পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ক্লাস শুরু হওয়াটা খুব দরকার

  • 05 February, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 459 view(s)
  • লিখেছেন : জাহাঙ্গীর আলম
এই লকডাউনে বছর খানেক স্কুল বন্ধ থাকায় এই ধরণের পড়ুয়ারা পড়াশুনা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। যা শিখেছিল সব ভুলে গেছে। তাছাড়া এবার একটি বড় অংশের আভিভাবক আভিভাবিকা ভেবেছেন পরের ক্লাসে উঠতে যখন হবেই না, পড়ে বা পড়িয়েই লাভ কি? লক ডাউনে স্কুল বন্ধ থাকায় অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কিছু ছেলে ইট ভাটায় কাজ করতে শুরু করেছে। কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনের সাথে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হয়ে বাইরের রাজ্যে চলে গেছে। লক ডাউনে এই সব পড়ুয়াদের পড়াশুনার ক্ষতি সব থেকে বেশি হয়েছে। স্কুল শুরু হওয়াটা কি জরুরী নয়?

গতকাল ব্যাংক একাউন্ট আপডেট করবার জন্য এক দল একাদশ শ্রেণীর ছেলে মেয়ে বিদ্যালয়ে হাজির। ওদের দাবি, ‘স্যার স্কুলকে খুব মিস করছি আমরা। কবে ক্লাস শুরু করবেন। আমরা ক্লাস করতে চাই।’ বললাম, ‘অনলাইন ক্লাস তো চলছে।’ পায়েল বলল, ‘স্যার আমাদের বড় মোবাইল (স্মার্ট ফোন) নেই।’ লীলা প্রামাণিক বলল, ‘স্যার অনলাইনে ক্লাস করতে ভালো লাগে না। বুঝতে পারি না। ছবিও ভালো আসে না।’

সত্যিই তাই। অনলাইন ক্লাস চলছে বটে। তবে শহরের সচ্ছল পরিবার ও গ্রাম এলাকার একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর মুষ্টিমেয় ছেলে মেয়ে বাদ দিলে সরকারি বিদ্যালয়ের সিংহভাগ ছেলে মেয়ে অনলাইন ক্লাসের বাইরে।

এইসব ভাবতে ভাবতে সামনে তাকিয়ে দেখি জনা পঞ্চাশেক পঞ্চম ষষ্ঠের পড়ুয়া দোলনা ও সুড়সুড়ির কাছে ভিড় জমিয়েছে। বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ চলে। দরজা খোলা থাকে। প্রতিদিনই সার্টিফিকেট, পাঠ্যবই ও খাতার নেবার বিভিন্ন অজুহাতে কিছু পড়ুয়া বিদ্যালয়ে হাজির হবেই। বাড়িতে ওদের ভালো লাগে না। ওদের অনলাইন ক্লাসের সাথে যোগ নেই। পড়াশুনার সাথেও নেই।

করোনা উত্তর লকডাউনের এই সব পড়ুয়াদের পড়াশুনা স্তব্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে আমাদের মতো গ্রাম এলাকার সরকারি বিদ্যালয়ের সাধারণ ঘরের প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিকের ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা থমকে গেছে। একাদশ ও দ্বাদশের বিজ্ঞান ও কলাবিভাগের প্রায় অর্ধেকের কিছুটা কম পড়ুয়া অনলাইনে ক্লাস করে। কিন্তু নীচু ক্লাসের সত্তর থেকে আশি শতাংশ পড়ুয়া পড়াশুনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আমাদের বিদ্যালয়ের কথা বলি। পঞ্চমে ভর্তি হওয়া পড়ুয়ার ষাট থেকে সত্তর শতাংশ সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে পারে না। ফলে পাঠ্যবইও পড়তে পারে না। এইসব পড়ুয়াদের নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সারাবছর রিমিডিয়ালের পাঠ পড়ানো হয়। উদ্দেশ্য একটাই, ওদের জন্য নির্ধারিত শ্রেনীভিত্তিক পাঠ্যবই পড়তে সক্ষম করা। কেউ পঞ্চমেই পড়তে শিখে নেয়। কেউ কেউ অষ্টম অব্দি চলে যায় কিন্তু পাঠ্যবই পড়তে শেখে না। এই সব পড়ুয়াদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এদের বাবা-মা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরিদ্র। বাবারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিযায়ী শ্রমিক। রাজ্যের বাইরে কাজ করেন। এরা শুধু দরিদ্রই নয়, অসচেতন এবং অশিক্ষিত বাবা-মা। ছেলে মেয়েদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠাবার উদ্যোগ নেন না। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার খোঁজ নেন না। বাড়িতে হোম ওয়ার্ক করল কি না তাঁর খোঁজ নেন না। বরং কোন কোন মা খুশি হন মেয়ে স্কুলে না গেলে কারণ মেয়ে বিড়ির মুখটা মুড়িয়ে দেবে। দু’পয়সা বাড়তি উপার্জন হবে। এইসব পরিবারের থেকে আসা পড়ুয়ারা বাড়িতে পড়তে বসে না। এঁদের পড়াশুনা যতটুকুই হয়, সেটা বিদ্যালয়েই। না আছে এঁদের অনলাইন ক্লাস করবার সুযোগ। না আছে বাড়িতে স্মার্ট ফোনের সুবিধা। না আছে পড়া বুঝিয়ে দেবার পরিবেশ। না আছে প্রাইভেট টিউশন। শহরের সচ্ছল পরিবারের জন্য অনলাইন ক্লাস করা যতটা সহজ, দরিদ্র নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদের জন্য সেটা মোটেই সহজ নয়। নিম্নবিত্ত পরিবারে একটি টুজি মোবাইল ফোন রাখাও বিলাসিতা।

এই লকডাউনে বছর খানেক স্কুল বন্ধ থাকায় এই ধরণের পড়ুয়ারা পড়াশুনা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। যা শিখেছিল সব ভুলে গেছে। তাছাড়া এবার একটি বড় অংশের আভিভাবক আভিভাবিকা ভেবেছেন পরের ক্লাসে উঠতে যখন হবেই না, পড়ে বা পড়িয়েই লাভ কি? লক ডাউনে স্কুল বন্ধ থাকায় অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কিছু ছেলে ইট ভাটায় কাজ করতে শুরু করেছে। কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনের সাথে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হয়ে বাইরের রাজ্যে চলে গেছে। লক ডাউনে এই সব পড়ুয়াদের পড়াশুনার ক্ষতি সব থেকে বেশি হয়েছে।

নিচু ক্লাসের ছেলে মেয়েদের কাছে বিদ্যালয় হল আনন্দের জায়গা। দোলনা, সুড়সুড়ি সহ খেলার উপকরণ, বিদ্যালয়ের মনোরম পরিবেশ এঁদের বিদ্যালয়ের প্রতি অকৃষ্ট করে।

তাছাড়া অনলাইন ক্লাস শ্রেনীকক্ষের ক্লাসের বিকল্প হতে পারে না, অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষ করে নিচের ক্লাসে। তাছাড়া অনলাইন ক্লাসের প্রচুর সমস্যা রয়েছে।

এক, অনলাইন ক্লাস করবার জন্য চাই ভালো স্মার্টফোন ও ভালো ফোর জি ইন্টারনেট কানেকশন। যেটা কিনে ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেবার ক্ষমতা সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিভাবকদের নেই।

দুই, যিনি ক্লাস নিচ্ছেন তিনি তাঁর স্মার্টফোনকে অনলাইনে ক্লাস করবার জন্য কতটা ব্যবহার করতে জানেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা ক্লাসে দারুণ পড়ালেও অনলাইন ক্লাসে একেবারেই সচ্ছন্দ নন।

তিন, গুগল মিট বা জুমে ক্লাস করতে গিয়ে যে ইন্টারনেটের গতি দরকার গ্রামের দিকে তা পাওয়া যায় না।

চার, লেকচার মেথডের ক্লাস কোন রকমে অনলাইনে হলেও অংক বিজ্ঞানের ক্লাস বা বোর্ড ওয়ার্ক অনলাইনে করা মুশকিল। বিশেষ করে মোবাইলের এত ছোট স্ক্রিনে ব্ল্যাক বোর্ডের লেখা বোঝা যায় না।

ছয়, কখনো ছবি পরিস্কার দেখা যায় না , কখনও কথা স্পষ্ট শোনা যায় না। ফলে ছেলে মেয়েরা অনলাইন ক্লাসে আগ্রহ হারায়। ছেলে মেয়েরা আগ্রহ হারিয়ে ফেললে শিক্ষক শিক্ষিকারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

সাত, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাদানের একটি বড় বৈশিষ্ট হল, ছেলে মেয়েদের অ্যাক্টিভিটি টাস্কের খাতা দেখা, ভুলগুলো বার করে তা শুধরে দেওয়া, ওদের দেখিয়ে দেওয়া। এই ছেলে মেয়েদের উত্তরপত্র দেখে ভুল ধরিয়ে দেবার কাজটি অনলাইন ক্লাসে খুব শ্রমসাধ্য ও কঠিন।

তাই স্কুল খোলাটা খুব জরুরি। স্কুল যখন সিনেমা হল নয়, তখন রোস্টার বানিয়ে দিয়ে সপ্তাহে ছয় দিনের বদলে ছেলে মেয়েরা দুদিন আসুক। কভিড প্রোটোকল মেনে আসুক। কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়াটা অন্তত পিছিয়ে পড়াদের জন্য আরও বেশী দরকার।

ছবি সুত্র ঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

0 Comments

Post Comment