পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ছিন্ন মস্তকদের রাজনীতির শিকার---

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 205 view(s)
  • লিখেছেন : দেবজিৎ ভট্টাচার্য
দিল্লির পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক অমিত শাহ। তাঁর প্রতিনিধিত্বে দিল্লি পুলিশ, তাদের বিবৃতিতে 'বাংলা ভাষা' আর 'বাংলাদেশী'-কে এক করে দেখিয়েছে। শ্রমিকেরা প্রবাসে গিয়ে কারাবন্দি হচ্ছেন। নিজের দেশের শ্রমিকদের ঘোরতর বিপদ থেকে মুক্ত করবার বদলে শ্রমিকশ্রেণির সমস্ত অধিকার কেড়ে নিতেই আদিবাসী, নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু শ্রমিককে 'অনুপ্রবেশকারী' দাগিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁদের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেদিন দমদমে আসবেন ঠিক তার আগের সন্ধ্যায় বিজেপির কার্যকতারা মোদীর সভা ভরানোর প্রচারে নেমেছিলেন। সকলের কাছে পদ্মফুলের ছবি আঁকা বিজেপির একটা প্রচার পত্র বিলিয়ে বলছিলেন, 'কাল প্রধানমন্ত্রী আসছে, দেখতে আসবেন'। প্রথমে, এমনি(ব্যক্তি ক্যারিশমায় বা একক ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বে বা সামাজিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কাজকর্ম প্রভৃতি।) নানা কায়দায় আর.এস.এস ও বিজেপির নেতা, সংগঠকরা লোক জোগাড় করে। তারপর তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে বাছাই করে নিয়ে নিজেদের দল ভরায় বা দলের শাখা বানায়, ফের মতাদর্শগত ভাবনায় সেই অঞ্চলে ফ্যাসিবাদী শাখা (ব্রাহ্মণ্যবাদী ইডিওলজিক্যাল উইং) তৈরি করে। হয়তো এমনভাবে এ রাজ্যের মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, হুগলী প্রভৃতির থেকে বাইরের রাজ্যে যাওয়া (হরিয়ানা, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি প্রভৃতি) নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু প্রবাসী শ্রমিকদের উপর উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী ক্ষমতার রাষ্ট্রীয় জোর দেখাতে সেই সব অঞ্চলের বা সেই রাজ্যের আর.এস.এস ও বিজেপি নেতৃত্ব প্রস্তুতি নিয়েছিল অনেকদিন আগে থেকে। প্রবাসী শ্রমিকেরা মার খাওয়ার পর সেখানকার রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনও ঘটনাস্থলে দেখতে গেছিল - পশ্চিমবাংলার প্রবাসী শ্রমিকদের 'ভারতীয়' পরিচয় পত্র। তা দেখবার পড়ে বুঝেছিল এঁরা সবাই 'অনুপ্রবেশকারী', ছুঁড়ে ফেলে এসেছিল বাংলাদেশে। তবে নরেন্দ্র মোদী এই রাজ্যে একজন প্রবাসী হয়ে ভাষণবাজী দিতে, নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু শ্রমিকদের হাতে গড়া মেট্রোর উদ্বোধন করতে এলেন, কিন্তু তাঁকে মার খাওয়া সেই সব নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু শ্রমিকেরা বা তাঁদেরই অংশের বাকিরা অথবা তাঁদের কথা বলা মূলধারার যে কোন সংসদীয় রাজনৈতিক দলেরা জিজ্ঞাসা করেনি যে, 'মোদী সাহেব আপনার পরিচয়পত্র কোথায়?' সেই সাহস কার আছে? নেই। উনি দমদমের ৪০ মিনিটের ভাষণে ১২ বার ভাঙা বাংলায় বিজেপির প্রচার চালিয়ে ফিরে গেলেন দিল্লিতে। ভাষণে বহুবার 'অনুপ্রবেশকারী' শব্দটি ব্যবহার করে উস্কিয়ে গেলেন এখানকার উচ্চবর্ণের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত, বর্ণভেদের হিংস্রতায় জর্জরিত উচ্চবর্ণীয় বাঙালির ভেতরকার ব্রাহ্মণ্যবাদী হিংস্রতাকে। 

দিল্লির পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক অমিত শাহ। তাঁর প্রতিনিধিত্বে দিল্লি পুলিশ, তাদের বিবৃতিতে 'বাংলা ভাষা' আর 'বাংলাদেশী'-কে এক করে দেখিয়েছে (এ বিষয়ে এটা মাথায় রাখা প্রয়োজন যে এই এক করে দেখানোর ঘটনা নিম্নবর্ণের হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমান শ্রমজীবী মানুষের উপরই প্রযোজ্য।)। তাহলে কী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবাংলায় এসে বাংলা ভাষা বলবার চেষ্টা করে আদপে বাংলাদেশী হওয়ার চেষ্টা করছেন? না, তেমনটা ভাবলে, এতটা সরলীকরণ করলে সঠিক ভাবনা থেকে দূরে সরে যাওয়া হবে। সাম্প্রতিককালে প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আর.এস.এস ও বিজেপির রাজ্যে যে সংগঠিত অত্যাচার হয়েছে তার মূখ্য ভূমিকায় রয়েছে জাতি-ধর্ম ও শ্রেণি হিংসা; সেই সব অত্যাচারিত প্রবাসী শ্রমিকের বর্ণ ও শ্রেণি, এই সমাজে শ্রমের সাথে বর্ণের আন্তঃসম্পর্ক, উচ্চবর্ণের অত্যাচার নিম্নবর্ণের প্রতি, ক্ষমতাবান উঁচু শ্রেণির অত্যাচার ক্ষমতাহীন নীচু শ্রেণির প্রতি, এমনিই গা-জোয়ারির ধর্ম ও বর্ণভেদের রক্ষকদের কর্মের ফলাফলের পরিণতি। যা ২০১৪ সালে দিল্লিতে আর.এস.এসের নরেন্দ্র মোদী বসায়, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু রাষ্ট্রের আওয়াজ জোরালো হওয়ার পর থেকে নানাভাবে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে, গোটা দেশজুড়ে। তাই আজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দমদমে এসে ভাঙা বাংলা বলা অথবা উচ্চবর্ণের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতার চলিত বাংলা বলার অপরাধ নেই। অপরাধ আছে গ্রামের নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘুদের ক্ষমতাহীন নীচু শ্রেণির বাংলা বলার ধরনে। কলকাতার উচ্চবর্ণের চলিত বাংলা গ্রামের নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু জনগণকে, জনগণের বাংলাকে রাতদিন তাড়া করে বেড়ায়, কলকাতায় এসেও তাঁরা প্রতি পদে অপদস্থ হন, জামাকাপড় পরায়, বাংলাভাষা বলবার আঞ্চলিক টানে, খাদ্যাভ্যাসের ধরনে। কলকাতার উচ্চবর্ণের চলিত ভাষা গ্রামের নিম্নবর্ণের মায়ের পেটের বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেয় না। দিল্লি বা অন্যান্য রাজ্য, সেই রাজ্যের জনগণ বাংলা ভাষা মানে বোঝে শুধু কলকাতার উচ্চবর্ণের চলিত বাংলা ভাষাকে। উদাহরণস্বরূপ: তাই দেখা মেলে প্রধানত, কলকাতা শহরের বড় স্টেশন বা জংশনে রেলের ধরপাকড়ে পশ্চিমবাংলার গ্রামের নিম্নবর্ণের ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেশি থাকে, তাঁদেরই পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া হয় বারেবারে। রেল পুলিশও বেশির ভাগ সময় গ্রামের নিম্নবর্ণের ও সংখ্যালঘুর ভাষার টান, জামাকাপড় পরার পদ্ধতি দেখেই বেপরোয়া হয়ে উঠে, তাঁদের উপর একের পর এক অভিযোগ চাপিয়ে দিয়ে তাঁদেরকে অপরাধী দাগায়, তাঁদেরকে দোষী বানিয়ে পকেট থেকে মোটা টাকা ছিনতাই করবার জন্যে। 

মোদী সাহেবের দমদম আসবার কিছুদিন আগেই রাজ্যের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস এই রাজ্যের প্রবাসী শ্রমিকদের উপর রাজ্য সরকারের অত্যাচার ও রাজ্যের শ্রমের বেহাল অবস্থা নিয়ে কেন্দ্রকে একটি লম্বা চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে সাতটি পয়েন্টের উল্লেখ রয়েছে। সব থেকে সত্য কথাটি হল, রাজ্যে কাজ নেই, শ্রমিকদের মজুরির মান অনেকটাই কম, কাজের জায়গায় সামাজিক সুরক্ষা নেই, কাজের স্থায়িত্ব নেই - এসব কারণেই প্রধানত এই রাজ্যের শ্রমিকেরা প্রবাসী হতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন এর সংখ্যা বাড়ছে, তার আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ হল কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু দমদমে নরেন্দ্র মোদীর ভাষণে একটা লাইনও এই রাজ্যে নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক ও কৃষকের জন্য ছিল না, তাঁদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বলা তো দূরের কথা। অথচ, তিনি কলকাতার চলিত বাংলা ভাষা বলাতেও জোর দিয়েছেন। এদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস 'বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার' নিয়ে প্রচারে নেমেছেন, আরও সাজানো গোছানো প্রচারে নামবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য প্রকল্প এনেছেন, উচ্চবর্ণের বাঙালি জাতীয়তাবাদে জোর দেওয়ার রাজনৈতিক অঙ্ক কষেছেন। এ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কলকাতায় উচ্চবর্ণের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের সম্মিলিত করে নানা সভা ও সেমিনার আয়োজন করছে। অথচ, মুখ্যমন্ত্রীর আনা প্রকল্পে, 'শ্রমে'র পাশে 'শ্রী' যুক্ত করে মৌখিক সন্মান দেওয়া হলেও তাতে প্রবাসী শ্রমিকদের পক্ষের কোন কথা নেই। এই প্রকল্প থেকে প্রবাসী শ্রমিকেরা যা কিছু পেতে পারেন তা সবটাই - 'বাইরে রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বাংলা ভাষা বলবার জন্য মার খেলে' তার পরে। অর্থাৎ, এ প্রকল্প প্রবাসী শ্রমিকের উন্নয়নের জন্য না কি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসী শ্রমিকদের মার খাওয়ার বৈধতার সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। আসলে রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্পষ্টত ফুটে উঠে এই রাজ্যের দুর্দশার কাহিনী, রাজ্যে কাজ নেই, রাজ্যের রাজনৈতিক জোর নেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঞ্চলিক দলের রাজনৈতিক জোর নেই, পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক জোর নেই, সেই সবের জ্যান্ত ছবি। 

অবশ্য এসব থাকবার জায়গাও নেই। ১৯৯৮ সালে বাম জমানার সরকার বাংলা ভাষাকে উপর থেকে বা লোক দেখানো গুরুত্ব দিতে বেশ কিছু 'শহীদ সমিতি' বানিয়েছিল, বাংলায় সব লেখবার হুকুম দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা এর মস্তক বা মাথাটাকে ধর থেকে বাদ দিয়ে বাকি সবটা করবার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কী সেই মস্তক বা মাথা? এ হল অর্থনীতি। যে কোন অঞ্চল বা দেশের জনগণের প্রকৃত জাতীয়তাবাদী বোধ বিকশিত হয় সেই অঞ্চলের বা দেশের দেশীয় পুঁজির বিকাশের মাধ্যমে। অর্থনীতির মধ্যে আবার দুই দিক থাকে বা অর্থনীতির ধরের দুটি দিক আছে; এক, রাজনীতি; দুই, সংস্কৃতি। অঞ্চলের বা দেশের দেশীয় পুঁজির বিকাশ না হলে তার প্রকৃত রাজনীতি ও সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক জনগণের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চেতনা বোধের উন্নতি হয় না, এমনটাই সমাজবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞেরা বলছেন। ঠিক তাই, তা হয়নি, ১৯৯৮-এ শিল্পী, সাহিত্যিক ধরে বাংলা ভাষার উন্নয়নে নানা সমিতি বানানোর পরে বাম সরকার বাংলার কৃষকের জমি বিদেশি বড় পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়। বাংলার ছোট-মাঝারি ব্যবসাদারদের আঞ্চলিক পুঁজির বিকাশ ধ্বংস করে তা বিদেশি বড় পুঁজির হাতে উন্নয়নের আছিলায় তুলে দিতে থাকে। ফলে সরকারগুলোর এমন ধরনের বিদেশি পুঁজি নির্ভর রাজনীতি ও সংস্কৃতি বাঙালির প্রকৃত জাতীয়তাবাদী বোধের বিরুদ্ধে গেছে। বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলে শহুরে জনগণ পাশ্চাত্য বা বিদেশি শিক্ষাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, তাঁদের সন্তানকেও বিদেশি পুঁজির নিয়ন্ত্রিত(পড়ুন, যেটাকে সরকারগুলো উন্নয়ন বলে) সংস্থার চাকুরী পেতে বাংলা ভাষা সঠিকভাবে শেখানোর বদলে ইংরেজি বা হিন্দি ভাষা শেখানোতে জোর দিয়েছে। আর বাংলার ভেতরের প্রতিটি গ্রামে, মফস্বলে শহর কলকাতার একাধিপত্য বেড়েছে, গ্রামের মানুষের উপর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক শোষণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আদিবাসী, নিম্নবর্ণ, সংখ্যালঘু, নিচু শ্রেণির বৃহত্তর বাংলার জাতীয়তাবাদী বোধ ধ্বংস হয়ে তা সীমিত হয়েছে উচ্চবর্ণের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের হাতে; কথিত সেক্যুলার বাঙালির জন্য রয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায় ও সামন্ততান্ত্রিক বর্ণভেদে প্রবলভাবে বিশ্বাসী বাঙালির আছে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ এবং আধা সেক্যুলার(কথিত) ও আধা সামন্ততান্ত্রিক বাঙালি রাশ সব মেলানোমেশানো হলেও প্রধানত গিয়ে পড়েছে বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, রামমোহন প্রমুখের দপ্তরে। আজ যা আরও তলিয়ে যেতে বসেছে, কলকাতার উচ্চবর্ণের চলিত বাংলা ভাষা এখন বহুত্ব ধারা, উপভাষাগুলোকে ধ্বংস করে ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দি-হিন্দুত্ব-হিন্দুস্তানি আগ্রাসনকারী বিবেক অগ্নিহোত্রীদের কাল্পনিক 'ফাইলস' এর চরিত্রে বন্দি হয়েছে, উচ্চবর্ণের বাংলা 'নতুন ইতিহাস' শিখছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন বা কয়েকটি ছোট অংশ তার বিরোধিতায় সরব হয়েছে।

কংগ্রেস ও বাম জমানাতে বিদেশি পুঁজির বিদেশি সংস্কৃতিতে উচ্চবর্ণের শহুরে একাধিপত্যে গ্রাম ঘেরার যে প্রস্তুতি নেওয়ার পথ চলা শুরু হয়েছিল এখন তার দৌড় জোরকদমে চলছে। ২০১৭ সাল থেকে গোটা দেশ জুড়ে একশো শতাংশ বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ সুনিশ্চিত হওয়ায় অন্যান্য জাতির মত বৃহত্তর বাঙালি জাতি সত্ত্বার রাজনীতিও মূলধারার সংসদীয় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়েছে। এর ফলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, আঞ্চলিক দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকটাই সংকটে পড়েছেন বাদবাকি আঞ্চলিক দলের নেতা, মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীদের মত। তাই বিদেশি পুঁজির খুবই কাছাকাছি আসবার চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনের মদতে(প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ) কৃষকের জমি দেদারে লুট হচ্ছে, বিদেশি পুঁজির চাহিদার বাজারের বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়েছে, বাংলা মাধ্যমের স্কুল বন্ধ হচ্ছে, বাংলা থিয়েটার ধ্বংস হয়েছে, বাংলার বিদ্রোহী ইতিহাস পড়ানো সম্পূর্ন বন্ধ হয়েছে বা তা বিকৃতভাবে পড়ানো চালু হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতার উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী বাঙালির ফ্যাসিবাদী সত্ত্বার উপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছেন, বিদেশি বড় পুঁজির ছোট বাছুর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। 

তবে ভারতের মূলধারার সংসদীয় রাজনীতিতে এই বাছুরদের দলের প্রধান সবসময়ই থেকেছে কেন্দ্র। কেন্দ্র(যা বর্তমানে আর.এস.এস ও বিজেপি), বিদেশি বড় পুঁজির সব থেকে বড় এবং কাছের বাছুর হয়ে আঞ্চলিক পুঁজি, রাজনীতি, সংস্কৃতির উপর হিন্দি-হিন্দুত্ব-হিন্দুস্তানি রাজনীতির একাধিপত্যরাজ চাপিয়েছে। আঞ্চলিক সরকারগুলো এর বিরুদ্ধে লড়বার জোর জোগাড় করতে গিয়ে একধারে নিজের অঞ্চলের ছোট জনগোষ্ঠী, ছোট পুঁজি, ছোট কৃষক, ভূমিহীন-ক্ষেতমজুর, দিনমজুর-শ্রমিক, মধ্যবিত্তের উপর ব্যাপক অত্যাচার নামিয়ে এনেছে। অপরদিকে, গভীর জলে তলিয়ে গেছে, বিশেষত, নরেন্দ্র মোদীর আমলে আজ এরা মাঝ সমুদ্রে ডুবন্ত টাইটানিক জাহাজে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। ভারতের রাজনীতিতে বিদেশি পুঁজির শাসন ও শোষণ যবে থেকে শুরু হয়েছে তবে থেকে এমন চরিত্রের বিভিন্ন ধরনের চিত্রগুলো লক্ষ্য করা গেছে। ব্রিটিশের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য বিস্তারের সময় থেকে রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের গোটা সময় জুড়ে অসম কৃত্রিম বিকাশ ও ব্যাপক আকারে প্রবাসী শ্রমিকের দেখা মিলেছে। ব্রিটিশ আমলে বিদেশি পুঁজির চাহিদার দৌলতে বাংলায় বৃহৎ কারখানাগুলো গড়ে উঠায় ভিন রাজ্যের(ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড) প্রবাসী শ্রমিকেরা কাজের খোঁজে আসেন। বিশ্বায়ন পরর্বতী জমানায় বিদেশি পুঁজি লুঠতন্ত্র আরও উৎপাদনহীন সর্বস্ব-পরিষেবাভিত্তিক এক হিংস্র জন্তুতে রূপান্তরিত হলে পশ্চিমবাংলার কৃষি-শিল্পের বিকাশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পুরোনো কারখানাগুলো বন্ধ হতে শুরু করে। প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা আজ দাঁড়িয়েছে ১ কোটির উপরে। যাঁদের উপরে বিদেশি পুঁজির চরম হিংসাত্মক নয়া উদারবাদী শোষণ ও প্রতিটি সরকারগুলোর ভয়ানক বেয়াদপি শাসন বরাবর দেখা গেছে। বিদেশি পুঁজির বেপরোয়া লগ্নির হিংসাত্মক চরিত্র কথিত আধুনিক সমাজকে বারেবারে মধ্যযুগীয় বর্বরতার ইতিহাস দেখাচ্ছে। তাই বহু আন্দোলনের পরে ২০০৮ সালে বাম জমানায় পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরে যে, ‘সেফ মাইগ্রেশন’ কার্যসূচি গৃহীত হয়েছিল তাও কিছু বছর বাদে বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক যেমনটা গ্রামে একশো দিনের কাজও বন্ধ হয়েছে। কিন্তু, পেটের জ্বালায়, কাজের তাড়নায় ও বিদেশি পুঁজি লগ্নির অসম বিকাশে নথিহীন প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এখন বিদেশি পুঁজির ছোট, মাঝারি, বড় বাছুর সরকারগুলোর কাছে অজানা রয়ে গেছে রাজ্য সহ গোটা দেশে মোট প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা কত রয়েছে। 

ভারতের দীর্ঘদিনের ছিন্ন মস্তকদের মূলধারার সংসদীয় রাজনীতি আজ বিদেশি পুঁজি ও পণ্যের চলাচলে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে। এদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, কাঁচামাল, শ্রমশক্তি বিদেশে লুঠের আইনি বৈধতা দেওয়া, লিখিতভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু রাষ্ট্রের স্থাপনা করার কাজ জোর কদমে চলছে। তবুও প্রতিটি রাজ্যের উদ্বৃত্ত শ্রম কত, তা হিসেব রাখবার ব্যবস্থা নেই। ফলে, শ্রমিকেরা প্রবাসে গিয়ে কারাবন্দি হচ্ছেন। নিজের দেশের শ্রমিকদের ঘোরতর বিপদ থেকে মুক্ত করবার বদলে শ্রমিকশ্রেণির সমস্ত অধিকার কেড়ে নিতেই আদিবাসী, নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু শ্রমিককে 'অনুপ্রবেশকারী' দাগিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁদের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র। পশ্চিমবাংলার আদিবাসী, নিম্নবর্ণ ও সংখ্যালঘু শ্রমজীবী জনগণ মুক্তির আশায় চারিদিকে হাতড়াচ্ছেন।

0 Comments

Post Comment