দলের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সাথে সুশীলবাবুর বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর কমলবাবু নির্বাচনের টিকিট পান। ফলে সুশীলবাবু নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান। কমলবাবুর দল ইতিমধ্যেই তাদের প্রচারের রঙে শহর ভরিয়ে তুলেছে। সুশীলবাবু বুঝলেন, জনতার চোখে জায়গা করে নিতে হলে শিল্পের শক্তি কাজে লাগাতে হবে। রাজনৈতিক ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে উঠতেই তিনি নচিকেতাকে ডাকলেন।
সুশীলবাবু নচিকেতাকে টাকার বিনিময়ে তাঁর হয়ে দেওয়ালে আঁকার প্রস্তাব দেন। রাজনৈতিক প্রচারে যাওয়া নিয়ে নচিকেতা প্রথমে দ্বিধায় ছিল। মনে পড়ে গেল গুরু জাফরসাহেব তাকে স্পষ্ট করে বলেছিলেন—"রাজনীতির আঁকাজোকায় জড়ানো উচিত নয়। শিল্পের মর্যাদা থাকে নিরপেক্ষতায়।" নচিকেতার সংসার ছোট, কিন্তু দায়ভার বড়। বাবা বহুদিন ধরে অসুস্থ, ওষুধের খরচ নিয়মিত বাড়ছে। মা গৃহস্থালির কাজ সামলান, কিন্তু সংসারের টানাপোড়েন তাঁর মুখে ক্লান্তির রেখা এঁকে দিয়েছে। ছোট বোন স্কুলে পড়ে, তার পড়াশোনার খরচ জোগানোও জরুরি। নচিকেতা জানে, যদি টাকার ব্যবস্থা না হয় তবে বোনের পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যাবে।
প্রতিদিন সকালে মা তাকে বলেন—“তুই যদি একটু বেশি রোজগার করতে পারিস, সংসারটা বাঁচে।” এই কথাগুলো নচিকেতার মনে চাপ সৃষ্টি করে। সে জানে, শিল্পীর মর্যাদা নিরপেক্ষতায়, কিন্তু পরিবারের চোখে সে শুধু একজন উপার্জনকারী। কিন্তু সুশীলবাবুর দেওয়া টাকার প্রলোভন, আর নিজের সংসারের টানাপোড়েন তাকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল। তাই শেষমেশ সে রাজি হয়ে গেছিল।
সুশীলবাবুর নির্দল প্রার্থিতা ঘোষণার পর শহরের দেওয়ালগুলোতে আঁকা শুরু হয়। শহরের দেওয়ালে সুশীলবাবুর প্রতীক, স্লোগান আর প্রতিশ্রুতির ছবি আঁকতে শুরু করে। তার আঁকা ছবিতে প্রাণ আছে, রঙে আছে আবেগ।
প্রাইমারী স্কুলের পাশের দেওয়ালে ফুটে উঠলো স্কুলের সামনে শিশুদের বই হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা, পেছনে সুশীলবাবুর প্রতীক—যেন তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ধুঁকতে থাকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের দেওয়ালে আঁকা হলো একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ছবি, যেখানে ডাক্তার রোগীকে দেখছেন, আর দেওয়ালে সুশীলবাবুর প্রতীক—মানুষের মনে ভরসা জাগানোর জন্য। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ছবি, যেখানে ডাক্তার রোগীকে দেখছেন, আর দেওয়ালে সুশীলবাবুর প্রতীক—মানুষের মনে ভরসা জাগানোর জন্য। ওয়ার্ডের সবচেয়ে অনগ্রসর অঞ্চলের দেওয়ালে দেখা গেল ভাঙা রাস্তা থেকে নতুন পাকা রাস্তা তৈরি হচ্ছে, পাশে সুশীলবাবু হাত তুলে আশ্বাস দিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি নজর কাড়লো বড় রাস্তার পাশের দেওয়ালে সুশীলবাবুকে সাধারণ মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে দেখানো, যেন তিনি তাদের সমস্যার কথা শুনছেন। এই ছবিগুলোতে রঙের উজ্জ্বলতা, মানুষের মুখে হাসি, আর প্রতীকী ভঙ্গি ছিল। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করেছিল, সুশীলবাবু সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়ানো একজন নেতা। নচিকেতার শিল্পকলা শুধু সৌন্দর্য নয়, মানুষের মনে আস্থা ও আবেগ জাগিয়ে তুলেছিল।
জাফরসাহেব খবর পেলেন। তিনি নচিকেতাকে ডেকে বললেন—“তুমি শিল্পকে বিক্রি করেছো। শিল্পীর কাজ মানুষের মন জাগানো, কোনো দলের জয়-পরাজয় নয়।” নচিকেতা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে অপরাধবোধ জন্ম নিল, কিন্তু সংসারের দায় তাকে চুপ করিয়ে দিল।
নচিকেতা সুশীলবাবুর প্রতীক আঁকতে চালিয়ে গেল। শহরের মোড়ে মোড়ে তার আঁকা ছবি ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ থেমে দেখল, প্রশংসা করল। শহরের মানুষ বিভক্ত হলো। কেউ নচিকেতার আঁকা দেখে সুশীলবাবুর প্রতি আস্থা পেল, আবার কেউ বলল—“এটা তো আর্ট নয়, এটা তো প্রচার।”কেউ বলল—“নচিকেতার হাতেই প্রাণ আছে।” আবার কেউ ফিসফিস করে বলল—“শিল্পীটা এবার রাজনীতির দলে নাম লিখিয়েছে।” নচিকেতা বুঝতে পারল, তার হাতের রেখা এখন আর শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং মানুষের মতামত গড়ার অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
কমলবাবুর দলের লোকজন ক্ষুব্ধ হলো। তারা নচিকেতাকে ভয় দেখাল—“আমাদের দেওয়ালে হাত দিলে ফল ভালো হবে না।” কেউ কেউ আবার তাকে টাকার লোভ দেখাল, দলে টেনে নিতে চাইলো। নচিকেতা দ্বিধায় পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার শিল্প এখন দুই দলের লড়াইয়ের মাঝখানে বন্দি।
শহরের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ভোট গণনা শুরু হলো। সকাল থেকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল—সুশীলবাবুর প্রতীক আঁকা দেওয়ালচিত্র মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। নচিকেতার রঙে রঙিন শহর যেন সুশীলবাবুর প্রচারের প্রাণ হয়ে উঠেছে। গণনার শেষে ঘোষণা হলো—সুশীলবাবু ব্যাপক ভোটে জয়ী হয়েছেন। নির্দল প্রার্থী হয়েও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী কমলবাবুকে বড় ব্যবধানে হারালেন। শহরের মানুষ বিস্মিত, কেউ বলল—“এই জয় শুধু সুশীলবাবুর নয়, নচিকেতার হাতেরও জয়।”
সুশীলবাবু আনন্দে ভেসে গেলেন। তিনি প্রকাশ্যে বললেন—“আমার বিজয়ের পেছনে নচিকেতার শিল্পের অবদান অপরিসীম।” জনতার ভিড়ে নচিকেতা দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তার মনে দ্বন্দ্ব। সে জানে, এই জয় তার আঁকা ছবির কারণে হলেও, গুরু জাফরসাহেবের সতর্কতা সে অমান্য করেছে।
জাফরসাহেব নচিকেতাকে ডেকে বললেন—“তুমি মানুষের মন জয় করেছো, কিন্তু মনে রেখো, শিল্পের আসল শক্তি রাজনীতির বাইরে। শিল্প মানুষের আত্মাকে জাগায়।” নচিকেতা নীরবে শুনল। তার মনে প্রশ্ন জাগল—সে কি শিল্পকে সঠিক পথে ব্যবহার করেছে, নাকি ক্ষমতার খেলায় হাতিয়ার বানিয়েছে?
সুশীলবাবু নির্বাচিত হওয়ার পর শহরে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও বাড়ে। শহরের জলনিকাশী ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। কিন্তু কাজের অর্ধেকও হয়নি। বর্ষায় জল জমে রাস্তাঘাট অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটি সরকারি স্কুলে নতুন ভবন তৈরির কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সুশীলবাবু টাকা গায়েব করেন। ফলে ছাত্রছাত্রীরা ভাঙা ঘরে পড়াশোনা চালাতে বাধ্য হয়। শহরের প্রধান সড়ক মেরামতের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয়। কিন্তু নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ করা হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তা আবার ভেঙে যায়। অথচ শহরের দেওয়ালে নচিকেতার আঁকা ছবিগুলো সুশীলবাবুর ভাবমূর্তি রক্ষা করে। মানুষ ছবির রঙে বিভ্রান্ত হয়ে যায়, মনে করে তিনি এখনো জনদরদী নেতা।
একদিন নচিকেতা সুশীলবাবুর একটি বিশেষ ছবি আঁকল—যেখানে তাঁকে জনতার মাঝে আলোকিত রূপে দেখানো হলো। ছবিটি শহরে আলোড়ন তোলে। কিন্তু ওপরমহলের নেতাদের মধ্যে ঈর্ষা জন্মায়। তারা মনে করে, সুশীলবাবু নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে গিয়ে তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী রমেশবাবু ঘনিষ্ঠ মহলে বললেন তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কৃতিত্ব সুশীলবাবু কেড়ে নিচ্ছেন। দপ্তরের প্রধান অরুণবাবু অভিযোগ করেন প্রশাসনিক সাফল্যের আলো কেবল সুশীলবাবুর ছবিতেই গিয়ে পড়ছে। জেলা সভাপতি হরিদাসবাবু প্রকাশ্যে বললেন, “আমাদের অবদান কোথায়? সব জায়গায় শুধু সুশীলের মুখ।”
সুশীলবাবু বুঝলেন, পরিস্থিতি সামলাতে হবে। তিনি নচিকেতাকে ডাকলেন এবং বললেন—“আমার জন্য যেমন ছবি এঁকেছো, এবার এনাদেরও জাজ্বল্যমান রূপে আঁকো।” নচিকেতা আবারও দ্বিধায় পড়ল, কিন্তু টাকার প্রয়োজন তাকে রাজি করাল।
নচিকেতার আঁকা নতুন ছবিতে ওপরমহলের নেতাদের মহিমান্বিত রূপ ফুটে উঠল। তারা নিজেদের ছবি দেখে সন্তুষ্ট হলো। ঈর্ষা অনেকটাই কমে গেল। সুশীলবাবুর ওপর থেকে চাপ কিছুটা সরল।
সুশীলবাবুর দুর্নীতি দিন দিন বেড়ে চলছিল। তাঁর ক্ষমতার লালসা এবার নচিকেতার বাড়ির লোকের ওপর নেমে এলো। একদিন সুশীলবাবুর লোকেরা নচিকেতাদের বাড়ি এসে কঠোর গলায় বললো,
“তোমাদের খালপাড়ের জমিটা সরকারি প্রকল্পের কাজে লাগবে। দাদা ঠিক করেছেন, এখানে নতুন কমপ্লেক্স হবে। তোমাদের এখনই জায়গা ছাড়তে হবে।”
নচিকেতার বাবা দুর্বল কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“কিন্তু এটা তো আমাদের পুরনো জমি। এখানে আমার জন্ম, আমার বাবার স্মৃতি আছে। সরকারি কাগজপত্রে তো কোনো নোটিশ পাইনি।”
লোকেরা হাসি চাপা দিয়ে বললো,
“নোটিশের দরকার নেই। দাদার মুখই আইন। তোমার ছেলে তো আমাদের জন্য ছবি এঁকে টাকা কামিয়েছে, তাই তোমাদেরও আমাদের কথা শুনতে হবে।”
নচিকেতার মা কাঁপা গলায় বলতে চাইলেন,
“আমরা কোথায় যাবো? সংসার চালানোই কঠিন, এখন যদি এই জমিটুকুও চলে যায়?”
লোকেরা এবার হুমকি দিয়ে বললো,
“বেশি কথা বলো না। জায়গা ছাড়লে কিছু টাকা পাবে। না ছাড়লে ফল ভালো হবে না।”
নচিকেতা সব শুনে সুশীলবাবুর কাছে গিয়ে রাগে ও কষ্টে বললো,
“আপনার লোকেরা আমাদের জমি দখল করতে এসেছে। বলেছে সরকারি প্রকল্পের জন্য দরকার, অথচ সবাই জানে এটা আপনার ব্যবসার জন্য। আমার অসুস্থ বাবাকে হুমকি দিয়েছে, মাকে ভয় দেখিয়েছে। এটা কি ন্যায্য?”
নচিকেতার মা আবারও কাঁপা গলায় বললেন,
“আমরা কোথায় যাবো? সংসার চালানোই কঠিন, এখন যদি মাথার ওপরের ছাদটুকুও চলে যায়, আমরা বাঁচব কীভাবে?”
ক্ষমতার ভরসায় সুশীলবাবু এবার ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“দেখো নচিকেতা, রাজনীতি মানে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নও। প্রকল্পের জন্য জায়গা দরকার, আর তোমাদের খালপাড়ের জমি সেই জায়গায় পড়েছে। এটা ব্যক্তিগত কিছু নয়, এটা উন্নয়নের স্বার্থে।”
নচিকেতা এবার ক্ষুব্ধ হয়ে বললো,
“উন্নয়ন? উন্নয়নের নামে দুর্নীতি আর লোভ ঢাকছো। আমার আঁকা ছবিগুলো দিয়ে তুমি জনতার চোখে ধুলো দিচ্ছো, আর এখন আমার পরিবারকে ধ্বংস করতে চাইছো।”
সুশীলবাবু এবার সোজা হয়ে কঠোর ভঙ্গিতে বল উঠলেন,
“তুই ভুলে যাচ্ছিস, একমাত্র আমার কারণে তুই আজ পরিচিত। আমিই তোকে সুযোগ দিয়েছি। আমার জন্য আঁকছিস বলেই তোর নাম হয়েছে। তাই আমার কথাই শুনতে হবে। না হলে তোর আঁকা ছবির কোনো দাম থাকবে না।”
নচিকেতা আগেই বুঝে গেছিল সুশীলবাবু আসলে নিজের ব্যবসার জন্য জমি চাইছেন। সব জেনেও সুশীলবাবু তাদের বিরুদ্ধে কিছু করলেন না। নচিকেতার মনে পড়ে যেতে লাগলো কিভাবে বাবার অসুখের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে দেখা গেছিল ওষুধ নেই, ডাক্তার নেই—কারণ বরাদ্দ টাকা অন্যত্র চলে গেছে। সে বুঝতে পারে কেন বারবার অনুরোধ করেও নচিকেতার বাড়ির পাশের নিকাশী প্রকল্পে কাজ হয় না, ফলে বর্ষায় তাদের বাড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। গুরু জাফরসাহেব তাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন—“রাজনীতির আঁকাজোকায় জড়িও না, শিল্পের মর্যাদা থাকে নিরপেক্ষতায়।” নচিকেতারা মুখ নীচু করে ফির এলো।
এই ঘটনার পর নচিকেতার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলো। সে বুঝল, আর চুপ করে থাকা যাবে না।
নচিকেতা তুলি হাতে নিল। শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে সে আঁকতে শুরু করল। বেরিয়ে এলো সুশীলবাবুর আসল চেহারা—লোভী, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতার নেশায় অন্ধ এক মানুষ। তার ছবিতে ফুটে উঠল—সুশীলবাবুর লোভী চোখ, রক্তমাখা হাত, ভাঙা প্রতিশ্রুতি, শৃঙ্খলিত জনতা।