পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মেঘ-অরণ্যকথা

  • 14 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 452 view(s)
  • লিখেছেন : অনিন্দিতা দে
ডিভোর্স শব্দটাকে অভিধানের ঘেরাটোপ থেকে বার করতে মানুষ বড় ভয় পায়। খাঁচার পাখি উড়তে গিয়ে যদি মাথা ঘুরে পড়ে যায়? আমাদের ঘরবাড়ির বাইরের দেওয়ালের রঙটা ঝকঝকে রাখতেই হয়, তা সে ভিতরে যতই চামচিকে বাসা বাঁধুক না কেন! *মেঘ-অরণ্যকথা* র গল্প লিখলেন অনিন্দিতা দে।
মেঘের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে অনেকদিন। বন্ধ চোখের পাতার আড়ালে ওর সাথে কথা বলার কত চেষ্টা করেছি , ও সাড়া না দিয়ে মিলিয়ে গেছে প্ৰতিবার।
মেঘ ছিল আমার বাউন্ডুলে, বোহেমিয়ান প্রেমিক। কোল্ড কফি রাতে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ ভাঙা দেখতে দেখতে জ্যোৎস্না মাখার ইচ্ছেরা সময় পেলেই উল বুনত ওর সাথে। কনকনে ঠান্ডায় পাহাড়ী তাঁবুতে অর্কিডের স্নিগ্ধতার ব্যাকড্রপে জলপ্রপাত হয়ে উঠতে চাইত ও। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলত – আমাকে একদিন কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবে আটলান্টিকের মাঝে কোন এক নির্জন দ্বীপে। সেখানে নাকি ও আমার কোলে মাথা রেখে ডলফিনের ডানা ঝাপটানো দেখবে আর আমি ওর উস্কোখুস্কো চুলগুলোতে বিলি কেটে দেব। পাগল একটা!
আমার লালফিতে কিশোরীবেলায় কালবৈশাখী ঝড় ছিল মেঘ। রোজ দেখা হত ওর সাথে, রো---জ। স্কুলের পাশেই যে সিমেট্রিটা ছিল, ওখানে ঝাউগাছের ছায়ায় আশি বছরের পুরনো কফিনটার মধ্যে মেঘ থাকত। আমার কল্পনাবিলাসের পাতায় রামধনু তুলি দিয়ে আঁকিবুকি কাটত মেঘ, মাঝরাতে দস্যুর মত আমার ঘুম ভাঙাত। ওর স্পর্শ পেতাম উপন্যাসের পাতার ভাঁজে, চুরি করে দেখা নিষিদ্ধ ছবির পর্দায়।
মেঘবৃষ্টির লুকোচুরি খেলা খেলতে খেলতেই ফ্রকটা শাড়ি হয়ে গেল। সিগন্যাল রেড হওয়ার আগেই হুশ করে একটা ট্রেন এল একদিন। জানলার ধারের সিটটাতে বসে চিনেবাদামের ঠোঙাটা শেষ করতে না করতেই লাজুক বিনুনিরা অবাধ্য, অসভ্য খোলা চুল হয়ে গেল। মিষ্টি ইচ্ছেগুলোতে নোনতার স্বাদ লাগল, মেঘ অশরীরী থেকে শরীরী হয়ে গেল। রণজয়ের সাথে ট্রামলাইন পেরোলাম আমি।
সেদিক থেকেই মেঘ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আমার থেকে। ওর এক আকাশ অভিমান। ভাঙানোর সাধ্য কি আমার আছে? অপরাধ তো আমারই, কেন যে আমি রণজয়ের মধ্যে ওকে খুঁজতে গেছিলাম!
বিয়ের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সবকটা পর্দা সরে গেল চোখের সামনে থেকে। আমি তো রূপকথা চেয়েছিলাম, কিন্ত আমার বর চেয়েছিল বোবা ওয়াক্স ডল। তবু, এডজাস্টমেন্ট ধর্ম, কম্প্রোমাইজ পরমং তপের প্রে-হুইলটা ঘোরাতে থাকি আমি।
আমার জংলী প্যাশনরা রণের কর্পোরেট কালচারের গ্ল্যামারে কেমন যেন গুটিসুটি মেরে কাঁপতে থাকে আজকাল। ওর সাথে দেখা হয় রবিবার করে। বাকি দিনগুলো ও রাত একটার আগে বাড়ি ফেরে না। প্রথম প্রথম আমি অপেক্ষা করতাম, খাবার নিয়ে বসে থাকতাম, কিন্ত ওর শার্ট থেকে আসা লেডিস পারফিউমের উগ্র গন্ধটা বড় কাঁদাত আমাকে!
ডিভোর্স শব্দটাকে অভিধানের ঘেরাটোপ থেকে বার করতে মানুষ বড় ভয় পায়। খাঁচার পাখি উড়তে গিয়ে যদি মাথা ঘুরে পড়ে যায়? আমাদের ঘরবাড়ির বাইরের দেওয়ালের রঙটা ঝকঝকে রাখতেই হয়, তা সে ভিতরে যতই চামচিকে বাসা বাঁধুক না কেন!মনের কার্নিশের যে ঘরটার সাথে আলো-হাওয়ার মুখ দেখাদেখি বন্ধ, অপূর্ণ ইচ্ছেদের সিটবেল্ট পরিয়ে রেখে দিয়েছি ওখানে। মাঝে মাঝে ওদের বার করে ধুলো ঝেড়ে আবার গুছিয়ে রাখি ঠান্ডাঘরে।
ওই ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজলে মেঘের ঠিকানা লেখা চিরকুটটা আবার খুঁজে পাওয়ার কি কোন সম্ভাবনা আছে?
আমার যেমন মেঘবেলা ছিল, তৃষার ছিল অরণ্যবেলা। বৃষ্টিভেজা সোঁদা মাটিতে অরণ্যের স্পর্শে গরম মোমের মত গলে যেতে চাইত ও। ফুলশয্যার পরের দিন আমাকে ফিসফিস করে বলেছিল – অরণ্য সারারাত ধরে ওর সিঁদুর ঘেঁটেছে।
নীলদার শরীরে নাকি অরণ্যের সবুজ গন্ধ পেয়েছে তৃষা। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই ওদের ছবি, পৃথিবীর নানা প্রান্তে, নানা ভঙ্গিমায়, উপচে পড়া ভালোবাসা। কিন্ত, এত সুখ পেয়েও তৃষার হাসিতে এমন সিন্থেটিক ফ্লেভার কেন?
কলেজ জীবনে তিন বছর টানা থিয়েটার করেও নিখুঁত অভিনেত্রী হয়ে উঠতে পারেনি আমার মেয়েবেলার সই। সেদিন, যখন শপিং এ গেছিলাম আমরা, ট্রায়াল রুমে তৃষার ডিপ গলা গমরঙা
ব্লাউজটার ফাঁক দিয়ে এক পলকের জন্য ভুল করে উঁকি দিয়ে ফেলেছিল ক্ষতচিহ্নরা।
লাভবাইট তো এরকম হয়না! এ যে দগদগে কালশিটে...
আজ চোদ্দই ফেব্রুয়ারী, ভালোবাসার দিন। ডিজাইনার কালেকশনে দুঃখগুলোকে ঢেকেছে তৃষা। কনসিলার আজ ভীষণ সাবধানী, বেল্টের সব দাগগুলোকে মিলিয়ে দিয়েছে পরম যত্নে। আজ তৃষা ম্যারিয়ট যাবে নীলদার সাথে। হীরের আংটির সাথে আধুনিক কবিতা জুড়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট দেবে। গোটা দুনিয়া ওকে দেখে হিংসায় মটমট করবে, এতেই ওর আনন্দ। ওর কানের দুল, গলার হার, নাকছাবি সবই খাঁটি সোনার, তা জীবনটা যতই সিটিগোল্ডের জল করা হোক না কেন।
আজ প্রেমদিবসে আমিও যত্ন করে চোখে কাজল দিয়েছি, অনেকদিন পর। একটু গাঢ় করেই পড়েছি, তিনরাত না ঘুমানোর কালি ঢাকতে হবে তো! এলোখোঁপাতে আলগোছে জড়িয়েছি জুঁইফুলের মালা। মেঘের প্রিয় সমুদ্র নীল শাড়িটা ন্যাপথলিনের সাথে সহবাস করা থেকে মুক্তি পেয়েছে আজ। নিজের গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ব এবার, দিকশূন্যপুরে যাব মেঘকে খুঁজতে। দেখা হলে ওকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে কাঁদব। অনেক শতাব্দীর কান্নারা হিমশৈল হয়ে জমে আছে যে।
ও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে আমি সবটুকু শক্তি দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলব – রণজয়ের মুখের উপর ডিভোর্স পেপারটা ছুঁড়ে মারতে পেরেছি আমি। ওকে বলেছি, রক্তাক্ত বাস্তবের থেকে নিরাকার স্বপ্ন অনেক মনোরম। এখন আর পাখি হয়ে মেঘের রাজ্যে উড়ে যেতে কোন বাধা নেই আমার।
ফিরিয়ে নেবে আমাকে মেঘ? আমি যদি ফিনিক্স হই, মেঘ আমার আগুন হবে?

0 Comments

Post Comment