পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মেয়ে সাজতে ইচ্ছে করল আমার

  • 11 May, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 1796 view(s)
  • লিখেছেন : রানি মজুমদার
‘আর পাঁচটা ছেলের মতো আমিও ছেলে হয়েই জন্মেছিলাম। এক্কেবারে ‘সুস্থ’ ‘স্বাভাবিক’। কী সুন্দর লেখাপড়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু কী করে যে কী হয়ে গেল। মেয়ে হয়ে গেলাম!’ লিখতে শুরু করলেন রানি মজুমদার, ট্রান্সজেন্ডার লেখিকা।

পৃথিবীতে বাঁচতে হলে আর পাঁচ জনের মতো হওয়াটা ভীষণ জরুরী।  এক সময় ক্লাসে স্ট্যান্ড করতাম। মাস্টারমশাইরা ভালোবাসতেন। চার দিক থেকে কত আদর। মেয়ে সাজার পর থেকেই আমার সব বিদ্যে ফুরুত করে ভ্যানিশ! এরপর থেকে আমি মানুষটা আর মানুষই  রইলাম নাএকটা আস্ত অ-মানুষ হয়ে গেলাম! 

পৃথিবীর কোনও কিছুর সঙ্গেই আমাকে আর মেলানো যায় না। অনেককে ভয়  পেয়ে যেতে দেখেছি।  রাস্তার বাঁকে হঠাৎই কারও মুখোমুখি হয়ে গেলে অনেককে বাবা-গো মা-গো বলে চিৎকার করে উঠতে দেখেছি। যেন বুনো মোষ আমি! শিঙ দিয়ে গুঁতিয়ে দেব! সময় যত  এগিয়েছে  ভয় পাওয়ার চেয়ে আমাকে দেখিয়ে ভয় দেখানোটা তত বেড়েছে। যত বেশি মেয়ে হতে চেয়েছি তত ধেয়ে এসেছে অত্যাচার 

তখন আমি বেশ পুচকে। কুমোর বাজারের দিকে একা একাই চলে গেছি। হঠাৎ একজন বেশ বড় সড় লোক আমায় সাইকেলে বসিয়ে নেয়। নানান গল্প করতে করতে ফাঁকা জায়গায় এক পুকুরঘাটে নিয়ে আসে। পাশের একটি জঙ্গলে আমার ওপর চেপে  বিচ্ছিরি রকম আদর করতে থাকে। আমি কাঁদছিলাম।  লোকটির হাত কোনও রকম ছাড়িয়ে বাইরে পিচের রাস্তায় চলে আসি। এরপর এক ছুটে ঘর।

আলোয় ঝলমলে কবেকার সেই সন্ধ্যে! ছোট্ট  আমি! আলো-দি গামছাটা শাড়ি বানিয়ে আমায় মেয়ে সাজিয়েছে! ঠোঁটে লিপস্টিক। হাতে চুড়ি। পায়ে আলতা। এ কোল থেকে ও কোল। সব্বাই আমায় আদর করে গাল টিপে ভালোবেসে বলছে, ইস, একদম মেয়ে লাগছে!

কিন্তু আজ যখন আমি নিজে থেকেই মেয়ে সাজছি, তখন আমার ওপর তোমাদের সকলের এই রসিকতা বড্ড বেমানান!

প্রেম, মন, এ সব তো তাজমহলের গল্প! আসল তো শরীর। শরীর দিয়েই ঘর বাঁধা হয়! সমাজের মুখ রক্ষা হয়। নারীর সঙ্গে পুরুষ! কিম্বা পুরুষের সঙ্গে নারী! বাবা বলেছিল, তোর জন্য  অনেক কষ্ট নিয়ে মরবআর মা বলেছিল, ভেতরে যা আছিস রেখে দে কিন্তু বাইরে তো  ছেলে হয়ে থাক। আমাদের মুখটুকু বাঁচা! 

কোথাও কোনও পথ নেই!  কোনও জানলা নেই এতটুকুও! চারিধার শুধুই উঁচু প্রাচীর! অনেক উঁচুতে একফালি আকাশে যতটুকু কালো অন্ধকার তা দিয়ে  নিজের শরীরটুকু দেখি। আমি নাকি  হিজরে! লোকে তো তাই বলে! লোকে বলে ছোটবেলায় আমি ছেলেই ছিলামভূতে  ধরার পর থেকেই  মেয়ে হয়ে গেছি! যত দূর মনে পড়ে ভূত নয়, শামীমে পেয়েছিল আমায়।  পীরবাবার  মেলার মাঠে ওকে অমন করে সিগারেট খেতে দেখে মন দিয়ে বসেছিলাম। তারও আগে চন্দ্রনাথ।

তখন ক্লাস  নাইন। চন্দ্রনাথের প্রেমে  একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছি। হাই স্কুলে পড়ি। আমি পুরোপুরি ছেলে। গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে সবে। চন্দ্রনাথকেই স্বামী বানালাম মনে মনে। ওর হাসি, কথা বলা, চলাফেরা, সব কিছু আমায় পাগল করে ছাড়লবঙ্কিম স্যারের কাছে  ও টিউশন ক্লাসে একদিন  না এলে মন খারাপ করে বসে থাকতাম। স্কুল ছুটির পর ও যখন ফেরার বাস ধরত আমি কেঁদে ফেলতাম। আমার এই প্রেম চন্দ্রনাথ এক দিনের জন্যও বুঝতে পারেনি। ছেলে ছেলেয় কি প্রেম হয়মাধ্যমিকের পর ওরা দিল্লি না কোথায় যেন চলে যায়। আমারও প্রেম কাহিনির ওখানে শেষ।

ছোটবেলায় প্যান্টটাকে হাতে করে তুলে  এমন ভাবে হাঁটতাম যেন শাড়ির কুঁচি সামলাচ্ছি। তা দেখে বাবা আর জ্যাঠা মিলে বেজায় ধমক দিয়েছিল। আয়নার সামনে প্রতিটা দিন দাঁড়িয়ে  শরীর দেখি আজকাল। ক্রমশ  লজ্জাস্থানে এসে লজ্জা পাই। এ শরীর তো আমার নয়! আমি তো এখন নারী! ভয় পাই। থরথরিয়ে  কেঁপে উঠি। চার দেওয়ালে  আঁচড় টানি। মনটা  সক্কলকে  দেখাতে পারি এমন আয়না আনতে পারে কি কেউ!

দেখেছি, কেউ কেউ মজা করে মগা বলে ডাকে। কেউ বলে হিজরা। প্রথম প্রথম  কত জনের ওপর কত বার করে রেগেছি, খেপেছি...  এখন ভালো লাগে এ ডাক.... যাক ছেলে তো নই, হিজরে!

আমাদের সঙ্গে চুটিয়ে  শরীর করা যায় কিন্তু প্রেম না। না কখনই নয়সমাজ নেই? ফ্যামিলি নেই? শেষে হিজরে জোটালিআসল মেয়ের কি অভাব পড়েছে বাজারে? মর মর থুতুতে ডুবে মর!

...তাই  শুধুই ফূর্তির দেওয়া-নেওয়া। আরও আরও একটা করে নতুন বছর। নতুন ঝকঝকে দিন আরও একটা... সিঁথি আছে সিঁদুর নেই... ঘোমটা টানি তবু স্বামী কই... মাসে মাসে মাসিকও নেই... পেট আছে থলে নেই। এত প্রেম রাখবি কোথায় মামণি! এত স্বপ্ন সাজাবি কোথায় মেয়ে!

লুডোতে সবাই কেবল ছক্কাই চায়। জীবন সংসারে সব ছক্কা আউট অব বাউন্ডারির!
0 Comments

Post Comment