আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে বাংলার প্রায় ১ কোটি ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার আবহে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার এই প্রক্রিয়া শুরুর আগে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছিলেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে ম্যাপ করতে পারলেই ভোটার তালিকায় নাম থাকবে। কিন্ত বাস্তবে এই ম্যাপিং-এ নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছিলো না। তাই কমিশন আমদানি করলেন বাংলা স্পেশাল ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ নামক এক প্রহসনের। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিচারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হল কোটি কোটি বাংলার মানুষের ভোটাধিকার। তার ফলস্বরূপ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পরেছেন ৬০ লক্ষাধিক মানুষ। বিচারাধীন আরও ৬০ লক্ষ, যাদের মধ্যে এখনো অবদি বেরোনো সাপ্লিমেন্টারী তালিকায় দেখা যাচ্ছে বেশীরভাগই বাতিলের খাতায়।
লক্ষ লক্ষ ভোটারকে বাদ দিয়ে হওয়া এই অপরিলক্ষিত নির্বাচনের ঢক্কানিনাদের মধ্যে ভেসে আসছে “মেয়েদের উন্নয়ন”, “নিরাপত্তা”, “সম্মান”-এর মত শব্দগুলি। বিগত নির্বাচনগুলিতে সরকার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মেয়েরা নির্ণায়ক শক্তি হয়ে এসেছেন। কিন্তু এস আই আর-এর কোপে গত ১০ বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারদের সংখ্যা সবচেয়ে কমে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে মহিলা ভোটারদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫৯ লক্ষ, ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লক্ষে। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের দয়ায় এই সংখ্যাটা বর্তমানে ৩ কোটি ১৬ লক্ষ। ২০২৪ সালে প্রতি ১০০০ পুরুষের বিপরীতে নারী ভোটারের অনুপাত ছিল প্রায় ৯৮৭, এখন ৯৬১। কোচবিহারের সিতাইয়ের মতো এলাকায় প্রথম সাপ্লিমেন্টারী তালিকাতেই ৪২ শতাংশের বেশি নারীর নাম বাদ পড়েছে। বিবাহের পরে স্থানান্তর, ঠিকানার অমিল, সরকারি নথি বানানোর জটিলতাসহ বিবিধ বৈষম্যমূলক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার কারণে সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক অংশের মানুষদের পাশাপাশি মহিলারা ভোটার তালিকা থেকে ‘অদৃশ্য’ হয়ে পড়ছেন। ‘সবর ইন্সটিটিউট’'-এর করা ভোটার তালিকার বিশ্লেষণ থেকে জানা যাচ্ছে, স্যারের ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও মহিলাদের নাম সবচেয়ে বেশী বাদ পড়ছে। যে দেশে আজ শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনী দেশের ৬৫ শতাংশ সম্পদের অধিকারী, সেই দেশে সার্বজনীন ভোটাধিকার অধিকার ছিল এই বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করার হাতিয়ার, যেখানে ধনী, গরিব, ট্রান্স, কুইয়ার, পুরুষ, অবদমিত জাতি ও উচ্চবর্ণ— সবার ভোটের সমান মূল্য। বিজেপির তাবেদারি করা নির্বাচন কমিশনের তুঘলকী এসআইআর প্রক্রিয়া সার্বজনীন ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ভারতবর্ষের ৯০ শতাংশ মানুষকে সস্তার শ্রম ও অসুরক্ষিত জীবনের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে।
তাই এই নির্বাচনে মেয়েদের জন্য বড় বড় প্রতিশ্রুতি যারা দিচ্ছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন— যেকোনো সরকারি প্রকল্পের দাবিদার হওয়ার জন্য যেখানে ভোটার কার্ড আর আধার কার্ডের লিঙ্ক বাধ্যতামূলক, বিচার চাওয়ার জন্য পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, সেই বাস্তবতায়, যে মহিলারা ভোটার তালিকা থেকেই বাদ পড়ছেন, তাঁদের কাছে “উন্নয়ন” বা “নিরাপত্তা”-র অর্থ কী? বিজেপি-আরএসএস-এর মহাপ্রবক্তা অমিত শাহের ‘ডিলিট-ডিটেন-ডিপোর্ট’-এর হুমকির মুখে মহিলাদের ৩০০০ টাকা মাসে মাসে দেওয়ার বিজেপির প্রতিশ্রুতির আদৌ কী দাম আছে? তৃণমূল সরকার কী নারী উন্নয়নের নামে চালু করা প্রকল্পগুলির, যার সীমিত ইতিবাচক প্রভাব আছে, সেগুলির সুবিধা ভোটার লিস্ট থেকে বাদ পড়া মেয়েদের দেবে?
এমনকি পশ্চিমবঙ্গের সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মেয়েদের জন্য প্রতিশ্রুতিগুলির দিকে যদি তাকিয়ে দেখি, তাহলে মহিলাদের অধিকারের প্রশ্নে তাদের দ্বিচারিতার কদর্য চেহারা পরিষ্কার হবে।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কন্যাশ্রী, লক্ষীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প সামনে রেখে নিজেকে “মহিলা-বান্ধব” সরকার হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি “মেয়েদের নিরাপত্তা” ও পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি শোধরানোর দাবি করার সাথে ধর্ম, অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গার মতো শব্দ জুড়ে দিয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষের জমি তৈরি করছে। একথা সত্যি যে লক্ষীর ভাণ্ডার বহু সাধারণ মহিলার হাতে সামান্য হলেও প্রতিমাসে অর্থ তুলে দিচ্ছে। বাল্যবিবাহ আটকানোর জন্য বিশ্বদরবারে কন্যাশ্রী সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পভিত্তিক সাহায্য আর অধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের মধ্যে ফারাক আছে। মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা মেয়েদের জীবনের কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে পারে না, বিশেষত যদি কাজ, মজুরি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যায়।
তাই তৃণমূল সরকার কন্যাশ্রী, লক্ষীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে নারীবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরি করলেও, এই প্রকল্পগুলি নারীর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, মর্যাদা ও সমানাধিকারের প্রশ্নে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ একদিকে কন্যাশ্রীকে সামনে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে নয়া শিক্ষা নীতিকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। নয়া শিক্ষা নীতি শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারীকরণ বকলমে ফি বাড়ানোর পথ খুলে দেয়। ফলে উচ্চশিক্ষা ক্রমশ আরও দুর্মূল্য হয়ে উঠছে। কন্যাশ্রী হয়তো মেয়েদের স্কুল বা কলেজে পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু যদি বিশ্ববিদ্যালয়, হোস্টেল, যাতায়াত, পড়াশোনার খরচ ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে প্রথমেই ছিটকে পড়বে প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা। অর্থাৎ, মেয়েদের শিক্ষার অধিকারকে শক্তিশালী করার বদলে, শিক্ষা বাজারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে শিক্ষা আর অধিকার থাকবে না, হয়ে উঠবে বাজারনির্ভর বিশেষাধিকার, যার মাধ্যমে শ্রেণি ও লিঙ্গ বৈষম্য আরও গভীর হবে।
পশ্চিমবঙ্গে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা ৪৩ লক্ষেরও বেশি, যা দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। বাংলায় মোট শ্রমিকের প্রায় ৩৫.৯ শতাংশ নারী, যা কিনা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ এই বিপুল শ্রমশক্তির বড় অংশই কেন্দ্র ও রাজ্য, দুই স্তরেই - ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা বা শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৭–৭.৫ লক্ষ আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও মিড-ডে মিল বা রন্ধনকর্মী প্রতিদিন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে সচল রাখছেন, অথচ তাঁদের সরকারি কর্মীর মর্যাদা নেই, নেই ন্যায্য মজুরি, পেনশন বা সামাজিক সুরক্ষা।
একইভাবে প্রায় ৩০ লক্ষ গৃহশ্রমিক, যাদের অধিকাংশই নারী, আজও আইনি স্বীকৃতি ও ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত। তৃণমূল সরকার ২০২২ সালে গৃহশ্রমিকদের উন্নয়ন বোর্ড গঠনের কথা বললেও তা কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতেও এই শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নে একই অবহেলা দেখা যায়। বলা যায়, বিজেপি ও তৃণমূল, উভয় দলই নারীর শ্রমকে “স্বেচ্ছাসেবা” বা “সহায়ক ভূমিকা”-য় সীমিত রেখে পুনরুৎপাদনশীল শ্রমের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য অস্বীকার করছে, যা পিতৃতান্ত্রিক শোষণ-কাঠামোরই জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি।
উপরন্তু বিজেপির জোর করে চাপানো শ্রম-কোড সেবা-শ্রমের সরকারি স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা দেওয়ার বদলে বহু লড়াইয়ের মাধ্যমে আদায় করা কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক ও নারী হিসেবে সুরক্ষা ও সমানাধিকারের বিবিধ বিধানগুলিকে হয় তুলে দিচ্ছে, নয় দুর্বল করে দিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বিজেপির বড়োলোক তোষণকারী নীতির ফলে একই সংকট দেখা যাচ্ছে। মনরেগা প্রকল্প, যা অধিকারভিত্তিক কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল, তার দুর্বল হয়ে পড়া ও বাজেট ছাঁটাইয়ের ফলে মহিলাদের কাজের সুযোগ কমছে।
কৃষিকাজে যুক্ত গ্রামীণ মহিলাদের হার প্রায় ৭৪ শতাংশ হলেও, কাজের নিশ্চয়তা ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ডিজিটাল পদ্ধতির বাধ্যবাধকতা প্রান্তিক, বয়স্ক ও দলিত-আদিবাসী মহিলাদের আরও প্রান্তিক করে দিচ্ছে। মহিলাদের কর্মসংস্থান, মজুরি ও বৃহত্তরভাবে সমানাধিকার ও নির্ভয় স্বাধীনতার প্রশ্নে বিজেপির ভয়াবহ ট্র্যাক রেকর্ড তাঁদের নারীবিদ্বেষী রাজনৈতিক চরিত্রের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমের অধিকার থেকে শুরু করে নিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই নারীরা চরম সংকটের মুখে।
সম্প্রতি বিহারের নালন্দায় প্রকাশ্যে এক মহিলাকে যৌন হেনস্থার ঘটনা দেখিয়ে দেয়, কীভাবে বিহারে “ধর্ষণ-রাজ” কার্যত খোলা ছুট পেয়েছে। এই ঘটনা কুলদীপ সেঙ্গার, ব্রীজ ভূষণ সিং, বাবা রাম রহিম-এর মতো ধর্ষকদের আশ্রয় দেওয়া বিজেপির নারীর প্রতি গভীর অবমাননা ও বৈষম্যের নীতির পরিচায়ক। এহেন বিজেপির মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।
অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী তৃণমূলের শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের গভীর সংকটও বাস্তব। ২০২৩ সালের এনসিআরবি তথ্য অনুযায়ী, নারীর প্রতি অপরাধে শাস্তির হারে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বেকসুর খালাসের সংখ্যা কয়েক বছরে ৮,০০০ থেকে বেড়ে প্রায় ১৯,০০০-এ পৌঁছেছে, আর বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩.৭ লক্ষ ছাড়িয়েছে। ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট, ক্রাইসিস সেন্টার, যৌন হেনস্থা প্রতিরোধী কমিটি সবই কাগুজে কিন্তু বাস্তবে অকার্যকর। হাঁসখালি থেকে আর জি কর, সাউথ কলকাতা ল কলেজ— এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নির্যাতিতাকে দোষারোপ করা সহ ধর্ষণ ও হুমকির সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রতিফলন।
পশ্চিমবঙ্গের শাসক ও প্রধান বিরোধী দলের নেতারা মনে রাখবেন, মেয়েরা শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক নয়; তাঁরা অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির চালিকাশক্তি। তাই এই নির্বাচনে যারা মেয়েদের ভোট চাইতে আসছেন, তারা আগে দাবি তুলুন— লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে বাংলাসহ ভারতের অধিবাসীদের ভোটাধিকার রক্ষা করার। মহিলাসহ বাদ পড়া প্রত্যেকটি ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল করার। সর্বোপরি, মেয়েদের জন্য প্রকল্পনির্ভর নয়— অধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় গড়া নীতি চাই, যেখানে লিঙ্গভিত্তিক পুনরুৎপাদনশীল শ্রমের স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোজগার ও সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত হবে।