তিনজন বন্ধু মিলে একটা সফটওয়্যার ডেভেলপ করেছে, একটা নিউজ পোর্টাল খুলেছে। প্রবহমান জীবনের ঘটনাবলী ও সমসাময়িক রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লেখে। এক কথায় ডিজিটাল ব্লগার। কাজের প্রয়োজনেই দিনের অনেকটা সময় সমাজমাধ্যমে অনলাইন থাকতে হয় এবং ল্যাপটপ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখতে হয়, কিন্তু ঘুম না হওয়ার সমস্যা কোনদিনই ছিল না। একটা বছর তিনেকের মেয়ে, একটা বছর পঁচিশের বউ ও বয়স্ক মা-বাবাকে নিয়ে বেশ চলছিল। বাড়িতে লক্ষ্মী-নারায়ণের নিত্য পুজো থেকে বড়দিনের কেক খাওয়া, ঈদে বন্ধু আইনুলের বাড়িতে সপরিবারে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা সবই চলছিল কাজের শতেক ব্যস্ততার ফাঁকেই। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, সমস্যা বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। ইদানীং বেশ কিছুদিন ধরে ঠিক মতো ঘুম হচ্ছে না, গত মাসখানেক ধরে চোখ বন্ধ করলেই একটা করুণ আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে, কানের কাছে বাজছে মৃত্যুর গগনভেদী চিৎকার। যত দিন যাচ্ছে তীব্রতা বাড়ছে চিৎকারের। প্রথম প্রথম কাজের চাপ ও ভবিষ্যতের চিন্তা ভেবে এড়িয়ে গেলেও এখন আর না ভেবে থাকা যাচ্ছে না। জাতি-ধর্ম-বর্ণে দীর্ণ সমাজ-সভ্যতা-সময়ের আর্তনাদ। শোষিতের আর্তনাদ। নারীর আর্তনাদ। শিশুর আর্তনাদ। অসহায় মানুষের আর্তনাদ। লেলিহান আগুনের আর্তনাদ। ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে।
আর্তনাদে আর্তনাদে দিশেহারা অনির্বাণ বন্ধুদের মনোবিদ দেখানোর পরামর্শ এড়িয়ে যাচ্ছিল সন্তর্পণে। পাগলের ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার মানে সবাই তো সহজভাবে নেবে না, বিশেষ করে জৈনির বাপের বাড়ি কেমন ভাবে নেবে? শেষে সেই জৈনিরই পরামর্শে তিন দিন চেষ্টার পর ডা: রাহুল রায়ের মুখোমুখি।
ডাক্তার বাবু, আমি ক'দিন ধরে একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছি।
খুব স্বাভাবিক। প্রতিক্রিয়াহীন হিমেল গলায়, জিজ্ঞাসা চিহ্নের ডগায় ঝুলছে স্থির দৃষ্টি।
খুব স্বাভাবিক (!) সমস্ত মুখমণ্ডল জুড়ে একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে রেখে অদ্ভুত রকমের জোর দিয়ে বলে- খুব অস্বাভাবিক।
- না, স্বপ্ন কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত যে, আমরা সারাদিন যা কিছু দেখি বা শিখি, ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলোকে গুছিয়ে রাখে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে রূপান্তর করার সময় যে চিত্রগুলো আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাই স্বপ্ন। স্বপ্ন আমাদের জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং আমাদের ব্যক্তিত্বের অপূর্ণ অংশগুলোকে পূর্ণ করার পথ দেখায়।
-ইন্টারনেটের ওপেন ডোমেনে কয়েক দিন ধরে এই সব অনেক পড়েছি জেনেছি। আপনার কাছে এসেছি প্রতিকারের আশায়।
- প্রথম একটা অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ শুনছেন, একটা আগুনের লেলিহান শিখা মানুষের শরীরের রক্ত লসিকার চর্বিতে জ্বলে উঠছে দাউদাউ করে, চারপাশে অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখছে কিন্তু কেউ কিছুই বলছে না। সাহায্য করতে এগিয়েও আসছে না, আগুনটা ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে মানুষ থেকে গাছ শহর থেকে গ্রাম নদী থেকে রাজপথ। প্রতিদিন দেখছেন একজন একজন করে দর্শক কমে যাচ্ছে। শেষ ডিসেম্বরের প্রবল শীতেও ঘামে ভিজে উঠছে শরীর।
- একদম ঠিক! কিন্তু আপনি...
অনির্বাণ অবাক বিষয়ে চেয়ে আছে ডা: রায়ের মুখের দিকে যেন গরুর ডানা হয়ে উড়ে যাচ্ছে কিংবা গাছেরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করছে নয়তো সরীসৃপ প্রাণীদের কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
কিভাবে সম্ভব। আপনিও কি?
গতকাল দেখেছেন আপনিই শেষ দর্শক তাই স্থির থাকতে পারেননি।
অনির্বাণের বিস্ময় বঁধেভাঙা বেনোজলের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার চেতনা, সে কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। আর কোনো প্রশ্ন করতে সাহস পাচ্ছে না। সে কি করবে ভাবতেই পারছে না। মাথাটা ভোঁ-ভোঁ করছে। যেন ঘুমের মধ্যে নয় জেগে থাকতেই ডা: রায়ের জীবন্ত বর্ণনায় ফিরে আসছে সেই দুঃস্বপ্ন।
ক'দিন ধরে রোগীদের স্বপ্নের কথা শুনতে শুনতে ডা: রায়ের ও মনে হচ্ছে তিনি নিজেও কি স্বপ্ন দেখছেন না? তিনিও তো এই স্বপ্নের মধ্যেই আছেন, মাঝে মাঝে স্বপ্ন আর বাস্তব আলাদা করা যাচ্ছে না। যায় না। কারণ একে অপরের পরিপূরক। দু'জনে হাত ধরাধরি করে চলে বলেই আমরা আছি, স্বপ্ন নিয়েই তো বাঁচি। সেই বেঁচে থাকার অবলম্বন আজ দুঃসহ দুর্বহ বেদনায় ভারাক্রান্ত।
বিরলের মধ্যে বিরলতম জঘন্যতম অপরাধে অভিযুক্তদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জনকল্যাণকামী গণতন্ত্রের সরকার নয়তো সরকারি দল। নারী ধর্ষণ ও নৃশংস খুনে অভিযুক্তকে ফুলমালা দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। ধর্মের নামে অবাধে চলছে হত্যা নির্যাতন লুটপাট। ধর্ম আজ মানবতার কলঙ্কে পরিণত হয়েছে, অত্যাচার ও আধিপত্য বিস্তার সংখ্যাগুরুর অধিকারে পরিণত হয়েছে, এক বিকৃত বোধ সমগ্র সমাজকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, সুস্থ চিন্তার মানুষগুলো ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে মুক্ত চিন্তাই আজ একমাত্র সংখ্যালঘু। মানুষকে বিচার করা হচ্ছে মনুষ্যত্ব দিয়ে নয় ধর্মের পরিচয়ে-অর্থের মানদণ্ডে। স্বদেশে ও প্রতিবেশী দেশে সাম্প্রতিক ও নিকট অতীত জুড়ে শুধুই সংখ্যালঘুর হাহাকার, ধর্ম ও ইজ্জত রক্ষার নিমিত্তে বেদনার্ত চোখের জলে ভিজে উঠছে রাজপথ। প্রান্তিক-এর টুটি টিপে ধরছে সংখ্যাতত্ত্বের আধিপত্যবাদ। দীপু দাস, আখলাক, আরিয়ান মিশ্র, আফানিউস, লাজারাস, বিপ্লব মণ্ডল, ধনঞ্জয় চাকমা, সাবির মালিক, জুয়েল রাণা সব মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে। তারও মাঝে মাঝে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একা থাকলে মাথায় হাত দিয়ে দেখছে চুলে আগুন ধরেছে কিনা।
ডা: রায় জিজ্ঞাসা করে- কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে? মনে হচ্ছে আপনি ঘুমিয়ে গেলে কেউ আপনার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে।
- একদম ঠিক।
না ঘুমিয়ে জানলার ধারে বসে থাকছেন, বন্ধ জানালার ওপারে কারা যায় আসে তাদের পায়ের ভাষা শুনছেন ও বোঝার চেষ্টা করছেন নতুন ভাষার ব্যাকরণ, কিন্তু ঠিক রপ্ত করতে পারছেন না, চেনা মুখগুলো মুখোশ হয়ে যাচ্ছে। পেঁয়াজের মতো খুলেই যাচ্ছে খুলেই যাচ্ছে শেষ হচ্ছে না, আপনি দেখছেন শূন্যতার নিকষ কালো রং চোখের সামনে ভুসোকালি ছড়িয়ে প্রতারণার ট্রাম্প কার্ড খেলছে।
ঠিক তাই। আপনিও কি একই স্বপ্ন দেখছেন কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব?
সম্ভব। সময়টা তো একই।
দুটো আলাদা মানুষ দুটো আলাদা অবস্থানে একই স্বপ্ন কিভাবে দেখে?
দেখে। দুজনেই যদি একই অস্থিরতার শিকার হয় তাহলে সম্ভব। আমাদের চেতন মনের প্রভাবেই তো অবচেতন তৈরি হয়। স্বপ্নও তো এক প্রকার অবচেতন, তাই চেতনের প্রভাব রোহিত নয়। আসলে কি জানেন আমাদের চারপাশের পরিবেশ এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এত দ্রুত সহনশীলতা হারাচ্ছে যে, আমরা যারা বদলে যাওয়ার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বদলাতে (নিকৃষ্ট ব্যক্তিবাদী হতে) পারছি না, পিছিয়ে পড়ছি সময়ের সমকক্ষ (হীনচরিত্রের দ্বিপদ জন্তু বিশেষ) হতে পারছি না। এই না পারার যন্ত্রণাই আমাদের অবচেতন-কে আক্রমণ করছে, আমরা দুঃসহ স্বপ্নের শিকার হয়ে পড়েছি।
ডাক্তারের কথা শুনতে শুনতে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা পরিমাপ করতে করতে অনির্বাণ যখন বিস্ময়ের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবলেশহীন হয়ে পড়ছিল- নিজেকে, সময়কে, সময়ের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলছিল, ঠিক যেমনটা হয় জটিল কোনো আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখতে (ভাবতে) বসলে, তখনই ডা: রায়ের মৃদু রসিকতা যা কঠিনতর সময়েও একমাত্র তাকেই শোভা পায়।
মুখটা বন্ধ করুন, মশা ঢুকে যাবে।
লজ্জা পেয়ে মুখ বন্ধ করে একটু নড়েচড়ে বসল অনির্বাণ। টেবিলে রাখা কাচের গ্লাস থেকে খানিকটা জল খেয়ে ডা: রায় আবার বলতে শুরু করলেন- এই একই ধরনের স্বপ্নের দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে মাসখানেক ধরে আমিও ব্যতিব্যস্ত অন্তত শ' পাঁচেক রুগী দেখেছি এবং আগামী ১৫ দিনের সমস্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট-প্রাপ্ত রোগীর প্রাথমিক লক্ষণ দুঃস্বপ্ন নিয়ে জেগে ওঠা ও ঘুমোতে না পারা।
আচ্ছা এর কি কোন প্রতিকার নেই?
- আছে। সমস্যটা যখন ব্যাক্তিগত নয়, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের থেকেও সমাজবিজ্ঞানের প্রতিকারের নিদান অনেক বেশি কার্যকর হবে। তাই প্রতিকারের সঠিক দিশা পেতে আগামী রবিবার বিকেল তিনটে ভাঙা মন্দিরের মাঠে আপনাকে আসতে হবে।
কেন?
এই স্বপ্নটা শুধু আপনি একা দেখছেন না গত এক দশক ধরে কি তার অনেক আগে থেকে অনেক অনেক মানুষ দেখছেন যারা আমার কাছে এসেছেন এবং যারা আসেননি কোনো না কোনো সূত্রে তাদের সবার কাছে খবর পাঠানোর চেষ্টা চলছে তারা যেন সবাই আগামী রবিবার বেলা তিনটায় ভাঙা মন্দিরের মাঠে জড়ো হয়ে প্রতিকারের সন্ধান পায়। যারা এই দুঃসহ স্বপ্নের কবলে পড়েছেন তারা সকলেই আসবেন। আপনিও আসুন। আর এই দুটো দিন এই ওষুধটা খান, হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ, তবে ইচ্ছা না করলে নাও খেতে পারেন,
সকালে ঘুম থেকে উঠে ও রাত্রে ঘুমাতে যাবার আগে একটু ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন।
রবিবার দেখা হবে।
প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে চেম্বার থেকে বেরতে বেরতে অনির্বাণের কেন জানি না শুধু 'হীরক রাজার দেশে' সিনেমার কথাই বেশি করে মনে পড়ছিল। যেন সে নিজেই সিনেমার ভিতর অনিচ্ছাতে ঢুকে পড়েছে, হীরক রাজা উদয়ন পণ্ডিত গুপী গাইন, বাঘা বাইন, যন্ত্রী (বিজ্ঞানী) মন্ত্রী মশাই চরণদাস, ফজলু, বলরাম সবাই তার চারপাশে হাঁটছে, তাকে দেখছে, কিন্তু সে সিনেমায় তার নিজের অবস্থান উপযোগিতা ও গুরত্ব অনুধাবন করতে পারছে না। ভাবতে ভাবতে একেবারে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে অনির্বাণ। কাতারে কাতারে মানুষ হাঁটছে, না, ঠিক হাঁটছে না যেন দৌড়চ্ছে। দুটো ভাতের জন্য, একটুকরো কাপড়ের জন্য, মাথার ওপর আচ্ছাদনের জন্য, বেঁচে থাকার স্বপ্নের জন্য মানুষগুলো পড়িমরি করে দৌড়াচ্ছে, লক্ষ্যহীন লক্ষ্যের দিকে। রাস্তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হয় এখন শুধু ঘুমিয়ে নয় সে জেগে জেগেও দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি তাই রবিবার ভাঙা মন্দিরের মাঠে তাকে যেতেই হবে তার আগে এই দুঃস্বপ্নটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে অনেক অনেক মানুষের মধ্যে।