পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এ-তনু ভরিয়া: দর্শন আপাদমস্তক/অরিন্দম চক্রবর্তী অনুষ্টুপ ২০২০

  • 17 December, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 245 view(s)
  • লিখেছেন : শামিম আহমেদ
মহাভারতের ভীষ্মপর্বে আছে, শরীরে সর্বদা তিনের যুদ্ধ চলছে। এই ত্রিধাতুর সমতার নাম স্বাস্থ্য। আবার সত্ত্ব, রজো ও তমের সমতার নাম মানসিক স্বাস্থ্য। পিত্ত, শ্লেষ্মা ও বায়ুর সমষ্টিকে মহাভারতে ‘সঙ্ঘাত’ বলা হয়েছে। এই সঙ্ঘাতের সাম্যে দেহ সুস্থ থাকে। আয়ুর্বেদাচার্যরা তাই ত্রিধাতুকে ‘ঈশ্বর’ বলেছেন। ব্যাধির জন্ম শরীরে আর আধির জন্ম মনে। আধি-ব্যাধি কিংবা জরা শরীরে এসে বাসা বাঁধলে ঈশ্বর উড়ে চলে যান।
অরিন্দম চক্রবর্তীর ‘এ-তনু ভরিয়া: দর্শন আপাদমস্তক’ পড়লে সেই ঈশ্বরের তন্ বা বিস্তার সম্যকরূপে বোঝা যায়। তন্ মানে শুধু বিস্তার নয়, ব্যাপ্তি ও প্রসারণও বটে। তন তাই দেহও—চৈতন্যচরিতামৃতে আছে ‘ক্ষীণ হৈল তন’। আর তনু হল মূর্তি, দেহ, কায়। কায় অবশ্য প্রজাপতি দেবতা, আবার যাতে অস্থ্যাদি চিত হয়, অর্থাৎ দেহ। কায় নিবাস বা বাসস্থানও বটে। যা বৃদ্ধি পায় তাই দেহ বা শরীর। অরিন্দম বলছেন, শরীর নিয়ে ভাবতে গেলে ‘ভিতর বনাম বাহিরের’ কথা ওঠে। দৈহিক অর্থে অন্দর ও বাহির। যাকে বাহ্যপ্রত্যক্ষ করা যায়, সেই শরীর আর অন্যটি হল আবেগ-অনুভূতি-চেতনার জগত, যাকে বুঝতে হয় মানস-প্রত্যক্ষ কিংবা অনুমান দিয়ে। দেহকে ঘিরে চলে সুন্দর-অসুন্দরের বিরোধ। কেউ বলে এই শরীর ক্লেদাক্ত আবার কেউ মনে করে এই দেহ হল মন্দির বা রম্যা নগরী। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যায়, কুৎসিতের মধ্যে আমাদের এক রকমের নান্দনিক বোধ হয়, সে কথা বিস্তারে বুঝিয়েছেন অরিন্দম তাঁর গ্রন্থের প্রস্তবানায়। কায়নিবাসের বীভৎসতার মধ্যে অদ্ভুত রসচমৎকার আস্বাদন। প্রস্তাবনার নামটিও ভারি চমৎকার—‘এই কদর্য কমনীয় কলেবর—কুৎসিতের রসসুন্দর আত্মসংস্কৃতি’।
এই যে আবেগ-অনুভূতি-চেতনার জগত, সেই চেতনা বিষয়ক যে দুরূহ সমস্যা, সে সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছেন লেখক। চৈতন্য বা সংবিৎ-এর সঙ্গে মস্তিষ্কের একটি নিবিড় সম্বন্ধ আছে, যে মস্তিষ্ক আবার আমাদের শরীরের অংশ। এই চৈতন্য হল চেতনভাব, জ্ঞান, বুদ্ধি। মহাভারত বলছে, চেতনাবৎসু চৈতন্যম্। আবার রঘুবংশে আছে—রামে চৈতন্যমাহিতম্। বেদান্তে এই চৈতন্য হল চিৎস্বরূপ পরমাত্মা, ন্যায়ে তা আত্মরূপ চেতনা। ‘সংবিৎ’ কথাটির মানেও তাই—জ্ঞান, বোধ। আবার তা সংবেদন, সহানুভূতি। মালতীমাধবে আছে—তত্ত্বস্নেহসংবিদরম্বিতজীবিত।
কুল্লুক অবশ্য একে কৃতব্যবস্থা বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ। অরিন্দম কাশ্মীরি শৈব রসতন্ত্রের উল্লেখ করে জানিয়েছেন, “আমাদের ব্যথা লাগা, গরম লাগা, হলুদ রং দেখতে পাওয়া থেকে শুরু করে উচ্চতর গণিত অথবা সত্তার স্বরূপ নিয়ে চিন্তা করা পর্যন্ত—সব রকমের ভাবনা, চিন্তা, অনুভূতিই এই সংবিতের খেলা।” চৈতন্যময় আমি বা উত্তম পুরুষ হল দেহের একটি অংশ, তাকে সুন্দর অংশ বলা যেতে পারে। তেমনি আছে অসুন্দর বা কুৎসিত অংশ—নাড়ীভুঁড়ি, মলমূত্র, গুহ্যদ্বার ইত্যাদির সঙ্ঘাত। এই কায়ের বিস্তৃতি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত—একটি নির্দিষ্ট স্পেসে ও সময়ে। মরণশীল এই তনুর জরা নিয়েও অনেক আলোচনা আছে অরিন্দমের বুদ্ধিদীপ্ত কেতাবে।
জরা হল বার্ধক্য যা আমাদের মৃত্যু সমীপে নিয়ে যায়, যে মৃত্যু হল ইহলোক ও ‘পরলোক’-এর সেতু। যে শরীরের কথা আমরা বলি, ‘আমি’-রূপী যে দেহ সে জন্মের আগে কোথায় ছিল, জন্মের আগে অনাদি কাল অব্দি সে ছিল কি? মৃত্যুর পর অনন্তকাল সে কোথায় থাকে? এমন আধিবিদ্যক প্রশ্ন ওঠে। সহজ কথায়, জরা হল বয়ঃকৃত শ্লথমাংসাদি অবস্থা। সুশ্রুত অবশ্য জরাকে পরিপক্ব শরীর বলছেন। অরিন্দম জানাচ্ছেন, “জরায়ু থেকে জরান্ত পর্যন্ত আমাদের এই আয়ুর চিত্রশালায় হয়তো যে ছবিটি যত অন্ধকার সেই ছবিই তত সুন্দর।’’ দার্শনিক অরিন্দমের মুনশিয়ানা এখানেই, তিনি আধি-ব্যাধি-জরাকেও দেখেছেন নন্দনতত্ত্বের আলোয়, যেখানে ফ্যাক্ট-ভ্যালুর যে তফাৎ তা যেন হঠাৎ করে কোলাপ্স করে যায়। এই পার্থক্য ঘুচে যাওয়া আমরা দেখেছি অমর্ত্য সেনের কল্যাণমূলক অর্থনীতি প্রসঙ্গে, যেখানে অর্থনীতির গণিতসর্বস্ব শরীর এসে নৈতিকতার আত্মার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, আবার নৈতিকতা বা ভাল-মন্দের ধারণা যৌক্তিক সত্য-মিথ্যার দেওয়ালে আঘাত হানছে। অরিন্দমের আলোচনায় অচেতন জড় পদার্থ বা শরীর যেন আপাত-বিরুদ্ধ চৈতন্যময় উত্তম পুরুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। প্রথমটি যদি ফ্যাক্ট হয় তাহলে দ্বিতীয়টি আদৌ সেই এক স্তরের ফ্যাক্ট নাকি ভ্যালুর জগত, তা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।
অরিন্দম চক্রবর্তীর এই গ্রন্থটিকে বুঝতে গেলে তা বার বার পাঠ করতে হবে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের নানা মতবাদ ছেনে তিনি একটি সন্দর্ভ রচনা করেছেন, এটা বললে বইটির প্রতি অবিচার করা হবে। অরিন্দমের মৌলিক চিন্তাভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটেছে এই কেতাবে। গ্রন্থটি কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয়ের পাঠক্রমে রাখা যায় কিনা, তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। অরিন্দমের ভাষায় বলা যাক, “…বুদ্ধিজীবীদের ভরসাতেই আমাদের সদাধিক্কৃত নৈরাশ্যজরাক্রান্ত স্মৃতিসত্তা অন্য এক রকমের ভবিষ্যতের দিকে ধীরে ধরে এগোতে পারে।” এ তনু ভরিয়া পাঠ করলে পুঁজিবাদের বাজারটিকে দেহ-মনের সঙ্ঘাত থেকে অন্য ভাবে বোঝা যায়। উৎকট দারিদ্র, অনাহার, অশিক্ষা, রাজনীতি ও ধর্মের পঙ্কিল জায়গাটিকে অন্য রকম ভাবে দেখা যেতে পারে। ভবের হাটে শরীর বেচে দুর্গানাম কিনেও ভাল থাকা যায়। মরণশীল এই তনুর সৌন্দর্যের কথা লেখক এড়িয়ে যাননি। উপভোগের নীড়, তপস্যা ও রোমাঞ্চের মন্দির, ব্যাধি ও বোধের বাসা এই ‘গা’-এর দর্শন পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচিত হয়েছে গ্রন্থটিতে।

0 Comments

Post Comment