেন। এইরকম মাথা খাওয়ার ও তৈরির আঁতুড়ঘর দরকার। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে আলোচনায় যাওয়া দরকার – সময় তাঁদের সামনেই কঠিন। শিক্ষকদের মনে করানো দরকার তাঁদের হৃদয়ের সঠিক অবস্থান আসলে বাঁ দিকের বুক পকেটে নয়, বরং আর একটু মাঝামাঝি।

এই দেখ পেনসিল্, নোটবুক এ–হাতে,

এই দেখ ভরা সব কিল্‌বিল্ লেখাতে ।

ইত্যাদি ইত্যাদি

একটা জিনিস বোঝা যাক। কিছু কিছু যুদ্ধ আমরা হেরে গেছি। ১) পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২ডিগ্রি সে.র উপরে বাড়তে না দেওয়া ২)বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র অটুট রাখা, অযথা যেখান সেখান থেকে গাছ এনে ভুলভাল জায়গায় চাষ না করা ৩)কিছ পশুপাখি গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ৪) জলসঙ্কট ৫) আবর্জনার বাড়াবাড়ি ...These are irreversible damages. আর সারানো যাবে না। সকলের ব‍্যক্তিগত, সমষ্টিগত ও এনজিও-গত উদ‍্যোগের প্রতি শ্রদ্ধারেখেই বলছি- বাড়িতে পালঙ শাক লাগানো, কিছু গাছ পোতা, গ্রামে গিয়ে জমি কিনে নিজের খাবার নিজেই উৎপাদন করা, স্কুলে পরিবেশ নিয়ে ছবি আঁকা, প্লাস্টিকের বদলে কাপড়ের ব‍্যাগ, পরিবেশদিবস পালন করা, প্রতিকী মিছিল করা, স্টিলের স্ট্র দিয়ে ডাবের জল খাওয়া, ফেসবুকে চিন্তা করা (যেমন আমি)...এই দিয়ে ওই ৫ টা লড়াই আপনি আর জিততে পারবেন না। এতে কেবল আপনি মারণযজ্ঞে শামিল না হওয়ার শান্তি পাবেন মাত্র।

কী পারবেন তাহলে? - যাতে আর ক্ষতি না হয়। কিন্তু তার জন‍্যেও আপনার ব‍্যক্তিগত উদ‍্যোগ যথেষ্ট নয়। ওতে আপনার বিবেক পরিষ্কার হবে, পৃথিবীর রোগ সারবে না। না, অনেক লোক আপনাকে উদাহরণ করে আপনার দেওয়া নিদান মানবেন না– এ কথা আমরা যত তাড়াতাড়ি স্বীকার করি, ততই মঙ্গল। প্রধান সমস্যা খেতে না পাওয়া, চিকিৎসা, রিফিউজি করে দেওয়ার হুমকি, রাত্রে বস্তিতে বোমা পড়ার ভয় - এইসব সমস্যার সমাধান হলে তবে পরিবেশ নিয়ে ভাববে বাকি 70% মানুষ, আপনার মত করে। আর একদম উপরের দিকের 10%? তাদের কিছু আসে যায় না, কারণ, উপরের ১,২,৩,৪,৫ সমস্যাগুলি আছে বলেই তাদের রোজগার হয়। মনসান্টো ব‍্যবসা করতে এসেছেন, ব্যাবসার নিয়মই মুনাফা, সে বিষবীজ বেঁচে হলেও। মনসান্টো বিরোধী মিছিল করে কী হবে? তাদের যারা আনছেন তাদের উপড়ে ফেলতে পারেন কী? আমরা সাধারণত পরিবেশ ও সমাজচিন্তার ‘কাজ’ হিসেবে যা করে থাকি – তা মনে হয় কেবলমাত্র উপরের খোসার দিকে তাকিয়ে। খোসা ছাড়াব কবে?


আগের পর্বের জের টেনে আবার বলি, ব‍্যক্তিগত উদ‍্যোগ জরুরী হলেও, এই সময়ে দাঁড়িয়ে তা আর যথেষ্ট নয়। কী পথ এ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন - আমি আমার ভাবনাগুলি ভাগ করে নিতে পারি। প্রথমে দেখা যাক নীতিগুলি কী।


প্রথম নীতি - বিজ্ঞান। আপনি-আমি যে অবস্থা ও অবস্থানে আছি, তা কতকগুলি সিস্টেমের পারস্পরিক interactionএর লব্ধি। আপনি একাধারে সমাজ, বাস্তুতন্ত্র ও বাজার -এই তিন সিস্টেমের মধ‍্যে আছেন, এই তিন সিস্টেমের দ্বন্দ্ব ও ভাব ভালোবাসার সুফল ও কূফল ভোগ ক‍রছেন। এই তিন সিস্টেমের মধ‍্যের যে উপাদানগুলি তাদেরও আবার নিজস্ব আন্তসম্পর্ক ও বৈরিতা আছে। আপনি মানুন আর না মানুন, আপনি কী খাবেন, কী পরবেন তার সিন্ধান্ত এই নানা সিস্টেমের অন্ত: ও আন্তর্সম্পর্কের ফল। এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত আসলে আপনি নেন না – আপনি ভাবেন যে আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে তা আপাত স্বাধীনতা। এইবারে আপনার জায়গায় আপনি যে কোন কিছু বসিয়ে নিন। একজন কৃষক বা আম্বানি বা যশোর রোডের হাজার হাজার গাছ বা সুন্দরবনের বাঘ– কেউই পুরদস্তুর স্বাধীন নন, একটা গন্ডীর মধ্যে বদ্ধ। এই অন্ত: ও আন্তর্সম্পর্ক একটি বিজ্ঞান, which is complex but not complicated!শুধু আবেগ নয়, আমাদের ক্রিয়াকর্মে এই সম্পর্কের বিজ্ঞানটি বোঝা প্রয়োজন।

  • গাছ লাগাবো, বেশ। কোন গাছ কোথায় কতটা? এই গাছটা বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে যাচ্ছে কিনা, কে কেন এই গাছ দেখভাল করবেন? কী কী অসুবিধা হবে? শুধু সবুজের অভিযান বললেই হল না।
  • মণিপুর, মহারাস্ট্রের কালোধান? বা:। কিন্তু এখানে একরের পর একর চাষ করব কেন? শুধু বাজারের কথা ভেবে? কার বাজার? কে খাবে? আপনি যখন ভিন রাজ‍্যে ভিন দেশে ধান রপ্তানি করবেন, আপনার সিস্টেম থেকে জলও রপ্তানি হয়ে গেল যে! কে খাবে ব্রকোলি? লাল হলুদ ক‍্যাপসিকাম? প্রশ্ন ও চিন্তা না করলে, মনসান্টোকে প্রশ্নের ভাষাও পাবেন না একসময়। সব আঙুলই আমাদের পরিবেশপ্রেম ও সমাজকর্মের দিকে ঘুরে যাবে।
  • কৃষকের চাষের জমি কিনে জৈব চাষ করবেন, খুব ভালো - কিন্তু সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও কাজের প্রতিস্থাপন বিষয় ভাবলেন কী। আপনি কি গ্রামে বসেও গ্রামের থেকে আলাদা হয়ে থাকলেন না? কৃষকরা আপনাদের আগে থেকে চাষ করছেন – তাদের কী শেখাবেন আপনি?
  • গাছ কাটবেন না? তাহলে রাস্তা কী করে হবে? আন্দোলনের আগে বিকল্পের খসড়া তৈরি আছে তো?
  • আপনার বাতলানো জৈব সার চাষী তৈরি করেন, না কেনেন? তাহলে তো ইউরিয়া কিনলেই হত। মাটির তলার জল দিয়ে আপনি জৈব চাষ করেন?
  • গোমূত্রে নাইট্রোজেন আছে বটে, কিন্তু তা দিয়ে চাষের সব সমস‍্যা সমাধান হয় না। দেশী ও বিদেশী গরু একই খাবার ও চিকিৎসা পেলে তাদের গোবরে কোন পার্থক‍্য নেই।
  • বিদ‍্যুৎচালিত গাড়ি দেখে হাততালি দিচ্ছেন? ওটা চার্জ করতে কিন্ত সারারাত কয়লা পোড়ানো carbon emitting বিদ‍্যুতই লেগেছে।

ভাবা যাক, অন্ত: ও আন্তর্সম্পর্কের বিজ্ঞান বোঝা যাক। সমাজ পরিবেশ অর্থনীতি - একসঙ্গে, আলাদা।আলাদা নয়। ওই যে বললাম জটিল কিন্তু কঠিন নয়।

আরো দুটি নীতি আবার পরে, তারও পর রাস্তা।


প্রথম নীতি ছিল বিজ্ঞান। দ্বিতীয় নীতি বৈচিত্র‍্য। বৈচিত্র‍্যকে অগ্রগতি দেওয়া স্থায়ীত্বর প্রথম শর্ত। macro ও microদুই স্তরেই। এতে resilienceবাড়ে, কারণ আপনি তখন আর কোন একটা কিছুর উপর নির্ভর থাকেন না। একবগ্গা থাকেন না। এমন কি এক্ষেত্রে আপনার বিপদাপন্নতাও কমে আসে - কারণ আপনার নির্ভরশীলতা বৈচিত্র‍্যময় বলে, আপনার বিপদের riskও ছড়িয়ে গেছে, কমে গেছে তার ধার। যেমন চাষজমিতে নানা কিছু মিশিয়ে চাষ করলে, চাষ ছাড়া রোজগারের জন‍্য পশুপালন, মাছচাষ, ফলের বাগান এইসব থাকলে -চাষীর রোজগারের স্রোতে বৈচিত্র আসে, একবার বাজার যাওয়ার বদলে তার নগদ আমদানী সারা বছর ধরে নানা সময় হতে থাকে, কোন একটি উৎসের ক্ষতি হলে আর একটি উৎস তা পূরণ করতে পারে। যা কিছু স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক তা এই বৈচিত্রের নিয়মেই চলে।

বৈচিত্র একধরণের সামগ্রিকতা আনে। বিভিন্ন জ্ঞান ও ধারণাকে বোঝা ও নিজের কাজে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা এই সামগ্রিকতা বাড়ানোর জন‍্য জরুরী - ঐ আবার, তাতে riskকমে, গ্রাহ‍্যতা বাড়ে, কমে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সম্ভাবনা। অন‍্যের কাজ ও ধারণা যদি আমি ধারণ ও শ্রদ্ধা না করতে পারি তবে আমি মৌলবাদী। দ্বিমত থাকবে, তার মেঘ কাটাতে বিজ্ঞানের আশ্রয় নেব। আমি কত ঠিক আর ওরা কত ভুল, আমি কত ভালো ওরা কত ভুলো - এতে আমার মানসিক insecurityই প্রকাশ পায়। আমরা কেউই সম্পূর্ণ নই, নানা কাজকে স্বীকার করা তাই জরুরী।
আমি জেন্ডার বুঝি, আমার খাবার কোথা থেকে আসছে তাতে আমার কী?
আমি পরিবেশকর্মী – সমকামিতা আবার কী?
আমি প্রফেসর, ভবিষ‍্যৎ তৈরী করি - আপনারাতো এনজিও ফেনজিও করেন।
আমি জল নিয়ে কাজ করি - বিটি কটন কোন সমস‍্যা নাকি?
আমি নাটক করি - ওতেই সব বদলে যাবে। আর কিছু করার কী দরকার?
অন‍্যকে মৌলবাদী বলার আগে একটা আয়না কেনা যাক। অদৃশ‍্য টিকি টুপি আমাদের মাথাতেও গেড়ে বসে আছে। না, সব কিছুতে জ্ঞানী হয়ে উঠতে পারি না আমি - কিন্তু জানলা তো খুলতে পারি। বৈচিত্র‍্যকে celebrateতো করতে পারি। সামগ্রিকতা আনতে পারি - যা আমি জানিনা তা জেনে নিয়ে, সাহায‍্য নিয়ে। সাহায‍্য নিলে আপনি ছোট হবেন না, উল্টে এই বিচ্ছিন্ন মৌলবাদীদের মধ‍্যে আপনি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠবেন। না হলে কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না যে, ঘুরপাক খাচ্ছি। অন‍্যের উদ‍্যোগে শামিল না হয়ে, শুধু আলাদা আলাদা আলাদা আলাদা উদ‍্যোগ শুরু করে যাব?

প্লিজ বলবেন না - এই তো আমাদের একটা নেটওয়ার্ক আছে, আমরা সবাই মিলেমিশে কাজ করি। নেটওয়ার্ক, কার্যক্ষেত্রে পরস্পরের পিঠ চুলকানোর জায়গা– স্বার্থভিত্তিক নেটওয়ার্কের কোন লম্বা ভবিষ্যৎ নেই। তাঁর দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্ত।


Scale, তৃতীয় ও শেষ নীতি। Scaleএর খুব সঠিক পরিভাষা নেই, সব থেকে কাছাকাছি ব‍্যপ্তি। পরিধি। আমি আর পরিসংখ‍্যান দিচ্ছি না যে ঠিক কতটা জলসঙ্কট বা ঠিক কতগুলো গাছ লাগালে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রায় ভারসাম‍্য আনা যাবে বা ঠিক কতটা প্লাস্টিক আমরা পৃথিবীময় জমিয়েছি বা ঠিক কবে আমাদের তেলের ভান্ডার ফুরিয়ে যাবে বা ঠিক আরো কতগুলো পৃথিবী লাগবে আমাদের বর্তমান ভোগের মাত্রাকে জীইয়ে রাখতে - এসব গুগল করলেই পাবেন। তবে বিমর্ষ করার জন‍্য একথা নিশ্চয় বলব - ভেবে নেবেন না যে আপনি কাপড়ের থলি নিয়ে বাজারে গেলেই পৃথিবীর সমস‍্যার সমাধান হবে বা আপনি জল সঞ্চয় করলে আপনাকে জল সঙ্কটে পড়তে হবে না। আবার এটাও মেনে নেওয়া যাক, কোনদিন, চূড়ান্ততম optimisticঅবস্থানেও, পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ প্রকৃতি ও সভ‍্যতার বিলুপ্তি ঠেকাতে সক্রিয় হয়ে উঠবেন না। এসি থাকবে, গাড়ি থাকবে, সেই গাড়ি জল দিয়ে ধোয়া হবে, প্রোটিন deficientদেশে মাংস খাওয়া বাড়বে, বিদ‍্যুতের ব‍্যবহার বাড়বে। কেনই বা বাড়বে না? অধিকাংশের জন‍্য বিকল্প আমরা তৈরি করতে পারিনি - তাই অধিকাংশের জন‍্য প্লাস্টিকের স্ট্র এর কোন বিকল্প নেই। তেল মাখানো বংশদন্ডে বাদর ওঠার মত। নীচের গড্ডলিকা প্রবাহের দিকে সে নেমে আসবেই, কারণ ঠেলে ওঠার যথেষ্ট ক্ষমতা তার নেই। এই ক্ষমতা আসতে পারে scaleথেকে। সময় লাগবে, কারণ আসল উপরে ওঠাটা, আপাতওঠা ও আসল নামার বিয়োগফল। এখন যা ঋণাত্মক। যতক্ষণ না এই উপরে ওঠার ক্ষমতাকে আরো শক্তি দিতে পারছি, এই তিলে তিলে উপরে ওঠাকে নিশ্চিত করতে পারব না।

scaleব‍্যাপারটা বুঝে ফেলা যাক। scaleহচ্ছে কাজের পরিধি ও তীক্ষ্ণতা যতটা ছড়িয়েছে। একটা নির্দিষ্ট সীমার উপরে না গেলে কোন কিছুরই যে কোন ছাপ পড়বে না তা নিয়ে নিশ্চয় সন্দেহ নেই। এখন এই পরিধি বাড়ানোর তিনরকম উপায় হতে পারে। ১. ছোট ছোট কাজ যে যা করছি করে যাওয়া, আশা রাখা যে একদিন বেশির ভাগ লোক এই রাস্তায় আসবেন। ২. বড় scaleএ পৌছানোর একটা রাস্তা, অনেক ছোট কাজকে একসঙ্গে জুড়ে একটা 'বড়' তৈরি করা – যেমন একটা ফানেলের মধ‍্যে দিয়ে নানা জিনিসকে একসাথে ঢাললে সব এক হয়ে এক জায়গায় গিয়ে পড়ে। ৩. যে কোন কাজ একটা বিশাল আকারে ছড়িয়ে করা, যেভাবে সরকার করেন।বিজ্ঞানের নীতি মেনে ১ চালিয়ে যাওয়া দরকার তবে তা যথেষ্ট নয়। ৩ সবথেকে দ্রুত কাজ করবে তবে তাতে বৈচিত্রের নীতি মানা যাবে মনে হয় না। এক ধরণের অতি সরলীকরণ ও serializationএর সম্ভাবনা থাকবে। রইল বাকি ২। রাতের আকাশের নানা space timeএর নানা তারা-নক্ষত্রদের যেমন আমরা একসঙ্গে দেখি, তেমনি। না নেটওয়ার্ক নয়। conglomeration, confluence। ৩ কেও কিন্তু ২এর মত করে করা যায়। তবে এই স্বত:স্ফূর্ত সমাহার কী করে হবে?

এটাই নীতি - বিজ্ঞান, বৈচিত্র ও scale। রাস্তার কথা লিখছি একটু দম নিয়ে।

নীতিকথা অনেক হয়েছে, এবার রাস্তার কথা। এমনিতেই যতটা উৎসাহ প্রথমে ছিল, তা নিশ্চয় কমে এসেছে পাঠকের। তবুও আমি নিজের উৎসাহেই যেরকম ভাবছি সেই ভাবনা গুলো ভাগ করে নিই।

আমরা কথায় কথায় বলি‘অরাজনৈতিক থাকব’, আর বলি – ‘আসলে সব কিছুতেই রাজনীতি আছে’। যখন বলি অরাজনৈতিক – তার মানে আসলে রাজনৈতিক পার্টি থেকে দূরে থাকব, আর যখন বলি রাজনীতি তখন বলি দর্শনের কথা। সংসদীয় গণতন্ত্র যখন মেনে নিয়েছি তখন ‘রাজনৈতিক দর্শন আছে কিন্তু অরাজনৈতিক’ ব্যাপারটার মধ্যে একটা অসুবিধা আছে বুঝতে পারছেন তো? আমার প্রস্তাবিত রাস্তা নাম্বার ১ – আমরা আপনারা সংসদীয় রাজনীতিতে নামছিনা কেন? বাইরে থেকে সমালোচনা করা সহজ বলে? কোনকিছুর পরিধি বাড়ানো কিন্তু অনেক সহজ হত তাহলে। কোন দল পছন্দ না হলে আমরা গ্রীন পার্টি নথিবদ্ধ করার জন্য একজোট হচ্ছিনা কেন?

তৃতীয় নীতির কথা বলেছিলাম স্কেল – কাজগুলির পরিধি বাড়ানো। আমাদেরএনজিওদের স্কেল-এর ধারণা – ‘সরকার আমার বলে দেওয়া নীতি মেনে নেবেন, তাহলেই আমি সন্তুষ্ট। আমাদের কাজ উদাহরণ তৈরি করা’। হাজার হাজার মতামত, পলিসি রেকমেন্ডেশন নিত্য সরকারের ঘরে জমা পড়ছে। তাহলে রাতারাতি সবকিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছে না কেন? কারণ আমাদের রেকমেন্ডেশন শুনতে সরকারের বয়ে গেছে। নীতির বদল আসে দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। যেমন RTI, MGNREGA ইত্যাদি আইন/নীতিগুলি এসেছে। আমরা সেই সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যেতে পারছি কি? না নিজ বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি ও পিঠ চাপড়াচ্ছি? স্কেলে পৌঁছানোর জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার (১৯৮৯ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় ভেলভেট রেভলিউশন মনে করাই। না হয় এই পাশের বাড়ির শাহিনবাগ)। আর দরকার, বিশেষতঃ, প্রশ্ন যখন এমন সব কাজের প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যা কিনা একটা বিশাল বিশাল স্কেলে না হলে কোন ইমপ্যাক্ট পড়বে না – দরকার, ঠিকঠাক আন্দোলনের ইস্যু খুঁজে বার করা। আপনি প্লাস্টিক ব্যাবহার বন্ধ করলেন, ঠিক – আপনি স্ট্র ব্যবহার বন্ধ করলেন, ঠিক – কিন্তু তাতে কিছু বদলাবে না। ভাবুন যদি আমরা ইস্যু করে তুলতে পারতাম, রাজধানি-শতাব্দি এক্সপ্রেসে প্রতিদিন যত জলের বোতল দেওয়া হয়, তার বদলে প্রতি কামরায় জলের এ টি এম বসাতে হবে – তাহলে এক ধাক্কায় কী হতে পারত। নদী নিয়ে নানা চিন্তা ভাবনা করছি, কোকাকোলা খাব না বলছি – এদিকে একটি নদীর জল কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে জানি? অবৈজ্ঞানিক নদীজোড়া প্রকল্পে বর্তমান সরকার দুটি নদীকে জুড়ে ফেলেছেন, জানি? আমরা কবেছোট্ট ছোট্ট কাজ করে পৃথিবী বদলে যাবে – এই ইলিউশন থেকে বেরিয়ে আসব? ছোট কাজ গুলি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকারও অপরিসীম, কিন্তু যথেষ্ট নয়, না হলে পতন আরও দ্রুত হবে। ইস্যু খুঁজে বার করার জন্য দরকার একজোট হওয়া – এমন জোট গড়ে তোলা, যা নির্দিষ্ট কাজভিত্তিক মানুষের সংগঠন নয় – মানে নাটকের দলের জোট, চাষির দলের জোট – এই রকম নয়। দরকার মিশ্র জোট, মানুষের জোট (বাদল সরকারের মিছিল নাটক দেখেছেন কেউ?)। তাহলে সবকিছু সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা হবে, প্রায়রিটাইজ করার একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে – সেখানে বায়াসড হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। এমন জায়গা কোথায়? আমার রাস্তা নাম্বার ২ হবে এমন একটা জায়গা গড়ে তোলা যেখানে ‘মানুষ’রা আসবেন – খোলামেলা, কেউ নাটক করবেন, কেউ গান, কেউ কবিতা পড়বেন, কেউ একদিন বলবেন কী ভাবে রাজস্থানের মানুষ এককাট্টা হয়ে একটা নদী বাঁচিয়ে তুলেছেন, আসবে চাষিদের কাছ থেকে খাবার দাবার – এইভাবে একটা সামুহিক চেতনা গড়ে উঠবে। একটা ছোট্ট জায়গা থেকে শুরু হয়ে সেটা একদিন সারা দেশ ছেয়ে দিতে পারে। হ্যাঁ, সত্যিকারের স্পেস – ফিজিক্যাল স্পেস – সাইবার স্পেস নয়। এটা হচ্ছে সেই ফানেল – যেটার কথা আগের লেখায় বলছিলাম।

আমার রাস্তা হচ্ছে মানুষ তৈরি করা। মানুষ, যে শুধুমাত্র আবেগে নয়, বুদ্ধি দিয়েও কাজ করবেন। কাজে কর্মে প্রফেশনাল হবেন। এইরকম মাথা খাওয়ার ও তৈরির আঁতুড়ঘর দরকার। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে আলোচনায় যাওয়া দরকার – সময় তাঁদের সামনেই কঠিন। শিক্ষকদের মনে করানো দরকার তাঁদের হৃদয়ের সঠিক অবস্থান আসলে বাঁ দিকের বুক পকেটে নয়, বরং আর একটু মাঝামাঝি। রাজনৈতিক দল যদি শ’য়ে শ’য়ে এরকম ক্যাডার গড়ে তুলতে পারেন – আমরা পারি না? রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের আলোচনায় আমরা যেতে পারি না? কথা বলতে পারি না? আমাদের সব আলোচনায় সব মিটিং-এ একই মুখ কেন? বার বার? বার বার? বার বার? নতুন সেনাপতিও নেই সৈনিকও নেই, যে সেনাপতিরা আছেন তারা নিজের ককুন-এ – যুদ্ধ জয় হবে কি করে?

তবে সাবধান – মানুষ তৈরির ক্লাসে যাওয়ার আগে আমাদের পুরনো সিলেবাস নিয়ে যাবেন না –এই পাঁচ কিস্তি ধরে ঐ তিনটে নীতি আর তিনটে রাস্তার নতুন সিলেবাসটাই আলোচনা করছিলাম কিন্তু!

--

0 Comments

Post Comment