পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

লকডাউনের ছাদলিপি

  • 22 May, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 457 view(s)
  • লিখেছেন : উজ্জয়িনী হালিম
ক্রমে বেলাশেষের পাখিরা সঙ্গীদের ডাক দিয়ে বাসায় ফেরে, চারপাশে বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়া বয়, মাধবীলতার সুগন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পশ্চিমে সূর্য ঢলে পরে। আশপাশের গ্রাম থেকে আজান আর শাঁখের শব্দ একসাথে শোনা যায়। আকাশের গায়ে এক চিলতে চাঁদ ওঠে। মশাদের আগমনের আগেই ছাদের কাব্যে ছেদ পরে, মাদুর গোটানোর পালা শুরু হয়। কিন্তু দুটো তারা না দেখে কি ঘরে ঢোকা যায়। সেই ছোটবেলার গ্রাম গঞ্জের সংস্কার, এই প্রজন্মও বহন করছে। দুই তারা হয়তো একতার প্রতীক, হয়তো মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া পৃথিবীতে একা একা বাঁচা যায় না। তাই সন্ধ্যাতারা আর তার দোসরকে দেখে তবে লকডাউনের দিনলিপি শেষ হয়। রাত নামে।

আবার লকডাউন। ছোট থেকে লক আউট শুনে বড় হয়েছি। তা সে লক আউটের ছবি হয়তো আমাদের বয়সী কিছু মানুষের স্মৃতিতে এখনো আছে। শ্রমিক ইউনিয়ন, দাবি দাওয়ার আন্দোলন আর তারপর লক আউট। ৭০-৮০ র দশকের অনেক শিল্প সাহিত্যে সেই লক আউটের চিত্র ধরা আছে।

আর ২০২০-২১ এসে আমাদের রোজকার জীবনের ছন্দপতন ঘটিয়েছে লকডাউন। শব্দদুটির উৎপত্তিতে তফাৎ অনেক, কিন্ত ফলাফল প্রায় এক, হঠাৎ করে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া দৈনিক জীবনযাত্রা। সর্বগ্রাসী এক অনিশ্চিতের আশঙ্কা।

এখন সরকারি নির্দেশ হঠাৎ করে বদলে গেছে আমাদের রোজনামচা। লকডাউন এমন এক অভিনব অবস্থা, যার সাথে ধাতস্থ হতে আমাদের সময় লেগেছে। ধাতস্থ হওয়া আদৌ যায় কিনা, সেই প্রশ্নটা রয়েই যাচ্ছে। গত বছর লকডাউনের আলেখ্য জুড়ে ছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের অবর্ননীয় দুর্দশার গাথা। এ বছরও গরীব থেকে মধ্যবিত্ত, সবাই নাজেহাল, কলসির জল ঢেলে আর কতদিন খাওয়া যায়! সরকারি চাকরি আর কজন করে, বেসরকারি অফিসেও আবার অনিশ্চয়তার মেঘ। কিন্তু মানুষ শত কষ্টেও, দুরাবস্থাতেও জীবনের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পরতে চায় না। নিজেদের জীবনকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা, সামাজিকতার ভালো মন্দ থেকে মন দেওয়া নেওয়া পর্যন্ত সব কিছুই যে ফল্গুধারার মত বইতেই থাকে, সেটাও লকডাউনের এক প্রত্যক্ষ উপলব্ধি। এ নিয়েও নিশ্চয়ই একদিন আমাদের সাহিত্য সম্মৃদ্ধ হবে, সাহিত্য তো জীবনেরই দলিল। আমি সাহিত্য করছি না। শুধু শোনাব শহরতলীর, মফস্বলি লকডাউনের অন্য এক গল্প। লকডাউনের নানান রূপের মতন, এটাও একটা রূপ। ধরে নিন এটা আমার লকডাউনের ডায়েরির একটা ছেঁড়া পাতা।

কলকাতা থেকে ২৫-৩০ কিমি দূরের মফস্বল, এখনো বহুতল বাড়িরা এখানে আকাশ ঢেকে ফেলেনি। এখনো সব জলাশয় প্রমোটিংএর কবলে পড়েনি এ অঞ্চলে। চারদিকে গাছ গাছালির সজীবতা আর পাখপাখালির কলতানে, গ্রীষ্মের অসহনীয় দুপুরগুলিও মায়াবী। ঘোর গ্রীষ্মের দুপুরে প্রতি বছরেই থাকে এক অঘোষিত লকডাউন। গরমের মধ্যে সহজে কেউ বাইরে বের হয় না। কিন্তু এবারের লকডাউনের সাথে তার তফাৎ অনেক। যারা বারোমাস সংসার সামলান বা যারা অবসরপ্রাপ্ত, তাদের চিরকেলে একচেটিয়া ও পরিচিত গ্রীষ্মের লকডাউনে এবার ইস্কুল পড়ুয়া থেকে কলেজের ছাত্র - ছাত্রী, চাকুরীজীবী থেকে ব্যবসায়ী, এক কথায় সব্বার বাধ্যতামূলক উপস্থিতি। আর এ লকডাউন স্বেচ্ছাধীন নয়, আইনের আদেশ।

তাই চরিত্রগতভাবে আলাদা এই লকডাউন, অনেক নতুন সমস্যার পাশাপাশি যে নতুন সামাজিকতার পরিসর তৈরি করেছে, তা বেশ দৃষ্টি কাড়ে। আমি তো একে বলি 'লাভ ইন দা টাইম অফ লকডাউন' - না না লাভ বলতে শুধু প্রেমিক প্রেমিকার কথা বলছি না, শহুরে সভ্যতার আগ্রাসনে গুটিয়ে যাওয়া শহরতলীর নিজস্ব জীবনের ভালোবাসার যে রঙ ছিল, তার কিছুটা হলেও যে প্রত্যাবর্তন হয়েছে, তার কথা বলছি। এর একটা উদাহরণই দিই আজ।

আমাদের এখানে, মফস্বলের লকডাউন দিব্বি হচ্ছে আর তার স্বরুপ যদি দেখতে হয়, তবে রাস্তায় কজন হাঁটছে না গুনে বরং দৃষ্টি রাখা দরকার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বাড়িগুলোর ছাদের দিকে। পড়ার চেষ্টা করা জরুরী লকডাউনে ছাদের দিনলিপি। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই পাশাপাশি বাড়ির ছাদে সপরিবারে সবাই জড়ো হচ্ছেন। ছাদে ছাদে দেখাদেখি চলছে, কেউ অনুপস্থিত কিনা! অনুপস্থিতির একটাই কারণ এখানে সবার মাথায় গেঁথে গেছে, লুকিয়ে রাখা কোভিড সংক্রমণ। কাজেই নেহাৎ ঠেকায় না পরলে সব্বাই উপস্থিত। যারা ছাদ পর্যন্ত যেতে পারছেন না, বয়েসের কারণে, তারা নিদেনপক্ষে বারান্দায় হাজিরা দিচ্ছেন। হাজিরা পর্ব মিটলেই ছাদের আসল দিনলিপি শুরু হয়। এ প্রজন্মের কাছে হয়তো একটা নতুন দুনিয়ার দরজা খুলে যায়। কিন্তু আমাদের কাছে অতীতের অলস ছুটির বিকেলগুলো যেন ফিরে আসে। তা’বলে একেবারে যে নতুনত্ব নেই তাও নয়। শহরের কল্যাণে এসব অঞ্চলেও আজ পাড়া কালচার হারিয়ে যাওয়ার মুখে। তাই পাশাপাশি বাড়ি হলেও জানাশোনা নামমাত্র, কথাবার্তা কালেভদ্রে। তা সেই প্রতিবেশী, যার নামটুকুই শুধু জানা, সেও আজ ছাদের দুনিয়ায়, ভ্যাক্সিন রাজনীতির গল্পে মেতে ওঠে পাশের ছাদের মানুষের সঙ্গে। বয়ষ্কদের মধ্যে চলে একে অপরকে কোভিড থেকে বাঁচার টোটকা বলার প্রতিযোগিতা। যে সব অনুপানের কথা কানে আসে, তা বোধহয় এই মফস্বলেই চট করে পাওয়া সম্ভব, শেকড়বাকর থেকে শাক - পাতা পর্যন্ত। গিন্নি বান্নিরাও সেই আলোচনাতেই ঝোঁকেন, অবশ্য, ভালো করে কান পাতলে দুচারটে চমৎকার রান্নার রেসিপিও পেয়ে যাবেন তাদের কথোপকথনে।

কমবয়সীদের কথা আলাদা। ছোটরা ছাদে ঘুড়ি ওড়ায়, কিশোরীর দল এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে আচার ভাগ করে খায়, আর যে ইস্কুলে এক বছরেরও বেশি যাওয়া হয়নি, তারই নানা গপ্পো করে। কিছু স্বাস্থ্য সচেতন তরুণ - তরুণী, দেড় কাঠা জমিতে তৈরি বাড়ির ছাদে সান্ধ্য ভ্রমণ সারতে এমন পাক খায়, কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে দেখলে মাথা বন বন করে উঠবেই। তারা অবশ্য কত পা হাঁটা হল, সেই পরিমাপক ঘড়ি পরে হেঁটে হেঁটে রুটিন বজায় রাখে, হয়তো বা সুস্বাস্থ্যও।

অন্য দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায়, কিছু নবীন-নবীনারা ছাদের বাধা না মেনেই মন দেওয়া নেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা ছাদের জগতেরও উর্ধ্বে নিজেদের জগতে নিমগ্ন। চোখের কথায়, মুখের হাসিতে, হাতের ভঙ্গিতে যেন সাদা-কালো চলচ্চিত্রের যুগে ফেরা। এই তো সময়, হৃদয়ে তো আর লকডাউন হয়নি। অবশ্য হাতে হাতে সবারই মোবাইল, অনবরত টুং টাং মেসেজের শব্দ আসে, স্ক্রিনের দিকে দেখে ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটে, পাশের ছাদে অর্থবহ দৃষ্টি বিনিময় চলতে থাকে।মফস্বলি রূপকথাতেও শহুরে প্রযুক্তিকে এড়ানোর সাধ্য কি!

আমাদের চিরকেলে দাপুটে পাড়ার বৌদির দল, যাদের মুচকি হাসি আর চটুল রসিকতায় পাড়ার অবিবাহিত দেবর কুল তো বটেই, বাঁধা পরে যাওয়া দাদাদেরও চিত্তচাঞ্চল্য হত, এই লকডাউনে ছাদের কাব্যে তারাও আবার অতীত থেকে ফিরে এসেছেন। হাসি তামাশার তলায় যদি কিছু পরকীয়ার সূচনাও হয়, তা সে-তো সনাতন শাস্ত্রে জাতে উঠে গেছে কবেই। বরং লকডাউনের বদ্ধ পরিবেশে, দৈনন্দিন আসা মৃত্যুর খবরের মাঝে দাঁড়িয়ে, ছাদের এই দিনলিপি যেন সহজ স্বাভাবিক এক জীবন ফিরে পাওয়ার আশ্বাস যোগায়। যে জগতে শুধুমাত্র টিভি সিরিয়াল দেখার বাইরে, প্রতিদিনের ইঁদুর দৌড়ের কথা ভুলে, অন্যকে হারিয়ে দিয়ে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার ভীষণ চাপের উর্ধ্বে উঠে, সামাজিকতায়, মানবিকতায় প্রতিবেশীরা একে অপরের কাছে আসে। পাড়ার তরুণ -তরুণী বা দাদা - বৌদি, ভবিষ্যতের হিসেব না কষেই হয়তো ভালোবাসার অলীক মালা গাঁথে। অবশ্য সেই সাথেই পাড়ার গেজেটরাও আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের চোখ এড়ায় সাধ্য কার। আজকালকার মিডিয়াকে তারা হেলায় হারিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর আমার মত কিছু আহাম্মক ক্যামেরা হাতে ছবিও তোলে ছাদে

ঘুরে ঘুরে, প্রকৃতি থেকে মানবপ্রকৃতি - সবই বড় আকর্ষণীয়, আর এই লকডাউনের অবসর যে বড়ই দুষ্প্রাপ্য। ক্রমে বেলাশেষের পাখিরা সঙ্গীদের ডাক দিয়ে বাসায় ফেরে, চারপাশে বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়া বয়, মাধবীলতার সুগন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পশ্চিমে সূর্য ঢলে পরে। আশপাশের গ্রাম থেকে আজান আর শাঁখের শব্দ একসাথে শোনা যায়। আকাশের গায়ে এক চিলতে চাঁদ ওঠে। মশাদের আগমনের আগেই ছাদের কাব্যে ছেদ পরে, মাদুর গোটানোর পালা শুরু হয়।

কিন্তু দুটো তারা না দেখে কি ঘরে ঢোকা যায়। সেই ছোটবেলার গ্রাম গঞ্জের সংস্কার, এই প্রজন্মও বহন করছে। দুই তারা হয়তো একতার প্রতীক, হয়তো মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া পৃথিবীতে একা একা বাঁচা যায় না। তাই সন্ধ্যাতারা আর তার দোসরকে দেখে তবে লকডাউনের দিনলিপি শেষ হয়। রাত নামে।

0 Comments

Post Comment