একদিকে জান্তব উল্লাস ও অপরদিকে শোক উত্তরণের নৈঃশব্দ্য দিয়ে বুর্জ খলিফার দেশ ইরানে যে ইতিহাস প্রতি মুহূর্তে রচিত হয়ে চলেছে তার শেষ পৃষ্ঠায় কবে আমরা চোখ রাখব জানি না; কিন্তু আপাতত ৭৫০টি রক্তাক্ত মৃতদেহের হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকার যে দৃশ্য নগ্নতার আব্রুকে লজ্জা দিয়েছে, প্রায় ১৩৫টি শহর,আধা শহর ও মহকুমাকে মিশাইল দিয়ে ফালাফালা করেছে ও নিষ্পাপ পবিত্র ১৮০টি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে তাতে আধিপত্যবাদী শক্তির বেপরোয়া দম্ভ যেমন প্রকট হয়েছে তেমনই বিশ্ব মানবতা এক খন্ডহরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।আমরা সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় দেখেছি সে দেশের মাদুরো সরকারের পতনের ক্ষেত্রেও আমেরিকার বিশ্ব কতৃত্বলাভের যে কাঙালপনা তাতেও ঐতিহাসিক ভাবে এই সত্যই প্রকট হয়েছে যে ‘তোমাকে আমার হতে হবে!’ইরানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ততখানি সত্য যে,ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইজরায়েল সফর শেষের দু’দিন পরেই আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথ ভাবে ইরানের ওপর এই অঘোষিত যুদ্ধ নামিয়ে এনেছে। প্রসঙ্গত ইরান দেশটির সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা, রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদ সহ যাবতীয় আলোচনার ক্ষেত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যে হামলা চালিয়েছে তাতে মানবতার দরজায় যে খিল তুলে দেওয়া হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
মিনাব শহরের দারেখত-ই তায়বা এলিমেন্টারি স্কুল। শনিবারের সকাল স্কুল। ক্লাশ সবে শুরু হয়েছে। ইজরায়েল হানাদারদের লক্ষ্য ছিল হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের সাজানো গোছানো মেয়েদের এই স্কুলটিকে ঘিরে।উপুর্যুপরি বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে ফুলের কুঁড়ির মতো শিশুর দেহ।এক ধ্বংসস্তুপের চেহারা নেয় এই স্কুল। বাদ যায়নি অভিভাবক, শিক্ষিকা সহ স্কুল চত্বরে থাকা সাধারণ মানুষও। পরিকল্পিত নিশানায় অভ্রান্ত ঘটনাস্থল তবে কি এটাই জানান দিল যে, মেয়েদের পড়াশোনা বারণ! আমরা গাজা ভূখন্ডেও দেখেছি হত্যাদৃশ্যের পৌনঃপুনিকতা। অন্তত সত্তর হাজার মানুষ যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা অগুন্তি, ইজরায়েলের নেতানিয়াহু সরকার যাদের মৃত্যু কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে উদ্দাম নৃত্য করেছে।শ্মশান করে দেওয়া হয়েছে দেশটিকে।আমেরিকার দাবী ছিল ১) ইরানকে পারমাণবিক গবেষণা ও ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি বন্ধ করতে হবে ২) পরিশোধিত ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। ইরান সে দাবিতে জল ঢেলে দিয়েছে। এই মুহূর্তে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের যে অভিমত তাতে এই আক্রমণকে পূর্ব পরিকল্পিত ও সশস্ত্র আগ্রাসন কিংবা অবৈধ ও অসাংবিধানিক যাই বলা হোক না কেন ইরান তারদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে মরণপণ লড়াই জারি রাখবে তাতে সন্দেহ নেই। ‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল’-সেই আপ্তবাক্যে যুদ্ধবাজ দেশের আর কোনো বিশ্বাস নেই! ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা ও অন্য দেশের খনিজ সম্পদ সহ মানবসম্পদ দখলে নেওয়ার লড়াই প্রত্যক্ষত হয়ে এই হামলার মধ্যে দিয়ে।তাই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু যখন বলেন,এই অভিযান এতটাই এক কেন্দ্রিক ও পরিকল্পিত যে যাতে ইরানের সাহসী জনগণ তাদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ ও পরিবেশ পায়।
একদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তোল্লা আলি খামেনেই-র পরিবারের কয়েকজন সহ মৃত্যু অন্যদিকে শোক ও আনন্দ উচ্ছ্বাসের যে ভারসাম্যহীনতা তাতে পাল্লা ভারি যার বা যাদেরই হোক গোটা বিশ্ব সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছে এক সাহসিনী ইরানি কিশোরী মার্টিসিয়া অ্যাডামস(ছদ্মনাম)র একটি ভাইরাল হওয়া ছবি।যেখানে সে খামেনেইয়ের ছবিতে আগুন ধরিয়ে তার থেকে সিগারেট জ্বালাচ্ছে সুখটান দেওয়ার জন্য।মার্টিসিয়ার এই প্রতিবাদের প্রেক্ষিতটি আমাদের অজানা নয়। ইরানে মেয়েদের ন্যায়,জীবন ও স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা এবং হিজাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংঘটিত করার কারণে তাকে দেশ ছাড়া হতে হয়। ইরান সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করার ফলস্বরূপ তাকে যে অত্যাচারিত হতে হবে এই অবশ্যম্ভাবী পরিণতির টের পেয়ে মার্টিসিয়া ছদ্মনামের আড়ালে দেশ ত্যাগ করে। প্রথমে তুরস্ক এবং পরে ছাত্র ভিসা নিয়ে চলে যান কানাডার টরেন্টোয়। এখন কানাডাই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। সালটা ২০২৫। ইরানে হিজাব বিরোধী নারী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ঐ আন্দোলনের সমর্থনে মার্টিশিয়া তার প্রতিবাদকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল। নীতিপুলিশের হেফাজতে ইরানের বিদ্রোহী নারী মাইশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন তারই অভিমুখে সেদিন স্লোগান উঠেছিল, ‘উই আর অল দ্য মাহিসা আমিনি।’ আজ যখন সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে দেশ উত্তাল তখন মার্টিসিয়া আবার ফ্রেমে-‘আমরা বলেছিলাম না, আমরা তোমার কবরে নাচব’ কিংবা ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন ইঁদুরের মতো গর্ত খুঁড়ে বের করে খামেনেইকে হত্যা করা হবে’-বাস্তবে তাই হয়েছে। কানাডাভিত্তিক নারী মানবাধিকার রক্ষাকর্মীর এই ভাইরাল ভিডিও অ্যাডামসকে রাতারাতি বিখ্যাত করেছে। আসলে সেই নারীর অধিকার; আমার স্বেচ্ছাচারিতা নয়, স্বাধীনতা যা একটি রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না। অবগুন্ঠনে ঢাকা থাকলেই মেয়েরা স্বাধীন থাকবে আর হিজাব খুললেই রাষ্ট্রবিরোধী তকমা তাদের কপালে জুটবে এই ফতোয়াকে অগ্রাহ্য করাই ছিল সেদিনের ইরানী মেয়েদের চ্যালেঞ্জ।সেদিনের খামেনেইর মেয়েদের এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে অবরোধ তার ইতিহাস দীর্ঘ হলেও আগাগোড়া আধিপত্যে মোড়া। মার্টিসিয়ার রোল মডেল ছিল মাহিসা আমিনি; যে মেয়েটি ইরানের সমাজকে শিখিয়ে ছেড়েছে,অনেক হয়েছ-এবার অবগুণ্ঠন খোলো খোলো। ইরানে হিজাব বিরোধী আন্দোলনের মুখ হয়ে বাইশ বছরের মাহিসা আমিনি ২০২২-র সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ যখন তার হিজাব খুলে আকাশে উড়িয়ে দিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রকাশ করেছিল তা পছন্দ হয়নি রাষ্ট্রের। আমিনির অধিকারবোধে উজ্জীবিত ছিল এক টুকরো কাপড় যা আমি অঙ্গে ধারণ করেছি তা যেমন আমারই ইচ্ছায় তেমনই তাকে খুলে ফেলার অধিকারও আমার আছে। ‘নীতি পুলিশ’(গন্ত-এ-এরশাদ)-র ন্যায্যতার কাছে যা ছিল গর্হিত অপরাধ। যথারীতি জেল বন্দী করা হয় আমিনিকে। ঠিক তিনদিনের মাথায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হয় মাহিসার।শুরু হয় ইরান জুড়ে বিক্ষোভ। গর্জে ওঠে নির্বিশেষে জনমত।বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বইতে শুরু করে।তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ইরান প্রশাসন।জো বাইডেন থেকে জাতিসংঘ মালালা ইউসুফজাই থেকে বলিউড অভিনেত্রী ঊর্বশী রাউতেলা প্রতিবাদে মুখর করে তুলেছিলেন নিজেদের ওয়াল। ইরানের দুই বিশিষ্ট অভিনেত্রী হেঙ্গামেহ গাজিয়ানি ও কাতায়ুন রিয়াহি প্রতিবাদ করে আটক হলেন নীতি পুলিশের হাতে। কিন্তু প্রতিবাদ থেমে থাকল না। গ্রেপ্তারের পর গাজিয়ানি বিবৃতি দিলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন বরাবরের মতো আমি ইরানের জনগণের পাশে থাকব। এটাই আমার শেষ পোস্ট।’ ইরানের মেয়েরা হিজাব খুলে আকাশে উড়িয়ে দেয়। প্রকাশ্য রাস্তায় নিজের চুল কাটে।ইরানের ব্যাপক অংশের পুরুষ এই আন্দোলনে সমর্থন জোগায়।চলে ধরপাকড়, লাঠিচার্জ। জারি হয় জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা। প্রসঙ্গত ১৯৭৯সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম ইরান প্রশাসনকে এতবড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হল। একটি মৃত্যুর কন্ঠস্বর যে এত ধারালো হতে পারে তা বুঝিয়ে দিল ইরানের জনগণ। প্রায় ২১ জনকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেওয়ায় অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিবৃতি দিয়ে জানায়, ইরানের কতৃপক্ষকে এই মৃত্যুদন্ড বাতিল করতে হবে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরেও যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করতে হবে। কাতার ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠে দাঁড়িয়ে ইরান ফুটবল দল তাদের দেশের মেয়েদের এই অভূতপূর্ব আন্দোলনকে শুধু সমর্থন জানানো নয় মাহিসা আমিনি সহ অন্য মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের দেশের জাতীয় সংগীত গাওয়া থেকে বিরত থাকে। অন্যদিকে মার্কিন ফুটবল ফেডারেশন তাদের জাতীয় পতাকা থেকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক-র চিহ্নটি সরিয়ে নেয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির ছবি নিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে মিছিল চলে।পোস্টারে লেখা থাকে,‘তোমার হাত থেকে আমাদের তরুণদের রক্ত ঝরে পড়ছে।’
২০০৫ সালেও নীতি পুলিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যায় সে দেশের নারী সমাজ। তাই এ আন্দোলন তাদের মজ্জাগত। যা রাষ্ট্রের আরোপিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে। ১৯৩৬-র ‘কাসভ-ই-হিজাব’ আইনের সারবত্তা এমনই ছিল যে, যদি কোনও মহিলা হিজাব পরিধান করেন তবে তা অপসারণের সম্পূর্ণ অধিকার দেশের পুলিশের। তবে কী আজকের ইরান সেই সব অরাজকতার উত্তর দিচ্ছে! আজকের ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যৌথ আক্রমণের লক্ষ্য যখন ইরানকে বশীভূত করা তখন মাহিসা বা মার্টিসিয়াদের যে নারীবাদী আন্দোলন তাকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। আপাতত পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে গেলে মঙ্গল। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলি একযোগে তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিলে ভারত যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্কট নিয়ে ভারত সরকার আপাতত তার মুখ বন্ধ রেখে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।কাশ্মীর সহ কিছু এলাকায় অশান্তি দানা বেঁধেছে।নীরবতা অনেক সময় যেমন কৌশল তেমনই অর্থবহ।কিন্তু মার্টিসিয়া অ্যাডামসদের ইরান রাষ্ট্রের প্রধানের প্রতি অবজ্ঞা কিংবা শহীদ মাহিসা আমিনির মৃত্যু যে শুধু যে একটি মৃত্যু ছিল না; তারা যে ভবিষ্যতের অনেক কথা লিখে গিয়েছিল তা আজকের এই আগ্রাসন প্রমাণ করে।