পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

শ্লোগানে শ্লোগানে ভরা দেওয়ালে দেওয়ালে…

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : সুজাত ভদ্র
এরাজ্যের সরকার বাহাদুর কি জানে আরেকটি মৌল সত্যকে : শুধু যাদবপুর কেন, পৃথিবী জুড়ে ছাত্র ছাত্রীরা সাধারণভাবে রাষ্ট্রমুখী হয় না। প্রশ্নবিহীন আনুগত্য প্রদর্শন করে না। জ্ঞান অর্জন, যুক্তি বোধ তাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, তর্ক করতে শেখায়, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। সেই জন্যেই তারা বিশ্বজুড়ে প্যালেস্টাইন মানুষের পাশে সংহতির আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে, সেই জন্যেই দেওয়ালে দেওয়ালে শ্লোগান লেখা হয়।

"Talk is cheap. Free speech isn't."
       

এই স্টিকারটি একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকায় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এখন এরাজ্যে দেখছি, মত প্রকাশের অধিকার বেশ দুর্মূল্য হয়ে উঠেছে, সস্তা কথার, তর্জন গর্জনের ভাষা রীতিমতো কথ্য ভাষার স্বাভাবিক রূপ ধারণ করেছে। যদিও মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল জরুরি অবস্থার পর্বের একটি কুখ্যাত মন্ত্রকে: 'কথা কম কাজ বেশি।' প্রায় চার মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে, চার মাস জুড়েই নানা সাংবিধানিক প্রধানের, শাসক দলের প্রধানের কথার ফুলঝুরিতে বঙ্গবাসীদের কান ঝালাপালা, ত্রাহি ত্রাহি রব। মূল স্রোতের গণ মাধ্যম সস্তা কথার, হুমকি যুক্ত বাক্যবাণের ইকো ব্যবস্থার ভূমিকা পালন করছে। ক্রিটিক আজ বিরলতম জীব।
এই আবহে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে  ২০ অগাস্ট দুপুরে এবং আরেকদিন মাঝ রাতে অভূতপূর্ব   "অশান্তির ঘটনা" ঘটলো বা ঘটানো হল। শুধু এবিভিপি নয়, রাজ্য সরকার জড়িয়ে নিল নিজেকে; স্থানীয় বিধায়কের মেদিনী কম্পিত তীব্র হুংকার আমরা শুনলাম। ক্ষীণ আশা ছিল, সরকার সেদিনের "গেরুয়া গুণ্ডামি" -র বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেবে। আশা করাটাই যে অর্বাচীনের মতো কাজ হয়েছে তা অচিরেই বুঝলাম।


শত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সমস্যায় দীর্ণ এই বাংলার কাজগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে, সরিয়ে রেখে, 'শত ব্যস্ততার' মধ্যেও  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, পুরো রাস্তা আটকিয়ে বিশাল প্যান্ডেল করে, বহু  মানুষের উপস্থিতিতে নতুন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং সভা করে ছাত্র সমাজকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে নিয়ে  "আমরা - ওরা" বিভাজন করে এসপার নয় ওসপার করে দেবেন বলে অ - মুখ্যমন্ত্রী সুলভ যুদ্ধ ঘোষণা করলেন, বঙ্গবাসীদের সতর্ক করে দিলেন। যেন সুসজ্জিত হাল্লা চলেছে যুদ্ধে!

মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে "মডেল ঢিটের" কৌশল প্রসঙ্গ উঠে এল: যে ভাবে ওসমানিয়া, জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম, অতি-বামদের জব্দ [সত্যি জব্দ করা গেছে?] করা হয়েছে, এবারে এবিভিপি নাকি সেইভাবে যাদবপুরেও 'দেশ বিরোধী শক্তিকে, টুকরে টুকরে গ্যাং' - কে শায়েস্তা করবে। একজন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত শিক্ষক তথা পূর্বতন রাজ্যপালের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, যাদবপুরে  ১৩ হাজারের মধ্যে এবিভিপির নাকি ১৩ জনও নেই! তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও,  ব্যাপারটা  আদৌ সংখ্যার নয়, ক্যাম্পাসে  পড়ুয়াদের  সমর্থন  আছে কিনা,  সেটাও  বিচার্য নয়। বিচার্য হল: তাদের মানসিকতা, তাদের সংস্কৃতি; দখল না করা পর্যন্ত এই শিক্ষা অঙ্গনে 'শান্তি পর্বের' [শ্মশানের?] দেখা মিলবে না। "ভূত আমার পূত, পেত্নি আমার ঝি, রাষ্ট্রবাদী সরকার আমার সাথে আছে, করবে আমায় কি?" -- এই মহান  মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ এই  বাহিনী তাণ্ডবের পুনরায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার উদাহরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন "গেরুয়া গুন্ডামির" নিরপেক্ষ তদন্তের কোনও উদ্যোগ সরকার না নিয়ে আক্রমণকারী এবিভিপির সমর্থনে রাস্তায় নেমে পড়ে। আচার্য হিরন্ময় নীরবতা পালন করেন। পুলিশ ৯০ শতাংশ নিষ্ক্রিয় থাকে। তবে ছাত্ররা, বাম ছাত্র সংগঠনগুলো দারুণ প্রতিবাদ জারি রেখেছে। 

যাদবপুর শিক্ষায়নটি যে দেশের প্রধান শাসক দলের আক্রমণের নিশানায় ছিল বা আছে, তা ভালোমতো বোঝা গেছিল  বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এক নির্বাচনী সভায় প্রধানমন্ত্রীর যাদবপুর নিয়ে এক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে। তাঁর বা তাঁর দলের (বা= দেশ) রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হোমিওপ্যাথি ডোজ যুক্ত তকমা দেওয়ার খেলায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ১৫ অগাস্ট লালকেল্লা থেকে সেই বিষাক্ত তকমা বাণ দেশবাসীর কাছে প্রেরণ করা হল: "দিমাগি নকশাল"। কর্তব্যও বলে দেওয়া হল : চিহ্নিতকরণ ও বিচ্ছিন্নকরণ । সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ মোতাবেক অস্পৃশ্যকরণ  নিষিদ্ধ। তেনারা বলবেন, হ্যাঁ, কিন্তু রাজনৈতিক অস্পৃশ্যকরণ তো নিষিদ্ধ নয়। অতএব...।


খেয়াল করবেন, "দিমাগি"দের ( যদিও কেউ জানে না তারা কারা, শাসক যাকে মনে করে, করবে) মতাদর্শের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক নয়, আলোচনা নয়, স্রেফ নিশ্চিহ্নকরণ। কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তো ফতোয়া দিয়েই দিয়েছেন, জুটাদের তালিকা থেকে শিক্ষকদের  চিহ্নিত করে তাঁদের পাড়ায় পাড়ায় তাঁদের নামে পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হবে ! নাৎসিদের ইহুদিদের বাড়ি, দোকান চিহ্নিত করার বঙ্গীয় সংস্করণ যেন এই পন্থাটি। শাসক  দল তথা সরকারের এই নাৎসিকরণ মানসিকতার প্রায়োগিক ফলের মুখোমুখি পশ্চিমবঙ্গ আজ।


প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগও মূলত একই:  যাদবপুর "দেশবিরোধীদের" আখড়া। তাই "দেশ ভক্ত" কারীয়কর্তাদের আবশ্যিক কর্তব্য সেদিনই নির্ধারিত হয়ে গেছিল। নতুন হোমিওপ্যাথি বোমা হাতে এসে গেছে। সবাই 'অ্যাকশন মোডে' রয়েছে। "সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের" সংকেত পাওয়ার অপেক্ষায় তারা; প্রয়োজন কেবল  উপযুক্ত সময়, সুযোগ ও অজুহাত। সেটা পাওয়া গেল অগাস্ট মাসের শেষ দুই সপ্তাহে। ঘটনা প্রবাহের রিল আজ সর্বজনবিদিত। পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। যেটা আজ আলোচনার  প্রয়োজন আছে সেটা হল: মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্যদের অভিযোগের সারবত্তা নিয়ে, তাঁদের বক্তব্যের গভীরতা নিয়ে।


যাদবপুর ও জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নগন্য প্রাক্তনী হিসেবে বর্তমান পড়ুয়াদের পক্ষে সওয়াল করছি না এই নিবন্ধে। দরকারই নেই। তারা পূর্ণ মাত্রায় দক্ষ তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে। একজন করদাতা ভারতীয় নাগরিক [‘সার’ এ আমার নাম আছে!] হিসেবে এই লেখা।

রাষ্ট্রবাদী কারে কয়?

মুখ্যমন্ত্রী আকাশ পাতাল⊃1; বিদীর্ণ করে আমাদের জানিয়েছেন, তিনি, তাঁর নতুন  দল, তাঁর পরিচালিত সরকার 'রাষ্ট্রবাদী', এবং তিনি রাষ্ট্রবাদীর  'অধিকার'⊃2;  প্রয়োগ করছেন, করবেন। এই দুই শব্দবন্ধের সংজ্ঞার্থ তিনি বা অন্য কোনো বিদগ্ধ নেতা দেন নি। তবে রাষ্ট্রবাদের চরিত্র ঠিক কি ধরনের তা শাসক দলের রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ক্ষমতা যেন ছিনতাই করে খুল্লাম খুল্লা বুঝিয়ে দিয়েছেন ৫ অগাস্টের প্রাক মুহূর্তে: কাশ্মীর নিয়ে, অনুচ্ছেদ ৩৭০ পুনরুদ্ধার নিয়ে দাবি যারা তুলবেন তাদের পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে হাসপাতালের ওপিডি হয়ে বাড়ি ফেরতের ব্যবস্থা করার জন্য রাজ্যের পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন (অবশ্য সংবিধান বা দেশের আইনের কোন ধারা  মোতাবেক এই পেটানো হবে তা তিনি পুলিশকে লিক করে দেন নি)। পরন্তু, তিনি কিন্তু  সরকারের কেউ নন। রাজ্য সভায় তাঁরই সহকর্মী, কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স-র সাংসদ একই দাবি তুলেছেন। তাঁকে রাষ্ট্রবাদী শ্রী ভট্টাচার্য ওপিডিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে কোনও চাঞ্চল্যকর খবর আমাদের নজরে আসে নি। সেই দল কাশ্মীরে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরেও পুরো রাজ্যের মর্যাদা সহ অনুচ্ছেদ ৩৭০ ফেরতের দাবি করে যাচ্ছে; সেদিনও এই মর্মে স্মারকলিপি দিয়েছে ভারত সরকারকে। এগুলো "সংবিধান বিরোধী", "দেশ বিরোধী" কাজ বলে ভারতের স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাদের বিরুদ্ধে  ইউএপিএ লাগু করেছে বলে আমরা শুনি নি!


ব্যাখ্যাবিহীন যে কোনও চরিত্রের রাষ্ট্রবাদী তাঁরা হন না কেন, তাঁদের ভূমিকা যে সাংবিধানিক ভাবে সীমাবদ্ধ, তা তাঁরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন    তখনই, যখন তাঁরা সংবিধান মেনে সরকার গঠন করছেন, তাকে রক্ষা করার শপথ নিচ্ছেন, অঙ্গীকার করছেন। ১৯৫০ সাল থেকেই সংবিধানের অঙ্গ হিসেবেই জম্মু কাশ্মীর সম্বন্ধীয় ৩৭০ অনুচ্ছেদ ছিল। তাহলে তো তখন থেকেই প্রকৃত, খাঁটি রাষ্ট্রবাদী দল হিসেবে জনসংঘ, তারই উত্তরসূরি বিজেপি বা শ্যামাপ্রসাদ সহ  অন্যান্য সহকর্মী ( বর্তমানের শ্রী ভট্টাচার্য) ৩৭০ মেনে নেওয়া উচিত ছিল। "রাষ্ট্রের অধিকার"কে তাহলে তাঁদের স্বীকার করে নেওয়া একমাত্র কর্তব্য ছিল। তা না করে প্রথম থেকেই ৩৭০ বাতিল করতে হবে দাবি নিরন্তর করা (২০১৯, ৫ আগস্ট পর্যন্ত ) তাহলে রাষ্ট্র বিরোধিতার, দেশ বিরোধিতার, টুকরে টুকরে গ্যাং কার্য কলাপের কদর্য ইতিহাস ছিল? বিপরীতে, আজ  ঊনসত্তর বছরের পুরাতন  অনুচ্ছেদ ৩৭০ কে পুনরুদ্ধার করার দাবি  তাহলে কেন রাষ্ট্র বিরোধী হবে? বরং তাঁরাই তো " "এক দেশ, এক সংবিধান" মেনে নিয়ে ৩৭০ কে মেনে খাঁটি রাষ্ট্রবাদীর  ভূমিকা পালন করেছিলেন। সম্মান তো তাদের পাওয়ার কথা। যারা ৩৭০ বাতিল করতে হবে বলে  ৬৯ বছর ধরে বলে আসছিলেন , তাঁদের  তো ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল কারাগার।


অবশ্য, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনের নানা বাঁক থাকার ফলে তাঁর  অতীত একটু সমস্যার। কংগ্রেস, তৃণমূল দলের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত থাকার ফলে ২০২০ পর্যন্ত ৩৭০ এর পক্ষে ছিলেন; অর্থাৎ  তিনিও তখন বিজেপির রাষ্ট্র তথা দেশ বিরোধিতার সমালোচক ছিলেন; পরে  দল বদলের ফলে নিজেকে এখন আরএসএস-- বিজেপি টাইপ রাষ্ট্রবাদীর ঘোরতর নব্য প্রচারক তৈরি করা ছাড়া উপায় নেই; অতীতকে তো মুছে ফেলতেই হবে। ওপিডির হুংকার, দেশ বিরোধী তকমা দেগে দেওয়ার আখ্যান তাই আসলে, ভুয়া, অন্তঃসারশূন্য। আমরা অবশ্য যেটা বিকল্প হিসেবে বলতে পারি, সেটা হল, প্রাগুক্ত দুটো মত -- বাতিল করার দাবি ও করা  এবং বিপরীতে সাত  বছর ধরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ কে পুনরুদ্ধার করার  দাবি  --  সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। দুটোই  ভারতীয় সংবিধানের মুক্ত, স্বাধীন চিন্তার  সীমানার মধ্যেই পারফেক্টলি রয়েছে। কোনোটাই দেশবিরোধী নয়। বিতর্ক চলবে ভবিষ্যতেও। তাকে দাবিয়ে রাখার পরিকল্পনা এক স্বৈরাচারী ভাবনা।

রাষ্ট্রবাদী হিসেবে, সংবিধান মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেনেওয়ালা রা স্বীকারও করেন, মহাত্মা গান্ধী হলেন আমাদের জাতির জনক। তাহলে তাঁর অন্যতম হত্যাকারী, নাথুরাম গডসের বই, তার উপর লেখা বই যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ প্রতিবছর বইমেলায় ( যেটা আবার জোর করে দখল করার চেষ্টা করছে সরকার  বিভীষণদের দিয়ে ) বিক্রি করে, আরএসএস কর্মীরা ঘরে ঘরে গডসের ছবি রাখে, পূজা করে হিন্দু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ শহীদ  নায়ক হিসেবে, তখন রাষ্ট্র বাদীরা তাদের বিরুদ্ধে  ব্যবস্থা  কেন নেন না?

উচ্চ শিক্ষা অঙ্গনে স্লোগান, গ্রাফিতি নৈব নৈব চ?

যাদবপুরের দেওয়াল জুড়ে নানা রাজনৈতিক স্লোগান, গ্রাফিতি কে ঘিরে রাষ্ট্রবাদী দের দু ধরনের  মতামত সামনে এসেছে।


১. বিশ্ববিদ্যালয় কে যদি নিজের বাড়ি মনে করে পড়ুয়ারা, তাহলে দেওয়াল  ক্লিন/পরিষ্কার রাখবে। যুক্তি টা অদ্ভুত। নিজের বাড়িতে কি লিখব, কি আঁকব, বা দেয়ালগুলো সাদা স্লেটের মতো রাখবো কিনা বাড়ির  মালিকের ব্যাপার। রাষ্ট্র বাদীদের নাক গলানোর কোনও এক্তিয়ার নেই। পরামর্শ না  চাইলে উপযাচক হয়ে দেওয়ারও দরকার নেই।


২. হ্যাঁ, লিখুক। কিন্তু কী লিখবে তা রাষ্ট্রনায়করা ঠিক করে দেবে। আর, অন্যরকম  কিছু লিখলে, বললে বরদাস্ত করা হবে না। বারবার অগাস্ট গুন্ডামির মুখোমুখি হতে হবে।
তবে যাদবপুরের পড়ুয়ারা  রাতের অন্ধকারে কাপুরুষের মত, কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে ঢুকে দেওয়াল লিখন মুছে দেওয়ার প্রতিবাদে করে; পাল্টা আবার  স্লোগান লেখে, ওই চুনকাম করা দেওয়ালের উপরেই। 

রাষ্ট্রবাদীদের একটা ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের ছাত্রদের শাস্তিদানের কাহিনী বলার  লোভ সংবরণ করতে পারছি না। মধ্যযুগে জার্মানির অন্যতম রোমান্টিক শহর  ছিল হাইডেলবার্গ। সেই হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের দুষ্টুমি, গণ্ডগোল ইত্যাদি বহুবিধ কারণে কয়েদ করে রাখতো। ছাত্ররা সেই কয়েদখানার দেওয়াল ভরিয়ে দিয়েছিল প্রতিবাদের গ্রাফিতি দিয়ে, স্লোগান দিয়ে। ভয় দেখিয়ে, গারদে পুরে মধ্যযুগেও পড়ুয়াদের দমন করতে পারে নি ক্ষমতাবানরা (দ্র booklet on HEIDELBERG STUDENT PRISON)। চেতনা  রাষ্ট্র দিয়ে দমন করা যায় না - এই শিক্ষা যত তাড়াতাড়ি  আমাদের শাসককেরা বুঝবে তত তাদেরই মঙ্গল। হেগেল যদিও বলেছেন, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।


এরাজ্যের সরকার বাহাদুর কি জানে আরেকটি মৌল সত্যকে : শুধু যাদবপুর কেন, পৃথিবী জুড়ে ছাত্র ছাত্রীরা সাধারণভাবে রাষ্ট্রমুখী হয় না। প্রশ্নবিহীন আনুগত্য প্রদর্শন করে না। জ্ঞান অর্জন, যুক্তি বোধ তাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, তর্ক করতে শেখায়, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়। তাই তারা যখন দেখে, নেলসন ম্যান্ডেলার বিখ্যাত উক্তির  অনুসরণে বলা যায়, "injustice anywhere is a threat to justice everywhere", তখন তারা সমষ্টিগত ভাবে প্রতিবাদ করে, ন্যায় পক্ষকে সংহতি জানায়। তাই তারা যখন লেখে, "Free the Palestine", তখন তারা বিশ্বজুড়ে প্যালেস্টাইন মানুষের পাশে সংহতির আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে, জিয়নবাদের বিরুদ্ধে  সরব হয়। গণতান্ত্রিক দেশে এই মতের বহিঃপ্রকাশের মধ্যে  অপরাধ কোথায়? এই স্লোগান দেশ বিরোধী কেন  হবে?  যাদবপুরেরই তো ৩ সেপ্টেম্বর ত্রিগুণা সেন হলের সামনে রাষ্ট্রবাদী দাবিদাররা ফ্লেক্সে জনসংঘী, ভারতের প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী বাজপেয়ী প্যালেস্টাইন ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের হাত তুলে নেওয়ার পক্ষে মত দেন বলে প্রচার করেছিল। তিনি আরাফাতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। আবার, মোদির নেতৃত্বে ভারত সরকার রাষ্ট্র সংঘের  সাধারণ পরিষদে এই চলতি বছরেই প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়েছে। ভারতের এক প্রাক্তন বিচারপতি সম্প্রতি প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলের মানবতা বিরোধী কার্যকলাপকে বিচার করার তদন্ত ট্রাইব্যুনালের প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন। এখন এগুলোকে অস্বীকার করে যদি মুখ্যমন্ত্রীর মানদণ্ড নিয়ে এগোতে যাই আমরা, তাহলে গাড্ডায় গিয়ে পড়বো : খোদ বাজপেয়ী থেকে মোদিকে দেশবিরোধী বলতে হয়, ভারত সরকারকে দেশ বিরোধী সরকার বলতে হয়। একথা বলার সাহস কি পশ্চিম বাঙলার স্বঘোষিত নব্য রাষ্ট্র বাদীদের আছে?


তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের শুরুতেই [যখন তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন] যৌথ বাহিনীর হাতে নিহত মাওবাদী নেতা কিষেনজী কে লাল সেলাম জানিয়ে দেওয়াল লিখনের ঘটনাতে মুখ্যমন্ত্রী তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। আপত্তির কারণও জানিয়েছেন: তিনি হিংসার পথে ভারতে বিপ্লবের চেষ্টা করেছিলেন। সেই অপরাধে তাঁকে নিহত হতে হয়েছিল রাষ্ট্রের হাতে। তাই তিনি নিষিদ্ধ নাম। তাই তিনি সম্মান পেতে পারেন না। তথ্য বলছে, ভারত সরকার, অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশ সরকার, এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার নিষিদ্ধ মাওবাদী দলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসেছে; এটা ঠিক, সব আলোচনাই ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এদেশেরই মানুষ কিষেনজীরা স্বাধীনতা সংগ্রামের মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবীদের মতোই শোষণ বিহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে আত্মত্যাগ করেছেন দেশের জন্য, তাঁর কোনো মুচলেকার ইতিহাস নেই। তাঁর পথ, মতের শত যোজন দূরে থেকেও, বিরোধিতা করেও তাঁর আত্মত্যাগকে সম্মান  জানাতে পারে না কেউ --- এই হুংকার সংবিধান সম্মত নয় দুটি কারণে। এক। ভারত সরকার আজও একই কায়দায় উত্তর পূর্ব ভারতে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র  বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চুক্তি করছে, প্রতিবছর যুদ্ধ বিরতি চুক্তি পুনর্নবীকরণ করছে। তাঁরা যদি সম্মান পেতে পারে, তাহলে কিষেনজীও সমভাবে সম্মান পেতে পারেন। দুই,  ১৯৯৫ সালের Balwant  Singh মামলায়  সুপ্রিম কোর্ট নিষ্পত্তি করে দিয়েছে, "খালিস্তান জিন্দাবাদ", "পাঞ্জাবকে হিন্দুস্তান থেকে মুক্ত করতে হবে" - এধরনের প্রকাশ্যে স্লোগান ওঠানো কোনও আইনি অপরাধ নয়। এই নিরিখে কিষেনজী  সংক্রান্ত দেওয়াল লিখন দেখে যে প্রতিক্রিয়া সরকারের তরফে দেখানো হয়েছে তা সংবিধান বিরোধী শুধু নয়,  মাত্রাতিরিক্তও বটে, আবার  একটি দেওয়াল লিখনকে অজুহাত করে, হাতিয়ার করে যাদবপুরে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন নামিয়ে আনার সরকারের একটা  কৌশল ছিল বা আছে।


বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত সত্য যে, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে   সবচেয়ে এগিয়ে। সেই সমস্ত শিক্ষায়নে কিন্তু সমানতালে প্রতিবাদী রাজনীতি  চলে, ক্যাম্পাসের বিশাল চত্বর গুলো ভরে যায় স্লোগানে, স্লোগানে, গ্রাফিতি তে। নানা ধরনের মত ব্যক্ত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শ গুলি পড়ুয়াদের মধ্যে চর্চিত হয়ে, চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটে। এই সমস্ত ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের স্পিচ কোড/ কথা বলার উপর নিষেধাজ্ঞার বিধি চাপানো হয় না। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় একবার চেষ্টা করেছিল স্পিচ কোড চালু করার। তা পরাস্ত হয় । কারণটা প্রণিধানযোগ্য: "...Through its long history, the cornerstone of this institution of higher learning  has been the idea that the truth  can be found  through critical thinking and learning ....
We needed to open our  minds to all ideas , even  those that hurt.
...We have a right to be challenged  with ideas that are not easy and that may hurt us...."[ দ্র Donald Alexander Downs, Restoring free speech and liberty on campus(2006) (2005), N.Y. p.272] (মোটা হরফ যোজিত)।


যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ সমস্ত উচ্চ শিক্ষা অঙ্গন ক্ষুরধার চিন্তা চেতনার স্থান হয়ে উঠুক, জ্ঞান চর্চার সঙ্গে সঙ্গে সত্য সন্ধানের পীঠস্থান হয়ে উঠুক , কোনো রংয়ের গুণ্ডামি, তাণ্ডবের, রাষ্ট্রীয় রক্ত চক্ষুর স্থান না হয়ে উঠুক - এটাই নাগরিক হিসেবে, প্রাক্তনী হিসেবে দেখে যেতে চাই।

----------------
⊃1;সচেতন ভাবে আমি আকাশ পাতাল লিখেছি; আসমান - জমিন লিখি নি। এই শব্দ বন্ধ সম্পর্কে  মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তি নেহাতই  সস্তার চমক। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর  লেখায় আসমান - জমিন ব্যবহার করেছেন। অন্যদের কথা না হয় বাদই দিলাম। এ প্রসঙ্গে দ্র আমার লেখা, সহমন, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬।

সেই লেখার সূত্র ঃ মোদী ও যোগীরা ভারতের ভাষার ইতিহাসকে মুছে দিতে চাইছে


⊃2;নোয়াম চমস্কি প্রমুখ রাষ্ট্রের অধিকার  নামক কোনো বস্তুকে তাত্ত্বিক ভাবে স্বীকারই করেন না। রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত entity; মার্ক্সবাদীদের ব্যাখ্যায়, নিপীড়নের হাতিয়ার। গান্ধীর কাছে হৃদয়হীন যন্ত্রবিশেষ/ soulless Machine মাত্র।


⊃3; মোদির আমলেই সংসদে বার বার প্রশ্ন করা হয়েছিল, টুকরে টুকরে গ্যাং বলতে, শহুরে নকশাল বলতে, দেশবিরোধী শক্তি বলতে সরকার কাদের বোঝাচ্ছে? সরকারের লিখিত উত্তর ছিল, সরকার এই বিষয়ে কিছু জানে না, কোনও তথ্য নেই। তবু বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে এই তকমাগুলো ব্যবহার করে আসছে মোদির দল ও সরকার। 

0 Comments

Post Comment