পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

শিক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রীয়তার পক্ষে যুক্তি

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 206 view(s)
  • লিখেছেন : দীপঙ্কর দে
যখন রাজ্যগুলিই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার প্রধান দায়িত্ব বহন করে, তখন রাজ্য সরকারগুলিকে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি নিজেরাই পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত। তাই শিক্ষাকে যৌথ তালিকা থেকে ফিরিয়ে রাজ্য তালিকায় আনা উচিত। সেক্ষেত্রে রাজ্যগুলি শিক্ষার ফলাফলের জন্য আরও দায়বদ্ধ হবে, যার ফলে আরও ভাল শাসন ও পরিচালনা সম্ভব। রাজ্যগুলি তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নীতি তৈরি করতে পারবে।

২৯ জুলাই লোকসভা সীমিত আলোচনার পর ধ্বনি ভোটে Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Amendment Bill, 2026 পাশ করেছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার তড়িঘড়ি এই বিল আনে, কারণ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ২৫ জুলাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জাতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনায় কেন্দ্রীয় সরকারের বারবার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলন চলছিল। রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁস-মুক্ত ও প্রযুক্তি-নির্ভর করতে সুপারিশের জন্য প্রাক্তন ইউআইডিএআই চেয়ারম্যান নন্দন নীলেকনির নেতৃত্বে একটি উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন টাস্ক ফোর্স গঠনের কথা ঘোষণা করেন। 

মনে রাখা দরকার, ২০২৪ সালে নীট ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর প্রধানমন্ত্রী ইসরো'র প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. কে. রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একই রকম একটি উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করেছিলেন। ওই বছর সরকার ইউজিসি নেট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাতিল করে, আর সিএসআইর নেট ও নীট পিজি পরীক্ষা স্থগিত করে। ওই বছরই কেন্দ্রীয় সরকার Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Act, 2024 আইন করে, যার উদ্দেশ্য UPSC, SSC, RRB, IBPS এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য এনটিএ সহ প্রধান নিয়োগ সংস্থাগুলির দ্বারা পরিচালিত সরকারি পরীক্ষায় অন্যায় উপায় রোধে একটি ব্যাপক আইনি কাঠামো দেওয়া। ২০২৬ সালে আবার প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রমাণ করে দেয় যে কেন্দ্রীয় সরকার পরীক্ষায় অন্যায় উপায় রোধে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা একটি কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে। পচন অনেক গভীরে। এই ঘটনাগুলিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করা মানে রোগের বদলে উপসর্গকে দেখা।

১৯৬৬ সালে যখন শিক্ষা রাজ্যের বিষয় ছিল, কোঠারি কমিশন সুপারিশ করেছিল শিক্ষায় সরকারি ব্যয় GDP-র ৬% হওয়া উচিত। ছয় দশক পর, শিক্ষা যৌথ তালিকায় যাওয়ার পর, ভারত শিক্ষায় জিডিপি-র মাত্র ২.৯% থেকে ৩.৫% ব্যয় করে — যা শিক্ষার প্রতি অবহেলা ও জাতীয় উদাসীনতারই পরিচয়। ১৯৭৬ সাল থেকে শিক্ষা রাজ্য তালিকা থেকে যৌথ তালিকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। যৌথ তালিকার অধীনে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই এখানে তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন করতে পারে। শিক্ষার জন্য এই বিভক্ত দায়িত্বের প্রধান ফল হল, রাজ্যগুলি শিক্ষা খরচের প্রায় ৭৫% থেকে ৮৫% বহন করে, অথচ UGC, NTA, AICTE ও NMC-র মতো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ক্রমশ নীতি, স্ট্যান্ডার্ড টেস্ট ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নির্দেশ করে। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিরোধী-শাসিত রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়, আর ভোগে ছাত্র ও শিক্ষা ব্যবস্থা।

নীট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় তামিলনাড়ুর শাসক দল Tamilaga Vettri Kazhagam (TVK) সংবিধানের সপ্তম তফসিলের রাজ্য তালিকা না যৌথ তালিকায় শিক্ষা থাকা উচিত, সেই পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের পর TVK বিবৃতি দিয়ে জোর দেয় যে শিক্ষাকে যৌথ তালিকা থেকে ফিরিয়ে রাজ্যের তালিকায়  আনতে হবে। এর ফলে রাজ্যগুলি চিকিৎসা শিক্ষা-সহ শিক্ষানীতির উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব পাবে। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসাবে, অবিলম্বে স্থানান্তর আইনি বাধার সম্মুখীন হলে, দলটি একটি “বিশেষ যৌথ তালিকা” তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে পূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত রাজ্য সরকারগুলিকে আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া যায়।

ভারতীয় সংবিধানের সপ্তম তফসিলে তিনটি তালিকা আছে: কেন্দ্রীয় তালিকা, রাজ্য তালিকা ও যৌথ তালিকা। কেন্দ্রীয় তালিকা বিষয়ে আইন করার একচেটিয়া ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের, রাজ্য তালিকার বিষয়ে রাজ্য সরকারের। যৌথ তালিকার বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ই আইন করতে পারে। ভারত একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশ হওয়ায় এখানে বিকেন্দ্রীভূত শিক্ষানীতি প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া ভারতীয় সংবিধান শিক্ষাকে রাজ্য তালিকায় রেখে রাজ্যের বিষয় করেছিল। কিন্তু ১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধী সরকার ৪২তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে শিক্ষাকে যৌথ তালিকায় নিয়ে যায়, যার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার নীট-এর মতো জাতীয় নীতি চালু করার পথ খুলে যায়।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাদে — যেমন (ক) বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বের প্রতিষ্ঠান; (খ) কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিক অর্থায়নে পরিচালিত এবং সংসদের আইন দ্বারা জাতীয় গুরুত্বের প্রতিষ্ঠান হিসাবে ঘোষিত বৈজ্ঞানিক বা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; এবং (গ) পুলিশ অফিসারদের প্রশিক্ষণ-সহ পেশাগত, বৃত্তিমূলক বা কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান — বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজ্য সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়। নীতি আয়োগের ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর নীতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯৫ টি State Public University (SPU) এবং তাদের ৪৬,০-এর বেশি অনুমোদিত কলেজ মোট ছাত্র ভর্তির ৮১% এবং ভারত জুড়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। SPU-গুলি উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসাবে কাজ করে এবং ভারত জুড়ে ৩ কোটি ২৫ লক্ষের বেশি ছাত্রকে সেবা দেয়। গত সাত দশকে SPU-গুলির সারা দেশে বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ মূলত সাশ্রয়ী উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন, বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে, এবং উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও আঞ্চলিক বৈষম্য মেটানোর জন্য হয়েছে বলে NITI Aayog জানায়।

এখন যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যখন রাজ্যগুলিই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার প্রধান দায়িত্ব বহন করে, তখন রাজ্য সরকারগুলিকে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি নিজেরাই পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত। তাই শিক্ষাকে যৌথ তালিকা থেকে ফিরিয়ে রাজ্য তালিকায় আনা উচিত। সেক্ষেত্রে রাজ্যগুলি শিক্ষার ফলাফলের জন্য আরও দায়বদ্ধ হবে, যার ফলে আরও ভাল শাসন ও পরিচালনা সম্ভব। রাজ্যগুলি তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নীতি তৈরি করতে পারবে। যেমন কেরালার উচ্চ সাক্ষরতার হার রাজ্য-নির্দিষ্ট নীতির কারণে। এছাড়া অগ্রগামী রাজ্যগুলি কেন্দ্রীয় বাধা ছাড়াই তামিলনাড়ুর স্কুলে ICT সংহতির মতো উদ্ভাবনী শিক্ষা মডেল পরীক্ষা ও বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে।

চিনের মতো নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো বেশিরভাগ উন্নত অর্থনীতি বিকেন্দ্রীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে। ভারত ও চিনের শাসন ব্যবস্থা ভিন্ন হওয়ায় ভারতের NTA-পরিচালিত পরীক্ষাকে চিনের Gaokao বা National College Entrance Examination-এর সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। সেখানে প্রতি বছর ৭ ও ৮ জুন প্রায় ৯০ লক্ষ ছাত্র পরীক্ষা দেয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির একমাত্র মাপকাঠি। চিনে সাম্রাজ্যিক শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থা Han রাজবংশের সময় থেকেই, ২০৬ BCE থেকে ২২০ CE, বলে অনুমান করা হয়। এই ঐতিহ্যের দীর্ঘতম উত্তরাধিকার হল বিখ্যাত Gaokao। জার্মানিতে শিক্ষার দায়িত্ব মূলত জার্মান রাজ্যগুলির (Länder), কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা খুবই সামান্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষার উপর সীমিত কর্তৃত্ব রয়েছে এবং শিক্ষানীতি রাজ্য ও স্থানীয় সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সহায়তা করার জন্য তৈরি। মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চিত করে যে রাজ্যের শিক্ষা আইন ও স্কুলের অনুশীলনগুলি মার্কিন সংবিধান মেনে চলে। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং স্কুলে ধর্মের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ করা।

Government of India Act, 1935 শিক্ষাকে Provincial List-এ রেখে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করেছিল। তবে ভারতীয় সংবিধানের প্রথম ধারা, Article 1(1), স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে: “India, that is Bharat, shall be a Union of States.” ভারতের একটি ফেডারেশনের সমস্ত মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও Article 1(1)-এর “Union of States” শব্দটি কিছু পার্থক্য বোঝায়। তাই আইনবিদরা ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোকে প্রায়শই “quasi-federal” বা sui generis (নিজস্ব বৈশিষ্ট্যযুক্ত) বলে বর্ণনা করেছেন। ১৯৭০-এর দশক থেকে, ৪২তম সাংবিধানিক সংশোধনীর পর, এই “আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয়” কাঠামোকেও ধীরে ধীরে আরও কেন্দ্রীভূত কাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। National Testing Agency (NTA)-এর দ্বারা জাতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনায় সাম্প্রতিক বিশৃঙ্খলা এই প্রক্রিয়ারই ফল। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার শুরু হওয়া উচিত তার মূল শাসন কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার মাধ্যমে, এবং এর মানদণ্ড হিসাবে ১৯৩৫ সালের Government of India Act-কে ব্যবহার করা উচিত।

_প্রকাশিত মতামত ব্যক্তিগত। মূল লেখাটা মিলেনিয়াম পোস্ট দৈনিক পত্রিকায় ১ আগস্ট  প্রকাশিত লেখার বঙ্গানুবাদ।

0 Comments

Post Comment