রেলের কামরায় হকার ও ভিখারিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। খুব নিপুণ, নিরাসক্ত আইনি ভাষায় লেখা—‘যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি ও রেলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণার্থে...’। আর তার নিচেই উদ্ধৃত করা হয়েছে একজন লজেন্স বিক্রেতা অন্ধ হকারের সেই অস্ফুট, শূন্য বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা গোঙানির মতো আর্তনাদ, —“পেটে লাথি মারবেন না, লাথি খুব লাগে। যদি মারতে হয় এক সাথে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারুন।”
রণজয় একজন সমাজ ও সময় সচেতন লেখক। সে বোঝে, এই চিৎকার কোনো বিচ্ছিন্ন মানুষের নয়; এটা আসলে একটা রাজনৈতিক ডিসকোর্স। সে পকেট থেকে ডায়েরি বার করে কলমটা চেপে ধরল, কালকের রবিবারের পাতায় এই বিষয়ে একটা গল্প লিখবে। রাষ্ট্রের চকচকে ‘উন্নয়ন’-এর মেটা-ন্যারেটিভের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া এই সাবঅল্টার্ন কণ্ঠস্বরকে সে আর শব্দহীন থাকতে দেবে না।
একটা ট্রেন এসে থামে। যাত্রীরা ধীর পদক্ষেপে নেমে যায়। দুজন আরপিএফ, ভয়ে নেতিয়ে পড়া ক্ষয়াটে চেহারার একজন বাউল শিল্পীকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে আবার কেউ দেখেও না দেখার ভান করে পাস কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। রণজয় ট্রেনে উঠে জানালার ধারে বসে। জানালা থেকে বাইরের দৃশ্যগুলো হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে মগজের অদৃশ্য ক্যানভাসে। ট্রেন ছাড়ার ঘোষণা হয়। তার মনে পড়ে না নিজের গন্তব্য, মের ওপর আচমকা অনেকটা চাপ পরে যাওয়ায় হার্ডডিস্ক হ্যাং করে গিয়েছিল। শেষে একেবারে ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে হুড়মুড় করে নেমে পড়ে।
লোকাল ট্রেনের ভেন্ডার কামরায় কোনো রোমান্টিকতা নেই। সেখানে নেই ভ্রমণের কবিতা। আছে ভিজে ঘামের গন্ধ, ধাতব চাকার নিরলস আর্তনাদ, আর পেটের দায়ে প্রতিদিন নতুন করে শুরু হওয়া জীবনের হিসাব। তাই লোকাল ট্রেনের ভেন্ডার কামরার দরজায় কোনো মেটাফর থাকে না।
সেই কামরারই এক পরিচিত মুখ শশী। জন্মান্ধ। পৃথিবীকে কখনও নিজের চোখে দেখেনি; তবু ট্রেনের শব্দ, রেলের কম্পন আর স্টেশনের গন্ধ মিলিয়ে সে এমন নিখুঁত মানচিত্র এঁকে নিয়েছে, যা অনেক দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের পক্ষেও সম্ভব নয়। ট্রেনের ঝাঁকুনি গুনে সে বলে দিতে পারে—এখন শ্রীরামপুর, না শেওড়াফুলি। সে ভিক্ষা চাইত না, তার ডানহাতে প্লাস্টিকের কৌটো, ভেতরে পাঁচ-মেশালি লজেন্স। সে বলত, “লজেন্স নিন বাবু, লজেন্স... টক-ঝাল-মিষ্টি লজেন্স”, শব্দগুলো ট্রেনের সিলিং ফ্যানের চক্করের সঙ্গে মিশে যেত বাতাসে। —দূরে সিগন্যাল বদলের ধাতব টংটং, রেলের লাইনের গা ঘেঁষে উড়ে যাওয়া পাখিদের ডানা, ট্রেনের হুইসিল, ঠিক তারই মাঝখানে ভেসে ওঠে শশীর পরিচিত ডাক, —“লজেন্স নিন বাবু, লজেন্স... টক-ঝাল-মিষ্টি লজেন্স…”
কেউ শোনে, কেউ শোনেও না। একটি বাচ্চা মায়ের আঁচল টেনে বলে, —“মা, ওই কাকুর কাছ থেকে একটা কিনি?”
মা শিশুটিকে টেনে নিয়ে যায়। ফিসফিস করে বলে, —“এখন না পরে,চলো, দেরি হয়ে যাবে।”
শশী শুধু কণ্ঠস্বর শুনে বুঝে নেয়—ক্রেতা চলে গেল।
তার পৃথিবী শব্দের পৃথিবী। মানুষের মুখ সে চেনে না; চেনে জুতোর আওয়াজ। কারও চটি টেনে হাঁটার শব্দে ক্লান্তি থাকে, কারও হিলের খটখট শব্দে অধৈর্যতা, কারও স্যান্ডেলের নরম শব্দে দ্বিধা।
কিন্তু আজ সকালে যে শব্দ প্ল্যাটফর্ম জুড়ে এগিয়ে আসছে, তার ভেতর কোনো দ্বিধা নেই। ভারী বুট। বেশ ভারী ও সিনক্রোনাইজড। মাপজোক করা। যেন শব্দগুলোও আদেশ মেনে হাঁটছে।
—“এই যে, শুনতে পাচ্ছিস? এখান থেকে উঠে যা।”
শশী মাথা তুলল। সে দেখল ক্ষমতার বীভৎস মুখ, চিনল— আদেশের স্বর।
—“নতুন অর্ডার হয়েছে। ট্রেনে, প্ল্যাটফর্মে— হকারি চলবে না।”
শশী চুপ করে রইল।
রণজয় বুঝল আজকের শব্দে একটা নতুন আইনের দম্ভভরা উচ্চকিত ঘোষণা আছে, যা উচ্চবিত্তের একচেটিয়া দৃশ্য-সংস্কৃতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। কর্পোরেট ট্রাভেলারদের চোখের শান্তি চাই। সেই ঝকঝকে, এসি-নিয়ন্ত্রিত আয়েশের ফ্রেমে শশীর মতো বিকলাঙ্গ, মলিন অবয়বগুলো বড্ড কদর্য, বড্ড অবাঞ্ছিত। প্রতিবন্ধীরা তো দরিদ্র; তারা তো বাজারের বড় ভোক্তা নয়, যে তাদের জন্য আলাদা খাতির রাখতে হবে! তাই এই ‘কঙ্কালের দল’ যেন উচ্চবিত্তের প্রমোদভ্রমণে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, তার পাকা বন্দোবস্ত হয়েছে।
লজেন্সের কৌটোটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে ধীরে বলল,
—“স্যার... বাড়িতে অসুস্থ মা... মেয়েটার খাতা কিনতে হবে…”
কোনো কথা নয়। একটি ভারী বুটের লাথি এসে লাগল শশীর লজেন্সের কৌটোয়। লাথিতে কোনো ব্যক্তিগত রাগ নেই, আছে বিবেকহীন সিস্টেমের অতি যান্ত্রিকতা।
কৌটোটা ছিটকে পড়ল প্ল্যাটফর্মে।
লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-কমলা—রঙের লজেন্সগুলো চারদিকে ছড়িয়ে গেল। যেন শিশুর ইজেল নয়তো উল্টে দিয়েছে রঙপেন্সিল বাক্স ।
একটি ছোট ছেলে দৌড়ে একটা লজেন্স তুলতে গিয়েছিল। তার বাবা হাত চেপে ধরলেন।
—“ছোঁবে না।”
—“কেন?”
লোকটি উত্তর দিল না। ছেলেকে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল।
শশী নির্বাক কিন্তু নির্বিকার নয়।
সে হাঁটু গেড়ে বসে হাতড়াতে লাগল। স্পর্শের আকুতি নিয়ে খুঁজে ফিরল লজেন্সগুলো। কোনটা কোন দিকে গেল—সে জানে না। তার আঙুলে শুধু হিম।
একটি লজেন্স নাগালে পেয়ে সে এমনভাবে মুঠোয় ভরল, যেন পৃথিবীর শেষ সম্বলটি উদ্ধার করেছে।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অল্পবয়সী আরপিএফ কনস্টেবল দৃশ্যটা দেখছিল।
মুহূর্তের জন্য সে ঝুঁকে পড়ে কুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। ঠিক তখনই পাশ থেকে উর্দ্ধতনের কড়া নির্দেশ,
—“কী হল? দাঁড়িয়ে আছ কেন? সরাও ওটাকে।”
সে চোখ নামিয়ে নিল, নয়তো সরে গেল।
শশী দেখতে না পেলও শুনতে পেল মানুষের আদিম নীরবতার সেই শব্দ।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার কণ্ঠস্বর আর আগের মতো ছিল না।
মনে হচ্ছিল, গলা দিয়ে নয়—পেটের অনেক গভীর থেকে শব্দ বেরিয়ে আসছে। যেন নিজের সাথে কথা বলছে।
—“পেটে লাথি মারবেন না স্যার… লাথি খুব লাগে।”
চারদিকে কোলাহল ঘেরা স্তব্ধতা। সময়ের ক্ষণিক থেমে যাওয়া এই প্লাটফর্মে সবাই সব দেখছে কিন্তু কিছুই দেখছে না।
কেউ এগিয়ে আসবে না। তারপর শশী বলবে,
—“যদি মারতেই হয়... একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারুন। ...বুটের চেয়ে বুলেটের দয়া অনেক বেশি।” ঠিক সেই ভাবেই সময় এগিয়ে চলল।
রণজয় মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবছিল।
শশী মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো।
তার ঠোঁট শ্রাবনের বাদলার হওয়া লাগা পাতার মতো তিরতির করে কাঁপছিল। তার বোধহয় জ্বর আসছিল, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর।
ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ ভিডিও বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে দিল। ইউজারদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় শশী নিমেষে ভাইরাল। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
মাইকে বাজল, —"ভারতীয় রেল আপনার নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ..."
রণজয় অনেকক্ষণ ডায়েরির সাদা পাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কলমের নিব কাগজ ছুঁয়ে থাকলেও কোনো শব্দ তাকে আলিঙ্গন করল না।
তার মনে হচ্ছিল, গল্প লিখতে বসে সে যেন ভুল দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটা মানুষের ক্ষুধাকে কীভাবে বাক্যে পরিণত করা যায়? একটি লাথির অভিঘাত কি বিশেষণের চেয়ে বড় নয়? সাহিত্য কি সত্যিই ক্ষুধার ভাষা জানে, নাকি সাহিত্য ক্ষুধাকে নান্দনিক করে তোলার এক সুসভ্য কৌশল মাত্র?
আইন শশীর জীবিকাকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করেছে। জনকল্যাণকামিতার মুখোশের আড়ালে আইনের শাসন আর লুকতে পারছে না মালিকের নখ দাঁত।
অথচ মাত্র পাঁচ টাকায় লজেন্স বিক্রি করেই শশীর ঘরে উনুনে হাঁড়ি চড়ে, ফোটা ভাতের গন্ধ ক্ষিদে ভর্তি পেটের ভেতর মোচড় দেয়, মেয়েটা আনন্দে তালজ্ঞানহীন হাত পা ছোড়ে বাতাসে। শশীর মনে হলো, তার পেটটা আসলে একটা ফাঁকা স্টেশন, যেখানে কোনোদিন মানবিকতার ট্রেন থামে না। তাই সে চিৎকার করেনি কোনোদিন। আজ করবে।
রণজয়ের কলম আর একটু হিংস্র ও ধারালো হয়ে উঠতে চাইলো। সে কাগজের টুকরো, বিধানসভার নোটিশ আর বিজ্ঞাপনের ভাষার কোলাজ জন্মাতে দেখল—
#টেক্সট অ, আইনসভায় ধ্বনিভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়ে গেল মন্ত্রী, এমএলএ ও এমপিদের বেতন ও ভাতা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধির বিল। এখানে কোনো বিরোধী দল নেই, কোনো মতভেদ নেই। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে শোষক শ্রেণী সর্বদা এক সমান্তরালে হাততালি দেয়।
##টেক্সট আ, রেলওয়ে নোটিশে স্টেশন চত্বরকে আন্তর্জাতিক মানের রূপ দেওয়া হচ্ছে। এখানে মলিনতা বা দারিদ্র্যের প্রদর্শন দণ্ডনীয় অপরাধ। ট্রেনের ভেতরে হকারদের জঞ্জাল ও অবাঞ্ছিত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো।
###টেক্সট ই, লজেন্সের প্লাস্টিক কৌটোটা যখন প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল, লাল-নীল-সবুজ লজেন্সগুলো ছড়িয়ে পড়ল ঠিক তার ও তার মতো অনেকের অধরা স্বপ্নের মতো ছড়িয়ে পড়ছে আর বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যেন বর্ষার রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে কাগুজে নাগরিক অধিকারগুলো।
বাক্যগুলো পড়ে তার অস্বস্তি বোধ হলো। এগুলো কি এক একটা গল্প? নাকি কাগজ কেটে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো পৃথিবী? নাকি পৃথিবীটাই আজ কোলাজ হয়ে গেছে। যেখানে আইন এক ভাষায় কথা বলে, বিজ্ঞাপন আরেক ভাষায়, আর ক্ষুধা—সে এখানে ভাষাহীন।
স্টেশনের বড় ডিজিটাল স্ক্রিনে একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের বিজ্ঞাপন চলছে—চকচকে পিৎজার ওপর চিজ গলে পড়ছে, উচ্চ-বিত্তের সন্তান চেটেপুটে (পড়ুন, লুটেপুটে) নিচ্ছে তৃপ্তি, আহা! প্রসাধনপুষ্ট ঠোঁটের গা বেয়ে নামছে সফেদ ক্রিম নাকি শশীদের তঞ্চিত রক্ত রস। খিদেয় কুঁকড়ে যাওয়া পেট দুহাতে আগলে, সেই স্ক্রিনের নিচে শশী মাটিতে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে ফিরছে হারানো লজেন্স।
একটাই প্ল্যাটফর্ম। দুটো আলাদা পৃথিবী। একটির আলো অন্যটিকে স্পর্শ করে না। দুটোই সমান্তরাল বাস্তব, দুটোই অসম্পূর্ণ।
রণজয় লিখল—কেন অসম্পূর্ণ? এই অন্ধ হকার, ভিখারি, ফুটপাতে বসা মানুষগুলো সম্পূর্ণ নয় কেন? কে জবাব দেবে? আসলে রাষ্ট্র নিজেই তীব্রভাবে অসম্পূর্ণ এবং পঙ্গু। যে রাষ্ট্র নাগরিকদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিসরটুকু দিতে পারে না,—সে এক ব্যর্থ কাঠামোর কঙ্কালমাত্র। শ্রমিককে অভুক্ত রেখে তাদেরই রক্ত-ঘাম-শ্রমে সৃষ্ট সম্পদের সিংহভাগ মালিকের পকেটে তুলে দেওয়ার সময় যে ব্যবস্থার হাত কাঁপে না, সে যখন পাঁচ টাকার লজেন্স-ওয়ালার পেটে লাথি মারে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়—দেশটা একটা কর্পোরেটের থিয়েটার।
জীবন কি খুব সরল? নাকি জটিল?
রণজয়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক আরেকজনকে বলছে —
—“এদের জন্য ট্রেনে উঠতে নামতে খুব অসুবিধে হয়।”
—“ঠিকই বলেছেন সস্তিতে বসায় যায় না।”
দু'পা পিছনেই দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ ধীর গলায় উত্তর দিলেন, —“হতে পারে। কিন্তু সুবিধে আর ন্যায়—এক জিনিস নয় বাবা।”
রণজয় মুখ তুলে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। একটি মাত্র বাক্য। কিন্তু তার নিজের লেখা সমস্ত অনুচ্ছেদের চেয়ে ভারী। সে ডায়েরিটা পকেটে ভরে রাখল। তার মনে হলো, গল্প লেখার আগে তাকে আরও একটু মানুষ হতে হবে।
শশীর একটা খুব ছোট ঘর আছে স্টেশনের দক্ষিণে খালপারের ঝুপড়ির শেষ মাথায়। সেখানে শ্বাসকষ্টে ভোগা বিধবা মা আছে, অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত বউ আছে, যে সারাদিন তিন বাড়ি বাসন মেজে কাপড় কেচে কোনো রকমে পেটটা সচল রেখেছে। আর একমাত্র মেয়ে—জুঁই ক্লাস ফাইভে পড়ে।
তাকে ঘিরে তাদের সাধ্যমতো স্বপ্ন আছে— তাদের ইচ্ছা সে একদিন মস্ত বড় মানুষ হয়ে উঠবে। কিন্তু কিভাবে? জানেনা শশী। সে শুধু ট্রেনের কামরায় কামরায় নিজেকে ফেরি করে, যাতে তার মেয়ের চোখের আলোটুকু যেন সমাজের অন্ধত্ব গ্রাস করতে না পারে।
গত সপ্তাহে জুঁই বলেছিল, —“বাবা, খাতা শেষ হয়ে গেছে। আর একটা জ্যামিতি বক্স কিনে দেবে? স্যার জ্যামিতি শেখাবেন।”
শশী মেয়ের নরম চুলে গভীর আবেগে হাত বুলিয়ে বলেছিল, —“দেব মা।” সে ভেবেছিল এই শনিবারের মধ্যে লজেন্সের দুটো প্যাকেট পুরো শেষ করতে পারলেই মেয়ের জ্যামিতি বক্সের সাথে খাতাও কিনতে পারবে। তখন মেয়ের কাছে বসে গল্প শুনবে, মেয়ের খাতায় হাত বুলিয়ে সদ্যজাত শব্দগুলোকে স্পর্শ করবে, আলোহীন চোখে শব্দকে ছুঁতে পারার অসীম আনন্দ সে কাউকে বোঝাতে পারবে না, এমনকি স্ত্রীকেও না।
আজ শনিবার। কিন্তু জ্যামিতি বক্সের বদলে শশী ঘরে পৌঁছবে ভাঙা কৌটা আর বুটের কালশিটে দাগ নিয়ে। জুঁইয়ের জ্যামিতির বৃত্ত আঁকার স্বপ্নটা আজ আরপিএফের বুটের তলায় একটা অনিয়মিত, থেঁতলে যাওয়া রেখায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র তার সুশৃঙ্খল জ্যামিতি বজায় রাখতে গিয়ে একটা বাচ্চার পেনসিলের শিসটাকেই ভেঙে দিল।
ভাবতে ভাবতে রণজয় নিজের দিকে তাকাল, নিজের অনেক অনেক ভেতরে ঝেঁকে দেখল একটা বিরাট বড় শূন্য, এই পৃথিবীটার মতোই। অন্যের ইচ্ছায় লিখতে লিখতে সেও সব সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে, সৌন্দর্য তার কাছে পণ্য হয়েছে। পৃথিবীর এই যাত্রা পথে সে নিজেও একজন প্রিভিলেজড যাত্রী নয় কি? শব্দের সাথে শব্দ জুড়ে প্রান্তিক মানুষের কান্নার নান্দনিক ব্যবচ্ছেদ করে সে বহাল তবিয়তে বেঁচে বর্তে আছে! এটাও কি এক ধরনের পরজীবী শোষণ নয়? আজ প্রথমবার তার মনে হলো, ক্ষুধারও হয়তো কপিরাইট আছে। সে কি সেই ধার করা ক্ষুধাকে মই বানিয়ে সাফল্যের শিখর চুড়ো ছুঁতে চাইছে?
একজন মানুষ যখন লাথি খায়, তখন আরেকজন মানুষ কি সেই লাথির শব্দ দিয়ে বাক্য বানানোর অধিকার রাখে?
তার চোখের পাতা দুটো হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। পকেট থেকে রুমাল বের করে ভারী পাতা দুটো মুছে, নিজেকে বলল, —‘কে আমি? আমি কি শশীর ক্ষত আর জুঁইয়ের স্বপ্ন বিক্রি করে নিজের বুদ্ধিজীবী সত্তা জাহির করছি? আমি কি শশীর দুঃখ বিক্রি করে নিজের রয়্যালটি বাড়াচ্ছি? এই গল্পটা আসলে কোনো গল্প নয়। এটা একটা সমষ্টিগত অপরাধবোধের চাবুক।’
স্টেশনের লাউডস্পিকারে ঘোষণা হলো, “আপ ডাউন সমস্ত লোকাল ট্রেন আপাতত বাতিল করা হলো...”
কিন্তু কেন?
রেললাইনের ওপর সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে শতখানেক তথাকথিত ‘অসম্পূর্ণ’ মানুষের সাথে কিছু অসহায় পিতা, স্বামী নয়তো সন্তান। যারা পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের মতো তথাকথিত উচ্চ-শিক্ষিত সম্পূর্ণ মানুষগুলোর মতো কথায় কথায় অসদুপায় অবলম্বন করেনি। লজেন্স বিক্রেতা অন্ধ শশী, মশলা পাঁপড় বিক্রেতা খুকু পিসি, চা-ওয়ালা রামধারী, দৃষ্টিহীন বাউল শিল্পী কৃষ্ণদাস কয়েকজন বিশেষ ভাবে সক্ষম সঙ্গীতশিল্পী (গলায় মিউজিক সিস্টেম ঝুলিয়ে গান গায়), হাতে তৈরি কাঁচা ধূপ বিক্রেতা বৌদি। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, আছে শুধু খালি পেট আর রাষ্ট্রীয় আইনের বুটে থেঁতলে যাওয়া কিছু ভাঙাচোরা স্বপ্ন।
রেলের সুরক্ষা বাহিনীর বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দিচ্ছে না। তারা একটি সম্মিলিত ক্ষুধার কোরাস গাইছে, যা ট্রেনের ধাতব হুইসেলকে ফালাফালা করে দিচ্ছে।
—“আমাদের এক সাথে দাঁড় করিয়ে গুলি করুন। আমরা আপনাদের ওই পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে, কর্পোরেট স্বর্গকে আর অপবিত্র করব না। আমাদের পেটের খিদেটা বড় কদর্য, বড় কুৎসিত—ওটা আপনাদের সিসিটিভি ক্যামেরার ফ্রেমে বড্ড বেমানান। আপনাদের ক্ষমতার খিদে মেটাতে কোটি কোটি টাকার বিল পাস হয়, আমাদের বাঁচার সুযোগ ক্ষয় পেতে পেতে আজ বিলুপ্তির পথে? তার চেয়ে আমাদের গুলি করুন, বুলেটের খিদে অন্তত এক নিমেষেই শান্ত হয়!”
রণজয় খবরের কাগজটা ডাস্টবিনে ফেলে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল। পেছনে পড়ে রইল একটা সম্পূর্ণ ‘মুক্ত’ ও ‘পরিচ্ছন্ন’ স্টেশন। কোনো হকার নেই, কোনো বিকলাঙ্গ শরীরের অস্বস্তিকর উপস্থিতি নেই। নিয়ন আলোয় স্টেশনটা এখন দেখতে ঠিক একটা বড় শ্মশানের মতো লাগছে। যেখানে এক দিন হয়তো সারি সারি দিয়ে সাজানো হবে তাদের চিতা যারা খালি পেটে এঁকে দিয়েছে ভারী বুটের রাষ্ট্রীয় আলপনা। রাষ্ট্র জিতে গেছে। অসম্পূর্ণ মানুষগুলোকে স্টেশনের ক্যানভাস থেকে মুছে ফেলে উচ্চবিত্তের দৃশ্য-সংস্কৃতি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
রণজয় স্টেশনের বাইরে এসে টোটো ধরল। আকাশটা মেঘলা, কেমন যেন একটা থমথমে অন্ধকার চারদিকে। ঠিক তখনই তার কানে এলো একটা খুব চেনা, অতি পরিচিত মৃদু সুর।
স্টেশন চত্বরের ঠিক বাইরে, সব হারিয়ে একটা নোংরা ডাস্টবিনের পাশে অন্ধকারে বসে আছে শশী। তার ডান হাতটা অভ্যাসবশত ফাঁকা বাতাসেই নড়ছে। সে ট্রেনের ঝাঁকুনি ছাড়াই, শূন্য অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় গুনগুন করছে—
“লজেন্স নিন, লজেন্স... টক-ঝাল-মিষ্টি লজেন্স… লাথির চেয়েও মিষ্টি লজেন্স… জ্যামিতি বক্সের মতো লজেন্স … অঙ্কের খাতার মতো লজেন্স…”
রণজয় টোটোর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে দেখল, শশীর সেই শূন্য হাতটা যেন শূন্যে একটা নিখুঁত বৃত্ত আঁকার চেষ্টা করছে। জ্যামিতি বক্স ছাড়াই, মেয়ের জন্য একটা অদৃশ্য পৃথিবীর বৃত্ত।
রণজয় বুঝল, রাষ্ট্র আইন পাস করতে পারে, বুটের লাথিতে লজেন্সের কৌটো ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু এই বেঁচে থাকার আদিম, কদর্য আর তীব্র জেদটাকে গুলি করার মতো বুলেট আজও কোনো কারখানায় তৈরি হয়নি। শশীর শূন্য হাতের সেই বাতাস-কাটার শব্দটাই যেন হয়ে রইল এই সম্পূর্ণ আধুনিক অন্ধকারের বুকে একমাত্র জীবন্ত ইশতেহার। দৃষ্টিহীন হকারের সেই আকুতি ভরা ভিডিও বার্তাটা কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সংবেদনশীল বন্ধুকে শেয়ার করে জানালো, —“কিছু একটা করা দরকার, কিন্তু কীভাবে? চলে এসো সকলে, সন্ধ্যা সাতটার সময় আমাদের পুরোনো আড্ডা কোর্টের বটতলায়। ব্যক্তি থেকে মানুষে উত্তরণের এটাই উপযুক্ত সময়, এখনো বসে থাকলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ঠিক সন্ধ্যা সাতটা, কোর্টের বটতলা।”
আপাতত বসতি এলাকার ছাত্রদের মধ্যে পেন-খাতা বিতরণের কর্মসূচী নিয়ে বাড়ি ফিরে রণজয় ল্যাপটপ খুলল। সাদা স্ক্রিনে ঝলমল করছে কার্সর। অনেকক্ষণ ধরে রণজয় একটি শব্দও লিখতে পারল না। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে প্ল্যাটফর্মের সেই ভাঙা প্লাস্টিকের কৌটো। ছড়িয়ে পড়া রঙিন লজেন্স। আর মাটিতে হাতড়াতে থাকা অন্ধ মানুষের আঙুল।
সে লিখতে শুরু করল— “একটি রাষ্ট্র…”
তারপর থেমে গেল। ‘রাষ্ট্র’ শব্দটা মুছে দিল।
আবার লিখল— “একজন দৃষ্টিহীন হকার…”
সেটাও মুছে দিল। পুরো পাতাটাই ফাঁকা। রণজয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। আজ তার মনে হলো, শব্দও খুব নিষ্ঠুর একটা প্রাণী। একজন মানুষ সারাদিন লাথি খেয়ে বাড়ি ফিরছে, আর সে বসে ভাবছে—কোন উপমাটা বেশি সুন্দর হবে?
‘বুটের অভিঘাত’?
‘ক্ষুধার ব্যাকরণ’?
দুটো শব্দই খুব অশ্লীল মনে হলো। সে ডায়েরিটা টেনে নিল। খুলল না। সরিয়ে রাখল।
প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।
সে কি সত্যিই কোনদিন শশীর পাশে দাঁড়িয়েছে? না কি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে একজন দর্শকের মতো তার কান্নার নোট নিচ্ছে? একজন মানুষের ভাঙা জীবন কি আরেকজন মানুষের সাহিত্যিক উপকরণ হতে পারে? সে মনে করার চেষ্টা করল— শেষ কবে কোনো ভিখারির পাশে বসে মানুষের মতো কথা বলেছিল?
মনে পড়ল না। পড়ার কথাও নয়।
ঘরের আয়নায় নিজের মুখটা হঠাৎ অপরিচিত লাগল। সে প্রান্তিক মানুষের কথা সাহিত্য রসে বোয়েমে বোয়েমে জারিয়ে রাখে বটে, কিন্তু শশীদের পায়ের ধুলো তার জুতোর তলায় লাগে না। তবু তাদের ব্যথা নিয়েই লিখতে চায়। কারণ, প্রান্তিকের অসহায়তা পড়ুয়া মধ্যবিত্ত তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। তার মনে হলো, গল্প লেখাটা হয়তো খুব কঠিন নয়। কঠিন হলো গল্পটা লেখার নৈতিক অধিকার অর্জন করা। বাইরে তখন গভীর রাত। দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। রণজয়ের মনে হলো, সেই শব্দের ভেতরেও যেন কেউ ডাকছে— "লজেন্স নিন বাবু...লজেন্স"
সে উঠে জানলার কাছে গেল। অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা গেল না।
অন্ধকারের উদ্দেশ্যে সে ফিসফিস করে নিজেকে বলল, — “শশী, তোমাকে নিয়ে গল্প লেখার আগে আমাকে তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।”
পরদিন সকালে শশীর বউ মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জিআরপি থানায় নিখোঁজ ডায়েরি লিখিয়েছে।