পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বর্ষারাতের গল্প

  • 22 August, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 413 view(s)
  • লিখেছেন : ব্রতী মুখোপাধ্যায়
শোনা গল্প। বন্ধুর কাছে শোনা। অনেকদিন ধরেই ভাবছি সবাইকে গল্পটি শোনাই। ভাবছিলাম কোথা থেকে আরম্ভ করি। শোনা তো, একটু এলোমেলো ছিলই। তার ওপর বলেছিল, আসলে গল্প নয়। গল্প নয় মানে সত্যি। হতে পারে, না হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। অথবা কোথাও সত্যি, কোথাও আবার কাল্পনিক সুতো দিয়ে মুড়ে দেয়া। গল্পটি একদিক দিয়ে দেখতে গেলে অনসূয়ার। অনসূয়ার একসময় মনে হতে থাকে কেউ হয়ত তাকে হত্যা করবে। অন্যদিক দিয়ে দেখলে গল্পটি বলা যেতে পারে প্রিয়াংশুরও। প্রিয়াংশু একদিন জানতে পারল তার স্ত্রী এইরকম ভয় পাচ্ছে। আসলে তখন চারপাশ থেকে অতিরিক্ত খুনখারাপির খবর আসছিল। সে এক বর্ষার রাত্তির। দুই বন্ধু, ঘর খালি, বোতল নিয়ে বসেছিলাম। তা কথা হচ্ছিল ওই খুনটুন নিয়েই। আমি জিগগেস করেছিলাম--- খুন করার পরে অপরাধী সারাজীবন নিজের বউবাচ্চার সঙ্গে কেমন আচরণ করে?

বন্ধু বলল--- স্বাভাবিক।

আমি বললাম--- তোর অনেক নেশা হয়ে গেছে।

তখন সে আমাকে এই গল্পটি শুনিয়েছিল। সে যেমন শুনিয়েছিল চেষ্টা করব প্রায় সেভাবেই শোনাতে।

* * * * *

উপমন্যু যেন আগে থেকেই তৈরি ছিল। পথের শেষ আবাসনের তিন তলার যে ফ্ল্যাটটাতে সে থাকে তার দক্ষিণে আর পশ্চিমে একটি করে জানালা রয়েছে। বিদেশি কি এক ওষুধ কোম্পানির ম্যানেজারদের মাথায় কাজ করতে করতে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে সে এই আবাসনে উঠে আসে। স্ত্রী আছে। উপমন্যু যেমন, সেরকমই শক্তসমর্থ। দুই ছেলে। একজন মুম্বাই, অন্যজন চেন্নাই। তবে উপমন্যুকে দিয়ে গল্প আরম্ভ করার কারণ এই যে একদিন সকালে আবাসনের অন্য সব বাসিন্দারা, দেবাবু থেকে দত্তবাবু, সেনবাবু থেকে মিস্টার গোয়েল, সবাই আবার সস্ত্রীক, তার দরজায় কড়া নাড়ে। উপমন্যু অবাক হয় না। তার মাথা বেশ ঠান্ডা। তার আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, কোনো কিছু ঘটতে পারে যেন সে সবসময়ই ধরে নেয়।

পথের শেষের যে কোনো অনুষ্ঠানে, দুর্গাপুজো কি দোলখেলা, গানবাজনা কি পিকনিক, উপমন্যুকেই দায়িত্ব নিতে হয়। সাধারণভাবে সবাই তাকে বিশ্বাস করে, তার ওপর তার বিদ্যাবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখে। উপমন্যু সবাইকে আপ্যায়ন করে ভেতরে ডাকে, আর প্রথমেই প্রশ্ন করে--- প্রিয়াংশু বিশ্বাস তো?

সেনবাবু অবাক হয়--- আপনি বুঝলেন কী করে?

কিছুদিন ধরেই প্রিয়াংশুদের ফ্ল্যাট থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি ভেসে আসছিল। নানারকম শব্দ, কান্নার শব্দও, শোনা যাচ্ছিল। সবকিছুই সন্ধের পর। তবে দিনের বেলা সম্পূর্ণ শান্ত। কিছু বোঝার উপায় নেই। স্বভাবতই প্রতিবেশীরা উদ্বিগ্ন, আর এখন তো কিছু একটা না করলেই নয় ভেবেই এখানে সবাই হাজির।

মিস্টার গোয়েল বলল--- একেবারে পাশের ফ্ল্যাটে থাকি। কার ফেমিলিতে কী হচ্ছে ইন্টাফেয়ার করতে চাই না। কিন্তু লিমিটের বাইরে চলে যাচ্ছে।

দেবাবু বলল--- কিছু একটা ঘটে গেলে লোকে বলবে আমরা কেন আগে থেকে স্টেপ নিলাম না।

দত্তবাবুর শ্যালক কোনো এক থানার মেজবাবু। তার ইচ্ছে এক্ষুনি পুলিশকে রিপোর্ট করার।

দাশগুপ্তবাবু বলল--- না, না, এক্ষুনি পুলিশের কাছে না গিয়ে আপনি যদি ওদের সংগে একবার কথা বলে দেখেন, আমাদের মধ্যে আপনাকেই এখানে সবাই মান্য করে…

তখন ঠিক হয় উপমন্যু প্রিয়াংশুদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজখবর নেবে। যদি তাতে কিছু না হয় সেবেলা দত্তবাবুর শ্যালক তো আছেই।

সকালের দিকে উপমন্যু প্রিয়াংশুকে ফোনে ধরে।

--- নমস্কার। উপমন্যু অধিকারী বলছিলাম।

--- নমস্কার, দাদা।

--- আপনাদের সাথে একটু কথা বলব।

--- কি ব্যাপারে?

--- আপনাদের ব্যাপারেই।

প্রিয়াংশুর দিক থেকে দশ-বারো সেকেন্ডের নৈঃশব্দ্য। উপমন্যু আবার বলল--- কি বলছেন?

--- না, মানে কি ব্যাপারে?

--- বললাম তো, আপনাদের ব্যাপারেই। প্রতিবেশীরা থানায় রিপোর্ট করতে চাইছেন।

বলেই উপমন্যু থামল। অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে এল--- আপনি! ঠিক আছে। আমি আসছি। কিন্তু অনসূয়া যদি কথা বলতে রাজি না হয়?

--- ম্যাডামকে আপনিই বলে দেখুন।

যা হোক, উপমন্যু দুজনের সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ পায়। গল্পের এখানে এসে, আসুন, দুজনের কী বলার আছে আমরা একটু জেনেনি। শর্ত হয় কেউ কিছু গোপন করবে না। কোনোরকম সঙ্কোচও করবে না। আর উপমন্যুও এসব কথা কাউকে জানাবে না। তবে প্রিয়াংশু আর অনসূয়া যার যেমন বলার ছিল গড়গড় করে বলে যায়নি। অনেক সময়ই উপমন্যুকে প্রশ্ন করতে হয়েছে।

প্রিয়াংশুর কথা

ভেবেছিলাম স্বপ্ন দেখেছে। খারাপ কোনো স্বপ্ন। লাস্ট উইন্টার। লাস্ট উইক অব ডিসেম্বর। রাত্তির দুটো আড়াইটা। লেপের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে চিৎকার করে উঠল, খুন করতে এসেছে।

আমি ডাকলাম, অনু!

উত্তর দিল না। বললাম--- স্বপ্ন দেখলে?

উত্তর দিল না। বৃষ্টি পড়ছিল। বিছানা থেকে নেমে ব্যালকনিতে গেলাম। ভাবছিলাম, ঘুমের ভেতরও কারো কনফ্রন্টেশন হয়?

অনু আবার চেঁচিয়ে উঠল--- আমাকে খুন করে দেবে।

ওকে আমি ঘুম থেকে তুললাম। মুখটা একেবারে ফ্যাকাশে। অত্যন্ত ভয় পেলে কিংবা হত্যাকারীর মুখোমুখি দাঁড়ালে যেমন হয়। অনু তক্ষুনি লেপের ভেতর মাথা গুঁজে দিল।

দুই

বিয়ে করতে দেরি হয়ে গেল। না, না, ফেমিলি বার্ডেন ছিল না। বাবা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে ছিল। মা ছেলেবেলায় মারা যায়। তাও আমার জ্ঞান হবার আগেই। কী হয়েছিল বলতে পারব না--- মামাবাড়ির কেউ কখনো আমাদের বাড়ি আসত না। বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি। বাবা ডিফেন্সিভ স্ট্যান্ড নিত। আমার একজন দাদা আছে। নিউ জার্সিতে থাকে।

তিন

বিয়ে করতে দেরি হয়ে যায় এইজন্যে যে আমার একটা আফেয়ার ছিল। নিজেই ঝুলেছিল। এগ্রেসিভলি বিউটিফুল। লম্বা। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। দূর থেকে দেখলে বিদেশিনী মনে হত। হ্যাঁ, গায়ের রঙ হলদেটে ফরসা। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত। বাড়িওলার সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছিল। তখন একদিন দলবল নিয়ে চমকে এসেছিলাম। বাড়িওলা দেখল, আমরা পাওয়ারে আছি, পুলিশ আমাদের কথায় চলে।

বিয়ে শেষ অব্দি হয়নি। আমিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। খুব ইনভল্ভড হয়েছিলাম বলে মনে হয় না। দু-একবার ওর টাকাতেই দীঘা আর দার্জিলিং বেড়াতে গেছি। এই পর্যন্তই।

পার্টি আমাকে স্কুলের চাকরি দিয়েছিল। তাছাড়া, ইনসিওরেন্স কোম্পানির এজেন্সিও করতাম তখন। এজুকেশন? পোস্টগ্রাজুয়েট। হিস্ট্রি। এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া। সত্যি কথা বলব? না পড়েই। কলেজের চাকরিটা শেষের দিকে পার্টির কাছ থেকে বাগিয়ে নিই। শেষের দিকে বলতে গার্গী বোস যে বছর উধাও হয়ে গেল। মাস ছয়েক দাড়ি রেখেছিলাম।

চার

আমার এখন তেতাল্লিশ। না, চুয়াল্লিশ। নাইন্টিন সেভেন্টি। পাঁচ বছর বিয়ে হয়েছে। ও, সে আমার লাইফের গ্রেট ডিফিট। ফার্স্ট ইসুটা মেয়ে ছিল। এক্সট্রা কিছু টাকা দিতেই ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছিল। মেয়ে মানেই বাড়তি বোঝা। অনু রাজি হয়নি। একটু প্রেসার দিতেই মেনে নিয়েছে। না, তারপরে আর কনসিভ করেনি। আর এখন তো চার-পাঁচ মাস আমি একেবারেই ডিপ্রাইভড।

পাঁচ

খুব সিম্পল বিয়ে হয়েছিল। কলেজের কোলিগরা আর অনুর বাড়ির লোকজন। বয়েসের ডিফারেন্স? থার্টিন ইয়ার্স। এক বন্ধুর বিয়েতে নেমন্তন্ন ছিল। সেখানেই পরিচয়। একটু হাইট শর্ট। তবে মুখে একটা বালিকাবালিকা ভাব। সংসার করার ইচ্ছে মনে এসেছে এর মধ্যেই। কলেজ মানে এখন তো সেম সাবজেক্ট, সেম নোট, ডেইলি। তারপর মাঝেমধ্যেই এই মুভমেন্ট সেই মুভমেন্ট। স্টুডেন্টদের ক্লাস করতে ইচ্ছে করে না। প্রায়ই ক্লাস নিতে হয় না। প্রিন্সিপালেরও পার্সোনালিটি বলে কিছু নেই, ম্যানেজ হয়ে যায়।

পার্টিও ছেড়ে দিয়েছি। মাথায় এল, ডেভলাপমেন্ট অব আর্মস নিয়ে রিসার্চ করব। বইপত্র কালেক্ট করছি, এইরকম সময়েই আমি ওই বিয়ে বাড়িতে অনুকে স্ট্রেট প্রোপোজ করি। অস্কার ওয়াইল্ড, দেখু্‌ন, রিয়েলি গ্রেট। প্রোপোজ করতেই অ্যাপ্রুভাল। অনুর বাবার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম জাস্ট পরের দিন। ভদ্রলোকের তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা। কলেজ! এমনভাবে বললেন! একটাই মেয়ে। নিজের বাড়ি নেই। সরকারি চাকরি করতেন। রিটায়ার্ড। স্ত্রী সুস্থ নয়। অ্যাকিউট আর্থারাইটিসের পেশেন্ট।

অনু নার্সিং হোমে রিসেপশনিস্টের কাজ করত। ছাড়িয়ে দিলাম।

ছয়

হোমমেকার হিসেবে শি ইস গ্রেট। ছাড়িয়ে দেয়ার সময় কোথাও খচখচ করছিল। একটা যা হোক ইনকাম তো। কিন্তু ভেবে দেখলাম তাতে হোম আর সুইট হোম থাকে না। তাছাড়া, বাইরের জগতে মেয়েদের, আমার বিবেচনায়, না বেরনোই ভালো। কনসার্ভেটিভ ইট মে লুক। তবে, বুড়ো বয়েসে বিয়ে করেছি। বলা তো যায় না অনু যদি কোনো ডাক্তারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। বলতে পারেন ভয় একধরনের ছিল, অথচ অনু এমন কিছু করেনি যাতে অমন ভয় পেতে পারি।

সাত

খুন করতে আসছে--- এই শব্দ তিনটিই ভয়ের জন্যে যথেষ্ট। প্রথম অভিজ্ঞতার পরের দিন কলেজ ছিল না। সারাদিন দুজনে একসঙ্গেই ছিলাম। টিভিতে একটা সিনেমাও দেখলাম। সিনেমাটিতে খুনখারাপিও ছিল। অনু কোনোভাবে রিঅ্যাক্ট করেনি। সন্ধেবেলা সল্টেড কাজুবাদাম আর হুইস্কি নিয়ে বসলাম। কলেজলাইফ থেকেই ডাবের জলের সঙ্গে হুইস্কি আমার প্রিয় পানীয়। অনু আমার পাশেই চেয়ার নিয়ে বসেছিল। কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। হাতে সূচসুতো। সুন্দর। পারেও। আমার শাদা রুমালটার এক কোণে গোলাপ ফুল তৈরি করে দিল লাল সুতো দিয়ে। নেশা একটু বেশিই হয়েছিল। মাতলামি না, কিন্তু প্যা টলছিল আর কথাও জড়িয়ে যাচ্ছিল। মাথায় ছিল আগের রাতের কথা।

তবে বিয়ের পর প্রথমবার অনু আমাকে সরাসরি রিফিউজ করল। আদর করব, অ্যালাও করল না।

আট

অনুর চেহারা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছিল। চোখের কোণে কালি। আগে যেমন ছিলই না, মানে, কেমন অপরিচ্ছন্ন লাগছে। হবারই কথা। রাতের পর রাত ঘুম হচ্ছে না। প্রথম প্রথম দুচারদিন অন্তর ব্যাপারটা ঘটত। এখন তো রোজের ব্যাপার, রোজ রাতের, তার মানে।

কাজের মেয়েটিকে দিয়ে মেঝেটাও ভাল করে মুছিয়ে নিচ্ছে না। জানলার পর্দাগুলোও আগের মতো ফি-হপ্তায় ধোয়া হচ্ছে না। এমনকি, খাবার টেবিলেও ময়লা দেখতে পাচ্ছি।

আমার নিজের শরীর হাফ হয়ে গেছে। দুশ্চিন্তা ফুটে বের হচ্ছে চোখেমুখে। কোলিগরা কোশ্চেন করছে, হোয়াটস দ্য ম্যাটার, প্রিয়াংশুবাবু? লুকিং ভেরি মাচ টেন্সড?

আমি অনুকে ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলাম। বাড়ি ও যেতই। মাসে একবার শুরুর দিকে। তারপর, দু-তিনমাস ছাড়া ছাড়াই। এবার একেবারেই যেতে রাজি হল না।

কাউন্সেলিংএর জন্যে তখুনি ভাবিনি। আমি তো কাছে রয়েছি। আমিই অবসার্ভ করছিলাম। সেট রাইট করার চেষ্টা করছিলাম। চেষ্টা করছিলাম যাতে ও নিজেই কমবাট করতে পারে। তখন ওকে না জানিয়েই একদিন ওর বাবার সঙ্গে দেখা করলাম। কেমন মনে হচ্ছিল যদি পুরনো কেস হিস্ট্রি থাকতে পারে। হ্যাঁ, তাই তো, পাঁচ বছর পরেই মনে এল। তার আগে যে দরকারই হয়নি, না?

শোনার পর অনু্র বাবা খুব ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, এমন তো কোনোদিন হয়নি। ছেলে যোগাড় করতে পারছিলাম না বলে আমরা সবাই টেনশনে থাকতাম। তার বেশি কিছু না। তুমি ডাক্তার দেখিয়েছ? উত্তরে আমি যা বললাম তার মানে হ্যাঁ-ও হয় আর না-ও হয়। আমি ধরতে পারিনি উনি আসলে কী জানতে চাইলেন।

নয়

রাজনীতি, কলেজের চাকরি পাওয়ার পরই, ছেড়ে দিই। সব ধান্ধাবাজ লোকজন। সবাই যেন সাপের পাঁচ পা দেখেছে। আমি কারো কর্তৃত্ব মানতে পারি না। ইটস মাই নেচার। তাছাড়া, সব একেকটা মূর্খ, কিচ্ছু জানে না, বোঝে না, কিছু বললেও মাথায় ঢোকে না। মার্ক্স লেনিন মুখেই, পাতা ওল্টায়নি। ভুলভাল লেখে, ভুলভাল বলে। আরে বাবা, দুনিয়া কেমন বদলে গেছে খেয়াল রাখতে হবে না? কিছু বলা যাবে না। কয়েকজনের কোটারি যা বলবে তাই মেজরিটির ভিউ, আর মেজরিটির ভিউ মানেই সায়েন্টিফিক। তারপর জানেনই তো, প্রোমোটারি, ইউজ অব ফায়ার আর্মস। আমি সরে পড়লাম। এখন আমি পার্টির কথা ভুলে গেছি, আমি ওদের সবকিছুই ভুলে যেতে চাই।

দশ

আপনি যদি পারেন, ভাল একজন কাউন্সেলর সাজেস্ট করুন। এভাবে আর ফাইট করতে পারছি না। আমার আর পেশেন্স নেই। চিৎকার করি। আমি বুঝি আবাসনে এটা অসভ্যতার মতো। চিৎকার করি, খাবার থালা ছুঁড়ে ফেলি, গায়েও হাত দিয়ে দিচ্ছি...

ইতিহাস পড়াতে হয়। সেখানে তো যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ। নিজেকেই মনে হচ্ছে, রোজ রাতে যুদ্ধের ময়দানে চলে এসেছি। নিজেকেই অস্ত্রধারণ করতে হচ্ছে।

ভয়! ভয় আমারও করছে। একেকসময় ভাবি, অনু কি সত্যিই ভয় পাচ্ছে? অনু কি ভয় পাওয়ার অভিনয় করছে? আমাকেই খুন হতে হবে না তো? রাত বাড়তে থাকে। অনু বদলাতে থাকে। হতেও তো পারে আমিই এক রাতে খুন হয়ে গেলাম।

অনসূয়ার গল্প

আপনারও সাবজেক্ট সাইকোলজি? আমি জানতাম আপনি মাল্টিন্যাশনাল মেডিকেল কোম্পানির বিগ বস ছিলেন। সাইকিয়াট্রিক ড্রাগের কোম্পানি? তবে তো ভালোই হল।

আমি নার্সিং হোমের পর নার্সিং হোম চেঞ্জ করেছি। শেষ যেখানে ছিলাম ভাল লাগছিল না। ছেড়েই দিতাম। তখন প্রিয়াংশু ফোর্স করল। ফোর্স করল বলছি, কারণ সব ব্যাপারেই ওর একরকমের জবরদস্তি থাকে। এমনিতে নার্সিং হোম, আপনি আমার চেয়ে ভালই জানেন, বাইরে থেকে যেমন চাকচিক্য দেখায় কি ধুলোময়লা নেই দেখায়, ভেতরে তার বিপরীত। আমাদের স্যালারি যা কম ছিল বলবার না। সবচেয়ে খারাপ লাগত যখন দেখতাম এরা সবাই একের পর এক মেকানিজম তৈরি করে যাতে পেশেন্ট পরিবারকে একেবারে ছিবড়ে করা যায়। এসব এরা সবার সামনেই করে, বেআইনিভাবেই করে।

প্রিয়াংশু পার্টি করত। ওকে আমি এইসব বলেওছিলাম। তা ওর একজন বন্ধু ছিল একটা নার্সিং হোমের মালিক। বন্ধু মানে পার্টির বন্ধু। তা সত্ত্বেও সেই নার্সিং হোমেই--- আপনি জানেন? প্রিয়াংশু বলেছে? সবকিছু বলেছে? বলবে না। মেয়ে ছিল। বলেছে? ও। আমার একদম মত ছিল না। প্রথম বাচ্চা। বলুন? ভগবানের দান। বলুন?

দুই

আমার মা অনেক বছর ধরেই অসুস্থ। গেরস্তালির সমস্ত কাজ বাবাকেই করতে হয়। আমি বড় হতে একটু রিলিফ। আমি তখন হাতে হাতে কাজ করতে থাকি। আমি একাই। ভাইবোন নেই। প্রথম প্রথম মনে হত, বিয়ে করব না, মা-বাবার সঙ্গেই জীবনটা কাটিয়ে দেব। তারপর স্থির করলাম, কলকাতা বা ধারেকাছে কোনো ছেলে যদি, ছোট পরিবারের ছেলে যদি, এগিয়ে আসে কলকাতায় থাকতে পারব, মা-বাবাকেও দেখতে পারব। সে কিছুতেই হচ্ছিল না। বয়েস বেড়ে যাবে, ভয় পাচ্ছিলাম। তখন ওই বিয়েবাড়িতে প্রিয়াংশুর সঙ্গে দেখা হল, আলাপ হল, আমাকে ডিরেক্টলি প্রোপোজও করল।

আমি আর বাবা, কেউই, না বলতে পারলাম না।

কিন্তু বিয়ের পরদিন থেকেই অন্যরকম লাগল। বাড়িতে কেউ কখনো জোরে কথা বলেনি। বাবা খুবই নরম মানুষ। প্রিয়াংশু কেমন যেন অ্যাসার্টিভ। জোরে জোরে কথা বলে। জোরে যখন বলে না, জোর দিয়ে এমনভাবে বলে যে ওর বলাটাই যথেষ্ট ও ফাইনাল। তার পরে আর কারো কিছু বলার থাকতে পারে না। কবে কী রান্না হবে, টিভিতে কী কী প্রোগ্রাম দেখা হবে, এমনকি, কাজের মেয়েটাকে পুজোর আগে ঠিক কত টাকা দেয়া হবে --- সবকিছুই যেমন ওর ইচ্ছে হবে মেনে নিতে হবে।

তিন

মেনেই নিচ্ছিলাম। মেনেই নিয়েছিলাম। ছেলেবেলা থেকে ওই একটি জিনিসই শিখেছি। ওই কেমন করে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হয়। খুকি, এটা ধরো না। ধরিনি। খুকি, এটা করো না। করিনি। ওই দিকে যেও না। যাইনি। ওইখানে দাঁড়িও না। দাঁড়াইনি। বাবা-মার নির্দেশ অমান্য করিনি। আমার জন্যে যেন বাবা-মার কষ্ট না হয়।

বিয়ের পর ভেবেছিলাম, নিজের নিরীহ নির্দোষ ইচ্ছেদের জায়গা জুটবে। এমনই আমার কপাল যে জোটেনি। প্রিয়াংশু সবসময় লড়াই, সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব, কমবাট, কনফ্রন্টেশন, ডিফারেন্স, এইধরনের ল্যাংগুয়েজে কথা বলে। যেমন ধরুন, তোমার সঙ্গে আমার এই যে ডিফারেন্স, এই কনফ্রন্টেশন, তার উৎস কি জানো? জাস্ট মিডলক্লাস পেটিবুর্জুয়া ভ্যালুস?

আমি মাথা নিচু করে বসে থাকতাম। ভাষায় এইসব শব্দ আছে আমার জানা ছিল। কিন্তু স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে এসব এভাবে যন্ত্রবৎ চলে আসবে, আমি সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। তবু ভাবতাম, শ্বশুর-শাশুড়ি নেই, ননদ-ভাসুর নেই, এও অনেক শান্তির। তবে কোথায় যেন মাটি সরে যাচ্ছিল।

চার

না, বিয়ের পরে অন্য কারো সঙ্গে ওর রিলেশন দেখিনি, টের পাইনি। বিয়ের আগের একটা ব্যাপার, এক গার্গী বোসের কথা খানিক বলেছিল, তাও একদিন নেশার ঝোঁকে বলেছিল। বলেছিল বিয়ে করা হয়নি। না, আর কিছুই বলেনি। নেশার ব্যাপারটি বিয়ের রাতেই সেন্স করেছি। মাঝেসাঝে হুইস্কি নিয়ে বসে। একাই। এখন অবশ্য প্রতিদিনই। গোলমাল করে না, বমিটমি করতে দেখিনি। না, না, গালিগালাজ করে না। তবে কারো কারো ওপর হয়ত রাগ রয়েছে, তাদের নাম করে বলে দেখে নেবে, গুলি করে দেবে, থ্রি-নট-থ্রি, চেম্বার, পিস্তলটিস্তলের নাম বলতে থাকে। হ্যাঁ, একদিন, নেশার মধ্যে বলে উঠেছিল, অনসূয়াকে যদি উঁ-উঁ-উঁ... আমার নাম নেই।

পাঁচ

ভয় প্রথম পাই এক বছর আগে। দার্জি লিং নিয়ে গেছিল। বলল, এক জায়গায় বেড়াতে যাই চল যেখানে তুমিও কখনো যাওনি আমিও কখনো যাইনি। বললাম, আমার তো কোথাও যাওয়া হয়নি। প্রিয়াংশু বলল, তবে দার্জিলিং চলো। ভালই ছিলাম। টাইগার হিলেও গেছি। কপালগুণে সূর্যোদয়ও দেখলাম। ফেরার পথে একটা বড় পাইন বন পার হয়ে জিপ ছেড়ে দিল। তারপর একটা উঁচু জায়গায় নিয়ে গিয়ে বলল, নিচে তাকিয়ে দেখো। দেখো কী গভীর খাত। কেউ যদি একবার পেছন থেকে ঠেলে দেয়, ব্যস!

আমার শিরদাঁড়া দিয়ে সেই প্রথম বরফের চাঁই নেমে গেল।

ছয়

ভালোবাসি। আর কাউকে ভালোবাসার সুযোগ জীবনে হয়নি। প্রিয়াংশুও যে ভালোবাসে না সেকথাই বা কী করে বলি? সঙ্কোচ? আপনার কাছে সঙ্কোচ নিয়ে আসিনি। হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। আপনি জিগগেস করুন। চার মাস। বা কমবেশি ওইরকমই হবে। অ্যালাও করিনি। বাচ্চা চাই না? চাই তো। কিন্তু আবার যদি কনসিভ করি, প্রিয়াংশু ওর ওই পার্টির বন্ধুর নার্সিং হোমে নিয়ে যাবে। বাচ্চা যদি মেয়ে হয়, তাহলে আবার--- আমি পারব না। আর যে লোকটা মেয়ে সন্তান পেটে এলে মেরে ফেলতে চায় তার বাচ্চা পেটে ধরব কেন?

সাত

সে বললে মিথ্যে হবে। এক্সপার্ট। এক্সপিরিয়েন্সড বলতে পারেন। দীর্ঘ সময়। ঘড়ি দেখিনি কোনোদিন। আমার মনে হয়, যে কোনো উম্যান সাটিসফাইড হবে। হ্যাঁ, দাদা, তা সত্ত্বেও আমি আর অ্যালাও করি না। জোর করছে তো। চড়থাপ্পর মারছে। আমি ওই একজায়গায় জিদ নিয়ে আছি। না, রেপ করতে পারবে না। আমি বাধা দিই। টায়ার্ড হয়ে পড়ে। ডিসফাঙ্কশানিং সিম্পটম লক্ষ করি।

সেকথাও কি ভাবিনি? প্রভিশন আছে আমি জানি। কন্ট্রাসেপটিভস অ্যাভেইলেবল আমি জানি। জীবনে একটা বাচ্চার মুখ দেখতে পাব না, ফুর্তিতে আমার ঘেন্না ধরে গেছে, দাদা।

আট

ভয় করে। দিনের বেলা ততটা না। আমার খালি মনে হয় কেউ আমাকে মার্ডার করবে। প্রিয়াংশু হয়ত নয়। আমি এ ব্যাপারে অবশ্য খুব সিওর নই। হয়ত ও যে পার্টি করত তাদের কোনো হায়ার্ড খুনি। হয়ত অন্য কেউ যাকে প্রিয়াংশু সুপারি দিতে পারে। অথবা ও নিজেই।

থানায় খবর দিইনি। সবাই জেনে যাবে। আমার বাবা-মা জেনে যাবে। বাবা-মা জানে? কী করে? তাহলে তো আমাকে ফোন করেও বলত। আমার তো বাবার সঙ্গে মার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। কালও কথা বললাম। ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা, না, বাবা-মাকে বলিনি।

আমিও বুঝি থানায় জানানো দরকার। প্রিয়াংশুকে বলেছি। ও কিছুতেই থানায় রিপোর্ট করতে দেবে না।

নয়

প্রিয়াংশুর আর্মস নিয়ে রিসার্চের কথা আপনি জানেন? বলেছে? ইন্টারনেট থেকে আর্মসের ইনফর্মেশন ডাউনলোড করে, প্রিন্ট আউট বের করে। বিছনায় সাজিয়ে রাখে। স্পেশালি রিভলভার--- কোন ইয়ারের, কী কী ফিচার, কে ফার্স্ট ইউজ করেছে, অ্যাডভান্টেজেস কীরকম--- আমাকে সব দেখিয়েছে। আর আমি একদিন...

* * * *

এর পরে আরও কিছু প্রশ্ন করে উপমন্যু, কিন্তু অনসূয়া আর কিছুই বলতে চায় না।

আমি বললাম--- তারপর?

আমাদের বেশ নেশ ধরেছে। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল।

--- তুই বল কী হতে পারে।

--- অনসূয়া মার্ডার্ড হয়ে যাবে। পুলিশ আসবে কোনো ক্লু পাবে না।

--- দূর! অনসূয়া মার্ডার্ড হবে না।

--- তাহলে কি প্রিয়াংশুই মার্ডার্ড হবে? অনসূয়াই…

--- না।

--- তাহলে? দুজনেই মার্ডার্ড হবে?

--- পুলিশ আসবে দিন সাতেক পরে।

--- এসে?

--- খেয়াল করেছিস উপমন্যুকে অনসূয়া একটা কথা বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত বলল না?

--- সে তো দুজনেই সবকিছু বলেনি?

--- আমি অনসূয়ার কথা বলছি।

--- বুঝতে পারছি না। পুলিশ কেন এল?

--- পুলিশ সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছিল। আর আশ্চর্য, অনসূয়া যেকথা উপমন্যুকে বলতে বলতেও বলল না, সার্চ করতে করতে পুলিশ তা পেয়ে যায়।

--- অনসূয়া?

--- আলমারির ভেতরে একটা চোরা ভল্ট ছিল। দেখলে মনে হবে ওয়াল। পুশ করলেই খুলে যায়। অনসূয়া একদিন বাই চান্স খুলে ফেলেছিল। তার ভেতরে ছিল একটা লোডেড পিস্তল।

--- পুলিশ তাহলে প্রিয়াংশুকেই বেআইনি অস্ত্র রাখার অপরাধে অ্যারেস্ট করল?

--- পিস্তলটা বেআইনি ছিল না। প্রিয়াংশুর লাইসেন্স ছিল। পার্টির কনটাক্টেই হোমরাচোমরা কাউকে দিয়ে ম্যানেজ করেছিল।

--- তবে অ্যারেস্ট করল কেন?

--- গার্গী বোস।

0 Comments

Post Comment