পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক দিক

  • 11 December, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 326 view(s)
  • লিখেছেন : সৌমিত্র বসু
মানুষের শ্রম-শক্তি আর প্রকৃতির বৈচিত্র দুটোই ন্যাচারাল , দুটোই পুঁজির বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে এক বেঁচে থাকার লড়াই। কারণ পুঁজি শুধুই এক-করন চায়, পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই , প্রতিটি জনপদেই গড়ে উঠেছিল নিজস্ব শুশ্রুষা ব্যবস্থা, নতুন সৃজন, নতুন ফসল উৎপাদন এবং নতুন জীবনচর্যা। সমস্ত কিছুর ওপর দিয়ে বুলডোজার চলছে , বন্ধ হচ্ছে প্রাকৃতিক চিকিৎসা, প্রাকৃতিক ওষুধ, প্রাকৃতিক পথ্য, প্রাকৃতিক সেবা পদ্ধতি, এবং প্রাকৃতিক উৎসব - ঠিক একই কারণে এবং একই ধাঁচায় একই এক-করণের সেই বুলডোজারি ক্রিয়াকলাপে।

সিপিআইএমএলের দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ফ্যাসিবাদের এক ভারতীয় তর্জমা উপস্থাপন করেছেন - "রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক বিপর্যয়" - এবং একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আগের সমস্ত ইতিহাসের নিরিখে এক চরম বিপর্যয়। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু - সংস্কৃতির জগতে এবং সাংস্কৃতিক ভাবে [দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়বস্তু] ফ্যাসিবাদ এর মুখ কী বা কী কী ? মানুষ যখন সম্মান [ডিগনিটি ] এবং অস্মিতার ওপর আঘাত উপলব্ধি করে আর সেই উপলব্ধি যখন মাত্রা ছাড়া হয়ে পড়ে, তখন সেটা একটা শক্তিশালী বাস্তব আঘাত বা পোটেন্ট শক্তি হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায়। সেটাই মানুষের সম্মিলিত ভাবে মেনে নেওয়ার সীমাকে অতিক্রম করে যাওয়া অর্থাৎ সহ্যের সীমা পার করে দেওয়া চরম আঘাত - অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ।

ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক দিকটি কী ? তা হচ্ছে সমস্ত বৈচিত্র নিধনকারী এক বুলডোজারের সমানতা। অর্থাৎ সমস্ত বৈচিত্র বিলীন করে একটি সংস্কৃতি, একটি বহিঃপ্রকাশ , একটি কায়দা, একটি প্রকল্পের অধীনে একটিই পন্থা আর একটিই শিক্ষা। সব কিছুর ছোটোখাটো থেকে বড়ো মাঝারি পার্থক্যকে একেবারে দুরমুশ করে এককরণ [একীকরণ বা ইউনিফিকেশন নয় - কারণ ইউনিফিকেশন মানে বৈচিত্রের মধ্যে সাধারণ সূত্র খুঁজে বৈচিত্রগুলোর সম্মিলন করা এবং বৈচিত্র কে সেলেব্রেট করা।

যে কোনো এককরণ একটি বানোয়াটি কাল্পনিক প্রকল্প এবং কাল্পনিক বিনির্মাণ ( imagined construction) খুবই পরিচিত মহান সেই পন্ডিতের নাম না হয় না ই উল্লেখ করলাম। অর্থাৎ আগে থেকেই (apriori) এক কাঠামো আর কল্পনা বানিয়ে সমস্ত কিছুর ওপর দিয়ে সোজা রোলার বা বুলডোজার চালিয়ে একেবারে একটি কাঠামোর মধ্যে সমস্ত বৈচিত্রের সম্পদকে ধ্বংস করা। আমাদের দেশে যখনই সরকার বিপাকে পড়ে, যখনই সে মানুষের ইচ্ছা অভীপ্সার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কিছু স্যাঙাতের নির্দেশনায় তাদেরই সেবায় লিপ্ত হয়, তখনি এই ধরণের বুলডোজার চালায়। CAA- NPR-NRC এর পরে যখন দেশব্যাপী কৃষক আন্দোলনের চাপে তাদের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে তারা তখন যে শুধুই চীন-পাক দেখাচ্ছে তাই নয়, তারা তখন "এক জাতি , এক আইন, এক নিদান, এক দল, এক নেতা এক দর্শন, এক শিক্ষা " এইসব স্লোগানের মধ্যে আমাদের ঠেসে দিতে চাইছে। এই স্লোগান কিন্তু তাদের একেবারে গোড়ার দর্শন, এই দর্শনেই গড়ে উঠেছে এই দলটি। বিভিন্ন সংকটের সুযোগে এই বুলডোজার এর নীচে মানুষকে পিষে দেওয়ার জিগির তোলে , ফিকির খোঁজে, ফাঁক পেলেই আইন বানিয়ে প্রতিস্পর্ধীদের ফাটকে পোরে ।
ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক আসপেক্ট বা অভিব্যক্তির একটি বিশেষ কায়দা হচ্ছে যে কোনো সৃজনকে নাকি আধিকারিকদের সম্মতি নিতে হবে প্রকাশের জন্যে , নিতে হবে তাদের কাছ থেকেই যাঁরা সৃজন করেননি কখনো অথবা প্রসাদপোষনা ও ভজনার পেশায় নিযুক্ত সরকারি দলের সেবায়িত, হওয়ার কথা ছিল সম্মিলিত মানুষের সেবায়িত , হল অন্য কিছুর (অর্থাৎ পাবলিক সারভেন্ট হওয়ার বদলে গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট বা শাসকের সার্ভেন্ট) । এই বিষয় নিয়ে হেইনরিখ বোয়েলের একই বিখ্যাত নাটক আছে Ende Eine Diensfahrt বা "একটি সরকারি অভিগমনের শেষ "। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক দেখিয়েছেন যে সৃজনকে যদি সরকারি অনুমতি নিয়ে বানাতে হয় , তা হলে তা সৃজন নয়। তিনি জার্মানির প্রেক্ষিতে ১৯৬৮ তে নাটকটা লিখেছিলেন। আমাদের দেশে এখন সেটাই চলছে ,এখানে সরকারি আধিকারিকদের থেকে আগাম অনুমতি নিয়েই কাজ করতে হয়, এটাই ফ্যাসিবাদের প্রকরণ যা দিয়ে তারা সমস্ত ধরণের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিকে দমন করে. সেই বুলডোজার এর উপমা!

সৃজন বৈচিত্রের ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয়, বৈচিত্রকে আরো বৈচিত্রময় করে, কারণ এই বৈচিত্রের স্পৃহা আরো অনেক বেশি করে গড়ে তোলে নিত্য নতুন বৈচিত্র। আর তাই ফ্যাসিবাদ হচ্ছে সৃজনস্পৃহার এক বিপরীত প্রতিক্রিয়া। অদ্ভুত ভাবে দেখা গেছে যে ফ্যাসিবাদ বা ফ্যাসিবাদীদের হাত দিয়ে কোনো সৃজন বেরোয়নি। সেটাই স্বাভাবিক , হয়েছেও তাই। তারা কিছু নোংরামো এবং perversion কে সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সে সবগুলোকে অর্থ উপঢৌকন দিতে পারে , দিয়েও থাকে (সেই সব শিল্পনির্দেশক রা সেই মধুভান্ডর কিছু ছিঁটে ফোঁটা র লালসায় তাদের "প্রতিশিল্প" (obnoxious reactionary art) এর জন্ম দেয় , এটাও বুলডোজার এর সমগোত্রীয় কাজ কারণ সেগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে mass culture বা pop culture বা গণসংস্কৃতি হিসেবে দেখিয়ে তাকেই মেইনস্ট্রিম বলে চালায় আর সমস্ত সৃজন কে delegitimise বা marginalie করে একটি "এক দেশে একমাত্র সংস্কৃতির" ধারার প্রবর্তন করার চেষ্টা করে। যা ছিল নর্দমা এবং পয়ঃপ্রণালীর কূসৃজন তাকেই করা হয় প্রধান - এটাই জনমানসের gutterisation বা নর্দমাকরণ। ফ্যাসিবাদী বাতাবরণ তাই আজ পর্যন্ত কোথাও কখনো কোনো প্রগতিশীল বা তারাক্কী-পসন্দ সংস্কৃতি বানাতে পারেনি - এটাই সংস্কৃতির regression। যা ফ্যাসিবাদের একমাত্র সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি। আর ঠিক তাই মনুবাদী সাহিত্য হয়নি, বা কোনো মানবিক অধ্যয়ন বা humanities গড়ে তুলতে পারেনি ফ্যাসিবাদীরা। আমরা কি কোনো ফ্যাসিবাদী শিল্পীর নাম মনে করে বলতে পারবো ? পারবো না , কারণ তৈরিই হয়নি , এটাই স্বাভাবিক, আর এটাই যে বিজ্ঞান তা বুঝিয়ে দিলো মানুষের সভ্যতা।

ফ্যাসিবাদ মানুষের ওপরে যে এক-করণের বুলডোজার চালায় তা সে প্রকৃতিতে ওপরেও চালায় , এ দেশের বিশাল কার্পাস তুলোর উৎপাদন কে বন্ধ করে দিয়ে নীল চাষের নামে সমস্ত উৎপাদক কৃষককে ভিখিরি বানিয়ে একের পর এক মন্বন্তর তৈরী করলো , সে দেশে করেছিল যে দেশ শুধুই কৃষিপ্রধান ছিল না , সমগ্র পৃথিবীর ২৭% সম্পদ ভারতে উৎপন্ন হতো আর বাংলায় ২১%, এ দেশের নৌ বানিজ্যে এবং গঞ্জ -পোত্ গুলো পৃথিবী এবং সমগ্র এশিয়ার সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু পোত্ ছিল। ভারতের কৃষক কে দিয়ে নীল চাষ করিয়ে কৃষকদের না খাইয়ে মারলো , নীলকর সাহেবরা পয়সা নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে বিলেতে ফিরে ধনকুবের হয়ে উঠলো। জোর করে চাল উৎপাদন করিয়ে সেই চাল আফ্রিকাতে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের খাদ্য হিসেবে নিয়ে গেলো , আর ভারত আর বাংলার কৃষকরা কোনোক্রমে নিজেরই জমির চাল নিজেরাই চুরি করে বাঁচতে চাইতে গিয়ে ফাটকে ঢুকে গেলো , বাকিটা জমিদারের খাজনায় চলে গেলো। সমস্ত রকমের বিভিন্ন উৎপাদন ধ্বংস হয়ে গেলো , ধ্বংস করে দেওয়া হলো। এসব ছিল উপনিবেশের "বিদেশ" শাসনের চিত্র। দেশ নাকি "স্বাধীন " হয়েছে , শোষণের ধারা একই রয়ে গেছে। বর্তমানে বহু লড়াই এর পরে যখন কৃষক রা নিজেরাই সংকর ধান বানাচ্ছে বিভিন্ন ধরণের ফসল ফলাচ্ছে, তখন বৃহৎ পুঁজি এবং কর্পোরেট পুঁজি হয় সেগুলো বাধ্যতামূলক দামে "কিনে" নিচ্ছে , এবং পরের মরসুমে কৃষককে বাধ্য করছে নিজেদের আদেশমত ফসল উৎপাদনে , আর তার পাশে পাশে জল জঙ্গল, বস্তু বা উঁচু জমি ধ্বংস করে প্রকৃতির বহুবল্লভ চরিত্র কে ধ্বংস করছে। জঙ্গলের বৈচিত্রকে ধ্বংস করে খনি-মাফিয়াদের কাছে জঙ্গল বেঁচে দিয়ে আর আবাসন-হাঙ্গরদের কাছে ফসলী জমি তুলে দিয়ে সেই সব জমিকে মরুভূমি বানাচ্ছে , বানাচ্ছে মাটির নিচের সম্পদের জন্যে , স্বাধীন কৃষককে শ্রমমজুর আর ভিখিরিতে পরিণত করছে।

জন বেলামি ফস্টাররা দেখছেন তাঁদের গবেষণায় , মার্কস এই ভয়ঙ্কর পরিণতির ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন। আর আজকে তা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হচ্ছে। দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজি শোষণ করে আর তার ফ্যাসিবাদী শাসনের চরম রূপ কী ভাবে শ্রম, জমি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রকৃতির বৈচিত্রকে ধ্বংস করে চলেছে। বহু গবেষক এটাও দেখিয়েছেন যে তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে গ্রামীণ সম্পদ সৃষ্টির কেন্দ্র গুলোতে গ্রামীণ সংস্কৃতির পীঠস্থান হয়ে উঠেছিলো সেই সব দেশে এখন এমনকি সেই দেশীয় সংস্কৃতিকে "লোক" এবং "আঞ্চলিক" আখ্যা দিয়ে বহিরাগত বিদেশী নগর সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বিশ্বব্যাপী "এক" সংস্কৃতির "চাষ" কিন্তু ফ্যাসিবাদের এক ধরণ, এটা একেবারে পরিকল্পিত প্রকল্প। এক বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি যার নাম ওরা দিয়েছে নব-উদারনৈতিক সংস্কৃতি যার মধ্যে নবও কিছু নেই আর উদারনীতি তো দূরস্থান।

মানুষের শ্রম-শক্তি আর প্রকৃতির বৈচিত্র দুটোই ন্যাচারাল , দুটোই পুঁজির বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে এক বেঁচে থাকার লড়াই। কারণ পুঁজি শুধুই এক-করন চায়, পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই , প্রতিটি জনপদেই গড়ে উঠেছিল নিজস্ব শুশ্রুষা ব্যবস্থা, নতুন সৃজন, নতুন ফসল উৎপাদন এবং নতুন জীবনচর্যা। সমস্ত কিছুর ওপর দিয়ে বুলডোজার চলছে , বন্ধ হচ্ছে প্রাকৃতিক চিকিৎসা, প্রাকৃতিক ওষুধ, প্রাকৃতিক পথ্য, প্রাকৃতিক সেবা পদ্ধতি, এবং প্রাকৃতিক উৎসব - ঠিক একই কারণে এবং একই ধাঁচায় একই এক-করণের সেই বুলডোজারি ক্রিয়াকলাপে। অর্থাৎ বিশ্বে আজকে যখন দেখি কয়েকটি দেশে ফ্যাসিবাদের উত্থান, আমরা যেন ভুলে না যাই যে এটা বিশ্বপুঁজির ফ্যাসিকরণের ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়ারই একটা অবধারিত যাত্রা। শুধুই পেকে ওঠার অপেক্ষায়।

মানুষ সংস্কৃতির মধ্যে দিয়েই বৈচিত্রকে সেলিব্রেট করে, এবং পরে এই বৈচিত্র সৃষ্টির সুখ, পরিতৃপ্তি এবং আনন্দের উৎসবে আবার নতুন সম্পদ এবং নিত্য নতুন বৈচিত্র সৃষ্টি করে , এটাই এক রূপ থেকে আর এক রূপে অবাধ চলাফেরার প্রক্রিয়া , এটাই মানুষের ও প্রকৃতির বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক বাধ্যতা , যা পূর্ণ স্বাধীনতা এবং গণত্রান্ত্রিকতা ছাড়া সম্ভব নয়. আর এটাকেই বন্ধ ও দাবিয়ে রাখবার জন্যেই তৈরী হয় ফ্যাসিবাদী এক-করণের প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি। সুতরাং বৈচিত্রের আরাধনাই ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের এক বাস্তবিক প্রকরণ।

0 Comments

Post Comment