পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বঙ্গের গুণ্ডা দমন ২০২৬ : বিরোধী দমন?

  • 15 July, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 260 view(s)
  • লিখেছেন : সুজাত ভদ্র
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিল দুটিতে অনুমোদন দিয়েছেন। গুণ্ডা দমন বিল পেশ করার সময় নতুন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন, তিনি কথা দিচ্ছেন এই আইন কখনই রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে না। কিন্তু তা কি সম্ভব? ইতিহাস কিংবা সমাজবিজ্ঞান কি তাই বলে?

গত জুন মাসে বিধানসভায় বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে, ৪১ জন বিধায়কের বিরোধিতার মধ্যে, সহজেই বিজেপি সরকার কর্তৃক পেশ করা গুন্ডা দমন বিল গৃহীত হয়। একই সঙ্গে গৃহীত হয় ১৯৭২ সালের একটি আইনের সংশোধনী। তৃণমূল সরকারের আমলে ২০১৭ ও ২০২৩ সালে এই আইনকে ভিত্তি করেই সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বিরোধী সংশোধনী আনা হয়েছিল। এই দুটি আইনের পোশাকি নাম হলো (সরকারি গেজেট অনুসারে) : দি ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি এন্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিস অ্যাক্ট; ২. দি ওয়েস্ট বেঙ্গল মেইনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) আইন। (এই সংশোধনী নিয়ে আমরা কোনো আলোচনা এখানে করি নি। ২০১৭ সালের সংশোধনী বিরুদ্ধে আমরা বলেছিলাম।)।

প্রত্যাশা মতই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিল দুটিতে অনুমোদন দিয়েছেন। গুণ্ডা দমন বিল পেশ করার সময় নতুন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী  শুভেন্দু অধিকারী  বিধানসভার  ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন, তিনি কথা দিচ্ছেন এই আইন কখনই রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে না। তিনি অপপ্রয়োগ করতে দেবেন না বলে বিধানসভার কক্ষে দৃঢ়তার সঙ্গে আশ্বাস দেন। রাজ্যপালের স্বাক্ষরের ফলে বিল দুটি আইনে রূপান্তরিত হওয়ার পরে, গত ১১ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, আইন দুটি ১৩ জুলাই থেকে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়ে যাবে; দাবি করলেন, গুণ্ডা দমন আইনের ফলে এই রাজ্যে  গুন্ডাদের অস্তিত্ব আর থাকবে না।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও সমাজবিজ্ঞানের  মৌলিক সূত্রের ভিত্তিতে  অবশ্য বলা যেতে পারে মুখ্যমন্ত্রীর দুটি দাবিই --- অপপ্রয়োগ হবে না ও  এরাজ্যে  গুন্ডার অস্তিত্ব বিলোপ হবে ---- অন্তঃসারশূন্য।  

সোমবার আইন দুটি চালু হওয়ার দিন মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যটি গুণ্ডা দমন আইনের আসল উদ্দেশ্যকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে: 'সিপিআইএম এর হার্মাদ এবং তৃণমূল গুনস(= গুন্ডাদের)' মোকাবিলা করার জন্য এই আইনের প্রয়োজন ছিল।“ (দ্র TOI, ১৪ জুলাই, '২৬, পৃ ১,৪)। অর্থাৎ প্রকৃত উদ্দিষ্ট: দুটো বিরোধী দল(ও অন্যান্য টুকরে টুকরে গ্যাং, জাতীয়তা বিরোধী শক্তি, "অনুপ্রবেশকারী"  সামাজিক ভিত্তি,  প্রতিবাদী 'বুদ্ধিজীবী')। আর, অনুচ্চ প্রচারের ঢং হচ্ছে, সমস্ত সাধু সন্ত, নিষ্পাপ মানুষের একমাত্র ঠিকানা হচ্ছে বর্তমান শাসক দল!!

আমরা যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখব, অতীতে যখনই কেন্দ্রের বা রাজ্যের  বিজেপি সরকার নতুন কোনো আইন  প্রণয়ন করতে উদ্যোগী হয়েছে, তখনই তারা প্রধান যুক্তি হিসেবে ঔপনিবেশিক ভাবন  ('colonial mindset' - মুক্ত  আইন রচনার কথা বলেছে । অর্থাৎ  প্রকৃত অর্থে উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রগতির দিকে যেন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভারতকে !

বর্তমান গুণ্ডা দমন আইন বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সংক্রান্ত সংশোধনী কী সেই দাবি করতে পারে? ব্রিটিশ আমলে এই ধরনের আইন বা প্রথা ছিল অশ্রুতপূর্ব ? স্বাধীন পশ্চিম বাংলায় অতীতে কখনও গুণ্ডা দমন সংক্রান্ত আইন ছিল না? অন্য রাজ্যগুলোতে নেই? "নতুন" গুণ্ডা আইনের চরিত্র কিরকম? অন্য আইনটির নয়া সংশোধনীতে [এর আগে দুবার সংশোধন হয়েছিল - ২০১৭ ও ২০২৩ সালে]    "ক্লেইমস কমিশনের" গঠন চরিত্র ও এক্তিয়ার নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। এপিডিআর এর তরফে রাংতা মুন্সী -রা আইন দুটো লাগু হওয়ার দিনেই এদের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছেন। 

স্বল্প পরিসরে এই নিবন্ধের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে প্রাগুক্ত প্রশ্নগুলো সহ আরো তিনটি বিষয :

১। আলোচ্য গুণ্ডা দমন আইনটি যেহেতু নির্বতন মূলক/ বিনা বিচারে  আটক আইন, সেহেতু বিনা বিচারের আটকের চরিত্র নিয়ে সংবিধান সভা থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিরোধের রূপ  আলোচিত হয়েছে।

২। গুণ্ডা দমন আইনটির গঠন কাঠামোর মধ্যেই যে সমস্ত মানবাধিকার বিরোধী উপাদান নিহিত আছে তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

৩। ভারতীয় রাজনীতিতে, যেখানে অর্থবল  ও বাহুবলের প্রায় নিরংকুশ একাধিপত্য রীতিমতো দৃশ্যমান, সেখানে গুন্ডাদের 'উপযোগিতা' নিয়ে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে।

 

সংবিধান সভার দ্বারা গঠিত মৌলিক  অধিকার সংক্রান্ত উপসমিতি (প্যাটেল সহ ১২ জন সদস্য ছিলেন) মৌলিক অধিকার  সংবিধানে সুরক্ষা দিলেও, একই অনুচ্ছেদের উপধারাতে কেড়ে নেওয়া সম্পর্কিত তাদের সুপারিশ মেনে নেওয়া হয়েছিল; তেমনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২ (৪) - এ নিবর্তনমূলক  ধারাও ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হলো রাষ্ট্রীয় দমনের অস্ত্র ভাণ্ডারে। ইতিহাস শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে সংবিধান সভার দুজন সদস্যের - কস্তুরী রঙ্গ সন্থানাম এবং কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ীর - তীব্র  বিরোধিতার কথা।⊃1; সন্থানাম বলেছিলেন, ২২ অনুচ্ছেদের প্রথম উপধারা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সপক্ষে, রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগের মুহুর্তে সুরক্ষা। কিন্তু তা সম্পূর্ণ  নাকচ হয়ে যাচ্ছে ('negatived ') এই অনুচ্ছেদেরই ৪ নং উপধারার দ্বারা। ১৯৪৭ সালের ২৯ এপ্রিল । সংবিধান সভায় সোমনাথ লাহিড়ীর প্রতিবাদী ঐতিহাসিক বক্তৃতা আজও স্মরণযোগ্য:

"... a Government which does not depend on the people and which rules the country by autocracy and by means of force, detains people without trial, without having  to go through  a judicial process. This is a thing against which  indians have been entertaining the bitterest  feelings and they have been agitating against this...."  ; তারপর এও বলেছিলেন, "That is why I am constrained to say that these are fundamental rights from a police constable's point of view and not from the point of view of a free and  fighting nation...."

 

পরবর্তীকালে একটি স্মারক বক্তৃতায় প্রখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিচারপতি কে সুব্বা রাও বলেছিলেন, এই বিনা বিচারের অনুচ্ছেদ ও তৎ সংক্রান্ত নানা আইন ( ১৯২৩ সালের গুণ্ডা আইন সহ) আইনের বইয়ে থাকার ফলে, "there are practically no fundamental rights against legislative action." ⊃2; 

কিন্তু প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই সংবিধানে  বিনা বিচারে আটক রাখার বন্দোবস্ত রয়ে গেলো। একের পর এক নিবর্তনমূলক আইন - COFEPOSA,  মিসা, এসমা এবং  ১৯৮০ সালের নাসা( ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট)-- সংসদে গৃহীত হলো। পেল সুপ্রীম কোর্টের সিলমোহর(দ্র এ কে গোপালন মামলার রায়⊃3; সহ অন্যান্য রায়)। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাব, বিদায়ের শেষ লগ্নে মেইনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার বিল(১৯৪৬) পাস করিয়ে ব্রিটিশ সরকার কীভাবে কমিউনিস্টদের বন্দি করে রেখেছিল। ⁴স্বাধীন ভারতে নেহরু সরকার কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় ৫০০০ সদস্য / সমর্থকদের বিনা বিচারে বন্দি করে রেখেছিল।⁵ অর্থাৎ জনপ্রশাসনে ঔপনিবেশিক মানসিকতা অব্যাহত রইলো। 

১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি তে ( বাংলা, বিহার , উড়িষ্যা)  সর্বপ্রথম গুণ্ডা আইন  প্রয়োগ করে। তারও আগে, ১৮৭১ সালে  ভারত জুড়ে  ব্রিটিশ  গোষ্ঠী নির্দিষ্ট তকমা মারার পদ্ধতি সর্বপ্রথম  চালু করেছিল  "ক্রিমিনাল ট্রাইব" আইন রচনার মাধ্যমে। বাছাই করে এক একটি আদিবাসী গোষ্ঠীকে জন্ম থেকেই চরিত্রগত/ স্বভাবগত ভাবে (habitual) অপরাধী বলে বদনাম দিয়ে ছিল। তাদের এলাকা ছাড়া করার  বন্দোবস্ত আইন রেখেছিল। ১৯১১ সালের নতুন ক্রিমিনাল ট্রাইবস আইনে ' ভয়ংকর' ও  'বদমায়েশ' বিশেষণ যুক্ত করা হলো। যাতে সহজেই ব্রিটিশের অপছন্দের আদিবাসী গোষ্ঠীর বাইরেও ব্রিটিশ বিরোধী সবাইকে এই আইনের আওতায়  আনা যায় -- সে কথা তৎকালীন লেফটেন্যান্ট মালিক উমর হায়াত খান খুল্লাম খুল্লা  আইন পরিষদে বলেছিলেন। গোখলে আইনটি নিয়ে আপত্তি না জানালেও  তার অপপ্রয়োগের  পূর্ণ সম্ভাবনার কারণে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।⁶ ব্রিটিশ শাসকেরাই সর্বপ্রথম পরাধীন ভারতীয় জনসাধারণের মধ্যে তিন ধরনের ফৌজদারি  বিভাজনের  সূচনা করেছিল: অপরাধী আদিবাসী গোষ্ঠী সমূহ,  তথাকথিত গুণ্ডা,  এবং  বদ চরিত্রের / বা ভয়ংকর। আর,   অন্যদিকে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি দাস্য মনোবৃত্তি পোষণ কারী কিছু সুভারতীয়!  ১৯২৩ সালের গুণ্ডা দমন আইন এই বৈষম্যমূলক ধারণারই পরিণতি। এই আইনেই সর্বপ্রথম "গুণ্ডা" শব্দটি ব্যবহৃত হয়।                 

ইতিহাসের কি করুণ পরিহাস! ১০৩ বছর পরেও সেই বিস্মৃতপ্রায় আইন দ্বিতীয়বারের জন্য ফিরে এল; এর মূল চরিত্রের সঙ্গে ২০২৬ সালের গুণ্ডা দমন আইনটির চমকপ্রদ মিলও  লক্ষ করা গেল। যেমন, বিনা বিচারে আটক রাখার মেয়াদ, এলাকা ছাড়া (extern) করে দেওয়ার ক্ষমতা, উপদেষ্টা পর্ষদের ( advisory board) গঠন চরিত্র এবং ক্ষমতা, বন্দির( detenu) আইনি অধিকারের চূড়ান্ত সীমাবদ্ধতা, গুন্ডার 'সংজ্ঞার্থ ' তথা বর্ণনার (অংশ বিশেষ)।

১৯৭০ সালে পশ্চিমবাংলায় কংগ্রেস সরকার  ১৯২৩ সালের গুণ্ডা দমন আইনের আদলে প্রথমবার একটি আইন প্রণয়ন করে, যার পোশাকি নাম ছিল ' The West Bengal ( Prevention of Violent Activities ) Act, 1970;  আইনটির উদ্দেশ্য অংশে স্পষ্ট বলা  হয়েছিল,  "নকশালদের অথবা অন্যান্য সমধর্মী গোষ্ঠী এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত সমাজবিরোধীদের ("anti-social elements")  হিংসাত্মক কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার জন্য বিনা বিচারে ব্যক্তিদের আটক করা জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সমস্ত প্রচলিত আইন তাদের কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়।" (দ্র পৃ ৭)। এর প্রয়োগের  ভয়ংকর ইতিহাস তো আমরা জানি। বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় ছিল রকের ও চায়ের দোকানের আড্ডা। পুলিশ সেই আড্ডাকে আক্রমণ করল। রকের আড্ডার যুবকরা যেন সব গুণ্ডা।  প্রাবন্ধিক কিন্নর রায় লিখছেন " ...ষাট দশকের শেষ থেকেই পুলিশের চোখে বিষ হয়ে উঠে রক। সংগঠিতভাবে তোল্লাই করা হতে থাকে রকের ছেলেদের। সন্ত্রস্ত হতে থাকেন রকে বসা রকবাজরা।...উর্দি আর সাদা পোশাকের পুলিশ ক্রমশ টার্গেট করতে থাকে রককে। তার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই [ছিল] চায়ের দোকান।.."।⁷ এই নিবর্তনমূলক আইনের শিকার অনেকে যেমন খগেন সরকার, অশোক দে, নিশি কান্ত মন্ডল, নীল নীলাঞ্জন মজুমদার প্রমুখ) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন উক্ত আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে ও প্রয়োগ নিয়ে। প্রশাসন ঘেঁষা সুপ্রীম কোর্ট সব কটি আবেদন খারিজ করে দেন।বলেন, বিনা বিচারে আটক করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বদ উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে পারলে শুধু ছাড় হতে পারে।⁸

দ্বিতীয়বারের জন্য আজ আবার  স্বাধীন (এবং শাসক দলের দাবি মত 'মুক্ত') পশ্চিমবাংলা ব্রিটিশ গুণ্ডা দমন আইনের নতুন সংস্করণের মুখোমুখি। ১৯৭০ দশকে রাষ্ট্রের " নকশালদের হিংসাত্মক ' কার্যকলাপের একটা অজুহাত তবু বলা হয়েছিল। এবারে এসবের বালাই নেই। তবে স্বীকার্য, উদ্দেশ্য অংশে নতুন মুখ্যমন্ত্রী চমকপ্রদ একাধিক নয়া শব্দ ব্যবহার করলেন: "সমাজের 'কিছু নিশ্চিত অংশের' ( "certain sections") সমাজ বিরোধী কার্য কলাপ এই রাজ্যের "bonafide" নাগরিকের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে গুরুতর হুমকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।" তারপর দানবীয় আইন লাগু করা যাবতীয় সরকারের মতোই দাবি করা হলো, প্রচলিত আইনগুলো যথেষ্ট নয় এই  "nefarious " কার্যকলাপকে মোকাবিলা করা। তাই কঠোরভাবে  সমাজবিরোধী দের ( "anti - social elements") শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে, এবং তাদের ষড়যন্ত্রমূলক ছককে   ( "conspiratorial designs ") আটকাবার জন্য এই আনার প্রয়োজন বিবেচিত হয়।..."(দ্র পৃ ৯)।

উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে উল্লিখিত ইংরেজি শব্দগুলোর মধ্যে চারটি শব্দ একবারে নতুন; এবং সেগুলো ব্যাখ্যা বিহীন হওয়ার দরুন দায়বদ্ধহীন, ফ্রী হ্যান্ড পেয়ে যাওয়া আইন রক্ষকদের সরকারের   কথামত বিরোধীদের বিরুদ্ধে এই আইন অবাধে প্রয়োগ করার পথকে প্রশস্ত করলো। 'Certain sections' বলতে আইন কাদের বোঝাচ্ছে? পার্ক সার্কাসের বিক্ষোভের পরে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিনির্মাণ করলে বুঝতে পারব কিভাবে রাজাবাজার, মেটিয়াবুরুজ, পার্কসার্কাসের সবিশেষ উল্লেখ ব্রিটিশ শাসনের সেই কুখ্যাত ক্রিমিনাল ট্রাইব ধারণাকে হস্তান্তর করে দেওয়া হলো সংখ্যালঘু এক সম্প্রদায়ের উপর, ভৌগোলিক এলাকা উল্লেখ করে; যেন সেখানকার বাসিন্দারা  bonafide নাগরিক কিনা সন্দেহ আছে। অনুচ্চ বার্তা: বাংলাদেশি ও/ বা রোহিঙ্গা।

আর, এই অ - bonafide - অংশ 'nefarious' ভাবে ষড়যন্ত্র মূলক পরিকল্পনা নিয়ে আক্রমণ করছে bonafide [পড়ুন হিন্দু] নাগরিকদের জীবন, জীবিকার উপর! এই উদ্দেশ্য একবারে নতুন। কিন্তু আইনের গঠন বস্তাপচা।লক্ষণীয় , ব্রিটিশ আইনে, বা অন্যান্য রাজ্যে এই জাতীয় "গুণ্ডা" দমনের  আইনগুলোর মতোই  আলোচ্য আইনটিতেও "গুন্ডার" কোনও সংজ্ঞার্থ নেই; রয়েছে কিছু কার্য কলাপের বর্ণনা। গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু , কেরালম, উত্তরপ্রদেশ - এর আইনগুলোতে গুণ্ডা কার্য -কলাপের ব্যাপ্তি বিশাল। তুলনায়, পশ্চিমবঙ্গের আইনটির লক্ষ্য যেহেতু নির্দিষ্ট, সেহেতু পরিধি ছোট এবং সংকীর্ণ। সন্ত্রাসবাদী  গুণ্ডা তকমা দিয়ে বিনা বিচারে এক বছর ( ও প্রয়োজনে বছরের পর বছর) বন্দি করে রাখার  দিকে ঝোঁক। দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় হল, উত্তরপ্রদেশের ১৯৭১ এর গুণ্ডা নিয়ন্ত্রণ আইনের বা গুজরাট সমাজবিরোধী প্রতিরোধক ( ১৯৮৫) আইনের মতোই এই আলোচ্য আইনটি প্রচলিত একাধিক ফৌজদারি আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও  গুণ্ডা বলে চিহ্নিত করেছে।আবার,  নতুন ন্যায় সংহিতার(২০২৩) অন্তর্গত নতুন দুটি ধারাকেও গুণ্ডা নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছে:  ধারা ১১১ এবং ধারা ১১২। ১১১ নং  ধারাটি  সংগঠিত অপরাধ (organised  crime) সম্পর্কিত, যার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, বা যাবজ্জীবন।

১১২ ধারাটি হল  ছোটখাটো সংগঠিত  অপরাধ (petty organised crime), যার সর্বোচ্চ সাজা ৭ বছর। বলা হল, উক্ত যেকোনো একটি ধারায় চার্জ শীট হয়ে গেলে সেই মামলার অভিযুক্তকে " গুণ্ডা" বলা হবে [ ধারা 2(d) ]। এবং এই আইনের আওতায় এনে তাকে  বিনা বিচারে এক বছর আটকও রাখা যাবে[ধারা 3(1)]। ভাবুন এই বিপরীতমুখী কিন্তু সমান্তরাল পরিস্থিতির কথা: একদিকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে; তাই রয়েছে ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন মামলা। মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন অভিযুক্ত নির্দোষ; জামিনও হয়ত পেয়েছেন। বিচার শেষে দণ্ড পাবেন নতুবা বেকসুর মুক্তি। সমান্তরাল ভাবে  নির্দোষ স্থিতি থাকা সত্ত্বেও 

গুণ্ডা আইনের বর্ণনায় তিনি গুণ্ডা তকমা পাবেন ও গ্রেপ্তার হবেন, প্রাপ্তি হবে বিনা বিচারে এক বছরের কারাবাস। একই সঙ্গে নির্দোষ ও গুণ্ডা! একই সঙ্গে একই মামলায় বিচারাধীন (বন্দি অথবা জামিনে  জেলের বাইরে) এবং এই মামলার  কারণে বিনা বিচারে এক বছর জেলে আটক ! কি বিচিত্র সমাপতন।

2(d)- র ধারায়  তাই গ্রেপ্তার সরাসরি সংবিধান বিরোধী;  সংবিধানে আছে, একই অপরাধে একবারের বেশি বিচার করা যায় না, সাজা দেওয়া যায় না [অনুচ্ছেদ ২০(২)]।

সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে 2(d)(iv) উপধারাটি;  প্রাগুক্ত অন্যান্য রাজ্যের গুণ্ডা দমন আইনেও এই  বাক্যটি আছে: যে ব্যক্তি  তার সম্প্রদায়ের কাছে  সাধারণভাবে   'desparate ' (মরিয়া) এবং  'dangerous' (বিপজ্জনক) বলে পরিচিত: "goonda means a person who is generally reputed to be desparate and dangerous to the community."  শুধু এই উপধারা সহ পুরো আইনটার কোথাও ব্যাখ্যা নেই  মরিয়া এবং  বিপজ্জনক ঠিক করার মানদণ্ড কি কি ? এক কথায়, যাকে ইচ্ছা বদনাম দিয়ে বিনাবিচারে আটক রাখার বন্দোবস্ত করা হল।  

 

আরোও কি আছে আইনটায়?

১. গ্রেপ্তার আদেশনামা  ১৫ দিন বৈধ থাকবে।

২. আটক করার কথা ডেটেনিউ কে মুখে জানানো যাবে বা লিখিত আদেশের কপি দেওয়া হবে। কারণ টা কিন্তু  বন্দিকে জানানো হবে প্রথম পাঁচদিনের মধ্যে । প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তখনই দেওয়া হবে [ ধারা ৭(২)]। অর্থাৎ, "আগে ধরো, পরে কারণ গুছিয়ে  তৈরি করো, কাগজ এমন ভাবে বানাও যাতে  দেখানো  যাবে  ধৃত কত ভয়ানক গুণ্ডা" ! অথচ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২(১ ও ২) সহ  প্রচলিত আইনে আছে, গ্রেপ্তারের সময়েই কারণ জানাতে হবে, ও আইনের ধারা উপধারা সহ; ধৃতর আইনজীবী নেওয়ার অধিকারের কথা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করানোর বিধান, পরিবারকে গ্রেপ্তারের  খবর দেওয়া, মেডিকেল পরীক্ষা করানো ইত্যাদি।এসব চেক লিস্ট অনুপস্থিত সব কটা  গুণ্ডা দমন আইনে। 

৩. আটক রাখার আদেশ দেবেন জেলা  শাসক, অথবা পুলিশ কমিশনার।

৪.  বিনা বিচারে এক বছর আটক রাখার লক্ষ্যে পাঠানো হবে কারাগারে, থুড়ি সংশোধনাগারে।

৫.  জামিনের ব্যাপার নেই।  জামিন বা এক বছর আগে মুক্তির বিরুদ্ধে গুন্দ আইন যেন বিমা।  প্রথম তিন সপ্তাহ স্রেফ জেল জীবন যাপন।

৬. তিন সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেই রাষ্ট্র  ডেটেনিউ- র বিষয়টি বিশেষ ভাবে গঠিত উপদেষ্টা পর্ষদে [সাধারণ প্রচলিত আদালতে নয়]  নথি পত্র সহ উত্থাপন করবে। তখন শুনানি হবে।

৭. আটক হওয়ার পর থেকে বন্দি দশায় ডিটেনিউ- র প্রায় সব ধরনের সাংবিধানিক ও ন্যায় বিচারের সর্বজনীন স্বীকৃত অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে:

 

ক.  তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে, তবে ব্রিটিশ গুণ্ডা আইনের মতো এই আলোচ্য আইনেও পর্ষদের কাছে কোনো আইনজীবীকে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারবেন না। অথবা জেলে ছাড়া আর কোথাও আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া যাবে না।

খ. তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত তথ্য প্রমাণ "জাতীয় স্বার্থে" জানানো হবে না; এবং গোপন সূত্রের পরিচয় জানানো হবে না।

গ.  কোনো আটক নির্দেশ নামায় উল্লিখিত কারণগুলোর মধ্যে যদি এক বা একাধিক  তথ্য বা ঘটনার পরিস্থিতি অস্পষ্ট হয়, অস্তিত্বহীন হয়, অপ্রাসঙ্গিক হয়, এমনকি অবৈধ হয়, তাহলেও আটকনামা কে অবৈধ বলে বিবেচনা করা হবে না [ধারা ৭(৫)]।

ঘ. পর্ষদ ( তিন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত) শুনানি শেষে , আটক করার দিন থেকে নয় সপ্তাহের মধ্যে তাদের রিপোর্ট সরকারকে জমা দেবেন।

ঙ. মতামতটুকু -- আটক ব্যক্তিকে টানা এক বছর  আটক   রাখার যথেষ্ট কারণ আছে কি নেই  -- প্রকাশিত হবে।কার্য বিবরণী সহ বাকি সব তথ্য  গোপন থাকবে। 

 

আইনে পরিষ্কার করে বলা নেই, পর্ষদের যথেষ্ট কারণ না থাকার কথা জানালেই আটক নয় সপ্তাহের পর মুক্তি পাবে কিনা। ধারা ১৩ - এ বলা আছে, এক বছরের আগে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি শেষমেশ সরকার বাহাদুরের মর্জির উপর নির্ভর করবে।

তারপরেও নিস্তার নেই স্বাধীন ভারতের নাগরিক- ডিটেনিউ। এই আলোচ্য আইন [ধারা ১৩(২)] সহ অন্যান্য রাজ্যের  গুণ্ডা দমন আইনে বলা আছে, একবছর অতিক্রান্ত হলেও, নতুন আটক  নির্দেশ সেই ডিটেনিউ কে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে পারে। এবং একই পদ্ধতিতে বিনা বিচারে আবার , আবার, বারবার জেলের ঘানি টানাতে পারে।

প্রাগুক্ত ক্রিমিনাল ট্রাইব আইন , ব্রিটিশ গুণ্ডা দমন আইনের ধাঁচে রচিত  ধারা ১৫ টি রাষ্ট্র কর্তৃক গুন্ডা তকমা প্রাপ্ত ব্যক্তিকে সর্বাধিক এক বছর পর্যন্ত  এলাকা ছাড়া (externment) হয়ে থাকতে হবে। ঠিক করবেন কে? তিন জনের একজন: জেলা শাসক, পুলিশ কমিশনার, অথবা ডেপুটি আই জি পদমর্যাদার কেউ, যাকে সরকার নিয়োগ করবে। শুধু এলাকা ছাড়া নয়। এই তিন জনের ক্ষমতা থাকবে সেই বিতাড়িত ব্যক্তির এলাকার বাইরে  চলাফেরার খবর চেয়ে পাঠানোর, বা নিজেকে এঁদের সামনে আদেশ মতো হাজির হওয়া[ ধারা ১৫(বি)]। এই সংক্রান্ত আদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে দেওয়া সম্ভব না হলে, সেই বিতাড়িত ব্যক্তির নথিভুক্ত ঠিকানায় বিজ্ঞপ্তি সাঁটিয়ে দেওয়া হবে। 

বিতাড়িত ব্যক্তির কিন্তু বিতাড়ন আদেশের  বিরুদ্ধে পর্ষদে যাওয়ার সুযোগ নেই। বড়জোর,বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ জারির পনেরো দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারেন। আবেদন ইতিবাচক সাড়া দেবে কিনা সরকারই ঠিক করবে। আবেদন যদি ঝুলে না থাকে, তাহলে ওই তিন জন আবার একবছরের জন্য এলাকা বিতাড়নের আদেশ দিতে পারেন।

 

বিতাড়নের আদেশ গুলো না মানলে তিন বছরের কারাবাস এবং অর্থদণ্ড। আর, আইনের ধারা ১৭ তে পুলিশ অফিসারকে যে কোনও স্থানে ঢুকে তল্লাশি করার, যে কোনও ব্যক্তি, পরিবহন আটকে তল্লাশি করার ক্ষমতা অর্পণ করা হল। তার অর্থ পরিবার, গৃহের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ধ্বংস করা হল; পুত্তুস্বামী মামলার যুগান্তকারী রায়ের মূল্য রইলো না। প্রকাশ্য দিবালোকে, কোনও ব্যক্তিকে রাস্তায় তল্লাশির নামে থামিয়ে , তারপর আটক করে নিয়ে যাওয়ার আর কোনও আইনি বাধা রইলো না।

 বোঝাই যাচ্ছে, আইনটির উদ্দেশ্য বিরোধের সদা আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে আটকে রাখা। আদালত জানেন, আইনি ন্যায়ের চারটি  নীতিমালার মধ্যে একটা হল: আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে আইনি ধরা উপধারার মধ্যে যুক্তিগ্রাহ্য সম্পর্ক স্থাপন করা যাচ্ছে কিনা পরীক্ষা করা।⁹ আমাদের মতে,  আলোচ্য আইন এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে নি।

 

ইতিহাসবিদ সুরঞ্জন দাস এবং  জয়ন্ত কুমার রায় তাঁদের ব্যতিক্রমী গবেষণায়( ১৯৪৬ - ১৯৭১)  দেখিয়েছেন,  স্বাধীনতার পর কলকাতা পুলিশ নতুন এক ধরনের "গুন্ডাদের" নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; পুলিশের  ফাইলের ভাষায়, ( তথাকথিত) "political goondas" অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্মী  কিন্তু আইন ভঙ্গকারী (অবশ্য আমাদের ভাষ্যে হিংসা অহিংসা নিরপেক্ষ ভাবে রাজনৈতিক বন্দি)। ফাইলে এটা লেখা থাকে পুলিশ কিন্তু অন্য  চোখে তাদের দেখত। তাদের কখনই পুলিশের তালিকায় থাকা সক্রিয় সাধারণ গুন্ডাদের মিলিয়ে দেওয়া হতো না।⊃1;⁰  এই আলোচ্য আইন বিপরীত পথে হাঁটছে।

 

রাজ্যে রাজ্যে ফৌজদারি ন্যায়বিচার কাঠামোর বিপরীত কাঠামো গড়ে তুলেছে / তুলছে এই গুণ্ডা দমন আইন। জামিন পাওয়ার অধিকারকে  নাকচ করে দিচ্ছে এই আইন। বা, আদালতের জামিনের আদেশকে এড়িয়ে জামিনপ্রাপ্ত কে বিনা বিচারের আইনে গ্রেপ্তার করার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। গত বছর সুপ্রিম কোর্টের ভ্যাকেশন বেঞ্চ ( বিচারপতি সঞ্জয় ক্যারল এর বেঞ্চ) কেরলম এর ২০০৭ সালের সমাজবিরোধী প্রতিষেধক আইনের উপর রায় দিতে গিয়ে  বলেছিলেন, "preventive detention should not be resorted to when ordinary criminal law provides sufficient means to address the apprehensions leading to the detention order."⊃1;⊃1; আরো মামলায়  - যেমন, রেখা বনাম স্টেট অফ তামিলনাডু  (২০১১), মুনাগালা ইয়াদাম্মা বনাম স্টেট অফ  এ পি (২০১২), ভি শান্তা ব স্টেট অফ তেলেঙ্গানা( ২০১৭) --- সুপ্রীম কোর্ট একই কথা বলেছেন।

 

এই কথাই তো মানবাধিকার আন্দোলন সমস্ত দানবীয় আইনের ক্ষেত্রে বলে আসছে: প্রচলিত ফৌজদারি আইন গুলো দিয়েই সহিংস গুন্ডামি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দুই, সমাজবিজ্ঞানের অ আ ক খ যাদের জানা আছে তাঁরা জানেন, অপরাধ সমাজ থেকে উৎসারিত; অপরাধীরা সামাজিক কারণেই "deviants"; আর্থ -সামাজিক বৈষম্য, সীমাহীন দারিদ্র্যের সুষ্ঠু সমাধান না হলে গুন্ডার অস্তিত্ব থাকবেই। রাষ্ট্রনায়কদের সেটা জানা উচিত।পুলিশ দৃষ্টি তে দেখলে  দমনের নামে সকলের সীমাহীন উৎপীড়নই হবে। ইতিহাসের শিক্ষা তাই বলে।

 

তিন, রাষ্ট্রনায়কদের প্রত্যক্ষ মদতে , পৃষ্ঠপোষকতায় , পুলিশ প্রশাসনের প্রশ্রয়ে রাজ্যে রাজ্যে, এলাকা এলাকায় নানা ধরনের গুণ্ডারাজ বহাল থাকে।  সুতরাং সর্ষের মধ্যে ভূত। গুণ্ডা ও রাজনীতি , গুণ্ডা ও প্রশাসনের মধ্যে নিবিড় আন্ত: সম্পর্ক, আন্ত :নির্ভরতা রয়েছে। পুলিশ কে একসময় আদালত " উর্দিপাড়া সমাজবিরোধী" আখ্যা দিয়েছে। তথাকথিত এনকাউন্টার  স্পেশালিস্টরা  তো  ঠান্ডা মাথার খুনী। পরন্তু , এও পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের  রাজনৈতিক ইতিহাসে  দেখা গেছে গুণ্ডা কালক্রমে প্রবল পরাক্রমশালী রাজনীতিবিদ পর্যন্ত হয়েছেন।

শান্তির সময়ে এলাকায় এলাকায় গুন্ডা, বদমায়েশ - রা সেই সময় গরীব, হতদরিদ্রদের সাহায্য করে যারা রাষ্ট্রীয় সংস্থার দোর গোড়ায় পৌঁছতে পারে না সামাজিক সুরক্ষা সম্পর্কিত প্রকল্পের উপভোক্তা হতে।

Paul Brass, Ward Berenschot - দের গবেষণা⊃1;⊃2; দেখিয়েছে,  সম্প্রদায়গত সশস্ত্র সংঘর্ষের সময়ে, "দাঙ্গার সময়ে", রাজনীতিবিদদের সঙ্গে গুন্ডাদের সহযোগিতা কি ধরনের রূপ নেয়। ২০০২ সালে গুজরাটের ঘটনায় তার অসংখ্য উদাহরণ আছে।

 

অবিভক্ত বাংলায় ও পরে, পুলিশের খাতায় গোপাল পাঁঠা ছিলেন একজন ভয়ংকর গুণ্ডা। কলকাতার দুদিনের  কলঙ্কিত সম্প্রদায়গত সংঘর্ষে গোপল মুখার্জীর ( পাঁঠা) ভূমিকা ছিল বীর নায়েকের মতো।

 

ইতিহাসের এটাও হয়তো পরিহাস, যে সরকার তাঁর নামে, তাঁর অন্য ভূমিকা কে অবজ্ঞা করে, ওই দুদিনের ঘটনায় তাঁর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে রাস্তার নামকরণ করল, সেই সরকারই কদিন বাদে গুণ্ডা দমন আইন আনল গুণ্ডা রাজের অস্তিত্ব বিলোপের জন্য।

তথ্য সূত্র

1. CAD, official report, vol. 1, (2014 edn., loksabha secretariat),pp. 404- 405
2. K Subba Rao(J), Fundamental rights under the Constitution  of India ( univ of Madras, n.d.) p.29
3. A k Gopalan v State of Madras, 1950 SCR
4.Rakesh Ankit, India in the interregnum ( N Delhi, 2019)p.261
5.David H Bayly, Preventive Detention in India( Calcutta, 1962); Hallie Ludsin, Preventive Detention and democratic state(Delhi,2016)
6.Malli Gandhi, Enforcing Criminality(Delhi, 2022)
7. " রক এখন ' শহীদ বেদী ', লীনা  চাকী সম্পাদিত, বাঙালির আড্ডা( কলকাতা) পৃ ২০১
8. Surendra & Sandeep Malik, Supreme Court on preventive Detention Laws in India (vol2), chap. 22.51
9. Sandhya Rohal, Public Accountability & Rule of Law( N Delhi, 2019), P.93
10. The Goondas..( Calcutta, 1998), p.12
11. The Hindu, June 19, 2025

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment