“ঘরের ছেলে ঘর দেখভালের দায়িত্ব পেলেন, ঘরের লোকেদের অবস্থা ভালো হবে” — জুন মাসের মাঝামাঝি সময় এই কথাই বলেছিলেন বিজেপি ঘনিষ্ঠ কিছু শ্রমিকেরা। তাঁদের ঘরের ছেলে অর্জুন সিং। তিনি শ্রমমন্ত্রী হওয়ার আগে অনেক ক’টি চটকল বন্ধ ছিলো। জুন মাসের মাঝামাঝি সময় মন্ত্রী অর্জুন সিং দায়িত্ব নিলেন সেইগুলো খোলার। এক ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে জানালেন, দশটি চটকল খুলবেন, কুড়ি হাজার শ্রমিককে কাজ দেবেন। অনেক শ্রমিকেরা আশা করেছিলেন, এই দশটি চটকলের মধ্যে ছিলো — উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল চটকল, এম্পায়ার চটকল, প্রবর্তক চটকল, অ্যালায়েন্স চটকল এবং হুগলির ইন্ডিয়া চটকল, ওয়েলিংটন চটকল ও হাওড়া জেলার মহাদেও চটকল। এইগুলো বিধানসভা নির্বাচনের কিছু দিন আগে বন্ধ হয়।
এখন বিজেপি সরকার তিন মাস অতিক্রান্ত। কিছু চটকল খুললেও ‘আধা’ খুলেছে, এখনও অনেক চটকল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। আধা-খোলা চটকলগুলোর অবস্থা কেমন? সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচদিন, দুই শিফটে উৎপাদনের কাজ চলছে। অভিযোগ, কাজের বোঝা বাড়িয়ে, ঠিকা শ্রমিক বাড়ানো হয়েছে। বেশিরভাগ নাম-নম্বর যুক্ত শ্রমিককে কাজ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তাঁদের অলিখিতভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বন্ধ চটকলগুলোর অবস্থা আরও কঠিন। চটকলগুলোর ভবিষ্যৎ ভয়াবহ। শ্রমিকেরা জানান, কর্তৃপক্ষ মিল খোলবার জন্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে যে কথা বলছে, চুক্তিপত্রে ভিন্ন কথা লিখছে। যার ফলে নাম-নম্বর যুক্ত আরও অনেক শ্রমিকেরা ছাঁটাই হবেন।
এই দেশে “Composite Jute Mill”-এর সংখ্যা তিরাশি। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে চৌষট্টি’টি রয়েছে। প্রায় সব ক’টি কর্তৃপক্ষের অপেশাদারিত্ব ও পুরোনো সরকারগুলোর উদাসীনতার জন্য অনেক আগে থেকেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। তেইশটি চটকলের কর্তৃপক্ষ আর্থিক লোকসানের গল্প-কথা শুনিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আত্মসাৎ করবার পথে হাঁটছিল। কিছু চটকলের কর্তৃপক্ষ শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আত্মসাৎ করে, জাতীয় ট্রাইব্যুনাল-এ ‘অর্থনৈতিক শূণ্যতা’র কথা ঘোষণা করে সেই চটকল ছেড়েছে। নতুন সরকার এর বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? বিজেপি সরকার শিল্প ও শ্রমিকের জন্য কী করছে? এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো কারখানার প্রচলিত ইউনিয়ন ও স্বঘোষিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে রাজনৈতিক হয়ে উঠেনি এখনও। বরং, তারা এ ব্যাপারে নানা কায়দায় বিজেপির অবস্থানের পক্ষ নিচ্ছে।
বিজেপি সরকারের শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং চটকলের সব থেকে ‘বিতর্কিত’, ত্রিপাক্ষিক চুক্তি ‘সম্পূর্ণ’ লাগু করবার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রতিটি চটকলে ‘তাঁত’ বিভাগে নতুন মেশিন ‘চিনা’ তাঁত ছ’টি থেকে আট’টি চালানোর দিকে হাঁটছেন। পূর্বের তৃণমূল সরকারের আমলে এই চুক্তি কাগজে লাগু (২০২৪ সালের ৩রা জানুয়ারি) হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তা বাস্তবায়িত করতে গেলে শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে কয়েকটি চটকল। আন্দোলনের প্রধান দাবি হয়ে ওঠে — অনৈতিক ‘বিভাগ বদলি’ বন্ধের ও নতুন ‘চিনা’ তাঁত মেশিনে কাজ করা বন্ধ করবার এবং মজুরি বাড়ানোর। এই দাবিগুলোকে সামনে রেখে হুগলির ভদ্রেশ্বর ‘শ্যামনগর নর্থ’ চটকলের শ্রমিকেরা উৎপাদনের কাজ বন্ধ করে দেন। পরিবার সমেত ১৪ দিনের ধরনা দেন চটকলের গেটের সামনে(২০২৪ সালের মার্চ মাসে)। হুগলির অ্যাঙ্গাস ও উত্তর ২৪ পরগণার কামারহাটী চটকলের ‘তাঁত’ বিভাগের অনেক শ্রমিকেরা একই দাবিতে কাজ বন্ধ করেন এবং কর্তৃপক্ষ ও শ্রম দফতরের মধ্যকার যোগসাজশের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি, আরও কিছু চটকলেও সাময়িক বিক্ষোভের সূচনা তৈরি হয়। ফলে, তৃণমূল সরকার নিয়ন্ত্রিত শ্রম দফতর অ্যাঙ্গাস ও কামারহাটী চটকলের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কেস করে। শ্রমিকেরা ক’টি করে মেশিন চালাবেন তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবার জন্য ‘স্টেট প্রোডাক্টিভ কাউন্সিল’(SPC)-এর কমিটি তৈরি করা হয়। এর তদন্ত রিপোর্ট অপ্রকাশিত হয়ে থাকে, এসব নিয়ে আর.টি.আই করা হলেও শ্রম দফতর যথাযথ উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরকারের করা কেসে ‘লেবার ট্রাইব্যুনাল’-এ শ্রমিকেরা অনেকটাই এগিয়ে যান। এই গোটা সময় জুড়ে বেশিরভাগ চটকলে ‘বিভাগ বদলি’ ও ছ’টি করে ‘চিনা’ তাঁত চালানো অনেকখানি বন্ধ হয়ে যায়।
আসলে ২০২৪ সালের চটকল ত্রিপাক্ষিক চুক্তি’র পর থেকে কারখানার ভেতরে ভয়ংকর বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি হয়। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা মত পুরোনো মেশিন (মোটা, হাঁসিয়া) উপড়ে ফেলতে শুরু করে। পুরোনো শ্রমিকদের আরও মজুরি কমিয়ে গায়ের জোরে ‘বিভাগ বদলি’ করে নতুন মেশিনে কাজ শিখতে পাঠায়। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নাম-নম্বর যুক্ত শ্রমিকের উপরে আগের থেকে তিন গুণ চাপ বৃদ্ধি করবার চেষ্টা চালায়। ফলে, কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া ‘কাজের বোঝা’ সহ্য না করতে পেরে জীবনের মধ্য বয়সে এসে, পনেরো-কুড়ি বছর কাজ করবার পর অসংখ্য নাম-নম্বর যুক্ত ‘ক্যাজুয়াল’ বা ‘অস্থায়ী’ শ্রমিক অলিখিতভাবে ছাঁটাই হন। কারখানার ভেতরে অনেকে প্রাণ হারান, কাজ থেকে অলিখিতভাবে ছাঁটাই হয়ে অনেক শ্রমিক আত্মঘাতী হন। শ্রমিকের প্রাণ নেওয়া এখন চটশিল্পকে ধ্বংস করবার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তাই চটের বস্তার গুণগতমানও তলানিতে ঠেকছে। পুরোনো মেশিনের ডবল বা ট্রিপল সুতোর স্বাস্থ্যবান বস্তা এখন ‘চিনা তাঁত'(S4A loom)-এ সিঙ্গেল সুতোর পচা, কমজোরী বস্তায় পরিণত হয়েছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ বহু রাজ্য অর্ডার দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে, এ কথা সেইসময় জানিয়েছিলেন, মালিকদের সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান জুট মিল অ্যাসোসিয়েশন'(IJMA)। রাজ্যের শ্রম দফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, চটের বস্তার অর্ডার খোদ কেন্দ্র সরকারও কমিয়ে দিয়েছে। আসলে ‘চিনা’ তাঁত(S4A loom)-এর সিঙ্গেল সুতোর বস্তা ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’। ফলে, সবজি, সিমেন্ট, চিনি ইত্যাদি দ্রব্যপণ্য রাখবার ক্ষেত্রে অপরিণত। এই বস্তার ব্যবহার পরিবেশেকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলছে, পরিবেশবিদরা এমনটাই বলছেন। ‘তাঁত’ বিভাগ ছাড়াও অন্যান্য বিভাগেও নতুন মেশিন বসছে, অনেক বিভাগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে(যেমন - বীমাকল ও ফোঁকানলি)। যার ফলে শ্রমিকের অলিখিত ছাঁটাই ও স্বেচ্ছায় কাজ ছেড়ে দেওয়ার পরিমাণ ও উৎপাদনে ঘাটতি বৃদ্ধির পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে চটকলে ঘুর পথে ঠিকা প্রথার ‘ভাউচার’ শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি বিভাগ আলাদা আলাদা ঠিকাদারের সাম্রাজ্যে পরিণত হচ্ছে। যাদের কাজ শিল্পের মালিকদের জন্য বাইরে থেকে স্বল্পমূল্যের অতিদক্ষ, দক্ষ, অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক খুঁজে আনা, কর্তৃপক্ষের চাহিদা মত শ্রমিকের যোগান দেওয়া। কর্তৃপক্ষ থেকে আজকের বিজেপি সরকার – সকলের উদ্দেশ্য এটা। চটশিল্পে চুক্তির পরবর্তী সময় থেকে, বর্তমানে এই ঠিকাদারি রাজত্বে সবথেকে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। তাই পূর্বের সরকারের আমলে করা — বিভাগ বদলি ও ‘চিনা’ তাঁত বিরোধী কেস, শ্রমিকের পি.এফ, গ্রাচ্যুইটিসহ ন্যায্য পাওয়ানো কেসগুলো বিজেপি সরকারের আমলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার আসবার পর থেকে ‘লেবার ট্রাইব্যুনাল’-এ বিচারকের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। তারিখের পর তারিখ বদলাচ্ছে। অর্থাৎ, পূর্বের সরকারের আমলে শ্রমিকদের লড়াই করে আদায় করা ন্যূনতম, সামান্য অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চালাচ্ছে বিজেপি সরকার, এই ৯০ দিনের(তিন মাস) মধ্যে। শ্রমিক ‘দরদী’, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক প্রবীণ উকিল জানান, শ্রমিকের বিচার পাওয়ার শেষ জায়গা আদালত, সেটাকে ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকেরা যাতে নতুন সরকারের পা’য়ে এসে পড়েন এবং রাজ্য বিজেপির সংগঠন ফুলেফেঁপে উঠে।
বাস্তবেও খানিক এমনটাই ঘটছে। কোথাও সাধারণ শ্রমিকেরা বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক সংগঠনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। নতুন বিধায়কদের সাথে দেখা করছেন, নানা সমস্যার কথা তুলে ধরতে। সেই বিধায়কেরা ঘুরপথে কর্তৃপক্ষের ল্যাজ ধরছেন। বলছেন, চটকল বন্ধ হলে আসতে। আবার, বেশিরভাগ জায়গাতেই বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো আন্দোলনকারী শ্রমিক থেকে সাধারণ শ্রমিকদের পদ, কাঁচা টাকাসহ নানা কিছুর লোভ দেখিয়ে নিজেদের দিকে টানবার চেষ্টা চালাচ্ছে। শ্রমিকদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে বিজেপির ট্রেড ইউনিয়ন ‘ভারতীয় জনতা মজদুর কাউন্সিল’(BJMC) বিভিন্ন চটকলে নিজেদের সংগঠন বিস্তারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু, পেরে উঠছে না। সিংহ ভাগ চটকলে বিজেপির ইউনিয়ন গড়ে উঠবার মত সদস্য সংখ্যা জোগাড় হয়নি এখনও। বেশিরভাগ শ্রমিকেরা বিজেপি সরকারের এই নিকৃষ্টমানের ধূর্ত রাজনৈতিক কৌশল খুব সহজেই ধরে ফেলছেন। অনেকে অর্জুন সিং-কে নিয়ে মস্করা করে বলছেন, “ঘরের ছেলে বেপথে গেছে, বেয়াদপি করছে, ঘরের লোকেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।” এই তিন মাসে বিজেপি সরকারের চালচলনও সেই দিকে। এখন অনেকের কাছে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে যে, পরিবর্তিত নতুন, বিজেপি সরকার চাইছে — স্বল্প ব্যয়ে কম সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ কাজ করাতে। শ্রমিকের জীবনকে বিপদের দ্বারপ্রান্তে পাঠিয়ে বড় ব্যবসায়ীদের কাঁচা মুনাফার বৃদ্ধি ঘটাতে।