পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নদী ভোলে না - সাতলুজ : সেন্সরশিপ ও মানবাধিকারের আর্কাইভ

  • 14 August, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 327 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
এই সাতলুজ কিন্তু সিনেমা সহজে মুক্তি পায়নি। প্রথমে নাম ছিল Punjab 95। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন একশো সাতাশটি 'কাট' চাইল। প্রযোজকরা মানলেন না। আদালতে গেলেন। প্রায় তিন বছর পর ২০২৬ এ এসে ৩রা জুলাই ছবিটি জি ফাইভে (ZEE 5) এল। নাম হল সাতলুজ। কোনো কাট ছিল না। মুক্তির আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সরকার তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ম ২০২১ এর ধারা ৩ ব্যবহার করে ছবিটি ব্লক করার নির্দেশ দিল। সিনেমা না হলে এই গল্পটি হারিয়ে যেত। রাষ্ট্র এখন সেই সিনেমাকেও হারাতে চাইছে। কিন্তু কেন?

সাতলুজ। নামটা উচ্চারণ করলেই শীতের কুয়াশা আর পাঞ্জাবের মাটির গন্ধ ফিরে আসে। ভূগোলের বইতে পড়েছি সাতলুজই হল প্রাচীন সেই শতদ্রু। ঋগ্বেদের নদী। পাঁচ নদীর দেশের পূবের নদী। নদী কথা বলে না, কিন্তু নদী ভুলে যায় না। ১৯৪৭ সালে সে দেশভাগের পরে হু হু করা বেদনায় ট্রেনের উইসিল্ শুনেছে। ১৯৮৪ সালে রাতের আগুন দেখেছে। আর ১৯৯৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর সকালে অমৃতসরের কবীর পার্কে সে দেখেছে একটা লাল রঙের মারুতি ভ্যানে একজন মানুষকে তুলে নিয়ে যেতে। মানুষটার নাম জসবন্ত সিং খালরা। পেশায় ব্যাংকের ম্যানেজার। কাজ ছিল হিসাব মেলানো। ২০২৬ সালের ৩রা জুলাই হানি ত্রেহানের পরিচালনায় সাতলুজ ছবিটি ZEE 5 এ এল। প্রধান চরিত্রে দিলজিৎ দোসাঞ্জ। ছবিটা ঠিক এই মানুষটার গল্পই বলতে চেয়েছিল। বলতে পারেনি। কারণ ৫ই জুলাই রাতেই ভারত সরকার তথ্যপ্রযুক্তি রুলস,২০২১ এর ধারা ৩ ব্যবহার করে ছবিটি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল। দুই দিনের মাথায় প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে গেল সাতলুজ। আগস্ট ২০২৬ এ ছবিটি টেলিগ্রাম অ্যাপের বিভিন্ন চ্যানেলে ঘুরছে। অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে নেই, কিন্তু মানুষের ফোনে ফোনে আছে। নদী আজও বইছে। ছবিটা নদীর বহমানতার মতন রইল না।

জসবন্ত সিং খালরা কোনো নেতা ছিলেন না। ১৯৮০ এর শেষ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাবে রাষ্ট্র কথিত 'জঙ্গিবাদ' এবং তার দমন - দুই চাপে ছিল। সেই সময় একটা কথা বাতাসে ঘুরত। অনেক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর তারা আর ফিরছে না। একে বলা হত 'এনকাউন্টার'। কিন্তু লাশ যাচ্ছে কোথায়! এই প্রশ্নটা জসবন্ত সিং খালরাকে রাতে ঘুমাতে দিত না। তিনি অমৃতসর, তরন তারান, পাত্তি, মাজিথা - পঞ্জাবের বিভিন্ন জায়গার  শ্মশানে যেতে শুরু করলেন। তার হাতে ছিল দুটো সরকারি খাতা। একটাতে লেখা থাকত আজ কটা দেহ পোড়ানো হল। আরেকটাতে লেখা থাকত কত কাঠ কেনা হল। তিনি জানতেন একটা দেহ পোড়াতে গড়ে তিরিশ কিলো কাঠ লাগে। কিন্তু হিসাব মিলত না। কাঠের বিল অনেক বেশি। রেজিস্টারে দেহের সংখ্যা অনেক কম। তার মানে কিছু দেহ পোড়ানো হচ্ছে যার কোনো নাম নেই। তাদের লিখে দেওয়া হচ্ছে পরিচয়হীন ও দাবিহীন। বাংলায় যাকে বলি অজ্ঞাতপরিচয়। এই শব্দটাই পরে খাতায় খাতায় ঘুরেছে। 'বেওয়ারিশ' হিন্দিতে, আর পাঞ্জাবিতে বলে 'লাওয়ারিশ'।

১৯৯৫ সালের ১৬ই  জানুয়ারি তিনি একটি কাগজ ছাপালেন। নাম  Disappeared and Cremation Grounds । সেই কাগজে তিনি লিখলেন শুধু তরন তারান জেলাতেই ১৯৮৪ থেকে তখন অবধি প্রায় ২ হাজার দেহ এইভাবে পোড়ানো হয়েছে। পাত্তি এবং অমৃতসরেও শত শত। মোট সংখ্যা পঁচিশ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা করলেন। এই তথ্য পাঞ্জাবের সীমানা পেরিয়ে গেল। লন্ডনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর আন্তর্জাতিক বৈঠকে এবং নিউ ইয়র্কের এশিয়া ওয়াচ তখনই রিপোর্ট করতে শুরু করল। খালরা সরাসরি পাঞ্জাব পুলিশকে দায়ী করলেন। তিনি বুঝেছিলেন এর ফল ভালো হবে না। তবু থামলেন না। আট মাস পরে ১৯৯৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর সকাল নটা কুড়িতে নিজের বাড়ির সামনে গাড়ি ধোয়ার সময় পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন লোক এসে তাকে একটি লাল রঙের মারুতি ভ্যানে তুলে নিয়ে গেল। সাথে ছিল সশস্ত্র সান্ত্রী। পাশের বাড়ির একজন ভ্যানের নম্বর টুকে রাখলেন। তারপর থেকে খালরাকে আর কেউ জীবিত দেখেনি।

মানুষটা উধাও হয়ে গেলে বাড়ির লোক কী করে! খালরার স্ত্রী পরমজিৎ কৌর বহু জায়গায় হন্নে হয়ে ঘুরে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় গেলেন। ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারায় হেবিয়াস করপাস পিটিশন দিলেন। আদালত যেন সরকারকে জিজ্ঞেস করে আমার স্বামী কোথায়। একই সময়ে শিরোমণি গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটির তৎকালীন প্রধান গুরচরণ সিং তোহরার পাঠানো একটি টেলিগ্রামকেও আদালত পিটিশন হিসেবে ধরে নিল। ১৯৯৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে নোটিস পাঠাল। তারপর ১৯৯৫ সালের ১৫ই নভেম্বর 'পরমজিৎ কৌর বনাম স্টেট অফ পাঞ্জাব' মামলায় আদালত একটি বড় সিদ্ধান্ত দিল। বলল, এই তদন্ত পাঞ্জাব পুলিশ করবে না। কারণ নিজের বিরুদ্ধে নিজে তদন্ত হয় না। পুরো দায়িত্ব গেল সিবিআই এর হাতে। তৎকালীন তরন তারানের এসএসপি অজিত সিং সান্ধুকে এলাকা থেকে সরানোর নির্দেশও দেওয়া হল।

সিবিআই ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কাজ করল। তারা আদালতে রিপোর্ট দিল যে খালরাকে তরন তারানের একটি পুলিশ ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল এবং সেখানেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সিবিআই তাদের রিপোর্টে আরও একটি কথা লিখল। তারা বলল ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে শুধু তরন তারান জেলাতেই ২০৯৭ টি দেহ বেআইনিভাবে পোড়ানো হয়েছে। এই সংখ্যাটি পরে সুপ্রিম কোর্ট এবং ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন দুজনেই গুরুত্ব দিয়ে নথিতে রেখেছে।

এরপর শুরু হল আদালতের লম্বা রাস্তা। ২০০৫ সালের ১৮ই নভেম্বর পাতিয়ালার একটি বিশেষ আদালত ছয়জন পুলিশ অফিসারকে দোষী বলল। ডিএসপি জসপাল সিং এবং অমরজিৎ সিং এর যাবজ্জীবন হল। বাকি চারজন সাব ইন্সপেক্টর এবং হেড কনস্টেবলের সাত বছর। কিন্তু সাত বছরের রায় বেশিদিন থাকল না। ২০০৭ সালের ১৬ই অক্টোবর পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট বাকি চারজনের সাজাও বাড়িয়ে যাবজ্জীবন করে দিল। দোষীরা সুপ্রিম কোর্টে গেল। ২০১১ সালের ১১ই এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট তাদের আপিল বাতিল করে দিল। বিচারপতিরা রায়ে পাঞ্জাব পুলিশের কাজের কড়া সমালোচনা করলেন। এই ষোলো বছরে অজিত সিং সান্ধু ১৯৯৭ সালে মারা গেলেন। ডিএসপি অশোক কুমারও বিচার শেষ হওয়ার আগে মারা গেলেন। কিন্তু মামলা থামেনি। সুপ্রিম কোর্ট একটি কথা বলেছিল যেটি আজও মনে রাখার মতো। আদালত বলেছিল খালরার দেওয়া তথ্য যদি একটুও সত্য হয় তাহলে সেটি মানবতার বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপরাধ। এই মামলাটি শুধু একটি খুনের বিচার ছিল না। এটি প্রমাণ করল রাষ্ট্রের পোশাক পরা মানুষও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একজন সাধারণ নাগরিক, যার কাছে ক্ষমতা নেই, শুধু কাগজ আছে, সেও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারে। NHRC এই মামলার সূত্র ধরেই ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাবে কী হয়েছিল তার একটি বড় রিপোর্ট বানাল। সেই রিপোর্টে অনেক কথা প্রথমবার সরকারি ভাবে লেখা হল যা এতদিন চাপা ছিল।

আজ তিন দশক পরে ২০২৬ সালে এই গল্প আবার সামনে এল সিনেমার হাত ধরে। ছবির নাম 'সাতলুজ'। পরিচালনা হানি ত্রেহান। প্রধান চরিত্রে দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তার সাথে অর্জুন রামপাল, কওয়ালজিৎ সিং, সুভিন্দর ভিকি। প্রযোজনায় রনি স্ক্রুওয়ালা এবং অভিষেক চৌবে। এটি কোনো হইচইওয়ালা সিনেমা নয়। এটি ধীর। শান্ত। এখানে বড় সংলাপ নেই। দিলজিৎকে আমরা গান এবং নাচে দেখি। এখানে তিনি একেবারে অন্য মানুষ। চুপচাপ। ভেতরে রাগ। সুভিন্দর ভিকি পুলিশ অফিসার। তার চোখে ক্ষমতা। পরিচালক চেয়েছেন গল্পটা যেন একটি ফাইলের মতো লাগে। পাতা উল্টালে ঘটনা বেরিয়ে আসে। ক্যামেরা স্থির। লং টেক। সংলাপ কম। আলো কম। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের পাঞ্জাবকে তিনি দেখিয়েছেন আর্কাইভাল ফুটেজের সাহায্যে। খবরের কাগজের কাটিং, টিভির নিউজ ক্লিপ, শ্মশানের রেজিস্টারের ক্লোজ শট। এই আর্কাইভাল উপাদানগুলো ছবিকে স্মৃতির দলিল করে তোলে। দিলজিৎকে দেখানো হয়েছে বারবার টেবিলের উপর ঝুঁকে থাকা অবস্থায়। কলম, ক্যালকুলেটর, কাঠের বিল। নায়কোচিত কোনো দৃশ্য নেই। কারণ এখানে নায়কত্ব হল একা বসে হিসাব মেলানো। সুভিন্দর ভিকির চরিত্রে ক্ষমতার শরীরী ভাষা আছে। সে কথা কম বলে। কিন্তু তার উপস্থিতিই ভয়। ছবির শেষ অংশে আদালতের দৃশ্যগুলো খুব ঠান্ডা। কোনো আবেগ নেই। শুধু কাগজ, ফাইল, এবং সময়।


কিন্তু এই সিনেমা সহজে আসেনি। প্রথমে নাম ছিল Punjab 95। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন একশো সাতাশটি 'কাট' চাইল। প্রযোজকরা মানলেন না। আদালতে গেলেন। প্রায় তিন বছর পর ২০২৬ এ এসে ৩রা জুলাই ছবিটি জি ফাইভে (ZEE 5) এল। নাম হল সাতলুজ। কোনো কাট ছিল না। মুক্তির আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সরকার তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ম ২০২১ এর ধারা ৩ ব্যবহার করে ছবিটি ব্লক করার নির্দেশ দিল। জি ফাইভ ভারত থেকে ছবিটি নামিয়ে দিল। এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকেও সরে গেল। আগস্ট ২০২৬ এ ছবিটি টেলিগ্রাম অ্যাপের বিভিন্ন চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে। জি ফাইভ বলল তারা আইনি ভাবে ফেরানোর চেষ্টা করবে। এখন পাঞ্জাবের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ছবিটি দেখাচ্ছে। তাকে বলা হচ্ছে গেরিলা স্ক্রিনিং।

এখানে থেমে গেলে গল্প অসম্পূর্ণ থাকে। কারণ আজকের ২০২৬ সালের এই নিষেধাজ্ঞা বুঝতে গেলে ২০২১ সালের তথ্যপ্রযুক্তি রুলস্ কে বুঝতে হবে। এই নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার যেকোনো ডিজিটাল কনটেন্টকে জরুরি ভিত্তিতে ব্লক করার নির্দেশ দিতে পারে যদি সেটি ভারতের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়। ধারা ৩ এর অধীনে কোনো বিচার লাগে না। নোটিস আসে, প্ল্যাটফর্ম মেনে নেয়। জি ফাইভের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টা মাত্র। তিন বছরের আইনি লড়াই, তারপর মাত্র দুদিন। ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্র একজন মানুষকে শেষ করেছিল কারণ তিনি কথা বলেছিলেন। তখনও আদালত ছিল। ১৯৯৫ সালেই সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছিল। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ বিচার হয়েছিল। দোষীদের সাজা হয়েছিল। ২০২৬ সালে আমরা দেখছি অন্য একটি পদ্ধতি।
হানা আরেন্ট ১৯৫১ সালে তার বই, দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটেরিয়ানিজম এ বলেছিলেন টোটালিটেরিয়ানিজমের প্রথম কাজ হল সত্যকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা। সে ইতিহাসকে বদলে দেয়। ২০২৬ এর সাতলুজ কেসে আমরা দেখছি একই যুক্তি। সত্যকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে মুছে ফেলার জন্য , যাতে নতুন প্রজন্ম প্রশ্নই করতে না পারে। ১৯৯৫ সালে আদালত ছিল প্রতিকার। ২০২৬ সালে প্রতিকার হল তিন বছরের আইনি লড়াইয়ের পরও আটচল্লিশ ঘণ্টায় সব শেষ। কারণ, এখন রাষ্ট্র হাসতে হাসতে সত্যকে সরিয়ে দেয়।

সিনেমার ইতিহাসে রাষ্ট্র যখন সত্যকে ভয় পায় তখন সে সিনেমাকে ব্যান করে। এটি নতুন নয়। ১৯৬৬ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার পরিচালক ইয়ান নেমেকের ছবি এ রিপোর্ট অন দ্য পার্টি এ্যান্ড গেস্টস । ১৯৬৮ সালের প্রাগ স্প্রিং এর পর সরকার ছবিটি নিষিদ্ধ করে দেয়। কারণ সেটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিয়ে ছিল। ১৯৭৬-১৯৭৭ সালে ইরানের পরিচালক বাহরাম বেইজাই এর ছবি দ্য ক্রো । ছবিটিকে রাজনৈতিক বলে ব্যান করে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর নতুন ইসলামিক সরকারের সেন্সরশিপ নীতির কারণে বাহরাম বেইজাই-এর এই সময়কার বেশ কিছু কাজ ও চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ বা সেন্সরশিপের মুখে পড়েছিল। ১৯৯৩ সালে চিনের পরিচালক ঝাং ইয়িমৌ এর টু লিভ । চলচ্চিত্রটি ১৯৯৩ সালে নয়, বরং ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় এবং এর নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ তিয়েনআনমেন চত্বরের ঘটনা ছিল না। চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হওয়ার মূল কারণ ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ (Cultural Revolution)-এর মতো সংবেদনশীল ঐতিহাসিক সময়গুলোর কঠোর সমালোচনা ও নেতিবাচক চিত্রায়ন।

২০০৫ সালে আমেরিকার পরিচালক স্টিফেন গাগানের সিরিয়ানা । সেখানে তেল, সিআইএ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে কথা হয়েছে। আমেরিকায় যদিও ব্যান হয়নি, তবে শাসকের পছন্দও হয়নি। সেখানে রাষ্ট্রীয় সমালোচনা সিনেমার অংশ। এই পার্থক্যটি বড়। গণতন্ত্রে সমালোচনা সহ্য হয়। ফ্যাসিবাদের প্রবণতায় সমালোচনা শত্রু হয়ে যায়। ভারতে ২০১৪ সালে অনুরাগ কাশ্যপের Ugly সেন্সরশিপে আটকেছিল। পরে আদালতের নির্দেশে মুক্তি পায়। ২০২১ সালে মিয়ানমারের মিলিটারি কু এর পর বহু ডকুমেন্টারি ব্যান হয়। কারণ তারা রাষ্ট্রীয় হত্যার কথা বলছিল।২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সামরিক জান্তা বহু সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন প্রযোজনা নিষিদ্ধ করে, যার ফলে অনেক ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্র দেশেই নিষিদ্ধ বা সেন্সরশিপের মুখে পড়ে এবং নির্মাতারা গোপনে কাজ করতে বা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সাতলুজ এই তালিকাতেই পড়ে।

এই প্রসঙ্গে পিয়ের বোর্দিয়োর কথা মনে পড়ে। ১৯৭৭ সালে তার বই রিপ্রোডাকশন ইন এডুকেশন সোসাইটি অ্যান্ড কালচার  এ তিনি বলেছিলেন রাষ্ট্র শুধু বন্দুক দিয়ে নয়, সংস্কৃতি এবং স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করেও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। বইটিতে তিনি এবং তার সহকর্মী জঁ-ক্লোদ পাসরন (Jean-Claude Passeron) শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে কীভাবে সমাজে ক্ষমতার অসমতা ও আধিপত্য বজায় থাকে, তা তুলে ধরেছিলেন।
সাতলুজ কেসে আমরা দেখছি একই প্রক্রিয়া। সিনেমাকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র একটি গোটা প্রজন্মের স্মৃতি থেকে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের পাঞ্জাবকে মুছে দিতে চাইছে। তথ্যের উৎস এখানে সুপ্রিম কোর্টের রায়, সিবিআই রিপোর্ট, NHRC -র  (National Human Rights Commission ) নথি এবং ২০২৬ সালের জি ফাইভের (ZEE 5) সরকারি বিবৃতি। জি ফাইভ ৫ই জুলাই , ২০২৬ এ বিবৃতিতে বলেছিল বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সাতলুজ ভারতে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত অনুপলব্ধ থাকবে। তারা আরও বলেছিল আমরা সাতলুজ এবং তার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির পাশে দৃঢ়ভাবে আছি। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছবিটি দর্শকদের কাছে ফেরানোর জন্য আমরা সব উপায় খতিয়ে দেখব।

সাতলুজ নামটিও নিছক নয়। সাতলুজই হল প্রাচীন শতদ্রু। ঋগ্বেদে এই নদীর উল্লেখ আছে। নদী সাক্ষী। সে কথা বলে না। কিন্তু বয়ে যায়। হানি ত্রেহান এই নামটি ব্যবহার করে স্থানীয়তা এবং সময়ের দীর্ঘতাকে একসাথে ধরেছেন। ১৯৪৭, ১৯৮৪, ১৯৯৫ সবই এই নদীর তীরে ঘটেছে। মিশেল ফুকো ১৯৬৯  সালে তার বই আর্কিওলজি অফ নলেজ  এ বলেছিলেন রাষ্ট্র ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় আর্কাইভকে নিয়ন্ত্রণ করে। খালরা সেই আর্কাইভকেই অস্ত্র বানিয়েছিলেন। ত্রেহান সেই আর্কাইভকে সিনেমা বানিয়েছেন। আর রাষ্ট্র ২০২৬ সালে সেই সিনেমাকেই আর্কাইভের মতো সরিয়ে দিতে চাইছে।

একটি সাধারণ ব্যাংক কর্মীকে নায়ক করা যায় কি। হলিউড ১৯৯৩ সালে ফিলাডেলফিয়া বানিয়েছিল। সেখানে এইডস রোগী একজন আইনজীবীকে নায়ক করা হয়েছিল। জোনাথন ডেমি পরিচালিত এই ড্রামা ফিল্মটিতে অ্যান্ড্রু বেকেট চরিত্রে অভিনয় করেন প্রখ্যাত অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস।

ভারতে ২০২৬ সালে খালরাকে নায়ক করাই অপরাধ হয়ে গেল। জি ফাইভ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। ২০২১ এর তথ্যপ্রযুক্তি রুলস্ অনুযায়ী সরকার বললেই কনটেন্ট সরাতে হয়। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম কি শুধু মাধ্যম! নাকি তারও মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। ২০১৯ সালে নেটফ্লিক্সের 'লায়লা সিরিজ' ভারতে এসেছিল।প্রয়াগ আকবরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত, দীপা মেহতা পরিচালিত এই হিন্দি ভাষার ডিস্টোপিয়ান ড্রামা সিরিজে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হুমা কুরেশি। সেটিও বিতর্কে পড়েছিল। কিন্তু সরানো হয়নি। সাতলুজ এর বেলায় মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা ছবিটি চলল। এই তফাৎ কেন! ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ লিখেছিলেন নিচের তলার মানুষের ইতিহাস লেখা হয় না। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মিলে ১৯৮২ সালে 'সাবলটার্ন স্টাডিজ' (Subaltern Studies) নামক গ্রন্থমালা প্রকাশের মাধ্যমে এই ধারাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। খালরা ছিলেন সেই নিচের তলার মানুষ। তার গল্প সিনেমা না হলে হারিয়ে যেত। রাষ্ট্র এখন সেই সিনেমাকেও হারাতে চাইছে।

শেষে এসে দাঁড়াতে হয় শতদ্রুর তীরে। নদী আজও বইছে। সে ১৯৪৭ দেখেছে। ১৯৮৪ দেখেছে। ১৯৯৫ দেখেছে। ২০২৬ এ সে দেখল একটি সিনেমা নিষিদ্ধ হতে। খালরা নেই। কিন্তু তার প্রশ্ন আছে। ১৯৯৫ সালের কাগজে আছে। ২০০৫ সালের রায়ে আছে। ২০২৬ সালের বিতর্কে আছে। আগস্ট ২০২৬ এ টেলিগ্রামের চ্যানেলে ছবিটি ঘুরছে। মানুষ ডাউনলোড করছে। আলোচনা করছে। হানা আরেন্ট,ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত জার্মান-আমেরিকান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও লেখক। উনি বলেছিলেন টোটালিটেরিয়ানিজমের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল মানুষকে স্মৃতিহীন করা। সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থায় (Totalitarianism) সত্যের বিলোপ, প্রোপাগান্ডা এবং মানুষের স্মৃতি ও ইতিহাস বিকৃতির ভয়াবহতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। সাতলুজ সেই স্মৃতির বিরুদ্ধে লড়াই। যতদিন এই প্রশ্ন থাকবে ততদিন শতদ্রুর জল বইবে। আর জল যতদিন বইবে ততদিন আমরা ভুলব না যে একজন মানুষ শুধু হিসাব মেলাতে গিয়েই রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। আর ২০২৬ সালে একটি সিনেমা শুধু সেই হিসাবটা দেখাতে গিয়ে নিষিদ্ধ হল। রাষ্ট্র বলে ভুলে যাও। আর সিনেমা বলে আমি মনে রাখব।

সিনেমার শেষে টাইটেল কার্ড পড়ার আগে  এই কথাগুলো পরপর কালো স্ক্রীনে পর্দায় ভেসে ওঠে -

* Before Kuljit Singh could testify in High Court, he was found dead in his home. He was under CRPF protection at that time.  
* Kuljit's testimony, along with the testimonials of several other witnesses, were instrumental in getting the five guilty police officers' life imprisonment for the abduction and extrajuditial killing of Jaswant Singh.  
* DGP Bitta's name has never mentioned in the report.  
* Estimates suggest that thousands of men, women and children have either disappeared or died in extrajuditial executions in the worst years of Punjab insurgency.  
* Thousands of soldiers and members of the Punjab police have lost their lives during this 'proxy war'.  
* Paramjit Kaur has continued the fight her husband started, and has helped being justice to the families of thousand of victims. She is still fighting.  
* Sikhs across Punjab and Canada commemorate the day of his disappearence in honour of Martyr Jaswant Singh's fight for dignity and justice. Schools and parks have been founded in US and Canada in his memory and honour.  
* Jaswant Singh's body has never been found  
* "I CHALLENGE THE DARKNESS"  
~ Martyr Jaswant Singh.

 

0 Comments

Post Comment