পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় বিস্মৃত সোদপুরের গান্ধী আশ্রম

  • 31 January, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 395 view(s)
  • লিখেছেন : মুকুট তপাদার
১৯৪৬ সালে নভেম্বর থেকে গান্ধী দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। তিনি সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ওই এলাকা ও বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শন করেন। তিনি আশ্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং সেরে সোদপুর স্টেশন থেকে রওনা দেন নোয়াখালির দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকায়। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ দূর করার চেষ্টা করেন। আজ সেই আশ্রম জরাজীর্ণ। সেই প্রসঙ্গেই এই প্রবন্ধ আরও বেশ কিছু কথা সামনে নিয়ে এসেছে।

মহাত্মা গান্ধীর হরিজন পত্রিকায় নোয়াখালির দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকার কথা উঠে আসে। সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত ও গান্ধীজির চেষ্টাতে কলকাতায় বরানগরের কাছে সোদপুরে একটি আশ্রম গড়ে তোলা হয়। তাঁর উপস্থিতি এখানে একাধিকবার ঘটেছে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সহযোগী ও গান্ধীর স্নেহভাজন সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত বেঙ্গল কেমিক্যালসের চাকরি ছেড়ে আশ্রমটি তৈরি করেন। এটি ছিল গান্ধীর দ্বিতীয় সবরমতি। স্বাধীনতার আগে যখন বাংলায় সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বলছে, এখান থেকেই তিনি পূর্ববঙ্গে নোয়াখালির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সোদপুরকে বলা হয় গান্ধীর দ্বিতীয় বাড়ি। ইতিহাসের কিছু ঘটনা আজ কি সময়ের আবহে চাপা পড়ে গেছে? তাহলে স্মরণ করা যাক -

 

সময়টা উত্তাল, ১৯৪৬ সালে অক্টোবর মাসে পূর্ববঙ্গে নোয়াখালির কর পাড়ায় লক্ষ্মী পুজোর দিন এক বলি প্রথা নিয়ে ঘটনার সলতে পাকানো শুরু। ঘটে যায় এক ভয়ানক অহিংসতা। দাঙ্গাকারীদের তরফে হিন্দু জমিদারকে সমূলে উৎপাটন করে মেরে ফেলার নির্দেশ আসে। তাঁর বাড়িতেই এক হিন্দু সাধুবাবার আবির্ভাব হয়েছিল। কথিত আছে, তিনি নাকি বলেছেন মুসলমানের রক্তে এবার পুজো সম্পন্ন হবে। এই কথা নিয়ে সর্বত্র আলোড়িত হয়। বারুদের মতো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের সমস্ত গ্রামগুলোতে। ক্ষিপ্ত হয়ে দাঙ্গাকারীরা একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। সমস্ত হিন্দু মন্দিরে আঘাত হানা হয়। জমিদার ব্যর্থ চেষ্টা করেন আক্রমণকারীদের আটকাবার। ভয়ানক নিষ্ঠুরভাবে জমিদারকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর কাটা মুন্ডু থালায় সাজিয়ে উপহার হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা হয়। ক্ষিপ্ত নোয়াখালির জনতা গণহত্যা চালায়।

 

তৎকালীন ফেনী, লক্ষ্মীপুর আর নোয়াখালিতে হাজার হাজার নারী পুরুষকে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়। যা ভারত স্বাধীন হওয়ার ঠিক এক বছর আগে এই ভয়াবহভাবে সংঘর্ষ চলে। একদিকে হিন্দু জনমত গড়ে ওঠে। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালন শুরু হয়। ত্রিপুরা জেলাতেও এর রেশ পড়ে। রমেশচন্দ্র মজুমদার বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থটিতে লিখেছিলেন বহু মানুষকে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধরমান্তরিত করা হয়। খুব দ্রুত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষিতে কলকাতাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে বহু মানুষ নিহত হন। যা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস নামে পরিচিত। অমৃতবাজার ও স্টেটসম্যান পত্রিকার রিপোর্টে দাঙ্গা বিধ্বস্ত অঞ্চলের কথা উঠে আসে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তখন দেশের বাইরে। নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসু নোয়াখালির ভয়াবহ অবস্থা পরিদর্শন করেছিলেন। এই বর্বরতার চিত্র তিনি সকলের সামনে তুলে ধরেছিলেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার বিভিন্ন সব আলোকচিত্র পাওয়া যায়। এরমধ্যে গান্ধীর বেশ কিছু ছবি রয়েছে। তিনি ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে হেঁটে গ্রাম পরিদর্শন করছেন। তবে প্রথমে তাঁর এক মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বলেন, ‘ঈশ্বর এই ঘটনাকে পথ দেখাবেন’। গান্ধী সেবাকে পরম ধর্ম মনে করতেন। তিনি বলতেন, ‘নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো অন্যের সেবায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা।’

 

১৯৪৬ সালে নভেম্বর থেকে গান্ধী দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। তিনি সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ওই এলাকা ও বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শন করেন। তিনি আশ্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং সেরে সোদপুর স্টেশন থেকে রওনা দেন নোয়াখালির দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকায়। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ দূর করার চেষ্টা করেন। সোদপুরের আশ্রমে বসেই তিনি বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জায়গা পরিদর্শনের কথা বলেন। নোয়াখালিতে শান্তি মিশন গড়ে তোলা হয়। অহিংস পথ অবলম্বন করতে বলেন। বহু মানুষকে নিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যান। গ্রামে গঞ্জে সকল বাধা অতিক্রম করে অত্যাচারিত মানুষদের উদ্ধার করেন। তাদের অস্থায়ী শিবির গুলোতে নিয়ে আসা হয়েছিল। শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান। বিধ্বস্ত গ্রামগুলোয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে রক্ষা করা যায় সেই চেষ্টা চালিয়ে যান। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও গান্ধীকে সকল স্তরের মানুষ স্বাগত জানিয়েছিল। শান্তি ও সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রায় চার মাস সেখানে পদযাত্রা করেন। তাঁর প্রার্থনা সভায় প্রতিদিন বহু হিন্দু - মুসলমান উপস্থিত হতেন। যার মাধ্যমে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেন।

 

তবে গান্ধী দাঙ্গা ও হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। তাঁর উপস্থিতিতেও বহু হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি সেই স্থান ত্যাগ করে বিহারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সোদপুরের আশ্রম বহু ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। এখানেই গান্ধীজি গড়ে তোলেন খাদি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে এটাই ছিল গান্ধীর স্থায়ী প্রথম খাদি কর্মশালা।

 

১৯২৭ সালে সোদপুর খাদি আশ্রমে এসে গান্ধী বলেন ‘জায়গাটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদধূলিতে ধন্য’। সোদপুরের আশ্রমে এসেছেন সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ, মোতিলাল নেহরু, বিধানচন্দ্র রায়, খান আব্দুল গফ্ফর খানের মত বহু নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। গান্ধীর ব্যবহৃত খাদির চরকা, শোবার চৌকি, বহু মূল্যবান ছবি এখানে রয়েছে। গান্ধী ও সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহাসিক বৈঠক এই আশ্রমে হয়েছিল। নেতাজি বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস ত্যাগ করবেন। ১৯৩৯ সালের ২৯ এপ্রিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করেন। তাঁর মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গান্ধীকেই জাতীয়তাবাদের প্রতীক মনে করতেন। সোদপুরে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলবার খুবই প্রয়োজন ছিল। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংগ্রহশালাটি দরকার।

 

বর্তমান সময়ে গান্ধীর আশ্রমটিতে সময়ের প্রলেপ পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে যথেষ্ট। বিশেষ করে বর্ষাকালে বাড়ির পাশে বড় বড় ঘাস হয়ে যায়। পরিত্যক্ত ভাবে বছরের অধিকাংশ সময় পড়ে থাকে। দেওয়াল থেকে রং উঠে গিয়েছে। গেটগুলো তালা বন্ধ অবস্থায় পড়ে। খাদি আশ্রমের ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়োজন। যা এক আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। স্থানীয়দের মধ্যে জায়গাটি নিয়ে আগ্রহ আছে। কিন্ত বহু দূর থেকে মানুষ দর্শন করতে এসে ব্যর্থ হন। অধিকাংশ সময় তালা বন্ধ থাকে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীজির মৃত্যুদিন। স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সোদপুর খাদি আশ্রম আজ বিস্মৃত। সময়ের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে।

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment