পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

উপমা

  • 10 March, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 530 view(s)
  • লিখেছেন : মৌমন মিত্র
এবারের সহমনের গল্প- শতদ্রু, মিশুক আর উপমার গল্প।

শতদ্রুর কথা  

 

প্রথমে মেন গেটটা ক্রস করবে ঠিক সকাল ন'টা বেজে সাত মিনিট। তার পর কার্ড সয়াইপ করে বাঁ-হাতের তালু দিয়ে কপালের এলোমেলো চুল আরও কেয়ারফ্রিভাবে কপালে এলিয়ে দেবে, উপমা। তার পর লিফট দিয়ে উঠে কাচের দরজা ঠেলে অফিসে ঢুকতে আরও মিনিট পাঁচ। এই,এই ,এইবার টেবিলের ওপর কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে ও চোখ রাখবে মনিটরের স্ক্রিনে।

আমার সঙ্গে উপমার সামনাসামনি কফি মেশিনের কাছে দেখা হতে সকাল এগারোটা। ওর স্টাইলিশ হিল চটির খটখট শব্দ টের পাই আমি। কিউবিকাল থেকে কফি মেশিন অবধি উঠে যেতে আধ মিনিটও সময় লাগে না। ফলে আধ মিনিটের বেশি উপমাকে মিস করার প্রশ্নই ওঠে না ! 

দেখা হলে উপমা প্রথম ঠোঁটে মিষ্টি একখানা হাসি ঝুলিয়ে বলবে,'' কফিব্রেক?'' আমি লাজুক হেসে কাগজের কাপ তুলে দেব ওর হাতে। কিন্তু, উপমা একদিনও কফি সিপ করতে করতে আমার সঙ্গে আড্ডা দেয় না। অফিসে ওর অনেক বন্ধু। আমাদের বস, মিশুকদা, তমাল, কল্যাণ,রুবি,মোহিনী। 

আরে! আপনারা আবার কী ভাবতে বসলেন? মেয়েটিকে ভাল লাগে আমার? দূর! আমি হলাম আস্ত এক বাউন্ডুলে, ছন্নছাড়া ছেলে! আমার কোনও প্রেমের সম্পর্ক টেকেনি আজ পর্যন্ত।

ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বেশ কয়েকটা চাকরি পেলাম,মুম্বাই,দিল্লি,হায়দারবাদে। বাবা মা আটকে দিল। কিছুতেই কলকাতার বাইরে পা রাখতে দেবে না,জানেন। আমাকে নাকি বাড়ির ব্যবসা সামলাতে হবে।

ব্যবসার লেনদেন সামলাব আমি? আমার বেহিসেবি, ভুলোমনে এই জন্মে সে সব পারব না। কয়েক মাস নাকানিচোবানি খাওয়ার পর একদিন সকালবেলা পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় চোখ রেখে ভারী গলায় আমার বাবা বলল,'' তুমি একটি ইডিয়ট। এইবার চাকরির কয়েকটা অ্যাপলিকেশন করো, কলকাতা শহরে। ফ্যামিলি বিজনেসটুকু সামলাতে শিখলে না ! '' মনে অনেক সাহস জুগিয়ে আমতা আমতা করে বলেছিলাম, '' চাকরির অভিজ্ঞতা না-হলে ব্যবসা বুঝব কীভাবে? '' 

বাবা আরও চটে গিয়েছিল সেদিন। পত্রিকাটা ঝাঁকিয়ে বন্ধ করে টেবিলের উপর রেখে বলল,'' জীবনে ডিসিপ্লিন না-থাকলে কিসুই পারবে না তুমি। একদিনও ঠিক সময় অফিসে পৌঁছতে পেরেছ? পারবে কোথা থেকে? তুমি কী ভাবো আমার চোখ নেই? ল্যাপটপের পর্ন ওয়েবসাইটগুলো ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে যে মুছতে হয়, সেই বুদ্ধিটুকুও মস্তিষ্কে নেই। আজ এই মেয়ে কাল সেই মেয়ে নিয়ে কফিশপ ঘুরে বেড়াও, আমি কোনও খোঁজ রাখি না মনে হয় তোমার? ''

প্রথমত, একটা কথা বলুন, যৌনতা দেখে সেটা মুছে ফেলব কেন? সেক্স কি জীবনের অংশ নয়? তা হলে? একটা ন্যাচারাল প্রসেসকে… যাক গে। বাবাকে বোঝানো ইম্পসিবল ! দ্বিতীয়ত, আমি মেয়েদের কফিশপে নিয়ে ঘুরে বেড়ালে ক্ষতি কী? মেয়েগুলোও তো এ সব চায়! আশ্চর্য!  

গোড়াতেই বুঝেছি যে, এই মানুষটার সঙ্গে এক অফিসে এক ছাদের তলায় কাজ করা সম্ভব নয়, তাই মাস তিনেকের মধ্যেই একটা ডিসেন্ট চাকরি জোগাড় করে ফেলি সেক্টর ফাইভে।

তারও বেশ কয়েক মাস পর অফিসে এল, উপমা। ততদিনে আমার চারটে ব্রেক আপ, আর দু'খানা হুক আপ হয়ে গেছে অলরেডি। নতুন কোনও সম্পর্কে জড়ানোর ইচ্ছে,আগ্রহ,কোনওটাই আমার নেই। এমনিই, জাস্ট এমনিই একদিন একটা বুক স্টোরে ওর সঙ্গে কফি খেতে গেলাম দুপুরবেলা। 

বেশ মা মা দেখতে। পাতলা লালচে ঠোঁট, এক পিঠ ঘন চুল। বছর পঁচিশ বয়স হবে।আমার চেয়ে বছর চারেক ছোট। কথাচ্ছলে জীবনের নানা ধরণের ভিউপয়েন্টস আলোচনা করলাম আমরা। ওকে আত্মবিশ্বাসী, আত্ম অহংকারী গোছের মেয়ে মনে হয়েছিল। কয়েক মাস পর কানে এল,মিশুকদা,মানে, আমাদের বসের সঙ্গে লটঘট চালিয়ে একের পর এক প্রমোশন হচ্ছে উপমার। প্রথমটায় মেনে নিতে কষ্ট হল। যতই অস্বীকার করি, মেয়েটিকে ভাল না বেসে বেসিক্যালি থাকা যায় না,জানেন।

হাসলে দু'গালে ভারী সুন্দর টোল পড়ে! কী মিষ্টি যে এই পৃথিবীটাকে মনে হয় তখন, কী বলব! মনে হয়, গাছ, পাতা, মেঘ, বৃষ্টি, পাখির ঠোঁট সব একেবারে সুগার লোডেড! 

সেই মেয়ে অফিসে ঢুকতে না ঢুকতেই ধান্দাবাজদের মতো মই ধরে তরতর করে উঠে যাবে? মিশুকদা হল উপমার থেকে প্রায় আঠেরো বছরের বড়। শেষমেশ ক্যারিয়ারে সাফল্য পেতে কাকুর সঙ্গে প্রেম? 

অথচ এমন নয় যে উপমার ক্যালিবার নেই। 

মেয়েটির মেধা আছে। পরিশ্রমী। শুনেছি, মাধ্যমিক,উচ্চমাধ্যমিক, গ্র্যাজুয়েশন, মাস্টার্সে প্রচুর নম্বর!  এত নম্বর আমার থাকলে আমি সাপের পাঁচ পা দেখতাম! তা হলে, তা হলে? আপনারাই বলুন, দ্রুত সফল হতে এই পথ বেছে নেওয়ার কোনও মানে হয়? 

এই দুঃখে আধুনিক যুগের দেবদাস ঢঙে ছ'দিন মোক্যাম্বো আর বারো দিন সামপ্লেসে ড্রিংক করলাম মাঝরাত পর্যন্ত। আবার ল্যাপটপে পর্ন দেখা শুরু হল ঘন ঘন। তাতে আদতে কিছুই হল না,বুঝলেন। দিন দিন উপমার প্রতি আসক্তি আরও বেড়ে গেল। জেদ চাপল মাথায়। মিশুকদার মতো একখানা বুড়ো ভাম। সে যদি উপমার মতো ক্রেডিবল মেয়েকে পায়, ওয়াই নট মি? আর - একবার উপমাকে ডাকব মোড়ের মাথার কফি শপে? প্রশ্ন করব, কেন করলে এরকম? বলো … একদম রুপম ইসলামের সুরে গাইব গানটা? 

 

তবে, একটা বিষয় খেয়াল করলেন আপনারা? এই যে আমার জীবনের লাভ অ্যাঙ্গেলের এত গল্প বললাম আপনাদের, একবারও উপমার মনটা ভেবেছি, বলুন তো? না, ভাবিনি। আই মিন, উপমা কী চায়? ও কি আদৌ আমার প্রতি অ্যাট্র্যাক্টেড? 

আমি শ্যামলা,হ্যান্ডসাম,অল্পবয়সি পুরুষ। আধ কামানো দাড়ি গালে কবি-কবি দেখতে। বড়লোক বাপের একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার পুত্র বলেই কী ভেবে নিয়েছি যে, উপমাও একইভাবে শতদ্রু সিংহ রায়কে পছন্দ করে, ভালবাসে?

কোনও এক বৃষ্টির রাতে প্রথম চুম্বনের পর আরও একশোবার আমার শরীরের ভিতর যেতে চাইবে মেয়েটি? 

 

উপমার কথা 

 

মিশুক, 

তোমাকে  এই কথাগুলো সামনাসামনি বসে বলতে পারলে ভাল লাগত আরও। সময়ের অভাবে সেটা হল না। 

ঘটনাটা ঘটে শুক্রবার সন্ধেবেলা। তুমি অফিসে ছিলে না। জ্বর হয়েছিল তোমার। হোম অফিস করছিলে। আমি সাড়ে ছ'টা নাগাদ বেরলাম অফিস থেকে। হিন্দুস্তান পার্কে কয়েকটা কাজ সেরে ভাবলাম, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরব আজ। মাও খানিকটা খুশি হবে। বেরিয়ে দেখি, অফিসের বাইরে সিগারেটের দোকানে দাঁড়িয়ে স্মোক করছে, শতদ্রু। হঠাৎ আমাকে দেখে ও দৌড়ে এল, '' বাড়ি ফিরছ? '' আমি হেসে মাথা নাড়লাম। 

তার পর গুটি গুটি পায়ে আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল ও। আমার দিকে তাকিয়ে ব্যাক স্টেপ নিতে নিতে দ্রুত এগিয়ে চলছে। ওর চোখে অনেক প্রশ্নচিহ্ন জমা রয়েছে, মনে হল আমার। জানতে চাইলাম,'' কিছু বলবে? ''  হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল ও, আমিও সামান্য অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। ঠোঁটের সিগারেট মাটিতে ছুড়ে, পা দিয়ে সিগারেটের বাটটা মাটিতে পিষতে পিষতে ও বলল,” আমি ল্যাপটপ ব্যাগটা নিয়ে আসি অফিস থেকে? এক কাপ কফি? না বোলো না প্লিজ…যাবে..'' ও কথা শেষ করার আগেই আমি মাথা নামিয়ে বললাম, '' এসো, অপেক্ষা করছি।'' 

কফি শপ পৌঁছে মিনিট দশেক আমরা দু'জনেই চুপ। আমিই শুরু করলাম,'' তোমার প্রশ্নগুলো কিন্তু আমি জানি, শতদ্রু।'' 

'' কীভাবে? '' 

'' সিক্সথ সেন্স বলতে পারো। কিংবা মেয়েলি হাঞ্চ! '' 

শতদ্রু জোরে হেসে উঠল,'' তা হলে তুমিই শুরু করো। দেখি, তোমার আন্দাজ মেলে কিনা। '' 

'' তোমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অফিসের সবাই বলে, সবাই জানে। '' বলতে বলতে শতদ্রুর চোখে ক্ষোভ, রাগ ঝলসে উঠল।

 সন্ধে নামছে বাইরে। সন্ধের হালকা আঁধারে সেদিন কেন জানি না, শহরটাকে নতুন করে ভালবাসতে চাইছিল আমার মন। আমরা সবুজ খিড়কি জানলার পাশে বসেছিলাম। বাতাসে কালবৈশাখীর সোঁদা গন্ধ। উঠবে ঝড়? বৃষ্টি নামবে কি? 

দু'কাপ ফার্স্ট ফ্লাশ অর্ডার করল শতদ্রু। সঙ্গে ফিশ ফিঙ্গার। ছটফট করছিল ও। বাকিটা শোনার জন্য। চটজলদি একটা সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করল,'' এই বিষয়ে আর কিছু? '' 

মাথা নিচু করে তখন আমি বলে গেলাম এক নিঃশ্বাসে,'' মিশুকের কথা বলছ তো? জানি। তবে, রিউমারটা মিথ্যে। আমি ওকে ভালোবাসি না। আমার মা অসুস্থ। বাবা নেই। মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন, অনেক টাকা। মিশুক সুকৌশলে আমাকে বড় বড় প্রজেক্টের ভার দিয়ে আমার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলার চেষ্টা করে প্রতিদিন। অফিসসুদ্ধ রটিয়ে বেড়াতে চায় যে, উই আর ইন রিলেশন! ও ডিভোর্সি। ওর কোনও সামাজিক দায় নেই। আমার কথা ভাবেই না।'' 

'' তুমি এগুলো মেনেও তো নিচ্ছ!'' চেঁচিয়ে উঠল শতদ্রু। 

''বললাম না, টাকা, টাকার লোভে ! আমাকে ঘৃণা করো শতদ্রু। তুমি, তোমরা, বিশেষত মেয়েরা, সব্বাই ! ঘৃণা করো আমাকে। আমি তারই যোগ্য। শুধু আমাকে নয়, অফিসের আরও বেশ কয়েকজন মেয়েকে ও একইভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এক্সপ্লয়েট করে চলেছে। ম্যাটারটা এক্সপোজ হলেই আমাদের চাকরিগুলো যাবে। আই হোপ এই কথাগুলো স্টে বিটউইন ইউ অ্যান্ড মি। মিশুক সেক্সচুয়ালি স্টার্ভড, জানো?” 

'' রিয়ালি? ছুঁয়েছে ও তোমাকে? সত্যি বলবে। কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে তোমাকে রাসকেলটা? '' 

ছেলেটা চা আর ফিশ ফিঙ্গার টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি,'' মাই ব্যাক। হোয়াটস্যাপ হুক্কা বারে। অনেকবার ছুঁয়েছে। কাফের দুটো বাচ্চা ছেলে দেখেওছিল। কোনও প্রতিবাদ করেনি ওরা। হয়তো ভেবেছে, আমি মিশুকের প্রেমিকা। আচ্ছা, প্রেমিকা হলেও কি পাবলিকলি একটা মেয়ের শরীরের প্রাইভেট পার্টস স্পর্শ করা যায়? ছোটবেলায় আমাদের মরাল সাইন্স ক্লাসে এ সব পড়ায়নি কেন বলতে পারো? '' 

চা জুড়িয়ে এল। কেউ কিছুই খেলাম না। আমার কান্না থামার পর শতদ্রু বলল, '' তুমি কাল থেকে আর অফিসে যাবে না।'' 

'' মানে? '' আমি অবাক হয়ে তাকালাম,'' কী বলছ তুমি? ভেবেচিন্তে বলছ শতদ্রু? '' 

'' হ্যাঁ, হ্যাঁ সব ভেবেই বললাম। তুমিই বোঝো না, আমি কতটা ভালবাসি তোমাকে। প্রথমদিন থেকে তোমার প্রতিটা স্টেপ ফলো করি আমি। তুমি কখন ফ্রি হবে, কখন তোমার কাছে যাব … কিন্তু, একটা সময় পর মিশুকদা আর তোমাকে ঘিরে এত অফিস গসিপ শুরু হল! ভাল লাগত না কিছুই। আমার ভিতরের প্রেমিক আজীবন বাধা পেয়ে এল। উল্টোদিকের মানুষটাও যদি এই ভালবাসতে চাওয়া না অনুভব করে ,কিছু এগোয়? আর মনে হত, হাজার হোক, মিশুকদা তোমার ক্যারিয়ারে একটা স্ট্রং ফুটহল্ড দিতে পারবে। আমি কি পারব? তবে, ইদানীং অদ্ভুত চুপচাপ লাগত তোমায়। বুঝতাম। কিছু একটা ঘটছে। '' 

'' তুমি একটা আস্ত গাধা! '' আমি চেঁচিয়ে বলে ফেললাম। হঠাৎ শতদ্রুর পিছনে বসে থাকা বয়স্ক লোকটা উঠে আমার কাছে এসে, আমার দুটো হাত তাঁর বুকের কাছে নিয়ে বললেন, “এই, এইটা খাসা বলেছ বাছা !'' শতদ্রু ইলেক্ট্রিক শক পাওয়ার মতো চমকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,'' বাবা ! তুমি?” 

ছেলেকে রাগি গলায় '' অকর্মণ্য কোথাকার! '' বলে, আমার দিকে তাকালেন, '' আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি। তার জন্য ক্ষমা কোরো আমাকে। তুমি কাল থেকে আমার অফিসে এসো। আমি ঠিকানা লিখে দিচ্ছি তোমাকে। পারলে তোমার অফিসের বাকি দুটি মেয়ের সিভি আমাকে পাঠিও। আমি দেখি যদি কিছু করতে পারি। '' 

শতদ্রু হতবম্ভ ! মাথা নিচু করে কাকুর সামনে দাঁড়িয়ে রইল। আমার খুব হাসি পেল তখন ! কাকু আরও বললেন, '' আজকের পর চাকরিটা আমার এই মাথা মোটা ছেলেটারও যাবে। হি ক্যান জয়েন মাই অফিস এনিটাইম। তবে, তার জন্য ওকে আরও ডিসিপ্লিন হতে হবে। ওর চাইতে তুমি অনেক বেশি যোগ্য ক্যান্ডিডেট এই মুহূর্তে। '' 

পকেট থেকে একখানা ছিমছাম নোটপ্যাড, কলম বের করে পুরনো স্টাইলে অফিসের ঠিকানা, ফোন নম্বর হাতে লিখে দিলেন কাকু। আমার দিকে পাতাটা এগিয়ে বললেন, '' গাধাটাকে তোমার পছন্দ হলে জানিও। আমার ছেলে এই প্রেমটা টিকিয়ে রাখতে না-পারলে, বুঝব, ও তোমার যোগ্যই নয়। '' ওঁর কথা শেষ। পাশের টেবিলের উপর রাখা ল্যাপটপ হাতে তুলে গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন !

 আমরা অবাক ! উচ্ছসিত ! 

আমি তো মনের ভিতর 'হরষগীত' শুনতে পেলাম। একা। কাকুর ওই কথাটা বেস্ট, '' তুমিই যোগ্য ক্যান্ডিডেট এই মুহূর্তে! ''

 গত দেড় বছরে ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমিও কিছু পারি। মনে হত তুমিই সব। মনে হয়, সব প্রজেক্টে আমাকে প্রমোট করছ, আমার যোগ্যতার জন্য নয়। তুমি আমার শরীরটাই চাও।সেটাই সব। আমার ডিগ্রি, ডিগ্নিটি সব মিথ্যে। 

মায়ের অসুস্থ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠত সারাটাদিন। অসহায় লাগত। ওয়াশরুমে কাঁদতাম অঝোরে। কয়েক পোঁচ মেক আপ, কনসিলার লাগিয়ে ফ্রেশ লুকে টেবিলে ফিরে এসেছি দিনের পর দিন। কলিগরা টের পায়নি। অথবা পেয়েছে। জেনেবুঝেও কেউ কিছু বলেনি। বলবেও না। তোমার ক্ষমতাবৃত্তে ইন্ট্রিউড করবে কার সাধ্যি বলো ! 

 

শতদ্রু হাঁ করে ক্যাবলার মতো বসে রইল কিছুক্ষণ। আমি উঠে বললাম,” আসি আজ...'' ও কোনও সাড়াশব্দ করল না, শুধু মাথা নেড়ে '' হ্যাঁ '' বলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। 

তারও বেশ কয়েকদিন পর একটা অভিমানী টেক্সট মেসেজ পাঠাল, '' তুমি এতটাই নিষ্ঠুর? আমাকে বিয়ে-ফিয়ের করার স্বপ্ন না হয় ছেড়েই দিলাম, প্রতিদিন বাবার অফিসে যাও, একটা মেসেজ পাঠিয়ে আমার খোঁজটুকুও নাও না?” আর নিজেকে ধরে রাখা যায়! 

লেকের ধারে বিকেলবেলা শতদ্রুকে ডাকলাম। সেইদিনই আমাদের বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়ে গিয়েছে। ফাল্গুন মাসের চার তারিখ। কীভাবে প্রপোজ করেছিলাম জানো?

লেকের ধারে সন্ধের আধো অন্ধকারে দেখা হতেই প্রকাশ্যে ফরাসি চুম্বন। বৃষ্টি পড়ছিল টিপটিপ। আমাদের ঠোঁটে জলের ফোঁটা লেগেছিল। ভেজা চুম্বনের রেশ টেনে শতদ্রু বোকার মতো প্রশ্ন করেছিল,'' আমাকে ভালবাসো তো উপমা? '' 

 '' গাধা কোথাকার!” বলে, ওর বুকে এক ঘুষি মেরেছিলাম আমি।

 

হয়তো ভাবছ, তোমাকে আমাদের প্রেমের ডিটেলসে লেখার প্রয়োজন ছিল কি? হ্যাঁ, ছিল। তুমি প্রেমের নামে কুৎসিত একটা খেলা খেলে যাও অফিসের জুনিয়ার মেয়েদের সঙ্গে। বোঝো কি যে, ওটা আর যাই হোক, প্রেম নয়? 

       এ সব থেকে আমি অন্তত বেঁচেছি, জানো। তোমাকে অফিসের ভিতর প্রকাশ্যে এক্সপোজ করতেই পারতাম। রুচিতে বাধল কোথাও। আর মনে হল, কোথাও-না-কোথাও আমিও দোষী। লোভী। 

       ঈশ্বর আমাকে একটা সুযোগ দিলেন। দেখি, জীবনটা নিজের যোগ্যতায় সাজাতে পারি কিনা। ভাল থেকো। শতদ্রুকে ভয় পেও না। তুমি আমাদের জীবন থেকে অনেক দূরে থাকলে ও কোনও ক্ষতি করবে না তোমার। শতদ্রুর বাবা, কাকুর কাছে আমি সত্যিই ঋণী। তবে, ওঁর অফিসের চাকরিটা হাতে না-থাকলেও খুব বেশিদিন আর তোমার শরীরের খিদে মেটাতে চাকরিটা টানতে পারতাম না। আমি বেশ কিছু ইন্টারভিউ দেওয়া শুরু করছিলাম কয়েক মাস আগে। এক্সট্রা ইনকামের জন্য আমি ও আমার এক কলেজের বান্ধবী জয়েন্ট বুটিকও শুরু করব হয়তো ভবিষ্যতে।

 

       মনে পড়ে মিশুক? তুমি এক একটা প্রজেক্ট দিয়ে আমাকে বলতে, “ চান্স দিলাম তোমাকে উপমা, তুমিও কিছু দাও আমাকে। কাম অন!” আজ আমি একটা চান্স দিলাম তোমাকে।

     

  আর হ্যাঁ, একটা শেষ কথা। মেয়েদের পাছায়,কোমরে হাত দিতে ইচ্ছে করলে,সেক্স আৰ্জ মেটানোর জন্য কলকাতা শহরে হাজারটা জায়গা আর উপায় রয়েছে।বিনা ইনভেস্টমেন্টে সেক্স চাইবে। আর পয়সা খরচের ভয়ে সেক্স ওয়ার্কারদের কাছে যাবে না। পিওর ভিতু, কুনো, কাপুরুষ! পারলে পুরুষ হওয়ার চেষ্টা কোরো। 

রেজিগনেশন লেটার মেল করে দিয়েছি তোমাকে।

অফিসের অন্তত আর-একটা মেয়েকে উদ্ধার করতে চাই আগামী নারী দিবসে। তোমার চক্রব্যূহ ভয়ঙ্কর! আমি ভুক্তভোগী।

সমাজ উচ্চাঙ্খাকেই দোষারুপ করবে। তলিয়ে কে আর ভাবে! বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে।

           তাই, চেষ্টা করব, যদি একটা মেয়েরও অসহায় জীবনে আমার নিজস্ব সাইলেন্ট প্রতিবাদটুকু যতার্থ উপমা হয়ে উঠতে পারে!

- ইতি উপমা

 

0 Comments

Post Comment