পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

হিসেবের ভূতের দেশে

  • 29 May, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 451 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
আয়ুস্মান ভারত কি একটা বড় দুর্নীতি? শোনা যাচ্ছে মৃত রোগীদের নামে চিকিৎসার বিল জমা পড়েছে। বিহারে আয়ুষ্মান ভারতের অডিটে দেখা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সংশোধিত টার্গেট ছিল ৬.১৮ কোটি সুবিধাভোক্তা, কিন্তু ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত তাদের মাত্র ৪১ শতাংশ যাচাই করা সম্ভব হয়। অথচ স্বাস্থ্য কভারেজ দেওয়ার দাবি করা হচ্ছিল অযাচাইকৃত ব্যক্তিদের। আরো অনেক দুর্নীতির হাল হকিকৎ পাওয়া যাবে এই প্রবন্ধে।

ভারতের সর্বোচ্চ অডিট সংস্থা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্ট যেন এক অদ্ভুত জগতের মানচিত্র। এখানে ‘৩১ ফেব্রুয়ারি’ তারিখের প্রশিক্ষণ সভা, ‘১২৩৪৫৬৭’ নম্বরের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্রাজিলীয় মডেলের ভোটার পরিচয়, আর গুগল থেকে ডাউনলোড করা ছবিতে ঠাসা প্রশিক্ষণার্থীদের উপস্থিতি—সব মিলে এক বিস্ময়কর মহাফেজখানা। সরকারের দাবি ডিজিটাল ইন্ডিয়া দুর্নীতি মুছে দিয়েছে। ক্যাগের কলম বলে উল্টো—ডিজিটাল প্রযুক্তি দুর্নীতিকে নতুন ছদ্মবেশ দিয়েছে মাত্র। এই প্রবন্ধে ক্যাগের সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলোর সেই সব তথ্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা হবে, যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে কান্না, আর সংখ্যার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শ্রেণী বৈষম্যের কঙ্কাল।

‘পিএমকেভিওয়াই’—দক্ষতা নাকি প্রতারণার মহোৎসব

প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা (পিএমকেভিওয়াই) চালু হয়েছিল ২০১৫ সালে, লক্ষ্য ছিল ১.৩২ কোটি যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া। বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪,৪৫০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সংসদে পেশ হওয়া ক্যাগ রিপোর্টে ধরা পড়ে বিরাট চিত্র। পিএমকেভিওয়াই ২.০ ও ৩.০ পর্বে ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ৮০১ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে ৯০ লাখ ৬৬ হাজার ২৬৪ জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ ছিল ‘নাল’, ‘এন/এ’ বা ফাঁকা। অর্থাৎ ৯৪.৫৩ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীর অ্যাকাউন্টই ছিল না। অথচ প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ৫০০ থেকে ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার কথা ছিল।

যেসব অ্যাকাউন্ট দেওয়া হয়েছিল, তার অবস্থা আরও হাস্যকর। ১২ হাজার ১২২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল ৫২ হাজার ৩৮১ জন প্রশিক্ষণার্থীর জন্য। সেই নম্বরগুলোর মধ্যে ছিল ‘১১১১১১১১১১’, ‘১২৩৪৫৬৭৮৯’, ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট নম্বরের জায়গায় লেখা ছিল নাম, ঠিকানা, এমনকি ‘NA’। অডিট টিম প্রশিক্ষণার্থীদের ইমেল ঠিকানাও পরীক্ষা করে। দেখা গেল, ৩৬.৫১ শতাংশ ইমেল ‘বাউন্স’ হয়ে ফিরে এসেছে। অনেক প্রশিক্ষণার্থীর একই ইমেল ঠিকানা। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তারিখ দেওয়া হয়েছিল ‘৩১ ফেব্রুয়ারি’—যে তারিখের অস্তিত্ব নেই। অথচ সিস্টেম সেটা গ্রহণ করেছিল।

এসবের ফল কী? ১.১ কোটি প্রশিক্ষণার্থীকে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৩৪ লাখ প্রশিক্ষণার্থী এখনও অর্থ পাননি। তাদের প্রশিক্ষণ কখনও হয়েছিল কি না, কেউ জানে না। শুধু কাগজে কলমে দেখানো হয়েছে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’। বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশিক্ষণে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার বেশির ভাগই এখন হিসাবহীন। শ্রমজীবী মানুষের সন্তান, যারা এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাকরির স্বপ্ন দেখেছিল, তারা এখনও অপেক্ষা করছে ফাঁকা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে।

‘বিওসিডব্লিউ’—শ্রমিকের কল্যাণে ঠিকাদারির কীর্তি

হরিয়ানার বিল্ডিং অ্যান্ড আদার কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারস ওয়েলফেয়ার বোর্ডের কাহিনি যেন এক ডিটেকটিভ গল্প। ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত এই বোর্ড থেকে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯৭টি বেনিফিট বাবদ ১,০০৭.৫৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ২ লাখ ১৮ হাজার ৯০১ জন সুবিধাভোক্তার মধ্যে বিতরণ হয়েছে এই টাকা। কিন্তু ক্যাগ যখন অডিট করে, তখন ধরা পড়ে এই বেনিফিটের ভিত্তি ছিল শুধু কাগজের ‘ওয়ার্ক স্লিপ’—যার সত্যতা যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

তদন্তে ২১.৭৮ লাখ ওয়ার্ক স্লিপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাত্র ২.৭০ লাখ বৈধ। বাকি ১৯.০৭ লাখ স্লিপ সম্পূর্ণ জাল। একজন যোগ্য নির্মাণশ্রমিক বিভিন্ন স্কিমে গড়ে প্রায় ২.৫ লাখ টাকা বেনিফিট পান। জাল স্লিপের মাধ্যমে কত অযোগ্য লোভী এই টাকা পকেটে নিয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। মোট দুর্নীতির পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা। শ্রমমন্ত্রী অনিল বিজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্বীকার করেছেন, বৈধ স্লিপের হার মাত্র ১২.৪৪ শতাংশ। অথচ ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কোনো ঠিকাদার বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শ্রমিকের কল্যাণের টাকা গেছে সেই সব ঠিকাদারের পকেটে, যারা স্লিপ তৈরি করেছে কেরানির টেবিলে বসে। যাদের হাতের কলমের টানে ‘শ্রমিক’ সৃষ্টি হয়েছে কাগজে-কলমে। এটাই শোষণের নয়া পদ্ধতি। কাগুজে শ্রমিক তৈরি করে তাঁদের নামে বরাদ্দ তোলা, আর প্রকৃত নির্মাণশ্রমিক রোদে পুড়ে যায় পাকা রাস্তায়। মালিক আর মজুরের দ্বন্দ্ব এখানে নেই, আছে মালিক ও সরকারি কর্মকর্তার মিলিত চক্র।

এক ছবির একশো ভোট—ব্রাজিলীয় মডেলের নির্বাচনী নাটক

২০২৫ সালের নভেম্বরে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী তুলে ধরেন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ল্যারিসা নেরি নামে এক ব্রাজিলীয় হেয়ারস্টাইলিস্টের স্টক ছবি হরিয়ানার ভোটার তালিকায় ২২ বার ব্যবহার করা হয়েছে। ক্যাগ রিপোর্ট প্রমাণ করে যে এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ভোটার তালিকায় ২২৩টি একই ছবি ব্যবহারের ঘটনা ধরা পড়েছে। ‘হাউস নম্বর ০০’ থেকে শুরু করে ‘১২৩৪৫৬’ অ্যাকাউন্ট নম্বর—সব মিলিয়ে এক বিরাট প্রতারণার জাল।

নির্বাচন কমিশনের দাবি, কংগ্রেস একটিও আপত্তি দেয়নি। কিন্তু ক্যাগ প্রশ্ন তোলে—আপত্তির আগে ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়াটাই কীভাবে এত অনিয়মিত হলো? ডিজিটাল ডাটাবেজে একই ছবি একাধিক ভোটার আইডির সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা থাকার কথা। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে গেছে প্রশাসন। ক্যাগ বলছে, এটি ‘সেন্ট্রালাইজড লেভেলে’ সংঘটিত জালিয়াতি। অর্থাৎ বুথ পর্যায়ে নয়, উর্ধ্বতন প্রশাসনিক স্তরে বসে নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে।

জনগণের ভোটাধিকার যেখানে পবিত্র, সেখানে ছবি জাল করে ভোটার তৈরি করার অর্থ হলো—গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে কাটা পড়েছে। আর সেই কাটা ধরছে ক্যাগ, কিন্তু কাটা বন্ধ করছে না কেউ। কারণ যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের জন্যই এই জাল ভোটার ‘পাল’ তৈরি করা হয়।

‘দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে’—প্রতি কিলোমিটারে দাম যেখানে পৌঁছেছে ২৫০ কোটি

দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ের কাহিনি শুনলে অবাক হতে হয়। ২৯ কিলোমিটারের এই প্রকল্পটি ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি অনুমোদন করেছিল প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে খরচ হবে ১৮.২ কোটি টাকা। ক্যাগের অডিটে ধরা পড়ল, প্রকৃত খরচ হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে ২৫০.৭৭ কোটি টাকা—অনুমোদিত খরচের প্রায় ১৪ গুণ। পুরো প্রকল্পের মোট ব্যয় ৭,২৮৭.২৯ কোটি টাকা।

কী কারণে এই বিপুল ব্যয়? হরিয়ানা সরকার বিনা মূল্যে ৯০ মিটার চওড়া জমি দিয়েছিল। ১৪ লেনের জাতীয় সড়ক মাটির ওপর নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ৭০-৭৫ মিটার চওড়া জমি। তার পরেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সড়কটি এলিভেটেড (উঁচু করে) নির্মাণের। অথচ ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়াই এড়িয়ে যায় এনএইচএআই। ক্যাগের প্রশ্ন—প্রয়োজনের চেয়েও বেশি জমি থাকার পরেও এলিভেটেড সড়ক বানানোর যুক্তিসঙ্গত কারণ কী? তার কোনো নথিভুক্ত উত্তর নেই।

এই অতি-ব্যয়ের বোঝা পড়বে সাধারণ যাত্রীর ওপর। প্রস্তাবিত টোল ধার্য করা হয়েছে ২৯০ টাকা প্রতি গাড়িতে। অথচ সমান্তরাল এনএইচ-৪৮-এর কেরকি দৌলা টোল প্লাজায় বর্তমানে নেওয়া হয় ৬০ টাকা। একজন যাত্রী কেন পাঁচ গুণ বেশি টাকা দিয়ে দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করবেন? প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি দাবি করেছিল গড়পড়তা যাত্রী সংখ্যা ৫৫ হাজার। সেই সংখ্যার ভিত্তিতে নির্মিত ব্যয়বহুল সড়ক এখন টোল আদায়ে ব্যর্থ হবে নিশ্চিত। শ্রমজীবী মানুষ যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন, সেই রাস্তা বানাতে গিয়ে সরকার লুটেছে কোটি কোটি টাকা। বানিয়েও দিতে পারল না যাত্রী-বান্ধব পথ।

টোল প্লাজা—পকেটে যা যাচ্ছে, হিসাবে যা দেখা যাচ্ছে

সড়ক খাতের আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে টোল প্লাজা নিয়ে। দক্ষিণ ভারতের ৪১টি টোল প্লাজার মধ্যে মাত্র ৫টির অডিট করেই ক্যাগ ধরে ফেলেছে ১৩২.০৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত আদায়। কীভাবে? এনএইচ ফি সংশোধনী আইন-২০১৩ স্পষ্টভাবে বলেছিল, চার লেনের জাতীয় সড়ক উন্নীতকরণের সময় নির্মাণ বিলম্বিত হলে যাত্রীদের ওপর বাড়তি ফি চাপানো যাবে না। অথচ তিনটি টোল প্লাজায় (নাথাভালাসা, চালাগেরি, হেব্বালু) সেই নিয়ম লঙ্ঘন করে মে ২০২০ থেকে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত আদায় করা হয় ১২৪.১৮ কোটি টাকা।

পারানুর টোল প্লাজায় টোল কমানোর নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি, আর মাদপাম টোল প্লাজায় প্রতি বছর বাড়তি হারে টোল আদায় করা হয়েছে। এই দুই প্লাজায় জমা পড়ে আরও ৭.৮৭ কোটি টাকা। এর বাইরে ব্রিটিশ আমলে ১৯৫৪ সালে তৈরি একটি সেতুর ওপর অবৈধভাবে টোল আদায়ের ঘটনাও ধরা পড়েছে। সেই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ আদায় করা হয়েছিল ২২.১০ কোটি টাকা, অথচ সেতুটি নির্মাণের সময়সীমা ১৯৫৬-এর আগে হওয়ায় সেখানে টোল নেওয়ার নিয়মই নেই।

এই টাকা কারা আদায় করেছে? এনএইচএআই-এর অনুমতি নিয়ে বেসরকারি কোম্পানি। কোম্পানি বলবে, ‘আমরা তো আইন মানছি’, আবার এনএইচএআই বলবে ‘কোম্পানি ভুল বুঝেছে’। কিন্তু যাত্রী টোল দিয়ে গেছেন। শ্রমজীবী ট্রাকচালক প্রতিদিন ১০০০ টাকা টোল দিয়ে চলেছেন জেনেও যে এখানে প্রতারণা চলছে। তার কাছে উপায় নেই। সেখানে কাগজে ‘অডিট’ হচ্ছে, নতুন নিয়ম হচ্ছে, কিন্তু ফিরে আসছে না ফেরত টাকা। কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাথ ঠিকই বলেছেন, মাত্র ৫টি প্লাজার অডিটে ১৩২ কোটি টাকা গরমিল—গোটা দেশের সব প্লাজা অডিট করলে কত বড় দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে।

ইউটিলিটি সার্টিফিকেট—৫৪ হাজার কোটি টাকার ‘অনুপস্থিতির প্রমাণপত্র’

২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের ক্যাগ রিপোর্টে ধরা পড়েছে কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় হিসাবহীন বকেয়া। ৩১ মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ১৫টি মন্ত্রক ও বিভাগের মোট ৩৩,৯৭৩টি প্রকল্পের ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট (ইউসি) বকেয়া ছিল। মোট আর্থিক মূল্য ৫৪,২৮২.৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার ৫৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে, কিন্তু সেই টাকা সঠিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না—তার কোনো প্রমাণ সরকারের কাছে নেই।

শুধু গত তিন অর্থবর্ষের (২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪) মধ্যে বকেয়া রয়েছে ৩৮,২৮৭.৫২ কোটি টাকার ১৩,৯২৬টি ইউসি। সবচেয়ে পুরনো বকেয়া ইউসির বয়স ১৯৮৫-৮৬ অর্থবর্ষের। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে টাকাগুলো ‘হিসাবহীন’ অবস্থায় পড়ে আছে। সর্বোচ্চ বকেয়া মন্ত্রক আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রক, যার বকেয়া ১৮,২৭২.৯১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে উচ্চশিক্ষা বিভাগ—১৪,৩৫৯.৭৬ কোটি টাকা।

জেনারেল ফাইন্যান্সিয়াল রুলস-২০১৭-এর ২৩৮ নম্বর নিয়ম স্পষ্টভাবে বলে, অনুদানের টাকা সঠিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তার স্বীকৃতি দিতে হবে অর্থবছর শেষ হওয়ার ১২ মাসের মধ্যে। এই নিয়মের এত বড় লঙ্ঘন। আর শুধু ইউসি বকেয়া নয়, একই রিপোর্টে ধরা পড়েছে ১২,৭৫৪.৪৭ কোটি টাকার ভুল শ্রেণিবিভাগ। পরমাণু শক্তি বিভাগ ৩,০৮৯.৯৭ কোটি টাকার রাজস্ব ব্যয় পুঁজি খাতে দেখিয়েছে। তিনটি প্রধান ব্যয় শিরোনামে ‘মাইনর হেড ৮০০’ (অন্যান্য) বাবদ ৫০ শতাংশের বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে।

এই ‘অন্যান্য’ হিসাবের মধ্যেই চাপা পড়ে গেছে ৫৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া ইউসি। কী ‘অন্যান্য’ খাতে টাকা গেছে? কেউ জানে না। মন্ত্রক জানে না। এটাই প্রকৃত দুর্নীতি—যার হিসাব কেউ রাখে না, যার জবাবদিহি কেউ নেয় না।

আয়ুষ্মান ভারত—মৃতের চিকিৎসা আর ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ নম্বরের জাদু

আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের ক্যাগ অডিট থেকে বেরিয়ে আসে এক পরীমায়ার তথ্য। ৭,৪৯,৮২০ জন সুবিধাভোক্তার সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বর ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’। আরও ৩৯,৩০০ জনের নম্বর ‘৮৮৮৮৮৮৮৮৮৮’, এবং ৯৬,০৪৬ জনের নম্বর ‘৯০০০০০০০০০’। একটিমাত্র নম্বর হাজারেরও বেশি সুবিধাভোক্তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেন এক রাতের মধ্যেই ‘কপি-পেস্ট’-এ তৈরি করা হয়েছে তথ্যভান্ডার।

এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য—মৃত রোগীদের নামে চিকিৎসার বিল জমা পড়েছে। বিহারে আয়ুষ্মান ভারতের অডিটে দেখা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সংশোধিত টার্গেট ছিল ৬.১৮ কোটি সুবিধাভোক্তা, কিন্তু ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত তাদের মাত্র ৪১ শতাংশ যাচাই করা সম্ভব হয়। অথচ স্বাস্থ্য কভারেজ দেওয়ার দাবি করা হচ্ছিল অযাচাইকৃত ব্যক্তিদের।

এই তথ্য বলছে, একটি বড় অংশের মানুষ জেনেও স্বাস্থ্য বীমার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। আর যারা ‘আওতায়’ আছেন, তাঁদের তথ্য যাচাই ছাড়াই অনুমোদিত। ‘মৃতের চিকিৎসা’ করা হচ্ছে—কথায় আছে ‘মরা হাতির দাম লক্ষ টাকা’, এখানে মৃত রোগীর দাম সরকারি কোষাগার থেকে কেটে যাচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষ প্রকৃত রোগ নিয়ে হাসপাতালে গেলে কবে পাবে এই বীমার সুবিধা? যেদিন আর ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ নম্বরের ভূত না থাকে, সেদিন।

শ্রমজীবী মানুষের কলমে—হিসেব মেলানো মানে শোষণের খতিয়ান খোলা

ক্যাগের রিপোর্ট যতবার পড়ি, ততবার বুকের ভেতর একটা রাগ জমে। রাজনীতিকেরা বলে ‘ডিজিটাল দুর্নীতি’, কেরানিরা বলে ‘প্রক্রিয়াগত জটিলতা’, ঠিকাদারেরা বলে ‘প্রকল্পের আকার বড় হয়েছে’। কিন্তু আমরা শ্রমজীবীরা যারা সারাদিন রোদে-বৃষ্টিতে কাজ করি, যাদের ঘামের ফোঁটা ফোঁটা টাকা জমা হয়ে সরকারি কোষাগার ভরায়, আমরা জানি—এগুলো জটিলতা নয়, এগুলো পরিকল্পিত লুঠ।

দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি কিলোমিটারের ২৫০ কোটি টাকা খরচের টাকা আমরা দিয়েছি। টোল প্লাজায় বাড়তি আদায়ের ১৩২ কোটি টাকা আমরা দিয়েছি। পিএমকেভিওয়াই-এর ভুয়া প্রশিক্ষণে বরাদ্দ হাজার হাজার কোটি টাকা আমরা দিয়েছি। আয়ুষ্মান ভারতের ‘মৃতের বিল’ ও ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ নম্বরের খরচও আমরা দিয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই টাকা শেষ পর্যন্ত কারা পেল? উত্তর দেয় ক্যাগ রিপোর্টের একটি লাইন—‘নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট অনুদানের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের নিশ্চয়তা অনুপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।’ এই ‘অনুপস্থিতির ইঙ্গিত’ মানে টাকা নেই, খরচ দেখানো হয়েছে কিন্তু টাকার অস্তিত্ব নেই। গেছে বড় বড় ঠিকাদার আর কর্মকর্তার পকেটে।

শ্রেণীচেতনাবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে আমি মেনে নিতে পারি না যে রাষ্ট্র নামক এই কাঠামো আমাদের কল্যাণের জন্য কাজ করছে। ক্যাগ রিপোর্ট প্রমাণ করে—এই রাষ্ট্রের যন্ত্রপাতি ক্ষমতাবানদের পকেট ভরানোর জন্য তৈরি। আর আমরা শ্রমজীবীরা সেই পকেট ভরিয়ে দিই আমাদের শরীরের রক্ত-মাংস বিকিয়ে। ১৯৮৫-৮৬ অর্থবর্ষের বকেয়া ইউটিলিটি সার্টিফিকেট আজও বকেয়া। তার মানে ৪০ বছর আগে যে টাকা লুট হয়েছে, তার কোনো জবাবদিহি আজও হয়নি। প্রশাসন বদলিয়েছে, সরকার বদলিয়েছে, কিন্তু লুটের খেলার নিয়ম বদলায়নি।

তবুও আমি আশা ছাড়ি না। কারণ ক্যাগ রিপোর্ট একদিন ধুলোয় ঢাকা পড়লেও, মানুষের স্মৃতিতে এই অঙ্ক গেঁথে যায়। দিনমজুরের ছেলে যখন পিএমকেভিওয়াই-এর ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে বসে থাকে, ট্রাকচালক যখন টোল প্লাজার অতিরিক্ত আদায়ের কথা জানতে পারে, নির্মাণশ্রমিক যখন বুঝতে পারে ‘তার’ নামে বরাদ্দ কেউ অন্যে নিয়ে গেছে—সেই জ্ঞানের আগুন একদিন জ্বলে উঠবেই। আর সেই আগুনে পুড়বে কাগজপত্রের সব ‘৩১ ফেব্রুয়ারি’ তারিখ। তখন হিসেব মেলানো মানে হবে শোষণের খতিয়ান খোলা। আর সেই খতিয়ানের প্রথম পাতায় লেখা থাকবে—‘যারা পরিশ্রম করে, তারাই পায়নি। যারা করে না, তারাই লুট করেছে।’ এটাই ক্যাগ রিপোর্টের আসল বার্তা। এটাই শ্রমজীবী মানুষের চোখে দেখা সত্য।

 

0 Comments

Post Comment