আজকের দিনে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা থেকে শুরু করে শহরের বস্তি-- পড়াশোনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন না,এমন অভিভাবকের সংখ্যা নেহাৎই হাতে গোনা। তাই ছোটবেলা থেকেই স্কুলের আঙিনায় আসার এক তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর প্রমাণ স্কুলে দাখিলার (এনরোলমেন্ট) সংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও একথা সত্য যে সরকারি স্কুল অবৈতনিক হওয়া সত্বেও, পরিকাঠামোর তুলনামূলক অগ্রগতি সত্বেও এবং সাম্প্রতিক সময়ে মিড ডে মিল,সাইকেল,বিভিন্ন নগদ টাকার অনুদান প্রকল্প চালু হওয়া সত্বেও সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমেই চলেছে।শিক্ষার্থীর অভাবে স্কুল বন্ধ হওয়া বা অন্য স্কুলের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া ( মার্জার) আজকের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন বাস্তবতা।ভারতে গত দশ বছরে প্রতিদিন গড়ে ২৫ টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া মোট স্কুলের সংখ্যা ৯৫০০০।এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্টে যার শিরোনাম : " Temporal Analysis and policy Roadmap for quality enhancement "।
২০১৪-১৫ সালে দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ছিল ১১.০৭ লাখ যা ২০১৪-২৫ সালে হয়েছে ১০.১৩ লাখ। পরিসংখ্যানে এটা স্পষ্ট যে সাধারণ মানুষ পয়সা বেশি লাগলেও বেছে নিচ্ছেন প্রাইভেট স্কুল।উল্লেখিত সময় পর্বে এই বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা ২.৮৮ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩.৩৯ লাখ।দেশে প্রজননের হার ক্রমশ কম হওয়ার কারণে এনরোলমেন্টের সংখ্যা সামান্য কম হওয়া অনিবার্য। ২০১৪-১৫ সালে ২৬.৯৫ কোটি ২০২৪-২৫ সালে হয়েছে ২৪.৬৯ কোটি কিন্তু তুলনামূলক বিচারে এটা স্পষ্ট যে সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা কমছে, প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানুষেরা মূল সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত না করে নিদান হাঁকছেন বিভিন্ন স্কুলগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার। এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে।মার্জার করার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৪০০০০।সরকারি স্কুল শিক্ষার সবচেয়ে বড় অভিশাপ ড্রপ আউটের ছবিটা প্রতিবেদনে মিশ্র।প্রাইমারি সেকশনে ড্রপআউটের পরিমাণ কম,মাত্র ০.৩%।আপার প্রাইমারিতে ৩.৫% কিন্তু সবচেয়ে চিন্তার জায়গা হল সেকেন্ডারি স্কুলের ক্ষেত্রে যা ১১.৫%।২০১৪-৫ সালে আপার প্রাইমারিতে ১০০ জন শিক্ষার্থী থাকলে সেকেন্ডারি স্তরে পৌঁছাত ৯১.৫৮% কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৮৬.৬%।ড্রপ আউট কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স পন্ডিচেরি ও কেরালা এবং খারাপ পারফরম্যান্স মেঘালয়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম প্রভৃতি রাজ্যের।
সরকারি স্কুলের প্রতি এই আস্থাহীনতা ছবিটার আরেকটা প্রমাণ হল ইউডাইস রিপোর্ট ( united district information system for education plus)যা নয়া শিক্ষানীতির সঙ্গে গোটা দেশের স্কুল শিক্ষা কিভাবে সমন্বিত হচ্ছে তার মূল্যায়ণ করে।সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০২৩-২৪ সালে সরকারি স্কুলে এনরোলমেন্টের সংখ্যা ছিল ১২.৭ কোটি যা ২০২৫-২৬ সালে হয়েছে ১১.৮৯ কোটি অর্থাৎ সোজাসুজি ৮৬ লক্ষ কম।অন্যদিকে একই সময়ে প্রাইভেট স্কুলে এনরোলমেন্টের সংখ্যা ৯ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.৮৯ কোটি। শিক্ষকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে, ৯৮.০৪ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ১.০৩ কোটি। এই বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংখ্যার অনুপাতে।এই মুহূর্তে নতুন নিয়োগ ও শিক্ষক র্যাশানালাইজেশনের ফলে দেশে ২৪ জন শিক্ষার্থী পিছু একজন শিক্ষক যা নয়া শিক্ষানীতিতে ঘোষিত ৩০:১ এর চেয়ে ভালে।তবে কালো দিক হল এখনো ভারতে এক লক্ষ স্কুল একজন শিক্ষক দ্বারা চালিত।তবে পানীয় জল,বিদ্যুৎ, খেলার মাঠ,ক্লাসরুম ও কম্পিউটারের ক্ষেত্রে, এককথায় পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে এই রিপোর্ট অনুযায়ী সরকারি স্কুলের পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভালো।অথচ পরিসংখ্যান বলছে সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।
সরকারি স্কুলের এই অধোগমন একদিনে হয় নি।আর এই অধোগমনের একাধিক কারণ রয়েছে।নব্বই এর দশকে গৃহীত সংস্কার নীতি যে সর্বাত্মক বেসরকারিকরণের আগ্রাসন নিয়ে আসে,শিক্ষাক্ষেত্র তার থেকে বাদ যায় নি। প্রয়োজনীয় আধুনিকীকরণ ও কাজের বাজারের সঙ্গে সংযুক্তিহীনতা সরকারি স্কুল সম্পর্কে অভিভাবকদের মধ্যে এক নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।ভোটের ডিউটি হোক বা জনগণণা, এসআইআর হোক বা অন্য কাজে শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় ধরে কাজে লাগানোর ফলে স্বাভাবিক ভাবে স্কুলে পঠন-পাঠনের মান নেমে যায়। এই অবস্থায় অনেক কম পরিকাঠামো নিয়ে আসরে উপস্থিত হয় প্রাইভেট স্কুল। গত দুই দশকের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হল বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরণের স্কুল। একই সঙ্গে আজকের দুনিয়ায় ইংরেজি জানাকে চাকরি ও ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। রাজ্য বোর্ডগুলোতে যেহেতু মাতৃভাষা পড়াশোনার প্রধান মাধ্যম তাই অভিভাবকরা চাইছেন ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল। অলিতে- গলিতে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে বিভিন্ন সর্বভারতীয় বোর্ডের অনুমতি প্রাপ্ত ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল। এগুলোর ফ্যাকাল্টি, পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অভিভাবকরা তা শুনতে রাজী নন।মিড ডে মিলের মত জরুরি পরিষেবাকে ব্যাঙ্গ করে বলা হচ্ছে সরকারি স্কুল মানে গরীবের স্কুল। একই সঙ্গে সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা তাদের সন্তানদের জন্য সরকারি স্কুলকে সম্পূর্ণ বর্জন করে এক নেতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করেছেন।এই অবস্থায় সরকারি স্কুলের সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠা অনিবার্য ছিল। নীতি আয়োগের রিপোর্ট সেই বাস্তবতাকেই চিহ্নিত করছে।