পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

চটাদার সঙ্গে সতের মিনিট!

  • 03 January, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 907 view(s)
  • লিখেছেন : অশোক মুখোপাধ্যায়
২০২১ সালের গত তিন মাসে সারা পৃথিবীতে মারা গেছে: করোনাতে = ৩১৪৬৮৭ জন, ম্যালেরিয়াতে = ৩৪০৫৮৪ জন, আত্মহত্যা = ৩৫৩৬৯৬ জন, পথ দুর্ঘটনা = ৩৯৩৪৭৯ জন, এইচ আই ভি = ২৪০৯৫০ জন, মদ্য পানে = ৫৫৮৪৭১ জন, তাহলে ? কেন এই বাধানিষেধ? কেন স্কুল বন্ধ করা? কেন লোকাল ট্রেনে বাধানিষেধ?

আচ্ছা, চটাদা, আপনি তো চলতি দুনিয়ার সমস্ত জনজরুরি খবরই শিরঝুলিতে জমা করে রাখেন। তা একটা জিনিস জানতে চাইব?

ভুল করে ধনেশ চক্কোত্তি স্ট্রিটের পেয়ারাতলার মোড়ে তারুকাকার চা সিঙ্গারার দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই চটাদাকে তখন ধরেছিলাম। না ধরে অবশ্য উপায়ও ছিল না। বিকেলে তোফা সংঘের আড্ডায় যে ভাষণ দিতে হবে বলে একটা আমন্ত্রণ পেয়েছি, তাতে কটা তথ্য সংগ্রহ না করলেই নয়। আর কে না জানে, আমাদের গোটা থানায় চটাদার মতো “সব-জানে” লোক আর একজনও নেই। কমলাকান্তের একুশ শতকি সংস্করণ বলা যায়। তবে চা আর ছানার বড়া ছাড়া কোনো নেশা উনি করেন না। সাক্ষাতকারের স্থান খেসারত আমাকে তক্ষুনিই দিতে হল আর কি!

বল, কী জানতে চাস, তবে তার আগে এক জোড়া আস্ত সিঙ্গারা বলে আয়।

আস্ত সিঙ্গারা মানে? তারুকাকা ভাঙা সিঙ্গারা দেয় নাকি?

তারু দেবে কেন? তোদের আবার ভেঙে খাওয়ার আর খাওয়ানোর অভ্যেস কিনা! চা-ও বলিস। আট মিনিট বাদে।

চটাদার সব কাজই পাকা। সেই অনুযায়ী মালপত্রের অর্ডার দিয়ে আসতেই চটাদা বললেন, বল, কী বলছিলি? কী খবর চাই?

বলছিলাম কি, অনেক দিন পরে উঁচু ক্লাশের ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে যাচ্ছে। ওদের কি আবার ই-স্কুলে ফেরত পাঠানো হবে?

চটাদা, কী বলব, চটেমটে একেবারে আগুন, মানে, বাংলায় যাকে বলে ফায়ার, হয়ে গেলেন।

ই-স্কুল? তোরা ওটাকে স্কুল বলিস? ওখেনে লেখাপড়া হয়?

কী বলছেন চটাদা? আমি বোঝাতে শুরু করি, সে এক বিরাট শিক্ষাদান প্রকল্প বলতে পারেন। মাস্টারমশাইরা ফোন হাতে নিয়ে বলতে থাকেন, ছেলেমেয়েরা ফোন হাতে নিয়ে শুনতে থাকে—তাকে আপনি শিক্ষার প্রদান আর গ্রহণ বলবেন না?

অ্যাই অ্যাই, অ্যাতক্ষণে একদম ঠিক কথাটা বললি। শিক্ষা গ্রহণ। প্রদান ফদান ওসব ফালতু কথা বলিস না! যা হচ্ছে তাকে একমাত্র শিক্ষা গ্রহণই বলা যায়।

সমস্যা হয়ে গেল। চটাদা ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন বুঝতে পারছি না। তবুও সাহস করে প্রশ্ন রাখলাম, শিক্ষা প্রদানই যদি না হবে শিক্ষা গ্রহণ হবে কোত্থেকে?

হুঁ, বুঝেছি। এই তোর বুদ্ধি। দুটো সিঙ্গারা দুহাতে ধরে গচ গচ শব্দে আধফালা করে মুখে ঢুকিয়ে দিলেন চটাদা। তারপর বললেন, তুই বলছিস দেওয়া নেওয়া, আর আমি বলছি গ্রহণ। সহজ বাংলায় এক্‌লিপস কথাটা শুনেছিস কখনও? আমি সেই গ্রহণের কথা বলছি।

গ্রহণ কী করে হল? আমারও জেদ চেপে গেছে।

কেন, শিক্ষা আর ছাত্রদের মাঝখানে মোবাইলটা রাখলেই তো একটা আড়াল হয়ে গেল। গেল না? কদিন আগে এক ইতিহাসের মাস্টার কী বললে জানিস? তার টেন ক্লাশের ৪১৩ জন ছাত্রের মধ্যে ইতিহাসের মোবাইল ভাষণের সময় উপস্থিত থাকে ৩৭ জন। বাকি ৩৭৬ জনের ক্ষেত্রে কী হল বল? একে তুই গ্রহণ বলবি না তো কী বলবি?

এখন তো উঁচু ক্লাশের ছাত্ররা স্কুলে আসছে।

কজন রে ফটিকেশ? কজন করে আসছে? খবর রাখিস কিছু?

আমি চুপ করেই থাকি। স্কুলগুলো খুললেও যে খুব একটা ছাত্র আসছে না, সে তো সবাই জানে। বাবা মায়েরা পাঠাচ্ছে না। ভয়ে। পাছে করোনা ধরে ফেলে। আমিও গলা নামিয়ে সেটাই বললাম।

ভয়ে? করোনার ভয়ে? চটাদা সিঙ্গারা যুগলকে দূরত্বের ফরমুলা না মেনে এক সঙ্গে মুখে ঢুকিয়ে দিলেন, তুই কোনো ভিড়ের মধ্যে করোনা দেখেছিস? ট্রেনে বাসে বাজারে কুম্ভ মেলায় গঙ্গামেলায় ভোট গজবে?

না, তা দেখিনি।

তাহলে স্কুলে ছাত্ররা এলে করোনা হবে কীভাবে?

কিন্তু ডাক্তাররা যে বলছে? আমি বললাম, এখন কে এক নতুন ভাইরাস আসছে, তাকে নিয়েও ভয়ের পাঁচালি পাঠ চলছে। আমি সেই ব্যাপারেই তোমার কাছে জানতে এসেছিলাম।

বটে? বটে? আচ্ছা লিখে নে। কটা ধারাপাত দিচ্ছি।

ব্যস, তারুকাকার সিঙ্গারা থেরাপিতে বেশ কাজ হয়েছে বুঝলাম। খুশহাট কাগজের বিজ্ঞাপনের একটা পাতা খুলে কলম হাতে করে তৈরি হয়ে নিলাম। বলুন চটাদা।

নে, লেখ—২০২১ সালের গত তিন মাসে সারা পৃথিবীতে মারা গেছে:

করোনাতে = ৩১৪৬৮৭ জন,

ম্যালেরিয়াতে = ৩৪০৫৮৪ জন,

আত্মহত্যা = ৩৫৩৬৯৬ জন,

পথ দুর্ঘটনা = ৩৯৩৪৭৯ জন,

এইচ আই ভি = ২৪০৯৫০ জন,

মদ্য পানে = ৫৫৮৪৭১ জন,

সিগারেট পানে = ৮১৬৪৯৮ জন,

ক্যান্সার = ১১৬৭৭১৪ জন।

বল এবার তুই, করোনা ভয় পাওয়ার জিনিস? পাগলামি কি না করলেই নয়? কিছু ওষুধ কোম্পানি বাজারে তাদের মাল বিকবে বলে টিভি তোতাদের দিয়ে এই সব বলাচ্ছে। আর সরকারের হুজুররা চাইছে ডি এম আইন আরও বহু দিন চালু রেখে মানুষের মুখ বন্ধ করে রাখতে।

কিন্তু লোক তো মারা যাচ্ছে চটাদা। সেটা কি কিছু নয়?

ম্যালেরিয়ায় অনেক বেশি লোক মারা যাচ্ছে যে। সেটা নিয়ে পাগলামি করছিস না কেন?

ম্যালেরিয়ার ব্যাপারটা অনেকটাই জানা আছে আমাদের। এই রোগটা একেবারেই নতুন। তাই লোকে ---

চটাদা পুরা কালের সেই টেনিদার মতো করে হেসে উঠল --- খিক খিক খিক! আচ্ছা, আরও শোন্‌ তবে:

যাদের করোনা হচ্ছে তাদের মধ্যে ৮১ শতাংশই কিচ্ছু টের পাচ্ছে না।

১৪ শতাংশের সামান্য কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।

মাত্র ৫ শতাংশের অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে। এ আর এমনকি?

আমি জিগ্যেস করলাম, তাহলে বলছ স্কুলে আরও ছোট বাচ্চারা এলেও ভয়ের কিছু নেই?

কেন থাকবে? আরও দেখ: সার্স ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুর হার ছিল ১০ শতাংশ, সোয়াইন ফ্লুতে মৃত্যুর হার ছিল ২৮ শতাংশ, আর কোভিড কত করে পার সেন্ট নিচ্ছে জানিস? মাত্র দুই পার সেন্ট। আর যদি বয়স ৫৫-র কম হয়, তাহলে এক হাজারে চার জন। বল, আর ভয় পাবি?

আমি বলতে বাধ্য হলাম, ভয় না পেলেও তুমি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলে।

আচ্ছা বেশ। চটাদা মুচকি হেসে বললেন, এবার তোকে ২০২১ সালের পয়লা মে-র কিস্‌সাটা শোনাই ---

সেদিন গোটা পৃথিবীতে করোনায় মারা গেল ৬৪০৬ জন;

২৬২৮৩ জন মরল ক্যানসারে;

শুধু হৃদ্‌রোগে কত জন মরে গেল শুনবি? ২৪৬৪১ জন;

৪৩০০ জন মারা গেল ডায়েবেটিসে;

আর ঠিক সেদিনই আত্মহত্যা করেছিল ৬৪৩৪ জন।

আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। চটাদাকে বললাম, থাক থাক, আর তথ্য লাগবে না। যা দিয়েছ এতেই আমার কাজ হয়ে যাবে।

কিন্তু ইতিমধ্যে তারুকাকা চাও দিয়ে গেছে। তার বিনিময়ে আরও কিছু তথ্য চটাদা দেবেনই।

লিখে নে পাকামো না করে: মশার কামড়ে প্রতি দিন গড়ে ২৭৪০ জনের মৃত্যু হয়। মানুষে মানুষে হানাহানি করে মারে দৈনিক গড়ে ১৩০০ লোককে। সাপের কামড়ে মারা যায় রোজ ১৩৭ জন। তাই একালের একজন মনীষী কী বলেছেন জানিস? “The Biggest Virus is not Corona but FEAR.”

আমি আর সাহস করে উমিক্রনের কথা জিগ্যেস করতেই পারলাম না। বিশেষ করে মশার কথাটা জানার পর।

0 Comments

Post Comment