তার মধ্যে রফিকের ঠোঁটের কষ বেয়ে প্রথম শীতের ঝোলাগুড়ের মতো টপ টপ করে ঝরছে রক্তের ফোঁটা। সেই রক্তবিন্দুতে মিশে যাচ্ছে নেড়িটার মুখের লালা। ওকে রফিক ভালোবাসত, রোজ বিস্কুট কিনে দিত। মরে পড়ে থাকা রফিকের আরও কাছে ঘনিয়ে আসে সে।
অবহেলায় পড়ে থাকা বাড়ির দরজার মতো হাট করে খোলা চোখগুলো আকাশের দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। হাঁ-মুখে কয়েকটা মাছি ভনভনিয়ে নিশ্চিন্তে প্রমোদভ্রমণ করে এল কয়েকবার। কয়েকটা মুখ জড়ো হয়েছে রফিকের মরা দেহটাকে ঘিরে। কিছুক্ষণ আগেও বেশ কয়েকটা মুখ ঘিরে ধরেছিল ওকে। তখনও ওর দেহটা জ্যান্ত ছিল।
ল্যাম্পপোস্টের ইলেকট্রিক তারের আদুরে জড়াজড়ির মতোই এই মুখগুলোও খুবই প্রাত্যহিক। ডাস্টবিনে কাকের জটলা যেমন, তেমনই আজকাল এদের দেখা যায় যত্রতত্র।
রফিক চার বছর ধরে এই বিভূঁইয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। রোজ সন্ধেয় এসে এই চায়ের দোকানে চা খায়, বিড়ি ফোঁকে, ভাড়া বাড়িতে ফেরে, বিস্বাদ খাবারগুলো গেলে রোজকার অভ্যাসে, একটা ঘরে দশজনে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আবার সকালে উঠে কাজে যায়। সপ্তাহ শেষে টাকা দেয় হেডমিস্ত্রি, সেই টাকা মুর্শিদাবাদে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তারপর জয়পুরের চায়ের গুমটিটায় বসে। বিড়ি ফোঁকে। রাতে ভাড়া বাড়িতে ফেরে। খেয়ে নেয়। গাদাগাদি করে দশজনে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সেই রফিক শীতের মনোরম সন্ধেয় ভাতের বড় দলা ঢোকানোর মতো মুখটা হাঁ করে, আধা ন্যাংটো হয়ে, পিচুটি মাখা চোখগুলো খুলে লাশ হয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের কষ বেয়ে টপ টপ করে পড়ছে শীতের নরম ঝোলাগুড়ের মতো রক্তের ফোঁটা।
বিড়িতে শেষ টানটা দিয়ে রফিকের মনে হচ্ছিল, কতদিন ঝোলাগুড় খায়নি। পরের সপ্তাহে বাড়ি যেতে হবে। বউটার জন্য মন কেমন করে। কতদিন হয়ে গেল, পরিমিত জলে বালির সঙ্গে সম ঘনত্বে মিশে যাওয়া সিমেন্টের মতো দু’জনে আদর করে না! দেশে ফিরে আম্মির চোখের অপারেশনটাও করাতে হবে। এবার গেলে আর আসবে না এসব জায়গায়। কিছু একটা দোকান খুলে নেবে বাড়ির কাছেই। বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে থাকতে মন চায় না আর। কিন্তু দোকান করবে কীভাবে! রাস্তার পাশে একটা গুমটি করতে গেলে তো পাড়ার ওই শুয়োরের বাচ্চা নেতাগুলোকে গাদা টাকা খাওয়াতে হবে।
এসব হাবিজাবি ভাবছিল সে। রোজই ভাবে আর বিড়ি ফোঁকে। আজকেও ভাবছিল বাড়ি যাবে, দোকান করবে। কয়েকটা খেজুর গাছ দাদন নেবে, টাকা জমেছে কিছুটা। তার থেকে গুড় বানিয়ে বিক্রি করবে। সকালে উঠে বউটার সঙ্গে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে ঝোলাগুড় দিয়ে বাসি রুটি খাবে।
তখনই পিছন থেকে একটা ঠাণ্ডা হাত শক্ত করে চেপে ধরে ওর কাঁধ। চমকে ফিরে তাকায় রফিক। লোকটাকে দেখেছে আগেও। লম্বাচওড়া ভাষণ দিচ্ছিল সেদিন মোড়ের মাথায়। লম্বা, মুখভর্তি বসন্তের দাগ, কপালের মাঝ বরাবর আলম্ব একটা তিলক। উঁইয়ের ঢিপির মতো উঁচিয়ে আছে ভুঁড়িটা।
—ক্যায়া বে বাংলাদেশি! ইধার আকে হম লোগোকা নৌকরি নিগল গ্যায়া তুলোগ। হারামি মাদারজাত! সব কুত্তো কা গাণ্ড তোড় দেঙ্গে!
একটু ঘাবড়ে যায় রফিক। আমতা আমতা করে, আলজিভটা আটকাতে থাকে টাকরায়।
—মা…মানে? বাংলাদেশি কেন হ…হব? আমি তো চার বছর ধরে এখানে কাজ করছি।
—চোপ শালা! একদম চোপ। জাদা বকওয়াস নেহি! জুবান নিকাল লেঙ্গে…নাম ক্যায়া হ্যায় বে তেরা?
আরও বেশ কয়েকজন এগিয়ে আসে। তাদের চোখে-মুখে ঘনিয়েছে জান্তব হতাশা। ওই সন্ধের ঝিরঝিরে হাওয়ায় আত্মরতির উল্লাসের ছাপ শরীরজুড়ে। থুঃ! একদলা থুতু উড়ে আসে রফিকের দিকে।
—বোল বে…নাম বোল জদলি…এক ঝাঁপর সে সাব দাঁত গিরা দেঙ্গে।
জড়ো হওয়া আট-দশজনের ভিড়টাকে দেখে জিভের লালা শুকিয়ে যেতে থাকে রফিকের। প্লাস্টিক জমা হতে হতে রাস্তার বড় নালামুখ যেভাবে বন্ধ হয়ে যায়, রফিকের গলাও সেভাবে আটকে আসে। কোনোরকমে মুখ খোলে,
—রফিক…
—আব্বে কাটুয়া শালা। ঘর কাহা হ্যায়? ইধার কা তো নেহি লগ হ্যায়।
উত্তর দেওয়ার আগেই একটা সপাট চড় খেয়ে মাথা ঘুরতে থাকে রফিকের।
—বাংলাদেশি কুত্তা কাঁহিকা…
—হারামি রোহিঙ্গা…
—ঘুসপেটিয়া জিহাদি…মার হারামিকো…
ইতিউতি কিছু মন্তব্য উড়ে আসতে শুরু করে চারপাশ থেকে, মন্তব্যের জটলা বাড়তে থাকে। বিক্ষিপ্ত মন্তব্যগুলো নিজেদের এক জায়গায় করে; একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের জুড়ে নিতে থাকে একের পিঠে দুই। অবিন্যস্ত মন্তব্যগুলো তখন সংগঠিত, চূড়ান্ত, অসীম শক্তিশালী, নিশ্ছিদ্র, একবগ্গা, আক্রমক, মতামতে পরিণত হয়েছে—বিক্ষিপ্ত স্টোনচিপ ঢালাই মেশিনে মশলা মেখে তৈরি করেছে বিশাল বাড়ির পিলার।
এরমধ্যে আরও দু’-চারটে চড়-চাপড় রফিকের শরীর ছুঁয়েছে। বেশ কিছু ধাক্কাও হাত মিলিয়েছে সেই চড়-চাপড়ের সঙ্গে। টাল সামলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু হাড়গিলে চেহারাটা অস্বীকার করে টাল রাখতে। পিচ ওঠা খোয়াময় রাস্তাটাকেই জড়িয়ে ধরে অবশেষে।
—ঘুসপেটিয়া জিহাদি…ইধার আকে হামলোগোকা নৌকরি খায়েগা রে কুত্তা…বাংলাদেশি…
—মার হারামি কো…ইধার হি কবর খোদ দুঙ্গা শালেকা…
—কাটুয়া…মুল্লা…
আরও আরও আরও শব্দেরা ঝরে পড়তে থাকে রাস্তায় এলিয়ে থাকা রফিকের শরীরে, তার সঙ্গে সঙ্গত করে অগুনতি কিল-চড়-ঘুষি-লাথি। একটা লাঠি জুটে যায় কোথা থেকে। উল্লসিত ভিড়টা মনের সুখে আধা ন্যাংটো কঙ্কালসার চেহারাটায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে—শিয়াল যেভাবে ঝাঁপায় মুরগি ছানার ওপর।
প্রহাররত ভিড়টাকে ঘিরে ভিড় আরও বড় হয়েছে। নিশ্চুপ, নীরব, নিথর অবয়বগুলোর চোখের ভাষা নিশ্চল। এদের কেউ কেউ চার বছর ধরেই রফিকের সঙ্গে এই চায়ের গুমটিতে আড্ডা মেরেছে, কেউ কুশল জিজ্ঞাসা করেছে, তাস পিটিয়েছে, কেউ টাকা ধার নিয়েছে-দিয়েছে, কেউ বিড়ি চেয়েছে, কেউ দেশলাই এগিয়ে দিয়েছে, মাঝেমধ্যে চায়ের দাম মিটিয়েছে।
এদের কেউ কেউ আজ উপভোগ করছে, কেউ বুঝে উঠতে পারেনি কী ঘটছে, কেউ শুধু কিছু একটা ঘটছে দেখার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ঝামেলায় জড়াতে চায় না বলে আফসোসসূচক আহা-উহু করেই ক্ষান্ত দিয়েছে।
প্রহাররত ভিড়ের থেকে দর্শকদের ভিড়টা আরও বড়, আরও দীর্ঘতর হচ্ছে।
শেষ লাথিটা যখন রফিকের গলার ওপর পড়ল, মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে একদলা রক্ত বেরিয়ে আসার সময় বিষব্যথা ছাড়া কিছুই অনুভব করেনি সে। আর কোনো চিন্তা আসেনি ওর মাথায়। বউ-মা-বাচ্চা…কারো কথা ভাবেনি। মরার ঠিক আগের মুহূর্তে স্বার্থপর রফিক নিজের অসহ্য যন্ত্রণার কথাই ভাবছিল শুধু।
তারপর তো সে মরেই গেল। আর কিছু ভাবতেও পারেনি। শীতল সন্ধের ঝিরঝিরে হাওয়ার মধ্যে পিচুটি মাখা চোখ দু’টো হাট করে খুলে আকাশ দেখতে দেখতে, মুখটাকে ইয়াব্বড় হাঁ করে, আধা ন্যাংটো হয়ে মরে গেল রফিক আলি মিদ্দা। মরার আগে ওর ঠিকানা একটা স্থায়ী ছিল। গ্রাম সোনাপাড়া। বাপের নাম নুরুল আলি মিদ্দা। ব্লক বেলডাঙা। জেলা মুর্শিদাবাদ। থানা, পোস্টঅফিস এসবের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
দর্শক ভিড়টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। ছাল ওঠা নেড়িটা আরও ঘনিয়ে আসছে রফিকের শরীরে। মাছিগুলো মনের সুখে ওর হাঁ-মুখের ভিতরে খেলায় মজে আছে।
মাছিদের ভনভনানির সঙ্গে মিশে গিয়েছে প্রথম শীতের আঠালো থকথকে ঝোলাগুড়ের মতো ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া টপ টপ রক্তের ফোঁটা।