সেই ছোটবেলাতেই আমাকে নিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল লোকটা। আর আমিও কী ভাবে কী ভাবে যেন সংসারের বাইরের লোক হয়ে গেলাম। ভাই যেখানে পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিয়ে ভাল রেজাল্টের হায়ার সেকেন্ডারি হয়ে কলেজ ইউনিভার্সিটি করে মাস্টারি পেয়ে গেল ইস্কুলের, আমার সেখানে এই কোম্পানি সেই কোম্পানি করে দিন এনে দিন খাওয়া। আজ ধুলাগড় তো কাল হলদিয়া, আজ মালদা তো কাল মেদিনীপুর। আমার কাজ ওই চেহারার জন্যই।
লোকটা কিছু বলবে যেন আমাকে। ঠোঁটটা কেঁপে উঠল না? বা বাতাসের জন্যও হতে পারে। ছবিটা আটকানো হয় নি হয়তো ঠিক করে। বা পেরেকের গায়ে শুধুমাত্র ঝুলিয়েই ছেড়ে দেওয়া। সত্যি কথা বলতে বাবা এত সহজে মুখ খোলার মানুষ নয়। মানে, ছিল না কোনও দিনই। আর আমার সঙ্গে ক’টা কথাই বা বলতো লোকটা?
খোকা—
ভুল শোনলাম না তো?
ফের তাকালাম পেছন দিকে। না, ঠিক যেমনি থাকার ছিল তেমনই তো। সেই পাট করে আঁচরানো চুল। সাদা কলারওয়ালা জামা। ধুতি। কালো ফ্রেমের চশমা। মাকে বললাম, তোমার কথামতো রেখে গেলাম বাবাকে। অনেক খুঁজে পেতে কোথায় পেলাম বলো তো? না, মায়ের অবশ্য কথাগুলি কানে গেল কিনা বোঝা মুশকিল। বললাম, কত বছর আগেকার কথা ভাবো! বাড়ি পাল্টানোর সময় কে কখন— ।
প্রসূন তো চেষ্টাই করতে চায় নি কোনও। একেবারে হঠাৎ করেই নাকি পেয়েছে। ওর কথায়, নীচের ঘরেই ছিল তো, মানে ওর নতুন তৈরি হওয়া বাড়িতে। আর বাবার ছবি ও নেবেই বা কেন? ঠিকই, সন্তান হিসাবে কেউ যদি বাবার কিছুমাত্র পেয়ে থাকে তবে প্রসূণই। কিন্তু কেন কে জানে, হয়তো মায়ের প্রতি বাবার দুর্ব্যবহারের জন্যই ও তেমন গ্রাহ্যই করত না বাবাকে। বাবার প্রতি তেমন প্রেম-ভালবাসা ছিল না ওর। অথচ ছবিটা পাওয়া গেল ওর বাড়িতেই। বলল, সিঁড়ির নীচে একটা আবোল-তাবোল জিনিষে ভর্তি বস্তায়। ওখানে গেল কীভাবে কে জানে? মায়ের ঘরে সেই দেওয়ালের গায়েই তো আটকানো ছিল লোকটা। সিঁড়ির নীচের ওই বস্তায় কে ঢোকাল?
কেউ না কেউ তো ঢুকিয়েছে, হয় তুই বা বউমা বা মা-ই হয়তো ভুল করে, এবার তাড়াহুড়ায়— ।
কম দিন আগেকার কথা? এই এতদিনে হঠাৎ করে প্রেম জেগে উঠল মায়ের। আর তুইও পারিস, মা বললেই শুনতে হবে? সারা জীবন যে লোকটা মাকে— । বলল, আমার কী, তুইই সারা জীবন মা-মা করে গেলি, আর মা-ও তোকে ছাড়া— ।
কথাটা ঠিকই। ছোটভাই প্রসূণ যতই দেখাশোনা করুক মায়ের, যতই খেয়াল রাখুক, মা কিন্তু ডাকবে এই ষণ্ডামার্কা চেহারার নির্বোধ আমাকেই। হয়তো পাবে না, হয়তো আমি তখন হাবিজাবি কোনও ব্যাপারে জড়িয়ে বাইরে ঘুরছি কোথাও, তবু— । আর ভাইয়ের কথাগুলি ভাবুন, ‘এই এতদিনে প্রেম জেগে উঠল মায়ের’— এ কেমন কথা? ও অবশ্য এমনই। একেবারে কাঠকাঠ। একটা মানুষ শেষ জীবনে এসে তাঁর স্বামীকে দেখতে চাইছে এটা কী এমন অস্বাভাবিক ইচ্ছে? আর মানুষটা কে, না তোমার মা। এই বয়সে যে কোনও মানুষ তো আসলে শিশুই। এইট্টি থ্রি, মানে তিরাশি। বাবা মারা গেছে তা ধরো বছর পনেরো। ওর নতুন বাড়িতে যাওয়া তাও বছর তিন। আর এতগুলি বছর কারও খেয়ালই পড়ে নি যে লোকটা মানে লোকটার ছবিই আসলে, যেখানে লটকানো ছিল এতদিন, নেই তো!
আমাদের সংসার বলতে আমি, আমার মা আর ভাই। ভাই বলতে ভাইয়ের পরিবার— ভাইবউ, ভাইপো। নতুন বাড়ির পেছনে অনেক টাকা ঢালতে হল। স্বাভাবিক। ইচ্ছে ছিল পুরনো মানে কলোনির এই সাড়ে চার কাঠার জমির ওপর বলতে গেলে সত্তর বছর আগেকার বাড়ি বিক্রি করে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে খরচের মেটানো হবে কিছুটা। ঠিকই, বাড়ি নয় আসলে দাম এখন সাড়ে চার কাঠা জমিরই। কিন্তু না, মা যাবে না কিছুতেই। স্বামী-শ্বশুরের ভিটে ছাড়বেই না। আমাকেই তবে থাকতে হয় মায়ের কাছে। কলোনির একেবারে পেছন দিক হওয়ায় আমাদের বাড়িটা নজরের বাইরেই থেকে যায় সবার। আর নতুন বাড়িটা করতে গিয়ে মনে হল, আরে এতদিন ছিলাম কীভাবে এখানে। বর্ষায় জমা জল, এদিক-ওদিক জঙ্গল-ঝোপ।
বাড়ির কথা মাথায় এনেছিল বউমা। নতুন বউ, কিছুদিন তবু কাটিয়েছে এখানেই, এবার বাচ্চা হওয়ার পর ভাবছে থাকা যাবে না কিছুতেই। এ বাড়ি বিক্রি করে হয় ফ্ল্যাট নয় জায়গা কেন কোথাও।
বাবাকে আনার কোনও ইচ্ছে ছিল না আমার। মা ‘ছবি কোথায় গেল’ বলার পর চেষ্টাই করি নি খোঁজার। এবার খুঁজে পাওয়া গেল যখন, তখন রাখতেই হয় কোথাও। রাখতে হল সেই আগের জায়গাতেই, মায়ের একেবারে চোখের সোজাসুজি, মানে দু’জন যেন দু’জনকে চাইলেই দেখতে পারে। এবার শোব কোথায় আমি? এই বয়সের অসুস্থ একজনকে একা রাখি কী ভাবে? সুতরাং আমার কাজের জন্য খুব দূরে যাওয় বন্ধ করতে হল, ধুলাগড়-হলদিয়া বাদ দিয়ে কাছাকাছির বারাকপুর-বারাসাত, যেন রাতে ফিরতে পারি বাড়িতে। একই বিছানা আমাদের। আর ভাই নতুন বাড়িতে চলে যাওয়ার পরপরই যেন রোগটা পেয়ে বসল মাকে। রাতভর কথা বলা। বা আমিই হয়তো খেয়াল করিনি এতদিন। এখন গোটা বাড়িতে আর কোনও লোকজনের না থাকার জন্যই হয়তো মায়ের কথাগুলি কানে আসবে আমার।
কার সঙ্গে কথা বলো, কী হলো?
কিছু একটা বলে, এটা ঠিক। কিন্তু এই বয়সে কারই বা গলার স্বর ঠিক থাকে তেমন। আর কথা বলছে তো ঘুমের ঘোরে। স্বপ্নও দেখে থাকতে পারে। ক’দিন পরপর জেগে উঠে গায়ে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়েছি মায়ের।
কী বলছো, কার সঙ্গে কথা বলছ তুমি?
জেগে উঠে শুধু তাকিয়েই থাকবে আমার দিকে। তখন আর কথা নেই কোনও। প্রসূনকে বললাম, এ তো আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেছে। প্রসূন দেখলাম, জানে। বলল, সে তো বাবার সঙ্গে, বুঝিসনি তুই?
কিন্তু বাবার সঙ্গেই বলবে কেন? আর কেউ থাকতে পারে না? সেই দেশের বাড়ি, গ্রাম, গ্রামের মানুষ বা মুক্তিযুদ্ধ, বর্ডার পার হওয়া। শেষ বয়সে শুনেছি একেবারে পুরনো সব কথাই নাকি— ।
না, ভাইয়ের স্থির বিশ্বাস অন্য কিছু বা কেউ নয়, ওই লোকটাই। প্রসূনের কথায়, মরেও শান্তি দেবে না, দেখ গিয়ে স্বপ্নে স্বপ্নে হাজির হচ্ছে হয়তো।
মা নিজেই একদিন বলে বসল বাবার কথা। দুপুর নাগাদ। আমি তখন চামচ দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছি একটু একটু করে। বলল, একটা ছবি ছিল না?
কার ছবির কথা বলছে বুঝতে পেরেও না-বোঝার ভান করে জানতে চাই, কোন ছবি?
তোর বাবার ছবি, ফেলে দিস নি তো!
বাড়ি তোমার যেমন হোক, পাঁচটা লোক থাকলে বাড়ি অনেক অন্য রকম। আর লোক না-থাকা বাড়ি সে বাড়ি আসলে বাড়িই নয় কোনও। লোক না-থাকা বাড়ির এই বাড়ি না-হওয়াটা টের পাই এখন।
মা বাথরুমে গেছে তখন। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে, একা। হঠাৎ শুনি, খোকা।
ঘাড় ফিরিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে দেখি, লোকটা দেখছে আমাকে। সরিয়ে নিলাম চোখটা। বাথরুমে থাকা মাকে ডেকে উঠলাম, হয়েছে তোমার?
বলা যেতে পারে বাবা মারা যাওয়ার পরপরই মা-ও যেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলল বেঁচে থাকার। তাহলে বাড়িটার কী হবে? কে তদারকি করবে সংসারের? প্রসূন ওর ভালবাসার মেয়ে খুঁজে পেল একটা। বা হয়তো খোঁজাই ছিল, বললাম, নিয়ে আয় তবে ওকে। ওর বাড়ির লোককে বল। ঠিক, তখনও কিন্তু ছিল বাবার ছবিটা। প্রসূণেরই বাঁধিয়ে নিয়ে আসা। ওরই টাঙিয়ে দেওয়া। একেবারে মায়ের ঘরেই। আলমারির গা ঘেঁষে একেবারে মায়ের চোখ বরাবর। আর আমারও চোখে পড়েছে তখন। সেই কলার দেওয়া সাদা জামা, পাট করা চুল, কালো ফ্রেমের চশমা।
মা বলল, তোর বাবাকে বিশ্বাস করাতে পারছি না কিছুতেই।
এখন আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় না কিছু। ওই যে, কী বিশ্বাস করাবে, কী? জানি, আমার প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে একেবারে চুপ করে যাবে তখন মা। বা, উল্টোপাল্টা কোন কথা থেকে কোন কথায় যাবে।
একটা মজার ব্যাপার হয়েছে ইদানিং, তা হল, টিভি সিরিয়ালের গল্পের সঙ্গে নিজের গল্প মিলিয়ে দেওয়া। বোন এসেছে একদিন। ওরই চোখে পড়ল প্রথম। আমি ঘরে নেই। মা নাকি একটা লোক দেখিয়ে বলছে, জিজ্ঞেস কর ওকে, জিজ্ঞেস কর, ও সব জানে। বোন নাকি অবাক খুব, বলল, মা কি পাগল হয়ে যাবে নাকি রে দাদা। কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলল, টিভি সিরিয়ালের একটা লোককে দেখিয়ে বলল, জিজ্ঞেস কর ওকে, জিজ্ঞেস কর— । বলছে, লোকটা কিন্তু জানে সব, একমাত্র ও-ই বলতে পারবে। বললাম, জিজ্ঞেস করতে পারলি না, কী জানে লোকটা বা কীসের কথা বলছে মা। বোনের কথায়, কী জিজ্ঞেস করব বল, উল্টোপাল্টা বলছে তো আজ অনেক দিন, তুই তো ঘরে থাকিস না, জানবি কী করে? ভাইয়ের বউই বলে উঠল, মা হয়তো ‘কোয়েলের বাড়ি’ সিরিয়ালের কথা বলছে। বোনের কাছে জানতে চাইলাম, কী রকম ছিল রে লোকটা দেখতে? বোনের কথায়, সে তো মুহূর্তের জন্য দেখা। নয়িকার উলটো দিক থেকে আসছিল। সরু একটা রাস্তা ধরে, গ্রাম বা শহর কিছু একটা হবে, মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, পাইছিলি? নিল তোরে? — ওইটুকুই। ‘পাইছিলি’ মানে তো কাউকে পাওয়ার মানে হয়তো খুঁজে পাওয়ার কথাই জিজ্ঞেস করছে, আর ‘নিল তোরে’ মানে না নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কাকে বা কার কথা বুঝতে পারলি কিছু? মেয়েটা কী বলল লোকটার কথা শুনে? নায়িকা যখন, তখন একটা উটকো লোক এমনি একটা কথা কেনই বা জানতে চাইবে? অচেনা একটি লোক ফাঁকা রাস্তায় শুধুশুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করলে নায়িকা চরিত্রের একটি মেয়ে কি চুপ করে থাকবে?
বোন বলল, তুইও তো দেখি মায়ের মতন হয়ে গেলি? ওই ফালতু একটা সিরিয়ালে কে কী বলল অমনি হাজার কথা তুলতে শুরু করলি। বললাম, গল্পের ওই নায়িকার সঙ্গে তেমন কোনও সম্পর্ক না থাকলে বা একেবারে পরিচয় না থাকলে— । কিছু তো একটা পেয়েছে মা ওই লোকটার মধ্যে? বা ওই জিজ্ঞাসার মধ্যে। না, বোন নাকি তেমন মনযোগ দিয়ে দেখছিল না তখন।
কিন্তু কী রকম ছিল লোকটা, মনে পড়ছে?
বোন বলল, কী রকম আবার ওই একটু কালো মতো, সাধারণ চেহারারই। হয়তো ওই রকম চেহারার কাউকে মা কোথাও দেখে থাকবে কোনও দিন। হয়তো বাংলাদেশেই। বা বর্ডার পার হওয়ার সময়। হতেই তো পারে। বর্ডার পার হওয়ার সময় মা তো একা, বাবা তো মাকে ফেলে পালিয়ে আগেই— । ওই লোকটাই হয়তো মাকে বর্ডার পর্যন্ত— । মানে ওই রকম দেখতে কোনও লোকই হয়তো।
বউমা বলল, ‘কোয়েলের বাড়ি’ সিরিয়ালটার সময় পালটে দেবেন চ্যানেলটা। দেখতে দেবেন না
‘কোয়েলের বাড়ি’ সিরিয়ালটা তাহলে দেখতে হবে আমাকে।
গল্পটা কী নিয়ে জানিস কিছু?
ওই বাংলা সিরিয়ালের গল্প যেমন হয় হবে তেমন কিছুই। এক পুরুষের দুটো বউ। থাকবে এক বাড়িতেই— । একটু নতুন বলতে ওপার বাংলার একটা লোক— কথা বলবে দেশের ভাষায়, ওই যার কথা বলছে মা। সব সিরিয়ালেই থাকে এমন এক-আধজন।
ও যাই বলুক, আমাকে দেখতে হবে। লুকিয়ে হলেও। ভূমিকা কী লোকটার? জাস্ট এসেছে না কি— । আগে এসে থাকলে কত আগে? না, বোন নাকি ওই একঘেয়ে বাংলা সিরিয়াল দেখেই না আর।
পরপর তিন দিন বসে থেকেও লোকটাকে দেখতে পেলাম না। এমনকী নায়িকাকেও না। বা ঠিক করে বললে মাত্র তিনদিনের দেখায় নায়িকা যে কে আমি হয়তো বুঝতেই পারিনি ঠিক করে। বোন বলল, তুইও কি সিরিয়াসলি নিলি মায়ের ওই ভুলভাল কথা? মায়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে তুইও দেখি— ।
বাবার মৃত্যুটা বোনের বলা সিরিয়ালের মৃত্যুর মতো ছিল না। ভুগেছে অনেক দিন। বোঝাই যাচ্ছিল দিন ঘনিয়ে এসেছে লোকটার। হ্যাঁ, ওই চরম অবস্থায়ও কিন্তু ছাড়েনি মাকে। মানে মায়ের চরিত্র নিয়ে অকথা-কুকথা। আর মাও শুনত বসে বসে। প্রসূণ রেগে যেত। বলত, মরার সময়ও তোমার স্বভাব গেল না। বা আরও কড়া কিছু। লোকটা নাকি খুঁজত আমাকে। আমাকে নাকি ওর দরকার খুব। ভাবুন একবার, বেঁচে থাকতে যে ছেলের ডাকখোঁজ করল না কোনও দিন এখন মরার সময়— । আমার অবশ্য আগ্রহ হতো না তেমন। শুধুমাত্র ভাইয়ের খুব পীড়াপীড়িতে হাজির হলাম একদিন। বলছিল আর কিন্তু টিকবে না, দেখার হলে দেখে যা, তোকে দেখতে চাইছে খুব। মা দেখি কপালে বেশ বড় মতো টিপ পড়ে বসে। তার মানে মা-ও বুঝে গিয়েছিল আর বেশিদিন ভোগাবে না লোকটা। ঠিক পরের দিনই ঘটে গেল যা ঘটার। বিদায় নিল একেবারে ভোরের দিকে। ভাগ্যিস ভাইয়ের ফোন পেয়ে আগের দিন একেবারে দুপুর-দুপুর চলে এসেছিলাম।
ভাল কথা, বাবার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সেই শেষ দিন লোকটা কিন্তু যুদ্ধের কথা তুলল। মানে খানসেনা, বর্ডার পার হওয়া। না, আমার জন্ম হয় নি তখনও। বললাম, যুদ্ধ নেই তো আর, খানসেনারা সারেন্ডার করেছে সেই কবেই। মা তখন লম্বা ঘোমটা দিয়ে বাবার শিয়রে বসে। বাবার মুখে তখন মৃত্যুর ছায়া স্পষ্ট একেবারে। ঘোলাটে চোখ, কোঁচকানো চামড়া, কথা এক-আধ মিনিট বলেই চুপ একেবারে।
তোরা বাধা দিস কেন? দে না বলতে, যা চায় বলুক।
বাবা তখন কথা বলছে একেবারে ফিসফিস করে, থেমে থেমে। একটা একটা শব্দ করে। ঠিক কিছু শোনাও যাচ্ছে না মুখের সামনে কান নিয়ে, ওই ঠোঁটই কাঁপনটাই শুধু। যেন শরীরের শেষ হতে থাকা শক্তির হিসেব করে করে চেষ্টা করছে কিছু বলার। বললাম, কী বলছ? কিন্তু চাইলেই কি শোনা যায়। লোকটা তখন জীবনের একেবারে শেষ মাথায় বলে কথা। শব্দ আসছে যেন কোন অতল গহ্বর থেকে। যেন অনেক অনেক দূরের কোথাও তখন অপেক্ষা করছে বাবা। আমি চুপ করে বসে থাকি, অপেক্ষা করি। আমি জানি মা-ও অপেক্ষা করছে লোকটার পরের কথাগুলির জন্য। কী হতে পারে, কী হতে পারে? কিন্তু না, পরের কথাগুলি আর বেরোলই না লোকটার মুখের থেকে। ঠোঁট নড়ানোর চেষ্টা দেখছিলাম যদিও, ওই কেঁপে কেঁপে ওঠা। বোনটা তবু জিজ্ঞেস করছিল লোকটার কানের কাছে মুখ নিয়ে, কী হল, কী বলবে বললে, বলো?
মৃত্যুর সময় মানুষ কেমন হারিয়ে যায় যেন। কথাটা বোনের। কোত্থেকে যে কথায় যাবে— । বললাম, ক’টা মৃত্যু দেখেছিস তুই যে এমন একটা কথা মাথায় এল তোর।
দেখছিস না কথা বলতে বলতে খেই হারিয়ে ফেলছে কেমন।
সে তো দুর্বলতা বা স্মৃতির টানাটানির জন্যও হতে পারে।
বাবার কথা এতদিন পর ফিরে আসল মায়ের জন্যই। আমরা সবাই আসলে এখন মায়ের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করছি মানে টের পাচ্ছি আর বেশিদূর নয়। প্রসূণ বলল, ওরা দু’জনই কেমন যুদ্ধ দেখেছে কিন্তু, আমাদের মনে হয় সে চান্স নেই।
যুদ্ধ না দেখাই ভাল, যুদ্ধ মানেই— ।
বোন হঠাৎ করে বলে বসল, তোরা বাবার মুখ থেকে কোনও দিন গল্প শুনেছিস যুদ্ধের?
মেয়েদের বুদ্ধি বলো বা মনে রাখার ক্ষমতা সবই যেন অন্য রকম। বললাম, ঠিক বলেছিস তো। প্রসূণকে বললাম, তোকে বলে নি বাবা যুদ্ধের গল্প? সেই যুদ্ধ বা মাকে ফেলে পালিয়ে বর্ডার পার হওয়া?
বোন বলল, বললে ওকেই বলবে, ওই হলো বাবার সবচেয়ে আদরের, বাবার মাথা বলো বা শিক্ষাদীক্ষা বলো পেয়েছে তো ও-ই। কিরে বলে নি তোকে কোনও দিন? বর্ডার কী ভাবে পার হলো বা মা হারিয়ে গিয়েছিল কী ভাবে?
প্রসূণের বউ মানে ঠিক করে বললে আমার বউমা অবাক হলো খুব। অবাক হওয়ারই কথা, এ সব নিয়ে ঘরে আলোচনাই বা হয় কোথায়? বলল, মা হারিয়ে গিয়ে থাকলে বিয়ে হলো কী ভাবে তোমার বাবার সঙ্গে?
প্রসূণ ধমকে উঠল ওর বউকে। হারিয়ে গিয়ে থাকলে বিয়ে না হওয়ার কী আছে? হারিয়েছিল ধরে নিলাম বর্ডার পার হওয়ার সময়েই, বা আগেই, তাতে বর্ডারের এপারে এসে বিয়ে হতে পারে না? আর মা তো হারিয়েছিল বিয়ের পরপরই। মানে বিয়ের দিন পাঁচ-সাতের মধ্যেই নাকি মিলিটারি ঢুকল গ্রামে, মানে পাকিস্তানি বা খানসেনা যাই বলো।
ওই শুরু হল, যা তো মা কী বলছে শোন দেখি, আমি ততক্ষণে— ।
মা দেখি বলছে কী সব। ওই ঘোর লাগা সব কথা। জানালার বাইরে কেউ যেন দাঁড়িয়ে। কেউ যেন বকে উঠল মাকে। কেমন অদ্ভুত না? মা কাঁদছে যেন, আর ভয়ও। যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে কিছু। ‘আমি ফিরমু কিন্তু।’ কতদিন পর মায়ের মুখে সেই দেশের কথা। বললাম, কে মা? কাকে বলছ তুমি? কার কাছে ফিরবে?
প্রসূণ বা বোন আজ বাড়ি ফিরবে না কেউ। বোন ওর ছেলেমেয়েদের রেখে এসেছে ওর বরের কাছে আর ওদিকে ভাইয়ের শ্বাশুড়ি এসেছে কাল তাই ওর ছেলেকে নিয়েও টেনশানের নেই কিছু।
অনেক দিন পর আমরা ফের একসঙ্গে। আমরা মানে আমি, আমার ভাই আর বোন। ভাইয়ের বউকে আমিই ঘুমোতে যেতে বললাম। বললাম, কাল ভোরের আগে কিছু হবে বলে মনে হয় না। কিছু হলে প্রসূণ ডেকে দেবে ঘুম থেকে।
আজ নিজেদের ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছিয়াম সবাই। বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানা গিয়ে প্রসূণ কেমন হাতির পিঠে চড়ার বায়না ধরেছিল বা বোন লক্ষ্মীপুজোর আগেই ঠাকুরের ভোগের নাড়ু খেতে গিয়ে মার খেয়েছিল মায়ের কাছে— কেমন জেগে উঠল এক এক করে। বোন একবার প্রসূণের বিয়ের কথা তুলল। বলল, তুই একেবারে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে কী ভাবে ওকে পটালি বল তো? বলল আমাকেও, বলল, তুই অপদার্থই একটা আমার স্কুলের তুলি কিন্তু তোকে— ।
মেয়েরা আসলে আমাদের থেকে বুদ্ধি ধরে বেশি বা ওদের অনুমান ক্ষমতাও অনেক। হঠাৎ করে আমাকে বলে বসল, তুই যে বললি মা নাকি কাকে ‘আমি ফিরমু কিন্তু’ বলল, কথাটা কাকে উদ্দেশ্য করে বলতে পারে বল তো? কার কাছে ফিরবে?
বললাম, ও তো বিকারের কথা, মৃত্যুর আগে আগে এমন বলে তো মানুষজন। বোনকে বললাম, তুই আবার এইসব কথা ধরে— ।
ঠিকই, কিন্তু এই শেষ বেলায় নাকি সবার মনে পড়ে অনেক কিছু। সেই ছোটবেলার অনেক মানুষজন, অনেক লুকোনো গল্প এসে হাজির হয়। শেষ বেলার এই বিকারে নাকি সত্যি কথাই থাকে।
বললাম, বাবাকে ছাড়া আর কাকে বলবে কথাটা? বাবার ছবিটার মধ্যেই হয়তো দেখতে পেয়েছে সত্যিকারের বাবাকে। হতেই পারে।
‘ফিরমু’ বলবে কেন তাহলে? ‘ফিরমু’ মানে তো যেখানে ফেরার কথা ছিল যাবে সেখানেই। যেন কেউ আটকে রাখতে পারবে না মাকে। মরার পর বাবার কাছে যাওয়ার কথা হলে ‘ফিরমু’ বলবে কেন, দেশের ভাষা দিয়েই তখন বলবে, ‘আইতাছি কিন্তু’।
বোনকে বললাম, চমৎকার বানাতে পারিস দেখি তুই।
প্রসূন দেখি ওই অবস্থাতেও হেসে উঠল ফিকফিক করে। বলল, যাত্রা লেখা শুরু কর এবার।
খোকা—
বাবার গলা না? জানালা-দরজা বন্ধ থাকলে যা হয়— বাইরে রাত যে তখন কত, বোঝা মুশকিল। ছবির লোকটা দেখি স্থির তাকিয়ে আমার দিকে। ওর তাকানো গ্রাহ্য করলাম না আমি। আমার মাথায় তখন বোনের কথাটাই। ‘আইতাছি’ না বলে ‘ফিরমু কিন্তু’ বলল কেন? কাকে বলল কথাটা মা? কেনই বা বলল?
হঠাৎ একটা শব্দ জেগে উঠল কেমন। ঘরঘর ঘরঘর। মা। কেমন একটা দোমড়ানো-মোচড়ানো। আবার চুপও করে গেল নিজের থেকে। একেবারেই চুপ। ঘাড় ফেরালেই আমি দেখতে পারি তখন। দরকারে ডাকতেও পারি ওদের দু’জনকে। ওরা অবশ্য নির্বিকার। ভাই মেঝেতে চাদর পেতেছিল একটা, ওটাতেই ও আর বোন কখন শরীর ছেড়ে দিয়েছে। আমি চেয়ারেই। প্রসূণের নাক ডাকছে সামান্য। বোন বিড়বিড় করছে, স্বপ্ন দেখছে হয়তো।
কাল ভোরভোরে মাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে সবাই। একে খবর দাও, ওকে খবর দাও। ডেথ সার্টিফিকেট নাও ডাক্তার ডেকে। খাট জোগার করো, ফুল আনো। দেওয়ালে লটকানো লোকটার কথা মনেই পড়বে না কারও।
আমি ঠিক এই সুযোগটার কথাই ভাবি। দেওয়ালের গা থেকে নামিয়ে আনি ছবিটাকে। মা এখন আর দেখতে পাচ্ছে না কিছুই। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে ঢুকিয়ে লোকটাকে আপাতত পাশের ঘরে খাটের নীচে রাখলেই হবে। এরপর কাল সুযোগ বুঝে একেবারে আগের বারের মতো প্রসূণের বাড়ির সেই সিঁড়ির নীচে হাবিজাবি জিনিষে ভর্তি বস্তাটাতে— ।
আমার ঘুম পেতে থাকে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি।