পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন ৪

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়
লখাই যতই বলে, “আমি আছি তো। কাঁদছিস কেন”, ততই আদরিনীর কান্নার বেগ বাড়তে থাকে। –”এ তুমি কী করলে।”

আগের পর্বের সূত্র -

অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন ৩

 

–“ভালোই করেছি। এছাড়া কোনো উপায় ছিল না আদু!”

–“কী উপায় ছিল না। আগে তুমি বলোনি কেন! এ তো বিরাট সর্বনাশ করে দিলে। এবার জলে ডুবে মরা ছাড়া আমার উপায় নেই। তুমি যাও। আমি আমার রাস্তা দেখে নিচ্ছি। আদরিণী এবার কান্না থামিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। মনকে শক্ত করে নেয়। তারপর লখাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলে, “নাও, শেষ দেখা দেখে নাও। যা খুশি করো। আমি আর কোনো বাধা দেবো না তোমাকে। শেষ বারের মতো তোমার যা শখ মিটিয়ে নাও। বুঝলে!”

 

হ্যাঁ। উনিশে ফাল্গুন, সকাল আটটা বা তার কিছু আগে পিছে আদরিনী কাপড় কেচে বালতি ভরে ফিরছিল পুকুর থেকে। একটা প্রজাপতি কোত্থেকে যে উড়ে এসে ওর গায়ে বসলো। আদরিনী ভাবলো, তার বোধহয় সময় এসে গেছে। প্রজাপতিটা সে তাড়ালো না। কিছুক্ষণের মধ্যে সে নিজে নিজেই উড়ে গেলো। আর ঠিক সেই সময় লখাই এসে হাজির ওর সামনে, “এই আদু। চোখ বন্ধ কর তো। আমি তোকে একটা জিনিস দেবো”।

 

–“কী জিনিস!”

 

–”এখন বলবো যদি, তবে চোখ বুজতে বলছি কেন। চোখ বন্ধ কর না তাড়াতাড়ি। লোক এসে যাবে।”

 

– “কী যে করো না”, এই বলেই আদরিনী চোখ দুটো বন্ধ করে বললো, “নাও। হয়েছে। দাও এবার, কী দিচ্ছ।”

 

কালবিলম্ব না করে লখাই পকেট থেকে একটা সিঁদুরের থান বের করে থান খুলে ডান হাতের মধ্যম আঙুলে একটু সিঁদুর নিয়ে দিল আদরিনীর সিঁথিতে ঘষে। বললো, “দ্যাখ একী দিলাম।”

 

তারপর যা হল সে তো একটু আগেই জানানো হয়েছে।

 

অবশেষে আদরিনীকে আশ্বস্ত করে লখাই বললো, “কিচ্ছু হবে না। চল, তোকে আর তোদের ঘর যেতে হবে না। আমি তোকে আমার ঘরেই নিয়ে যাবো।”

 

– “তা কী করে হয়।”

 

– “আর তো কোনো উপায় নেই। এখন তোর এই একটাই রাস্তা। তোরে মরতে তো দেবো না আদু। মরার জন্যই কি প্রেম করেছিলি। চল, খুশি মনে আমার ঘরে চল।”

 

চোখ মুছতে মুছতে আদরিনী বলে, “তোমার দাদা বৌদি জানে?”

 

– “সেসব আমি বুঝে নেবো। তোকে ভাবতে হবে না।”

 

– “আমাকে তো গালমন্দ শুনতে হবে। তখন।”

 

– “কিচ্ছু হবে না।”

 

আর তো কোনো উপায়ও নেই। আদরিনী ভাবে। সিঁথিতে সিঁদুর পরে সে যদি নিজের ঘরেই যায়, কী হতে পারে। তার চাইতে, “সিঁদুর যখন পরেইছি তখন লখাইয়ের সঙ্গে থাকাই ভালো হবে। আমার তো কোনো দোষ নেই।”

 

এইসব ভাবতে ভাবতে চটজলদি লখাইয়ের ঘর যাবারই সিদ্ধান্ত নেয় সে। কিন্তু এই বালতিটা!

 

– “এখানেই রেখে দে। কেউ না কেউ ঠিক তোদের ঘরে পৌঁছে দেবে। নইলে যে পাবে, পাবে। আর পিছন ফিরে দেখতে হবে না।”

 

অগত্যা বালতিটা সেখানে রেখে দিয়েই লখাইয়ের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে আদরিনী।

 

চোখে মুখে দুশ্চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।

 

রাম কাজে বেরিয়ে গেছে। সৌদামিনী রান্নায় ব্যস্ত। এমন সময় অতর্কিতে সিঁদুর পরা একটা মেয়ের সঙ্গে লখাইকে দেখে বৌদি সৌদামিনী যেন দিনে তারা দেখলো।

 

– “এটা কে!”

 

– “আমার বৌ।”

 

– “সে কী? তুমি তো একটু আগে ঘরেই ছিলে। এর মধ্যে কখন বিয়ে করলে? এ কী করলে তুমি। বলা নেই কওয়া নেই, একেবারে বৌ নিয়ে হাজির!”

 

– “করে ফেলেছি তো বৌদি! কী করবে বলো!”

 

– “ছিঃ ছিঃ! এ কী করলে তুমি। পাড়ায় মুখ দেখাবো কী করে! তোমার দাদাই বা কী বলবে বলো তো! এবার আমিই বা কী করি!”

 

– “কী আর করবে। দাদা আসা অব্দি তো থাকতে দাও।”

 

–”কোথাকার মেয়ে? মেয়ের ঘরের লোক জানে? নাকি নিয়ে পালিয়ে এসেছো?”

 

–”সেসব পরে ব'লবো। এখন একটু বসতে দাও তো।”

 

কী আর করে সৌদামিনী। এটা লখাইয়েরও তো ঘর। তাড়িয়ে দেয় সে কী করে। অগত্যা দুজনকেই ঘরে এনে বসালো সৌদামিনী।

 

হাঁড়িতে আর এক কৌটো চাল ফেললো সে। দুপুরে তো খেতে দিতে হবে।

 

তারপর এক গেলাস সরবৎ এনে নতুন বৌয়ের হাতে দিয়ে বললো, “কী নাম তোমার?” মেয়েটি প্রথমটায় চুপ করে থাকলেও শেষ অব্দি সৌদামিনীর কথার উত্তরে বলতেই হ'ল। মাথা নিচু করে নিচু গলায় বললো, 'আদরিনী'।

 

– “ঘর কোথায়?”

 

– 'বেদে পাড়া।’

 

– “ও। এই তো সামনেই। তা কোন মন্দিরে বিয়ে করলে?”

 

মেয়েটি চুপ। আর কিছু বলতে পারছে না সে।

 

লখাই বলে, “পরে সব জানবে বৌদি। এখন ওকে একটু চুপচাপ বসে থাকতে দাও। ওর মন মেজাজ ভালো নেই।”

 

(১১)

 

ভিজে কাপড় ভর্তি বালতিটার কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই আদরিণীর এই অত্যাশ্চর্য বিবাহ বন্ধনের খবরটা পৌঁছে গেলো উপেনের বাড়িতে। খবর পেয়েই উপেন হতভম্ব হয়ে গেলো। এ কী হল। কিছুই বুঝতে পারলাম না। মেয়েটা কাউকে না জানিয়েই এমন কান্ড করে বসলো।

 

মেয়েটাকে জোর করে সিঁদুর ঘষে একটা ছেলে নিয়ে চলে গেলো–ব্যস! এই পর্যন্তই। ছেলেটা কে, কোথায় ঘর, কী নাম, তা আর কেউ বলতে পারলো না। উপেন রূপেনকে ডেকে বললো, “হ্যাঁ রে, মেয়েটা গেল কোথায় তা তো জানতে পারছি না। থানায় যাবি কি?”

 

– “দরকার নেই। ও তো আর নিখোঁজ হয়নি। আগে ওদের ঠিক বোঝাপড়া ছিল। নইলে এমন করে কেউ কাউকে সিঁদুর পরাতে পারে না। যেখানে গেছে যাক্। ইচ্ছে হলে আসবে, নাহলে যেখানে গেছে সেখানেই থাকুক।”

 

রূপেনের সন্দেহ হয়, “তবে কি সেদিন যে ছেলেটা এসেছিল আবাস যোজনার খোঁজ নিতে, এটা কি তারই কান্ড! মিথ্যা একটা বাহানা নিয়ে এসেছিল সেদিন!”

 

রূপেনের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়, “আরে, ওই তো বিয়ের দিন ড্রাইভারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আদু আর সুজি তো ওই ছেলেটার সাথেই কথা বলছিল। নিশ্চয় ওরই কান্ড।”

 

উপেন মুষড়ে পড়ে। সে ছেলের দিকে তাকিয়ে কয়েক ফোঁটা চোখের জল ফেলে বলে, “ভেবেছিলাম একটাই মেয়ে। বেশ জাঁকজমক ক'রে মেয়েটার বিয়ে দেবো। তা তো আর হ'ল না। দ্যাখ, মেয়েটা আর ফিরে আসে কি না।” তারপর বলে, “তোর মাকে কান্নাকাটি করতে মানা কর। গর্ভে ধরেছে তো। ওর কষ্টটা কি আর আমরা বুঝতে পারবো। যা দ্যাখ। ওর কিছু হয়ে গেলে তো আর এক বিপদ। পাড়াপড়শিরা এসে তো ওকে আরও যন্ত্রণা দিয়ে যাবে। তুই একটু বোঝাবি যা। বলবি, এ যুগে এসব কিছু ব্যাপার নয়। দেখবে ঘরে ঘরে এভাবেই সব বিয়ে হবে। অগ্নি স্বাক্ষী রেখে বিয়ের দিন শেষ। তুমি বিন্দাস থাকো। কেউ কিছু বললে স্পষ্ট বলে দিও আমাদের ঘরের ব্যাপার। তোমাদের অত চিন্তা কেন!”

 

এদিকে সৌদামিনী ভাবে, “যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আর তো ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। বেশি কিছু বললে শুধু অশান্তিই বাড়বে বৈ নয়। তার চেয়ে মানিয়ে নেওয়াই ভালো। যেভাবেই হোক, রামকে শান্ত করতে হবে। আর পাড়াপড়শির কথায় কান না দিলেই হলো।”

 

একটা নতুন শাড়ি বাক্স থেকে বের করে সঙ্গে নতুন সায়া ব্লাউজ সৌদামিনী আদরিনীর হাতে দিয়ে বলে, “এই নাও। নতুন বৌ তো, এই নতুন শাড়িটা পরো। ভাববার কী আছে! সব ঠিক হয়ে যাবে।”

 

আদরিনী একটু সান্ত্বনা পায়। বলে, “দিদি, আমি তো এভাবে বিয়ে করতে চাইনি। আপনার দেওর জোর করে আমাকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে। কী করবো বলুন!”

 

সৌদামিনী হাসে। বলে, “দেওরের তর সইছিল না। পাগল একটা! আমাদের বললেই তো হত। কত ধুমধাম করে বিয়ে দিতাম। যাক্ গে। এবার ঝড় সামলানোর পালা। সে আমি দেখে নেবো। তোমরা বরং চটপট রান্না শেষ হলেই খেয়ে নিয়ো।”

 

সৌদামিনী ঠিক করে, রাম আসবার আগেই ওদের খাওয়ার পাটটা চুকিয়ে দিতে হবে। পরের দৃশ্য তখন কেমন হবে বলা তো যায়না।

 

রাম একটা মুদির দোকানে কাজ করে। দুপুরে আসতে তার দুটো আড়াইটে বেজে যায়। তার আগেই ওদের খাওয়ার পর্ব চুকিয়ে নিয়ে ভেতরের ঘরে পাঠিয়ে দিতে হবে। রাম এসেই যেন দেখতে না পায়। ও এলে ওকে আজ ভেতরের ঘরে যেতে দেবো না। বলবো, “আজ এখানেই বসো। কিছু কথা আছে।”

 

যুক্তিটা মন্দ নয়। লখাই ভাবে, “দাদা-বৌদিকে আগে জানিয়ে কাজটা করলেই ভালো হতো। কাজটা ঠিক করিনি। রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। বৌদিরও কি মনে দুঃখ হয়নি। সেটা হয়তো চেপে রেখেছে বৌদি। আদরিনীর ঘরেও তো ঘটনাটা বিষ নজরে দেখবে। সবাইকে জানানোই উচিত ছিল। “অমত থাকলে তখন না হয় এভাবেই নিয়ে আসতাম”–এই আফসোস এখন কুরে কুরে খাচ্ছে লখাইকে।

 

আদরিনী খুব ভয়ে ভয়ে আছে। বৌদিই এখন ভরসা। আদরিনী বুঝতে পারে। ততক্ষণে সৌদামিনী ওদের দুজনের পাশাপাশি দুটো আসন পেতে থালায় ভাত আর কিছু ভাজা, সুক্তো ও মাছের ঝোল এনে রাখলো। তারপর দুজনকে ডেকে আনলো। লখাই আদরিনীর পাশে বসে খেতে চাইলো না। বৌদি হাসতে হাসতে বললো, “বা রে! তাই কি হয়। নতুন বর-কনেকে পাশাপাশি বসেই খেতে হয়। এটাই নিয়ম। কাল থেকে না হয় আলাদাই বসবে।”

 

“আজের দিনটা তো ভালোয় ভালোয় পার হোক্”–লখাই ভাবে। অতঃপর দুজন পাশাপাশি বসেই সলজ্জ ভঙ্গিতে খাওয়ার পর্ব শেষ করে।

 

হাত-মুখ ধুয়ে ওরা যখন ভেতর-ঘরের চৌকাঠ পেরোবে (লখাই আগেই পেরিয়ে গেছে) ঠিক সেই সময় রাম এসে হাজির। এবং সে আঁচ করে শাড়ি পরে কে যেন ভেতর ঘরে ঢুকলো।

 

আজ একটু আগেই রাম এসে গেছে। নইলে এ দৃশ্য তার চোখে পড়তো না।

 

সে সৌদামিনীকে জিজ্ঞেস করে, “কে ঢুকলো?”

 

সৌদামিনীর সাদামাটা উত্তর, “কই। কেউ না তো।”

 

– “আমি দেখলাম।”

 

– “'ওটা তোমার ভ্রম।”

 

– “মোটেই না। তুমি কিছু লুকাচ্ছো মনে হয়।”

 

সৌদামিনী বলে, “আমি তোমাকে কোনোদিন কিছু লুকিয়েছি। এই চৌকিটাতে বোসো। জল খাও। তারপর সব বলবো।”

 

রাম কিছুটা আন্দাজ করে। সে বুঝতে পারে লখাই ঠিক কিছু কান্ড করে বসছে। সৌদামিনীকে বলে, “লখাই নিশ্চই কোনো মেয়েকে নিয়ে এসেছে। বল তো কী ব্যাপার?”

 

সৌদামিনী রামের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলে, “রাগারাগি কোরো না। তুমি যা ভেবেছো তাই। ঠাকুরপো বিয়ে করে বৌ নিয়ে এসেছে। তুমি কিছু বোলো না। ফালতু ঝামেলা বাড়বে। লোকে শুনবে। পাঁচ কান হবে। তুমি খাওয়া সেরে কাজে চলে যাও। ওদের সাথে দেখাও কোরো না। সন্ধ্যায় ফিরে এসে যা বলার বলবে।”

 

রাম মাথা ঠান্ডা রেখেই বলে, “তোমাকে অত ভাবতে হবে না। আমি মুখ্যু হতে পারি কিন্তু বেকুব নই। আমি ওদের সঙ্গে দেখা করে তবেই যাবো। দেখো না কী হয়!”

 

এই বলে রাম ভেতরের ঘরে ঢুকে যায় সোজা।

 

“কই রে লখাই। তোর বৌ কই। নতুন বৌ যে ঘরে এনেছিস, তোর বৌদিকে একটা প্রণামও করালি না? তা হ্যাঁ রে। ওদের ঘরের লোক জানে তো? নাকি সিঁদুর ঘষে নিয়ে পালিয়ে এসেছিস?”

 

লখাই মাথা নিচু করে থাকে কিছুক্ষণ। মুখ দিয়ে আর কথা সরে না। আদরিনীও চুপচাপ মাথা নিচু করে থাকে।

 

দাদা এবার আদরিনীকে উদ্দেশ্য করে বলে, “মাথা নিচু করলেই হবে। আমি তোমার ভাসুর। মাথায় ঘোমটা নাও। আর যাও, তোমার বৌদিকে প্রণাম করে এসো। কাজটা তোমাদের ভালো হয়নি। যাক গে। আমার তো এখন সময় নেই। কাজ শেষ করে আসি। তারপর তোমাদের রামায়ণ শুনবো।”

 

এই বলে রাম বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে। লখাই আর আদরিনী গিয়ে দাদা আর বৌদিকে প্রণাম করলো। লখাই মাথা নিচু করে দাদাকে বললো, “দাদা। ভুল হয়েছে। আমাদের ক্ষমা করে দাও।”

 

– “'ক্ষমা করবো কি না, তা ফিরে আসি, তারপর হবে।”

 

এই বলে সৌদামিনীকে সদর দরজাটা বন্ধ করে দিতে বলে রাম বেরিয়ে গেলো। বলে গেলো, যেই আসুক না কেন, দরজা যেন না খোলে।

 

সন্ধ্যা ছ'টা। বাড়ি ফিরে রাম কারো সাথে কিছু কথা না বলে সোজা চলে যায় ভেতর ঘরে। লখাই তখন গালে হাত দিয়ে তক্তায় বসে কী সব ভাবছে। আর আদরিনী জানালার ধারে একটা টুলে বসে আছে চুপচাপ। রাম সোজা লখাইয়ের কাছে গিয়ে একটা রূপার আংটি হাতে দিয়ে বললো, 'যা, এটা তোর বৌয়ের আঙুলে পরিয়ে দে'।

 

লখাই ইতস্তত করে।

 

রাম সেদিকে আর নজর না দিয়ে লখাইকে বলে, “এবার বল্, কীভাবে তোরা বিয়ে করলি। বিয়েটা কোথায় করেছিস। কারা ছিল তোদের বিয়ের সময়।”

 

আমতা আমতা করে লখাই যখন সব কথা খুলে বললো, রাম তখন কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে কী সব ভাবলো। তারপর বললো, “চিন্তা করিস না। ওদের বাড়িটা কোথায় বল্, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি ওদের বাড়ি। ওরাও তো চিন্তায় আছে। মা-বাবার ব্যথা বেদনা তোরা কি আর বুঝবি। বিয়েটা কোনো হুজুগ নয়। যা করেছিস, ঠিক করিস নি। যাক গে। দেখি কতটা কী করতে পারি।”

 

ওদের ঠিকানা নিয়ে রাম বেরিয়ে পড়লো উপেনের ঘরের দিকে।

 

(১২)

 

উপেনের সদর দরজা বন্ধ। ভেতরে উঠোনে একটা আলো জ্বলছে, দেখা গেলো।

 

দরজায় কড়া নাড়তেই হন্তদন্ত হয়ে দরজাটা খুলতে খুলতেই উপেন পাগলের মতো বলে ওঠে, “কে। আদু। এলি মা। আয়। আয়। এই যে খুলছি। দাঁড়া।”

 

“কোথায় ছিলি মা” বলতে বলতে দরজাটা খুলতেই একটা অচেনা মুখ দেখে বলে ওঠে, তুমি কে হে। আমার আদুকে নিয়ে এসেছো বুঝি। সে কোথায় বলো।

 

রাম প্রথমটায় খুব বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “আপনার আদু আমার ঘরে আছে। ভাববেন না।”

 

উৎসুক মনে উপেন ওর হাতটা ধরে বলে, “নিয়ে এলে না কেন। ওকে নিয়ে এসো, যাও।” তারপর বলে, “তোমার ঘরে গেল কেন! কে নিয়ে গেছে ওকে? এক্ষুনি এনে দাও আমার আদুকে। ঘরে সবাই চিন্তা করছে। আর তুমি তোমার ঘরে ওকে আটকে রেখেছো কেন। কী দোষ করেছে আমার আদু?”

 

রাম সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “উপেন বাবু! একটু শান্ত হন। আপনার আদু কোনো দোষ করেনি। পরে আপনাকে সব বলবো। আপনারা চিন্তা করবেন, তাই খবরটা দিতে এলাম। যান, নিশ্চিন্তে ঘুমান। আমি কাল সকালে আবার আসবো। তখন সব কথা হবে।_

 

উপেনের যেন আর ধৈর্য্য ধরে না। বলে, “তুমি দাঁড়াও। আমি ঘরের সবাইকে ডেকে আনছি”–এই বলে সে তৎক্ষণাৎ ঘরে গিয়ে সবাইকে ডেকে আনলো। এবং সবকিছু তাদের জানিয়ে সেদিনের মতো অবস্থাটা সামাল দিয়ে রাম ঘরে ফিরে গেলো।

 

পরের দিন। অর্থাৎ বিশে ফাল্গুন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মুখ হাত ধুয়ে এবং ঘরে কিছু না খেয়েই রাম সোজা উপেনদের বাড়ি। উপেনরা তখন সবেমাত্র দাঁত মেজে চা খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সদর দরজা খোলাই ছিল। রাম বিনা অনুমতিতেই সোজা ওদের উঠোন পেরিয়ে একেবারে যেখানে চা বানাচ্ছিল উপেনর বৌ, সেখানে গিয়ে হাজির, “মাসিমা। আমি এসে গেছি। চা না খেয়েই। আজ আপনার হাতেই প্রথম চা খাবো।”

 

উপেনের বৌ চটজলদি ঘোমটা টেনে বললো, “বোসো বাবা। আদু ভালো আছে তো।” “দিব্যি আছে। ওকে নিয়ে ভাববেন না। আমি আছি তো।”

ততক্ষণে উপেন ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে রামের সামনে একটা চেয়ার পেতে দিয়ে বলে, 'এখানে বসো'।

 

– “না না। আমি মেঝেতেই বসবো। ওখানে আপনিই বসুন” –এই বলে ধপ্ করে মেঝেতে বসে রাম বলে উঠলো, “দিন। চা-টা দিন তো'।

 

উপেনের বৌ প্লেট ছাড়াই এক কাপ চা রামের সামনে নামিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেলো।

 

উপেন চেয়ারটা সরিয়ে দিয়ে মেঝেতে বসে বসেই রামের কাছে জানতে চাইলো, আদু ওদের ঘরে কেন।

 

রাম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো, “সে কী!, জানেন না। আমার ভাই ওকে সিঁদুর পরিয়ে নিয়ে গেছে। আদু এখন আমাদের ঘরের নতুন বৌ।”

 

উপেন বললো, “শুনেছি ও নাকি কোন ছেলের সঙ্গে চলে গেছে। তোমার ভাইকে বিয়ে করেছে। আর তা তোমরাও মেনে নিলে। আমাদের ঘরে পাঠিয়ে দিতে পারলে না? আমরা এবার বাইরে মুখ দেখাবো কী করে বলতো।”

 

রাম হাসলো। বললো, “মেসোমশাই! আজকাল এগুলো কোনো ব্যাপারই না। আগেকার দিন ভুলে যান। ওদের যখন পরস্পরকে পছন্দ হয়েছে তখন আমার আপনার কী যায় আসে! ওরা মনের আনন্দে সংসার করুক না। ভাইকে আমিও তো কোলেপিঠে মানুষ করেছি। আমারও তো কত স্বপ্ন ছিল ভাইয়ের বিয়ে দেবো। তা তো আর হলো না। তো কী করবো! মানুষের সব আশা কি পূরণ হয়, বলুন?”

 

এইভাবে আলাপচারিতায় কেটে যায় কিছু সময়। অতঃপর পরিবেশটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

 

আসার সময় রাম উপেনকে আগামী কাল ২১ ফাল্গুন বৌভাতে সবাইকে তাদের বাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ করে।

 

উপেন বলে, “বিয়েই হল না, তায় আবার বৌভাত। এসব দেখে লোকে তো আরও বেশি হাসাহাসি করবে।”

 

রাম হাসতে হাসতে বলে, “কে কী করবে তা নিয়ে আমাদের ভাববার কী আছে বলুন তো! বিয়ে তো দেওয়া হ'লো না, অন্তত বৌভাতটা তো হোক। কিছুটা ইচ্ছেতো পূরণ করি। আপনারা অবশ্যই যাবেন।”

 

– “ঠিক্ আছে।”

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment