পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নিছক মৃত্যু নয়, এ এক বিচারবিভাগীয় হত্যাকাণ্ড

  • 06 July, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 579 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস আইচ
দোষী সাব্যস্ত হোক কিংবা বিচারাধীন, একজন বন্দির সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। লঙ্ঘিত হলে তা রক্ষা করার দায়িত্ব আদালতের। আদালত সে দায়িত্ব পালন করেনি। তাঁকে তিলে তিলে মরতে দিয়েছে। কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। বম্বে হাইকোর্টে শেষ জামিনের আবেদনে রাঁচির বাগাইচা আশ্রমে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন আদিবাসী-প্রাণ ফাদার স্ট্যান স্বামী। আদালত তা মঞ্জুর করেনি। তবু, স্ট্যান লিখেছিলেন খাঁচাবন্দি পাখিও গাইতে পারে। তিনি বন্দি শিবিরে সহ-বন্দিদের মানবিক মুখগুলিও এঁকে রেখে গিয়েছেন।

এক গুরুতর অসুস্থ অশীতিপর বৃদ্ধকে তিলে তিলে মেরে ফেলা হল। এবং তা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে। যে মানুষটির দীর্ঘ আন্দোলন-জীবনই ছিল 'সবার পিছে, সবার নীচে, সব হারাদের' বৃত্তে ঘেরা, আইন ভঙ্গকারী রাষ্ট্র এবং তাদের সাঙ্গাৎ পুঁজিপতিদের তাবড় বেআইনের বিরুদ্ধে আইনি ও সাংবিধানিক পথে। তাঁকে বন্দি করা হল এক চরম বেআইনের আইনি ফাঁদে। যে মানুষটি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের বিস্থাপনের বিরুদ্ধে, জল-জঙ্গল-জমির আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার বুঝে নিতে তাত্ত্বিক ও আইনি শিক্ষায় শিক্ষিত করে চলেছিলেন, রাঁচি শহরের অদূরে বাগাইচা জেসুইট ক্যাম্পাসে গড়ে তুলেছিলেন এক প্রশিক্ষণ শিবির, গড়ে তুলেছেন প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে, আদিবাসী অধিকার থেকে উচ্ছেদ হওয়া এবং বিনাবিচারে জেলবন্দি আদিবাসীদের জন্য গবেষণা কেন্দ্র, পথে নেমে নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলনের — তিনি যে রাষ্ট্রশক্তির চক্ষুশূল হবেন সে নতুন কোনও কথা নয়। কথা এই যে, বিচারবিভাগীয় হেফাজতে তাঁকে মরতে হল কেন?



মহারাষ্ট্রের পুণে শহরে কখনও যাননি স্ট্যান স্বামী, ভীমা কোরেগাঁও আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সুদূর কোনও সম্পর্ক ছিল না, মাওবাদীদের সঙ্গে তো নয়ই — সেই স্ট্যানকে জোড়া হল এই সবেরই সঙ্গে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন এনআইএ অভিযোগ করল, দেশ জুড়ে হিংসা ও অশান্তি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছেন স্ট্যান। আসলে সাঙ্গাৎ পুঁজিপতিদের ঝাড়খণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের বিরুদ্ধে বিস্থাপন আন্দোলন হয়ে উঠেছিল এক প্রবল প্রতিস্পর্ধা। এবং সেই পথেই পাথালগড়ি আন্দোলন। রাষ্ট্রের কাছে বড় জরুরি ছিল তাঁকে জেলে পোরার।

আদালত জানত, অতিমারি পরিস্থিতির মধ্যে দুরারোগ্য পারকিনসন রোগে আক্রান্ত এক অশীতিপর বৃদ্ধকে 'টেররিস্ট' অভিযোগে নিষ্ঠুর ইউএপিএ আইনে জেলবন্দি করা হয়েছে। আদালত তো জানত, স্নায়ুরোগে জর্জরিত এই বন্দি নিজের হাতে খেতে পারেন না তাঁর স্ট্র ও সিপার প্রয়োজন হয়, যা এনআইএ-র আধিকারিকরা তালোজা জেলে প্রবেশের সময় কেড়ে নিয়েছিল। আর ফেরত দেয়নি। বার বার আবেদন সত্ত্বেও এনআইএ-র প্ররোচনায় তালোজা জেল কর্তৃপক্ষ তা জেনেবুঝে সরবরাহ করেনি। এনআইএ আদালত একথা জানত। উচ্চ আদালত একথা জানত। কীভাবে জানত? জানত যখন আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল এই অশীতিপর মানুষটিকে। আদালতের উচিত ছিল না, এ কথা বলা একজন মাওবাদী হলেও তাঁর জীবনের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না এনআইএ এবং তাদেরই মদতে জেল আমলারা। এএ পরেও তাঁর স্ট্র ও সিপার তিনি ফেরত পাননি। জেল ক্যান্টিন থেকে কাজ চালানো গোছের একটি কিনে নিয়ে ছিলেন। সুষ্ঠু ভাবে দিনের পর দিন তাঁর খেতে না পারাটা আসলে তাঁকে না-খাইয়ে, অন্ন থেকে বঞ্চিত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার সামিল? জীবনের মহত্তম অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সামিল। অর্থাৎ, নাগরিকের জীবন রক্ষার দায়, জীবনের অধিকারের দায় স্বীকার করেই এই রায় দিয়েছিল উচ্চ আদালত। অর্থাৎ, জেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলেছিল। আদালতের উচিত ছিল না এমনটা জানার পর এই চরম অসুস্থ মানুষটির উপর, বিচারাধীন বন্দির উপর, বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিটির জীবন রক্ষা করার জন্য বিশেষ নজর দেওয়ার? উচিত ছিল না কো-মর্বিডিটি লক্ষণযুক্ত ব্যক্তিটিকে কোভিডে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার? নানা শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে অশক্ত করে তুলেছিল কিন্তু জেলের মধ্যে এক অশীতিপর বৃদ্ধের প্রয়োজনীয় খাদ্য-পথ্য অমিল হওয়ায় দিনে দিনে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছিল। সে কথা আদালতে জানিয়েও ছিলেন তিনি। আদালত এনআইএ-র বয়ানে বিশ্বাস করে প্রয়োজনীয় কোনও নির্দেশ দেয়নি। ঘোর অতিমারির মধ্যে শেষ পর্যন্ত তিনি কোভিডে আক্রান্ত হলেও কোভিড পরীক্ষা হয়নি। চার মাস আগেই টিকা পাওয়া উচিত ছিল। দেওয়া হয়নি তা। শেষ পর্যন্ত প্রবল অসুস্থতার পর কোভিড পজিটিভ নির্ণয় হলে মিলেছিল ওষুধ। অবশেষে উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। বিগত সাত মাসে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলির বিচারই শুরু হয়নি। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগই মিলল না তাঁর। বিনাবিচারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যু কেড়ে নিল তাঁকে। তাঁর প্রিয়জন তো বটেই বহু নাগরিকই মনে করছেন এ আসলে এক প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা।

দোষী সাব্যস্ত হোক কিংবা বিচারাধীন, একজন বন্দির সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। লঙ্ঘিত হলে তা রক্ষা করার দায়িত্ব আদালতের। আদালত সে দায়িত্ব পালন করেনি। তাঁকে তিলে তিলে মরতে দিয়েছে। কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। বম্বে হাইকোর্টে শেষ জামিনের আবেদনে রাঁচির বাগাইচা আশ্রমে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন আদিবাসী-প্রাণ ফাদার স্ট্যান স্বামী। আদালত তা মঞ্জুর করেনি। তবু, স্ট্যান লিখেছিলেন খাঁচাবন্দি পাখিও গাইতে পারে। তিনি বন্দি শিবিরে সহ-বন্দিদের মানবিক মুখগুলিও এঁকে রেখে গিয়েছেন।



মাদ্রাজ হাইকোর্ট করোনা-কালে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কিত এক মামলায় মন্তব্য করেছিল — কমিশনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা করা উচিত। আজ কার বিরুদ্ধে খুনের মামলা হবে? স্ট্যানের মৃত্যুর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, যিনি এই সেদিনও স্ট্যানের মুক্তির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছিলেন; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, এনআইএ ও ইউএপিএ যাঁর যাবতীয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার দ্বিমুখী হাতিয়ার; জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, আইন রক্ষার জন্য বেআইনে যাদের নির্ভরতা; নাকি বিচারব্যবস্থা? আইনসভা, প্রশাসন, পুলিশের প্রতিহিংসা ও দমনমূলক হিংস্র অন্যায়ের হাত থেকে একজন নাগরিককের রক্ষা পাওয়ার জন্য গণতন্ত্রের যে স্তম্ভটি শেষ আশ্রয়স্থল। ভীমা কোরেগাঁও মামলা, ১৬ নাগরিকের বন্দিত্ব এবং তাঁদের অন্যতম স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, ন্যায়বিচারের আশ্রয় আমরা হারিয়েছি। এবং এই দেশের বিচারব্যবস্থা গণতন্ত্রের অন্য তিন স্তম্ভের মতোই ন্যায়ধর্মহীন, নিষ্ঠুর, সমানুভূতি বর্জিত ও কাণ্ডজ্ঞানহীন। মাঝেমধ্যে যে আলোকবর্তিকার হদিশ মেলে তা নিছকই ব্যতিক্রম।

ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু আসলে এক বিচারবিভাগীয় হত্যাকাণ্ড। এ অপরাধের ক্ষমা নেই।

0 Comments

Post Comment