পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মাতৃবন্দনা ৪

  • 25 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 257 view(s)
  • লিখেছেন : শামিম আহমেদ
অত্যাচারী রাজা কংস একদিন দৈববাণী শুনতে পান, দেবকীর অষ্টম সন্তান তাঁকে হত্যা করবেন। তখন তিনি সাবধান হয়ে দেবকী ও তাঁর স্বামী বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করেন। বন্দি অবস্থায় তাঁদের ছয়টি সন্তান হয়, প্রত্যেকটি শিশুকে কংস হত্যা করেন। সপ্তম সন্তান বলরাম দেবকীর গর্ভ থেকে প্রতিস্থাপিত হলেন রোহিণীদেবীর গর্ভে। আজ নবমী চতুর্থ পর্ব

দুর্গাই মুক্তি। এই দুর্গারূপী মুক্তি নিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন অনাদিকাল থেকে চর্চা করে এসেছে। তাই মুক্তি বা দুর্গা এক নন, তিনি বহু—কখনও তিনি নির্বাণ, কখনও তাঁর নাম নিঃশ্রেয়স, কখনও তিনি মোক্ষ নামক পরম পুরুষার্থ। বিভিন্ন মানুষ নানা প্রকারে বিঘ্ন নাশ করার চেষ্টা করেন। বিঘ্ন বা দুঃখযন্ত্রণানাশের নানা পথ—তাই দুর্গা কোনও একক শক্তি নন, তিনি সকলের মিলিত শক্তি। অশুভ-র বিরুদ্ধে শুভ, অবিদ্যা নামক অন্ধকারের বিপক্ষে জ্ঞানরূপী আলো, অধর্ম বা নীতিহীনতার বিরুদ্ধে ধর্ম বা নৈতিকতা, ঘৃণার প্রত্যুত্তরে ভালবাসা, দাঙ্গার জবাবে শান্তি—তিনি নানা রূপে বিরাজমান। এই দুর্গার প্রতীকীরূপ তাই বহুভূজা—সেই সব হাতে থাকে নানা অস্ত্র। কখনও তিনি অষ্টাদশভুজা, ষোড়শভুজা কিংবা দশভুজা, বা অষ্টভুজা অথবা চতুর্ভুজা। দেবী দুর্গার নানা মূর্তি দেখা যায়। তবে দশভুজা রূপটিই বেশি জনপ্রিয়। অনেকটা দশের লাঠির মতো। আঠারোটি হাতের পিছনে আছে প্রতীকী অর্থ। আঠারো পর্বে যেমন মহাভারত, আবার আঠারো দিনে সংঘটিত হয়েছিল মহারণ। এমন এক মহাকাব্যে দেবী দুর্গার কোন পরিচয় পাওয়া যায়?

বনপর্বে দেখি, অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবরা নানা স্থান পর্যটন করে একদিন দ্রৌপদীসহ এসে পৌঁছলেন মৎস্য নগরে। প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠির মনে মনে দুর্গার স্তুতি করছিলেন। আর বার বার তাঁকে ত্রিভুবনেশ্বরী বলে সম্বোধন করছিলেন। এই ত্রিভুবন আসলে তিন প্রকার দুঃখ, যার ঈশ্বরী বা নাশিকাশক্তি হলেন দুর্গা। অজ্ঞাতবাস বড় কঠিন সময়। খাওয়াদাওয়ার অসুবিধার পাশাপাশি রয়েছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। ধরা পড়ে গেলে আবার বারো বছর অজ্ঞাতবাস। তাছাড়া বনে জঙ্গলে দুর্গম জায়গায় নানা রকমের কষ্ট, কখনও কাঁটার আঘাত, আবার কখনও বিষধর সর্পের ভয় কিংবা বনের হিংস্র পশু ধেয়ে আসার ভীতি। শরীর এবং মনের কষ্ট তো আছেই। এক কথায় ত্রিবিধ দুঃখে পাণ্ডবরা বিধ্বস্ত। এমন সময়ে দেবী দুর্গা যিনি দুর্গতিনাশিনী বলে পরিচিত, তাঁকে ডাকা ছাড়া পথ নেই। যুধিষ্ঠির যখন দেবীবন্দনা করছিলেন, তখন তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হল, দেবী দুর্গা যশোদাগর্ভসম্ভূতা এবং নন্দগোপকূল-জাতা।

অত্যাচারী রাজা কংস একদিন দৈববাণী শুনতে পান, দেবকীর অষ্টম সন্তান তাঁকে হত্যা করবেন। তখন তিনি সাবধান হয়ে দেবকী ও তাঁর স্বামী বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করেন। বন্দি অবস্থায় তাঁদের ছয়টি সন্তান হয়, প্রত্যেকটি শিশুকে কংস হত্যা করেন। সপ্তম সন্তান বলরাম দেবকীর গর্ভ থেকে প্রতিস্থাপিত হলেন রোহিণীদেবীর গর্ভে। রোহিণী বসুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রী, তিনি থাকেন গোকুলে। ভাদ্রমাসের পূর্ণিমায় বলরামের আবির্ভাব। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণাষ্টমী তিথিতে, গভীর রাতে কৃষ্ণ নামক অষ্টম পুত্র জন্মলাভ করেন দেবকীর গর্ভে। পিতা বসুদেব সদ্যোজাত শিশু কৃষ্ণকে গোকুলে গোপরাজ নন্দের ঘরে গোপনে প্রেরণ করেন। সেই রাতে নন্দের স্ত্রী যশোদার কন্যা যোগমায়া জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আসলে দেবী মহাশক্তি। বসুদেব কৃষ্ণকে যশোদার ঘরে রেখে ওই সদ্যোজাত কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে মথুরায় প্রত্যাবর্তন করেন। যোগমায়া কংস কর্তৃক শিলাতলে বিনিক্ষিপ্তা হয়ে আকাশে অন্তর্হিতা হয়েছিলেন। এই দেবী দিব্যমাল্যবিভূষিতা, দিব্যাম্বরধরা ও খড়্গখেটকধারিণী। তাঁর বর্ণ বালার্কসদৃশ, তাঁর আনন পূর্ণচন্দ্রনিভ এবং তিনি চতুর্ভুজা ও চতুর্ব্বক্ত্রা। তিনি কৃষ্ণবর্ণা ও অষ্টভুজারূপেও পূজিতা। তাঁর ওই অষ্ট হস্তে থাকে বর, অভয়, পানপাত্র, পঙ্কজ, ঘন্টা, পাশ, ধনু ও মহাচক্র। তাঁর দিব্য কুণ্ডল, মাথায় উৎকৃষ্ট কেশবন্ধ এবং তার উপর দিব্য মুকুট। বেণী কটিসূত্র অবধি লম্বিত। দেবী মহিষাসুরমর্দ্দিনী এবং বিন্ধ্যবাসিনী। যুধিষ্ঠিরের স্তবে তুষ্টা দেবী দুর্গা তাঁকে নির্বিঘ্নে অজ্ঞাতবাসের বর দান করে অন্তর্হিতা হন। মহাভারতের বিরাটপর্বে আছে—দুর্গাত্তারয়সে দুর্গে তত্ত্বং দুর্গা স্মৃতা জনৈঃ (৬/২০)। সকল প্রকার দুর্গতি থেকে উদ্ধার করেন বলে উপাসকরা দেবীকে দুর্গা-নামে স্তুতি করে থাকেন।

কুরুক্ষেত্রে মহারণের শুরুতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সখা অর্জুনকে বললেন, হে অর্জুন! তুমি দেবী দুর্গার স্তব করো। অর্জুন রথ থেকে নেমে পড়লেন। তার পর কৃতাঞ্জলি হয়ে দেবীর স্তুতিগান করলেন। সেই স্তুতিতে তৃতীয় পাণ্ডব বললেন, দেবী দুর্গা যোগীদের পরম সিদ্ধিদাত্রী, ব্রহ্মস্বরূপিণী, সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের হেতু, জরামৃত্যুরহিতা, ভদ্রকালী, বিজয়া, কল্যাণপ্রসূ, মুক্তিস্বরূপা, সাবিত্রী, কালরূপিণী, মোহিনী, কান্তিমতী, পরমা সম্পৎ, শ্রী, হ্রী ও জননী। এই স্তুতিতে যে সব শব্দ পাওয়া যাচ্ছে তার বেশির ভাগ শব্দ পরম ব্রহ্মের বাচক। জগতের আদি মহাশক্তি তিনি। অর্জুনের পূজায় প্রসন্না দেবী তাঁকে শত্রুজয়ের বর প্রদান করলেন। এই কাহিনী ভীষ্মপর্বে রয়েছে।

ছবি -- আনখ সমুদ্দুর

 

এই লেখকের আগের লেখাগুলো ---

তৃতীয় পর্ব -https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-3

দ্বিতীয় পর্ব--https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-2

প্রথম পর্ব--https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-1

 

0 Comments

Post Comment