জঙ্গলের মধ্যে বাড়ি আর তাতে প্রচুর গাছ ফলে দূষণ হয়নি ।ঘরের মধ্যেও প্রচুর গাছ ফলে ঘরেও দূষণ কই ? এতো গাছের মধ্যে শোয়া যে সাপেরা গায়ের ওপর দিয়ে ঘোরে । কালাচ সাপের মতো , যে সাপ মানুষের গায়ের গন্ধ ভালবাসে , পাশে শোয় আর পাশ ফিরতে গেলে কেটে পালায় । তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে আমাকে কালাচে কামড়ে চলে গেলো আর তারপর কোনো যন্ত্রণা নেই দেখে আতঙ্কে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় । দেখি জঙ্গল গাছ কোনো কিচ্ছু নেই , আমি ঘরে শুয়ে নিজের ঘরে আর বাইরে অনবরত আওয়াজ হচ্ছে ঘড় ঘড় করে । আমার বউ আমাকে বলল ,” মুখ ধুয়ে নাও ।‘’ আমি মুখ ধুতে কালাচ সাপের কথা ভাবি তারপর দোকানে টুকিটাকি জিনিষ কিনতে গেলাম । যখন জানতে পেরেছি নাম বাদ গেছে তারপর থেকে লোকজনের দিকে চোখ পিটপিট করে নিবিষ্ট ভাবে দেখতে শুরু করেছি ।সেটা দেখে দোকানদার সন্তু বল লো ,’’ গুড মর্নিং ।‘’ এখন সকাল তাই আমিও বলেছি ,’’গুড মর্নিং।‘’ সন্তুর দোকানের বাইরেও একটা ঘড় ঘড় আওয়াজ শোনা যেতে থাকে ।সন্তু বললো , ‘’ বড্ড আওয়াজ ।‘’ আমি বললাম ,’ হ্যাঁ ।‘’ সন্তু বলেছিল,’’ আপনিও শুনতে পাচ্ছেন ?” আমি সায় দিতে সে বিশেষ ভাবে আমার দিকে তাকালো ।ও চোখ পিটপিট করে নিবিষ্ট ভাবে আমাকে দেখলো , আমার মতোই, তারপর বললো ,” আশ্চর্য ! ‘’
- কিসের ?
- না মানে……
- কী ?
- অনেককে জিজ্ঞেস করেছি বুঝলেন ।
- কী ?
- না মানে ……
- সারাক্ষণ মানে মানে করছ । মালের হিসেবে ভুল করে ফেলবে । কম চাইলে বেশি দেবে , বেশি চাইলে কম ।টাকা গুনতেও ভুলে যাবে ।
- আরে সেসব কিছু হচ্ছে না বুঝলেন দাদা ।
- তাহলে ?
- সকাল থেকে অনেককে জিজ্ঞেস করেছি শুনতে পাচ্ছে কিনা কেউ তো হ্যাঁ বলেনি !
- আমি ছাড়া ?
- হ্যা , হ্যাঁ আপনি ছাড়া কেউ বলেনি ।
- তাই নাকি ?
- হ্যাঁ ।
- আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ?
- কী ?
- তোমার কি নাম বাদ গেছে ?
- আপনি কী করে জানলেন !
- তোমাকে দেখে ।
- আমাকে ?
- হ্যাঁ ।
- কীভাবে ?
- তুমিও আমার মতোই – চোখ পিটপিট করছো , নিবিষ্ট ভাবে দেখছো ।
- তার মানে আপনারও ?
- নাম বাদ গেছে ।
বলে সন্তু নিবিষ্ট ভাবে আমাকে দেখতে থাকে চোখ পিটপিট করে বিশেষ রকম করে চেয়ে থাকে আর অজান্তেই আমিও ওর দিকে একই রকম করে চেয়েছিলাম এটা বুঝলাম বাড়িতে এসে যখন বউ বলেছিল , “ অমন ড্যাব ড্যাব করে আরকি দেখার আছে ! অনেক বছর তো হলো ! আদিখ্যেতা !'' আমি বলতে যাচ্ছিলাম নিবিষ্ট ভাবে দেখার কথা যা নাম বাদ যাবার পর আমি দেখছি , সেসব কথা কিন্তু কিচ্ছু বলিনি।
প্রথম যখন নাম তোলানোর কথা জানতে পেরেছিলাম বাচ্চুর কাছে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ,” কিসের নাম ?’’
- তালিকায় ।
- কিসের তালিকায় ?
- জানো না ?
- মাইরি বলছি ।
- সব্বাই জানে সব্বাই তোলাচ্ছে ।
- কে তুলছে ?
- আমি ।
- তুই তো আমার নাম জানিস , জানিস না ?
- ওরকম ভাবে হবে না । তাহলে যা বলছি ভালো ভাবে শোনো ।
এই বলে বাচ্চু সুন্দর করে তালিকায় নাম তোলানোর সব রকমের কায়দা আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে বলে ,” বুঝেছ তো ?’’ এতো সুন্দর করে বাচ্চু বুঝিয়েছে যে না বলা যায় তাই আমিও বললাম , ‘’ বুঝিনি আবার , এতো জলের মতো ।‘’ তারপর বাচ্চু ফর্ম দিয়ে যায় যা ঠিকঠাক ভরে আমার বউ জমা করেছে যথাসময় । কিন্তু যাহ্ , এটা কীরকম হ লো তালিকা বেরনোর পর শুধু আমার নামটাই বাদ গেল ! বাড়ির সব্বার আছে শুধু বাদ আমি ।অনেক চেষ্টা করে কাগজ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তালিকায় নাম তুলতে গেলে যেমন যেমন করতে লাগে বা না লাগে সবই করেছি আমরা কিন্তু আমার নাম এলো না চূড়ান্ত তালিকায় । বাচ্চুকে বলাতে সে বলেছে আপিল করতে ।
- কার কাছে ?
- ডি এম ।
- সে কে ?
- মাথাটা গেছে ।
- কার ?
- ডি এম মানে জানো না ?
- জানি ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ।
- ওখানে আবার তালিকা দেখা হবে ।
- আমাকে কী করতে হবে ?
- সব বলে দেবো ।
- বলিস কিন্তু মাইরি , বলবি তো ?
- বললাম তো ।
- কী ?
- বলে দেবো ।
বাচ্চু আর কিছু করেনি । দিন গেছে , মাসও আমিও আর জিজ্ঞেস করিনি । বাচ্চুর সঙ্গে দেখা হলে বললাম , “ ভালো আছিস তো ?’ ও বললো ,” হ্যাঁ । তোমার ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলছি । কিছু হলে বলবো।‘’
- কী বলবি ?
- তালিকায় নাম বাদ পড়ার ব্যাপারটা ।
- ও ।
- বাড়িতে এসে জানিয়ে যাব ।
- আচ্ছা ।
তারপর থেকে আর যাই হোক রাতে ঘুমের আসুবিধেটা আর নেই বললেই চলে ।ওই নাম বাদ পড়ার পর থেকে আরকি ।এমনিতে বয়েস হ লো চৌষট্টি , পায়- সারা গায়ে বাত , অল্প স্বল্প অর্শ , হাই প্রেসার সব আছে , তারা কখনো বাড়ে , ক্খনো কমে ঠিকঠাক থাকে তবে ঘুমের ব্যাপারে আমাকে আর যাই হোক কেউ কিচ্ছু বলতে পারবে না । গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে আমি বহাল তবিয়তে আছি । কী দিন , কী রাত ঘুমিয়ে চলেছি তো চলেইছি । রাস্তার দিকে বেরিয়ে নিবিষ্ট ভাবে লোকজন দেখছি, চোখ আপনা থেকে পিটপিট করে আর প্রায়ই কোনো অদেখা একটা বিশাল যানের চলতে থাকার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি ঘড় ঘড় ঘড় ঘড় । সন্তু ছাড়া এই আওয়াজ নিয়ে আর কার সঙ্গেই বা কথা বলব , দেখেছি ওসব বললে আমাকে পাগল ঠাউরাচ্ছে ।এমনিতে পেনশন পাওয়া বুড়োদের ওপর দুনিয়াশুদ্ধু লোকের অশেষ রাগ , তায় আটভাট বকলে আর রক্ষে নেই , সব্বাই পেছনে লেগে যাবে আর নাম বাদ যাওয়া আমার অবস্থা আরো কেরোসিন হবে ।
এখন বন্ধু বান্ধব কমে গেছে , কিছু লোক মরেছে আর অনেকেই কেমন আছে খোঁজ রাখা হয় না । তাদের কাদের নাম বাদ গেছে, না আছে জানার সুযোগ নেই । চাইলে জানা যায় না এমন নয় , চাইলে কিনা হয় কিন্তু চাইতেও ইচ্ছে করে না । জঙ্গলের জন্তুর মতো আমার রোজকার হাঁটা পথ নির্দিষ্ট । ওরা যেমন শুঁড়ি পথ দিয়ে চলাচল করে প্রতিদিন , আমিও করি । চোখ বন্ধ করলে একটা জঙ্গল দেখতে পাই সেখানে আমি হাঁটছি ।
আস্তে আস্তে শীতকাল এসেছে । ঘুমে চোখ আরো জড়িয়ে আসছে শীতকালের সব বেলায় , আমি প্রত্যেক দিনের মতো সেদিনও ভোরের দিকে সন্তুর দোকানে রওনা দিয়েছি ।ভারী হয়ে কুয়াশা নেমে এসেছে, কখন কুয়াশা কাটবে ? এমন ঘন কুয়াশার সব অঞ্চল যে সামনে তাকানো দায় । আবছা আবছা সামনেটা আর সেটা ভেদ করে ভোরের মোটর বাইক আলো জ্বালিয়ে সব ফুঁড়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে । আমার প্রতিদিনের শুনতে পাওয়া আওয়াজটা আস্তে আস্তে বাড়ছে , যত সন্তুর দোকানের দিকে এগোই আওয়াজটা আরো বাড়তে থাকে , বেশি বেশি করে শুনতে পাচ্ছি । চোখ পিটপিট করে নিবিষ্ট ভাবে দেখার সুযোগ আজ এই কুয়াশার মধ্যে পাব কি ? কিন্তু আওয়াজ শোনায় বাধা নেই । ক্রমে দোকানের পথ শেষ হয়ে আসে । কুয়াশাও ক্রমে বাড়ছে । দোকানের বাইরের দিকে সাজিয়ে রাখা হলুদ দুধের ক্রেট গুলো এ ওর ওপর পরপর সাজিয়ে রাখা । দোকানের বাইরে চাপ চাপ কুয়াশার মধ্যে সন্তুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম , শাল মুড়ি দিয়ে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর চশমার মোটা মোটা লেন্সের আড়ালে স্পষ্ট দেখলাম ও নিবিষ্ট ভাবে আমাকে দেখছিল ।ওর চোখ পিট পিট করছিল । আমি বললাম , ‘’মর্নিং ।‘’ সন্তু আমার কাছে , খুব কাছে সরে আসে , ওর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে শীতের ধোঁওয়া বেরচ্ছে ।খুব কাছে এসে সন্তু আমাকে বললো ,” এতো জোরে আওয়াজটা হচ্ছে যে দোকানে থাকতে পারলাম না ,ফাঁকায় বেরিয়ে এলাম, নইলে এই ঠাণ্ডার মধ্যে কেউ বাইরে আসে , বলুন। ‘’ আমরা নাম বাদ যাওয়া দুজন রাস্তার ধারে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে অভ্যস্ত ঘড় ঘড় ঘড় ঘড় আওয়াজটা শুনছিলাম সেদিন , অনেকটা বুলডোজারের মতো শুনতে তা।