পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

শিমুল রঙের পাখি

  • 21 October, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 621 view(s)
  • লিখেছেন : রাজকুমার শেখ
ঝিকঝিক রোদ উঠেছে। গত রাতে গোটা বন জুড়ে বৃষ্টি নেমেছিল। বেশ ঠান্ডা লাগছিল। ননি বেশ কয়েকদিন হল সাজুর বনে এসেছে। সাজুর বনে এই তার প্রথম আসা। শহরে সে হাঁপিয়ে উঠেছিল। তার বন খুব টানে। বন জংগলের ভেতর দিয়ে তার এলোমেলো হাঁটতে ভালো লাগে। আজ সকালের রোদটা দেখে ওর মনটা ভালো হয়ে গেল। বন বাংলোর হাতায় একটি বড় শিমুল গাছ। গাছে এখন শিমুল ফুলের ঢল। লাল ফুলের বাহার যেন বনময় ছড়িয়ে গেছে।

ননি বন বাংলোর বারান্দায় বসে আছে। বাতাসে বনজ গন্ধ ভেসে আসছে। ও বুক ভরে বাতাস নেয়। বড়ই আরামবোধ করে ও। এখন ভরা ফাগুন। যদিও হিমেল ভাবটা আছে। ভোরবেলা চাদর নিতে হয়। এখানে আসবার সময় তুলি বার বার বলেছিল, ননিদা, শীতের কিছু নিয়ে যেও।
তুলি কত ভেবে কথা বলে। তুলি সত্যিকারের ওর বন্ধু। সব কিছু শেয়ার করা যায়। ও এখানে আসবে বলেছে। ও এলে খুব মজা হবে। তুলিও গাছগাছালি ভালোবাসে। বনময় ছড়িয়ে যাবে ওর গায়ের সুগন্ধি। বনজ গন্ধ আর তুলির গায়ের সুগন্ধি  মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। গাছে গাছে মুনিয়াদের ডাকাডাকি। মৌটুসী ডেকে যায়। গোটাবন পাখিদের ডাকে মুখরিত হয়ে আছে। বিদু এলে দুজনে বসে চা খাবে। ও সাজুর বনের কাছাকাছি কোথাও থাকে। বিদুর ওখানে যাবে একদিন। ননির বেশ চায়ের নেশা পেয়েছে। বিদু না এলে ওর চা খাওয়া হবে না। এই সাজুর বন বাংলোটা বিদু দেখাশোনা করে। বিদু খুব আলাপি মানুষ। মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। দেখতেও বেশ। গায়ের রং একটু তামাটে। চোখ দুটো সবুজ খেতের মতো। চুল গুলো এলোমেলো। বেশ মাঝারি গড়ন। ও কখনো বাঘকে ভয় পায়না। বিদু বলে, সাহেব, বাঘকে ভয় নেই। ভয় মানুষকে।
বিদুর কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছিল ননি। আসলে সে অনেক কিসিমে’র মানুষ কে দেখেছে। তার বন হাতের তালুর মতো চেনা। বাঘ কখন শিকার ধরতে বের হয় তা ও জানে। হরিণরা কখন জল খেতে আসে। পাখি কখন জল খায়। ওর সব জানা। বন্যপ্রাণীদের আনাগোনা ও বোঝে। বহুবার বাঘের সামনে পড়েছে। কিন্তু ও বেঁচে ফিরেছে। বনের ভাষা ও বোঝে। বনের সুঁড়ি পথ ধরে প্রতিদিন আসে। আবার রাত হতেই ফিরে যায়। ননি ওকে যেতে বাড়ন করে।
আরে সাহেব, আমি ঠিক চলে যাবো।
ও ননির সঙ্গে খেয়ে চলে যায়। ননি একা অনেক রাত অবধি বসে থাকে। রাতের তারারা ওর সঙ্গে জেগে কাটায়। শিশির পড়ে গাছের পাতা থেকে। দূরে কোথায় যেন বন কাঁপিয়ে বাঘ ডাকে। ভয় পেয়ে রাতের পেঁচা ডেকে পালায়। ওদের ভারী ডানার শব্দ শোনা যায়।
আজ রোদের তেমন তেজ নেই। এমন সময় বিদু এলো। ও এসেই রান্না ঘরে চলে গেল। ও জানে সকাল থেকে ননি বাবুর চা খাওয়া হয়নি। ননি চুপ করে বসে মৌটুসীর ডাক শুনছে। শিমুল গাছ থেকে ফুল গুলো ঝরে পড়ছে। গোটা জমিনে লাল চাদর বিছানো যেন।
এমন সময় বিদু চা নিয়ে এলো।
ননিবাবু, চা। আজ রাতে খুব জোর বৃষ্টি নেমেছিল। রাস্তাতে একটা হরিণ মেরেছে চিতাতে।
তাই! আমাকে দেখাতে নিয়ে যাবে?
আগে টিফিন রেডি করি। তবে চিতাটা আসে পাশে কোথাও থাকবে। তবু চলুন।
বিদুর খুব সাহস। ওরা এই পরিবেশে মানুষ হয়েছে।
ওরা এক সময় টিফিন খেয়ে বেরিয়ে পড়ল। বেলা বাড়তে থাকে। ওরা এক সময় বনের মধ্যে হারিয়ে গেল।

দুই --

ননি বসেছিল নালাটার কাছাকাছি। এ সময় বন্যপ্রাণীরা জল খেতে আসে। ও একটা ঝোপের আড়ালে বসে। যাতে কোনো পশুপাখি যেন টের না পায়। অবশ্য এ বুদ্ধিটা বিদুর। ও জানে বিষয় গুলো। ননি বেশ অনেকটা সময় চুপ করে বসে আছে। যাতে কোনো শব্দ না হয়।মানুষের গন্ধ পেলে বন্যপ্রাণী পালাতে পারে। চোরা শিকারীরা এ ভাবেই শিকার করে। সে সব হিসেব কেউ রাখে না। কোনো হরিণ তার বাচ্চা গুলো রেখে জল খেতে আসে। আর অমনি তাকে শিকার করা হয়। বাঘেও ধরে। কতই না বিচিত্র জীবন!  নালার জলটা স্থির হয়ে আছে। বনের শুকনো পাতা ভাসছে জলে। জলের খুব একটা গভীরতা নেই। শুখা মরসুমে জলের সংকট দেখা দেয়। অনেক বন্য প্রাণী মারা যায়।
বেলা অনেক হল। আর একটু পরে সূর্য ডুবে যাবে। ননির চোখটা কেমন এঁটে এসেছে। এমন সময় হঠাৎ শুখনো পাতা মাড়ানো পায়ের শব্দ। ননি চোখ খুলে তাকায়। দেখছে একটা বড় চিতা। নালার ও পারে দাঁড়িয়ে। ননির বুকটা ধড়াস করে উঠেছে। চিতাটা এ দিক ও দিক তাকাচ্ছে। ও নিশ্চয়ই মানুষের গায়ের গন্ধ পেয়েছে। ননি কোনো শব্দ করে না। ও ঝোপের আড়ালে বসে থাকে। চিতাটা একটু কি ভাবলো যেন। তারপর ও জল না খেয়ে পালিয়ে গেল। চিতাটা জংগলের মধ্যে মিশে যেতেই ননি ওখান থেকে সরে আসে। ওর গায়ে যেন মেখে গেছে চিতার কটু গন্ধ। ওর গা গুলিয়ে ওঠে। বাতাসে যেন আরও বেশি গন্ধটা ছড়াচ্ছে। নালার পাশ থেকে ও সরে আসে। বিদুর রান্না এখন নিশ্চয় শেষ হয়ে গেছে। ওর খিদেও পেয়েছে। বনের পথ ধরে ও। নালার কাছ থেকে বন বাংলোটা বেশ দূরে। বনের মধ্যে  দিয়ে যেতে হবে। ওর কেমন ভয় করছিল। চিতাটা  দেখার পরই ও কেমন ভয়ে ভয়ে আছে। ননি এত বড় চিতা কখনো দেখেনি। ওর মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল। যেন ও কত দিন থেকে খেতে পায়নি। ননি এখনো একটাও হরিণ দেখেনি। বিদু বলেছে, ওরা নাকি নিরাপদ স্থানে থাকে। ওদের দেখতে গেলে ঝলির মাঠে যেতে হবে। যেখানে কিছু কিছু জায়গায় চাষাবাদ করে। তার আশপাশে হরিণ থাকে। এখানে চিতা আসতে ভয় পায়। ঝলির মাঠের মাচানে বসে দেখতে হবে। হরিণরা কচি কচি ঘাস খেতে আসে। দল বেঁধে আসে ওরা। চোরা শিকারীরা কখনও কখনও এদের শীকার করে। হরিণ মারে।
ননি হেঁটে যেতে থাকে। এমন সময় কোথায় একটা বাঘ ডাকল। ননির বুক হিম হয়ে আসে। ও আর এগোতে পারছে না। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। তুলি সাথে থাকলে ও হয়তো ভয়ে ননিকে চেপে ধরত। হয়তো ও কেঁদেও ফেলতো। ননি খুব সাবধানে এগোতে থাকে। সবুজ সবুজ গন্ধটা ওর গায়ে লেগে যায়। ফাগুন আসতেই নানান ফুলের মিশ্র গন্ধ বাতাসে মিশে ভেসে আসছে।
ননি যখন বন বাংলোতে এসে পৌঁছালো তখন বেলা হয়ে গেছে। বিদু তাড়াতাড়ি ননিকে খেতে দেয়। ননি খেয়ে এসে নিজেকে বিছানায় এলিয়ে দেয়। কেমন এক আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ঘুমের মধ্যে চিতাটা ও যেন আদর করছে। আর ওর মুখ দিয়ে কেমন এক লোভী লালা ঝরছে।

তিন--

তুলি কালই এসেছে। বিদু আর ননি চোঙা থেকে আনতে গেছিল। চোঙা বেশ অনেকটা পথ। বনের পথ। তবে বেশ সুন্দর রাস্তা। রাস্তার দুধারে গাছ আর গাছ। বিদু একটা টাঙাওয়ালাকে ঠিক করেছিল। শুকনো পাতা মাড়িয়ে ছুটে চলেছে টাঙা। ননি দুচোখ ভরে বন দেখছিল। বনের সবুজ গন্ধ বুক ভরে নিচ্ছলো । শিশিরে ভেজা পাতা গুলো দারুণ লাগছিল। কোথাও কোথাও শিমুল ফুল পড়ে। লাল ফুল। সবুজ ঘাসের ওপর রোদ পড়ে চিক চিক করছে। চোঙা যখন ওরা পৌঁছালো তখন বেলা অনেকটা। তুলি ওদের দেখতে পেয়ে হাসে।
এলুম তা হলি।
তুলির এমন করে বলা শুনে ননি হেসে ফেলে। বিদুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়।
তুলি এখন স্নান ঘরে। সকালের টিফিন খেয়ে ওরা বনে একটু ঘুরতে বের হয়েছিল। শিমুল গাছের নিচে ওরা বসে ছিল। আজ যেন বনে আগুন লেগেছে। সব গাছে ফুলে ভর্তি। ওর মনেও আজ আগুন।তুলি আজ সকালে একটু সেজে বের হয়েছিল। ননি বার বার ওকে দেখছিল। চান ঘরে গান করছে গুন গুন করে। ননি কান পেতে গান শুনছে। ওর মন ভালো হয়ে গেল। তুলি সত্যিই ভালো।
আজ দুপুরে খাবার পর ওরা এসে বসে বন বাংলোর হাতায়। তুলি একটা কি বলবে বলে ওকে নিয়ে এলো। ননি কথাটা শুনবে বলে বেশ উৎগ্রিব। তুলিকে আজ যেন বড়ই অচেনা মনে হচ্ছে। শিমুলের ডালে একটা শালিক চেচাচ্ছে। ও যেন কিছু বলতে চাইছে।
ননিদা, কালই চলে যাবো।
কেন?
আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি।  
ননি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। ননি মুখে কিছু বলতে পারে না। তুলির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। দূরে কোথায় একটা পিউকাঁহা ডেকে উঠলো। ননির বুকের ছোট্ট তুলিটা উড়ে গেল আজ মুক্ত আকাশে। এতকাল যাকে সে আগলে রেখেছিল শিমুল রঙের বাড়িতে।

0 Comments

Post Comment