রান্নার বিভিন্ন ধাপের সাথে তার খাবার জোটার সমীকরণ অত সোজা তো নয়। মানুষ প্রথমে রান্না করে। উনান জ্বালানোর আগে থেকেই একটা স্বাদ আর গন্ধ জিভ আর নাকে তৈরি করে ফেলে। তারপর রান্নার প্রতিটা ধাপে সেই স্বাদ আর গন্ধের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করতে করতে, বার বার নতুন স্বাদ, নতুন গন্ধ খুব মসৃণ বেগে আগের স্বাদ আর গন্ধে প্রলেপ ফেলতে থাকে। মানুষ জানতেও পারে না যে জানলা খোলা না বন্ধ, আকাশে মেঘ না রোদ, ঘরের দেওয়ালে থম ধরা টিকটিকি না পিলপিল পিঁপড়া, তার উপর প্রতিবার তার খাবারের স্বাদ বদলে যায়। সে গরমে ঘামে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে। তেলচিটা কৌটা খুলতে গিয়ে হাত আঠা হয়। তবুও রাঁধে খাওয়া আর খাওয়ানোর জন্য। রান্না হয়ে গেলে, নিজে খায়। অন্য মানুষদের খেতে দেয়। নিজেদের খাবার শেষ হলে চিবায় তুষ করা হাড় বা না চিবাতে পারা যা কিছু, বাটিতে নিয়ে এই টিপকল থেকে খানিক দূরে ড্রেনের পাশের ঢিপটায় ছোঁড়ে। তখন পাড়ার নেড়ি কালু লালু ইত্যাদিরা খায়। কয়লারা হয় তার পরে নলির হাড় খানিক পায়। না হয় তাদের অন্য ধান্দা নিতে হয়। কালু কয়লা সবাই সব সময় খুব মন দিয়ে খাবার খায়। মানুষও বেশির ভাগ সময়ই মন দিয়ে খাবার খায়। তবে শুধু মানুষই খাওয়ার আগে রান্না করে। যখন মানুষ খুব মন দিয়ে রান্না করে তখন কয়লা তাকে দেখতে খুব ভালোবাসে। মন দিয়ে রান্না করলে, ঘামে ভেজা কাপড়, ধোঁয়ায় লাল চোখ, ঝাল গন্ধে নাক দিয়ে গড়ান জল সব কেমন ভুলে গিয়ে অল্প আঁচে কষান মাংসের মতন নরম তুলতুলা দেখায় মানুষকে। মানুষ যখন খুব মন দিয়ে রান্না করে তখন তারা কয়লাকে তাড়ায় দেয় না। দরজার পাশে বসে রান্না করা দেখতে দেয়। আজকের গন্ধে খুব মনোযোগ। খুব আনন্দ। এত আনন্দ যে মাংস কড়াইয়ে চাপানোর আগেই মাংসের হাড় চাবানোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এক লাফে পাঁচিল টপকায় রান্না ঘরের দরজায় যাওয়ার জন্য পিঠ বেঁকায় কয়লা। তবে রান্না তো আর উনান জ্বালানোর পরে শুরু হয় না। শুরু হয় অনেক আগে। রান্নার মাঝপথে কখনো দর্শক জুটে যায়। কয়লা এই রান্নার প্রথম দর্শকও নয়। এক আশমানি নিকষ কালোর ভিতর হালকা আঁচর মতন এক রুপালি প্রথম খেয়াল করে খুব একটা মনোযোগী রান্নার আয়োজন। জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনের বাইরের ছাদের মাথা থেকে পিছলাতে পিছলাতে জারুলের পুরাট পাতার ফাঁকফোঁকড়ে প্রায় না থাকার মতন ঝুলে ছিল সে। স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ঘাড় উঁচু নীচু ব্যাঁকাট্যারা করে পাতা ডালের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে চাঁদ কখনো দেখতে আর কখনো না দেখতে পেরে ফুরফুরা একটা ফুর্তিতে তা দেওয়ার চেষ্টা করে সবুজ। এত রাতে না ঘুমায় জার্নি করা আর ট্রেন থেকে নাইমে টোটো ধরার রেস দেওয়ার মাঝে এমন হালকা পুলক আসা মুশকিল বুঝে সবুজ ফের ফাঁকা টোটো খুঁজতে মন দেয়।
"শিরিশতলা রিজার্ভ কত নিবা?"
প্যাসেঞ্জারদের মতন খুল্লম খুল্লা না হইলেও টোটোদের লাইন নম্বরের হিসাবের ভিতরেও একটা চোরাগোপ্তা রেস আছে বলে বোঝা যায়। স্টেশনের বাউন্ডারি ওয়ালের পিছনে দুই চাষের মাঝে, মাস খানেক ধরে হাঁফ নেওয়া ফাঁকা জমি যে আসমানের থেকেও ছ্যাঁদাহীন আঁধারে দাঁড়াশ আর শিয়ালের বাচ্চাদের আলাদা আলাদা গর্তে, আলাদা আলাদা অভয় দিচ্ছিল, সেই আঁধার ছ্যাঁদা করে একটুকরা লাল মুখ আধ খাওয়া বিড়ি ধাঁই করে ছুঁড়ে লাইন ভাইঙ্গে টোটো আগায় বাবলু। টোটোর কাঁচে পেশি ফুলান হাতে ধনুক টানা রামের স্টিকারের তলায় ঢাকা পরা চিড় হঠাত ঝটকায় একটু কাঁইপে ওঠে। শিরিশতলার পাশেই তার ভাড়া বাড়ি। লাস্ট ট্রিপে বাড়ির পাশের ভাড়ার উপর তার হক বেশি। তিনটা ব্যাগ হাতে কাইলা ঢ্যাঙা মতন প্যাসেঞ্জারের চেহারা কথায় আন্দাজ হয়, আসাম থেকে আসে নাই। কুচবিহার বা ধুপগুড়ি হবে। ধনুকের মতন ঠাটায় বাঁকান দুই ভুরুর নীচে পিটপিটান চোখ দেখলে বোঝা যায় টেঁটিয়া আছে কিন্তু খুব ট্যানশন। ভাড়া নিয়ে দরদাম করবে। কিন্তু শেষে শুরুতে বলা ভাড়াই মাইনে নিবে।
"দেরশ"।
"আরে এইখান থেকে এইখানে"
"কত কিলোমিটার কন তো? এত রাতে......"
জলপাইগুড়ি রোড স্টেশন থেকে বের হয়ে দুই দিকের পুরু আন্ধারের সর পড়া জমির মাঝ দিয়ে স্কেল টানার মতন সোজা পিচের রাস্তার দুই পাশে তিন মানুষ লম্বা খুঁটির মাথায় থাকা এল ই ডি চুয়ানো সাদাটে আলো খুব হ্যাস্কারি নিয়ে আশপাশের অন্ধকার খানিক ফিকা করতে করতে নিজেই মাঠের আন্ধারে মাথা এলায় ঘুমায় পড়ে। সবুজেরও ঘুম পায়। বাবলুরও পায়। তবে পিচের রাস্তায় আলো টনটন। এক দুইটা খাম্বায় আলোর নীচ থেকে এমনকি সি সি টিভি ক্যামেরাও প্যাঁচার খোলা চোখের মতন হা-মুখ ঝুলে থাকে। এগুলার তল দিয়ে যাওয়ার সময় সার সার আধঘুম মানুষেরা এগুলা খারাপ এবং ঠিক করার লোক নাই জাইনেও হাতের বিড়ি আড়াল করে নেয়, গাড়ির সিট বেল্ট বাঁধে আর দুই সেকেন্ডের মতন গল্প করা থামায়। এর পরে রাস্তা ভাগ হয়। চওড়া হয়। ফাঁকা হয়। রাস্তার পাশে এক বাড়ির থেকে অরেক বাড়ির দূরত্ব কমতে থাকে। ধীরে ধীরে গায়ে গা লাগায় থাকা ছাদ দেওয়ালের সিলাই, রাস্তা আর রাত-কালো খালি জমির মাঝের সমস্ত ফোঁকর এমন রিপু কইরে দেয়, যে হঠাত মঠাত রাত খেঁকুড়া শিয়ালের চিৎকার ছাড়া খালি জমি, তার ভেতরে সাপ শিয়ালের গর্ত, আর সব গর্ত মিলায় দেওয়া আন্ধার কোথাও কোন দিন ছিল বলে আর টের পাওয়া যায় না। সবুজ ঝিমায়। বাবলু বিড়ি ধরায়। চৈত্রের পড়তি জাড়ে রাতের হাওয়ার দাঁত পুরাপুরি ক্ষয়ে যায় নাই। কিন্তু দিনের গরমের কারণে জামা কাপড়ে আর তেমন আগল রাখা হয় না। পিঠে ফরচুন কাচ্চিঘানি লেখা হলুদ টিশার্ট ফুঁড়ে দাঁত বসায় হাওয়া। ঠান্ডা লাগে বাবলুর। বিড়িতে জোর টান দিলে এতক্ষণের তাক করা চোখ ফাঁকা রাস্তায় ছড়ায় ভাইসে যায়। সারাদিনের ৫৮০ টাকার ভাড়ার হিসাব, বাজারে নতুন ওঠা লতি সজনার দাম, কাল সকালে রুটির সাথের কোন তরকারি হবে তার আন্দাজ, ছোট ছেলের প্রাইভেট মাস্টারের প্রতিদিন সকালে তার বাড়িতে রুটি খাওয়া আর পড়ানোতে ফাঁকি দেওয়া...হঠাত ঝাঁকি...ভাঙা রাস্তা, শহরে দূরাবস্থা, সিভিকের ঘুষ, কোমরের বাত, দশ তলা হসপিটালের পচ্চিমা ডাক্তার, স্ট্যান্ডের ৮ টা বিহারি টোটোয়ালা, শহরটা বিহারি মারোয়ারীতে ভরে গেল....... পিচের রাস্তায় টোটোর চাকার মতন এমন টানা গড়ায় যাওয়া ভাবনায় হঠাতই পায়ের পাতা হয়ে মাথা পর্যন্ত বেরেক লাগে। চপ্পল উপচান একটা আঠালো তরল ঠান্ডা গু পাড়ানোর মতন শিউড়ায় তোলে।
"একি ব্যাগে মাংস নিয়ে আসচেন নাকি!"
ঘ্যাঁচ করে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়ায় যায় টোটো।
চিৎকার বলা যায় না। কিন্তু শুনশান রাস্তায় একটা খুব ধারাল কিন্তু ভারী চাপা বিরক্তি টোটোটাকে কেন্দ্রে রাইখে মাটির কাছ দিয়ে ঢেউয়ের মতন চারিদিকে ছড়ায় পড়ে। পশ্চিম দিকে যে ঢেউটা যায় তার একটা সোঁতা রাস্তার ধারের ডেউয়া গাছের গোড়া থেকে তিরতিরায় আগার দিকে যাওয়ার সময় ডালে বসে ঝিমান ভামবিড়ালের বুকের লোমের ভিতর খেই হারায় ফেলে। ভাম হাই তুলে ডাল বদলায়। তার তিন ছটাক দূর দিয়ে ঢেউয়ের আরেক সোঁতা গাছ, বাড়ির পাঁচিল, দেওয়াল , পাতাবাহারের ঝোপ সব মিস কইরে পিছনের দিকের একটা ডোবার পচা জলের উপর ব্যাঙ লাফানো পিছলায় উলটা দিকের ঝোপে মিলায় যায়। আর রাস্তা বরাবর যাওয়া আরেকটা সোঁতার পুরাটাই এক রাত জাগনা কুত্তা দুই কানে পুরে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এগুলা নিয়ে খুব একটা চিন্তা হয় না চমকায় জাইগে ওঠা সবুজের। তবে ঢেউয়ের বেশির ভাগটাই গিয়ে পরে রাস্তার পাশের সার সার বাড়ির দেওয়ালে। তার কিছু নিশ্চইয়ই দেওয়াল ফুঁড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে মেঝে বায়ে খাটের পায়া বায়ে উপরে উঠে, মশারির ভিতরে ঘুমায় থাকা মানুষজনের নাক কানের খুব কাছাকাছি কাঁপা কাঁপি করছে। সেগুল নিয়ে একটু গুর গুর ধরে সবুজের সদ্য জাগনা খাওয়া বুক। এত রাতে রেসিডেন্সিয়াল জায়গা। মানুষের ঘুমের ভিতর এমন ……
“ওঠার সময় বইলে উঠবেন না?”
আরেকটা ঢেউ টোটো কেন্দ্র করে ছড়াতে থাকে।
“আরে খাসি কাকা খাসি। মেসে যাচ্ছি, গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসচি। কী ভাবচেন?”
পালটা ঢেউ ছড়ায় দিতে চায় সবুজ।
“আরে ভাই তোমার ব্যাগ চুয়ায় রক্ত বার হচ্ছে পুরা গাড়ি নোংরা কইরে দিলা”।
“প্লাস্টিক ফাইটে গেসে গো মনে হয়! পৌঁছায় ধুয়ায় দিচ্ছি চল চল”।
“আরে এগুলা এখন খুব রিক্সের জিনিস রে ভাই। কয় দিন আগে ফুলবাড়িতে কি হইল জানো না? বইলে উঠবা বুঝলা। পোষাইলে নিব না পোষাইলে নিব না। রাস্তা ঘাটে বাল…”
টোটো চলা শুরু করে। নাক আর কপালের উপর বিড়বিড়ানো ঘামে বাতাসের খামচি লাগলে সবুজ টের পায় ফাঁকা মাঠের হাওয়া এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। গরম পড়বে এবার ভালই মনে হয়। খানিক পেচ্ছাপ পায়। কিন্তু এখনই টোটো থামাইতে বলতে ইচ্ছা করে না। রেসিডেন্সিয়াল জায়গা। মানুষ ঘুমাচ্ছে। টোটোর প্যাসেঞ্জার - টোটো – টোটোওয়ালা - টোটোর ভিতরের ব্যাগ – ব্যাগের ভিতরের কাপড় ওষুধ মাংস বই খাতা এই সবটা নিয়ে একটা ছোট পৃথিবী একটু আগের আলাপ সালাপের কেন্দ্র থেকে খানিক দূরে চলে যাইতে চায়। তারপর খুব লম্বা পাঁচ মিনিট যায়। সবুজ মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে ব্যাগ দেখে, মোবাইলে নেটওয়ার্ক চেক করে, অহেতুক গা মোড়ামুড়ি দেয়, চেষ্টা কইরে আওয়াজ করে হাই তোলে, ডান পা তিরতির কাঁপায়, নাক টানে, গুগল ম্যাপে লোকেশন দিয়ে দেখে আর কতক্ষণ লাগবে, বোতল থেকে জল খায়, ফলে আরো জোরে পেচ্ছাপ চাপে।
“কাকা সাইডে একটু দাঁড় করায়েন”।
পেচ্ছাপ করার পর সিগারেট ধরাইতে গেলে সবুজ তিনটা দেশলাইয়েও সিগারেট ধরাইতে পারে না। হাওয়া তো নাই। হাত একটু কাঁপতেছে। ঠান্ডাতেই হবে নিশ্চইয়ই। ওয়েদারের বাল বাপ মা নাই। এই গরম এই… আবার ঘাড়ের পিছনটা ঘামে বিজবিজা। সিগারেট ধরাইতে না পাইরে টোটোয় গিয়ে বসলে বাবলু জ্বলন্ত বিড়ি আগায় দেয় ধরার জন্য। প্রয়োজনের থেকেও বেশি কৃতজ্ঞতায় উপচায় ওঠে সবুজ। প্রায় ঘুটঘুটান আন্ধারেও খুব জোরে টানা সিগারেটের আগুনে যতটুকু সম্ভব দাঁত বের করা হাসির মুখে ধরা দিতে চায়। বুকের ভিতর একটা ভারি কেমন গড়ায় যাওয়ার জন্য এদিক ওদিক করে।
“ফুলবাড়ির কেসটা অন্য কাকা। ওটা মহামেডান এরিয়া তো! অন্য কেস”।
টোটো চলে ঢিম লয়ে ঝাঁকুনি না খায়ে। এখানে রাস্তা ভালো।
“ওটা তো গণ্ডগোল হবেই। বিফ নিয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাবি আর গন্ডগোল হবে না? কি কাকা? আরে এইটা তো মানতে হবে যে হিন্দুরা মেজরিটি। হিন্দুদের দেশেই থাকবি আর তাদেরই ধর্মে আঘাত দিবি! আরে খাসি কাটা হইল গ্রামে। ভালো খাসি। তা প্রায় ৩০ কেজি বুঝলা। তা আ… মা কইল নিয়া যা একটু। এই।”
উলটা দিকের ট্রাকের আলো টোটোর কাঁচে সাঁটা রামের বাইসেপসে পিছলায় সবুজের মুখের ডান প্রান্ত হয়ে হুশ করে পিছনে মিলায় গেলে রাস্তা খুব অন্ধকার ঠেকে। টোটোর স্পিড একটু কমে।
“নামবা কই?”
“শিরিষতলার ইন্দিরাগান্ধির মূর্তির পাশে যে গলিটা ওর ভিতর মেসে। পরশু রেলের পরীক্ষা আছে না? বন্ধুর মেসে থাকব”।
“এই টাইমে চাকরি কই? ঘুষ ছাড়া হয়? আমার বড় ছেলে বিএ পাশ দিল। কই? কিছুই তো নাই”
“তাও সেন্ট্রালে কিছু হয়”।
ঘ্যাঁচ কইরে ফের দাঁড়ায় টোটো।
“জল আছে? দেও। রক্তটা একটু ধুয়ে নেই।”
একটা বাতিহীন ল্যাম্পপোস্টের নীচে চিলতা অন্ধকারে আঁটসাট দাঁড়ায় থাকা টোটোর ভিতর থেকে গড়ায় আসা জল, অন্ধকারের সীমানা পর্যন্ত কালচা লাগে। আরো খানিক গড়ায় পরের ল্যাম্প পোস্টের তলায় পৌঁছালে তাকে লাল লাল লাগারই কথা। রাস্তার উপর দিয়ে কতদূর গড়ানোর পরে জলটা পিচ পুরাপুরি শুইষে নিবে আন্দাজ করতে করতে জল ছোঁড়ার দিক বদলায় বাবলু। খানিক দূরের মেইন রোডের আলো শব্দের খিচুড়ির দিকে চোখ রাইখে সবুজ রিজনিং আর কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের গোটা পাঁচ প্রশ্নের উওর মনে করতে গিয়ে পারে না। মনে করতে না পাইরে আজ সকাল পর্যন্ত যে টেনশন হচ্ছিল তাও হচ্ছে না দেখে বুক শূন্য লাগে। টোটো ধোয়া জলের ধারার দিক বদলায় রাস্তার বাম পাশ দিয়ে ড্রেনের ভিতর যাওয়া দেখতে দেখতে সবুজ ভাবে দুপুরে কাটা মাংসের ভিতর রাত পর্যন্ত কতটা রক্ত থাকে! এর ভিতর প্রচুর রক্ত ছিল বোঝা যাচ্ছে। সামনের রানের মাংস। বডির কি এক এক জায়গায় এক এক রকম রক্ত থাকে? সবার ভিতর কি সমান রক্ত থাকে? তার ভাগ্যেই পড়ল এমন। আর মা বাল কেমন কইরে বাঁধল প্লাস্টিক? কোন কাজ যদি…… এখন যদি……তার মায়ের শরীরে রক্ত কম। অ্যানিমিয়া। সবুজ নিজের আঙুলের ডগা টিপে রক্ত বোঝার চেষ্টা করে। অন্ধকারে টোটো ধোয়া জলের মতই তার আঙুলের ডগা কালো লাগে। টোটোওয়ালা খুব বিরক্তি নিয়ে “হুর বাল” বলে দুই নম্বর বোতলের তলানি দিয়ে ব্রেকের তলা ধোয়ার চেষ্টা করলে সবুজ চিন চিন করে জানতে চায় মোবাইলের আলো ধরবে কিনা। ধোয়া টোটো মেইন রোড ক্রস করার সময় সবুজ চড়া আলোয় ঝুঁইকে পরে দেখতে চায়, ব্যাগ আর চুয়াচ্ছে কিনা। টোটো সারসার বাড়ি চাপা গলিতে ঢুকলে বাবলু ফের টোটো দাঁড় করায় মোবাইলের আলো ফেইলে দেখে।
“আরে আর বাড়াবে না কাকা। চল চল ……… তোমার ছেলে বিএ পাশ তো চাকরির পরীক্ষা দেয় নাই?”
“কত দিলো। কই হয়”।
“রিজার্ভেশন নাই?”
“ও বি সি তে কি হয়?”
“না না সময় বদলাইচে কাকা। কোর্টের রায় দিল না? আগে তো ওবিসিতে বেশির ভাগই এম কাস্টদের চাকরি দিত। এখন কিন্তু সে ব্যাপার নাই। হিন্দুদেরই হচ্ছে। চেষ্টা করতে বল”।
“চেষ্টা তো সবাই করে। তুমিও করতেছ”।
পায়ের তলার আঠালো ভাব খানিকটা কমলেও এখনও মাঝে মাঝে চপ্পল আর পায়ের পাতার মাঝে ঠান্ডা লাগলেই তরল একটা শিউরানি পা থেকে মাথা পর্যন্ত উইঠে আসতেছে। বাম পায়ের বুড়া আঙুল লাফায় উঠতেছে মাঝে মাঝে। ধুর বাল, টোটো চালানোর কাজ…স্পিড বাড়ায় বাবলু। দুই চারটা বাম্পারে খুব ঝাঁকি লাইগে প্যাসেঞ্জার মাথায় বাড়ি খায়। বাবলু স্পিড আরও বাড়ায়। ব্যাগটা পিছনে দিলে আবার গাড়ির পিছনটাও ধুইতে হবে। ভাড়া বেশি চাইতে হইত। নামানোর পরে বেশিই নিবে। না আগেই বলবে? এত ঝামেলা জানলে……
“একদিকে চাকরি নাই, আর জিনিসের যা দাম। এই যে সারাদিন টোটো চালাই, এত রাত পর্যন্ত চালাচ্ছি কত ইনকাম? পোষায়? দেশের যা অবস্থা!”
“খারাপ তো আছেই কাকা, কষ্ট তো আছেই। কিন্তু দেশের ব্যাপারে ভালোটা দেখতে হবে। পজিটিভ হইতে হবে। সব সময় নেগেটিভ নেগেটিভ কথা বললে হবে না। এই যে আগে টেররিস্ট অ্যাটাক হইলে কি হইত? কিছুই হইত না। এখন দেখ। দেশ শক্তিশালী হচ্ছে। তার জন্য একটু তো…… অপারেশন সিন্দুর দেখচ তো খবরে? ৬০০ টেররিস্ট কে ঘরে ঢুইকে গাঁড় মাইরে আসচে। করাচিতে, লাহোড়ে ঠুইকে দিয়ে আসচে। সিনা চওড়া হয় কিনা? আগের মতন অমন ঝিমানো মিনমিনা দেশ তো আর নাই। পাকিস্তান পাছায় হাত রাখলে বুকে ফুটা করে দিছে, বুকে হাত রাখলে পাছায়।”
রাতের বেলায় মাংসের রক্তে ভেজা টোটোর ভিতরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে গড়ায় ঘরে ফিরতে চাওয়া দুই মানুষের স্বাভাবিক চাপা স্বরের আলাপের ভিতর, হঠাতই পাকিস্তানের বেইজ্জতি সংক্রান্ত ফাজলামোতে খুব ভক্তিভরে উচ্চ স্বরে হাসার নাগরিক দায়িত্ব পালন করবার সময় বড় নিরাপদ বোধ করে টোটোর প্যাসেঞ্জার, টোটো ড্রাইভার আর হয়ত ব্যাগের ভিতরের কাটা মাংস। টোটোর স্পিড একটু কমে। ড্রাইভারের পায়ের পাতার শিউরানি একটু আড়ালে চলে যায়। প্যাসেঞ্জারের ঘাড়ের পিছনে গরমে বিজবিজা ঘাম খানিক শুকায়। ঠান্ডায় কাঁপা হাত একটু শান্ত হয়। ব্যাগের ভিতর থেকে একটু অনায়াসে চুয়ায় খাবার ধোয়া জল।
“হ্যাঁ পাকিস্তানকে কিন্তু টাইট করে দিছে”।
“মোদিজী আসার পরে ভারত আর আগের ভারত নাই। কি কন কাকা? দেশের ভিতরে কম টাইট দিছে? দরকার ছিল, বুঝলেন খুব দরকার ছিল। যা বাড়বারচিল না! এই যে টোটো চালান আপনি। বাংলাদেশ থেইকে কত অনুপ্রবেশকারী আইসে দিনে টোটো চালায় রাতে দেশে ফিরে গিয়ে আপনার ভাত মারত কন? সব দুধেল গাই! ফুলবাড়ি দিয়েই তো কত ঢুকত! এখন দেখেন। শিলিগুড়ি সিটি সেন্টারের সামনে কতগুলা চায়ের দোকান? অর্ধেক উইঠে যাবে। সব বাংলাদেশ থেকে আসা। এনআরসি ফেনারসি আর কিছু একটা হোক না , দেখবেন…আমাদের একটু তো কষ্ট করা লাগবেই … দেশের জন্য একটু তো… হেঁ হেঁ তাই না?”
ঘুমন্ত শহরের রাস্তার দুই দিকে শাটার টানা দোকান ঘরের মাঝ দিয়ে টোটো ডাইনে বাঁক নিতে গিয়ে হালকা ঝাঁকি খায়। শাটার টানা দোকান ঘরের ভিতরের মতই গম গম করে টোটোড্রাইভার আর প্যাসেঞ্জারের বুক। গমগমান সেই বুকের ভিতর নিজের কাগজ, নিজের নাম, নিজের নামের বানান, নিজের ঠিকানা, নিজের ধর্ম, নিজ ও দেশ - সরকারি অফিস, সরকারি অফিসার, সরকারি লাইন, সরকারি নিয়ম, সরকারি আইন, সরকার ও বিদেশ ইত্যাদি সংক্রান্ত যাবতীয় আশঙ্কা আর আতঙ্ক খুঁজে নিতে চায় বন্ধ ট্রাঙ্কের মতন আঁধার ঘুপচির আবডাল। শাটারের তল দিয়ে জুলজুল উঁকিতে বুঝে নিতে চায় সহনাগরিকের নাম, সহনাগরিকের ঠিকানা, সহনাগরিকের নামের বানান, সে বানানের ঠিক ভুল, তার হাতের তাবিজ, কোমরের তাগা, ব্যাগের মাংস, কাঁচে সাঁটা ভগবানের রাগী মুখ, প্যাসেঞ্জারের সম্ভাব্য রাগী মুখ, ড্রাইভারের সম্ভাব্য রাগী মুখ, হাজার হাজার ঘরের ভিতরে মশারির নীচে ঘুমায় থাকা লাখ লাখ মানুষের সম্ভাব্য রাগী মুখ।
“বাংলাদেশে তো কয়েকজন কে ঠেইলে পাঠাইল না? হেঁ হেঁ। একেবারে পে-লোডারে উঠায় কাটা তারের ওই পারে ছুঁইড়ে ফেলাইচে বলে? হেঁ হেঁ বাল বি এস এফ এরও বুদ্ধি! কুচবিহারের দিক থেইকেও নাকি কয়েকজনকে পাঠাইল ওই পার? পোয়াতি মেয়েছেলেও ছিল নাকি? তবে ওরা মুসলমান হইলেও বলে ইন্ডিয়ানই ছিল। পরচ বাল বি এস এফের খপ্পরে যাবা কই হেঁ হেঁ হেঁ…ফিরতে তো পারবে না কও? নাকি? তবে বাংলাদেশের খুব খারাপ অবস্থা না? প্রচুর হিন্দু লোককে মারতেছে বলতেছে খবরে। আওয়ামির লোকদেরও মারতেছে বলে। আওয়ামিগুলাও তো এদিকে পালায় আসবে এইবার মনে হয়”। কথা শেষ করার পরেও অনেকটা দাঁত অনেকক্ষণ বার করে রাখে বাবলু।
“তাই তো শুনি। আমার বুঝচতো বাবার নামটা মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডে … ওই সামান্য একটা… সেদিন চোখে পড়ল। তা এফিডেভিট করে নিলেই তো হবে? তাই না? তোমার ঠিক আছে?”
দুইটা নিরেট ঢোঁক দুইটা ভিন্ন গলা দিয়ে নামতে থাকায় একজন কোন উত্তর দেয় না - আরেকজন নিজের বাচালতার অস্বস্তি কাটাতে রাস্তায় খানিক থুতু ফেলে।
“বাঁ দিক বাঁ দিক। ল্যাম্প পস্টের পাশে দাঁড়াও।”
“পঞ্চাশ টাকা বেশি দিও ভাই। এত ঝামেলা কইরে আনলাম!”
“বইলে উঠলাম কাকা”
“সব কথা তো বল নাই ভাই”
“আচ্ছা ৫০০ টাকা খুচরা হবে?”
“খুচরা নাই ভাই। তুমি মেস থেকে নিয়ে আসো না।”
“মেসে কেউ নাই। বন্ধু সকালে ঢুকবে।”
“এইরে। তালে?”
এই ছোট্ট সমস্যার এক চিলতি সমাধান আছে। কিন্তু সেই চিলতি সমাধানের নিজস্ব বিপদও আছে।
এক আকাশ আন্ধার সমান এক বিশাল সমস্যার যে বিপুল সমাধান অলি গলি স্টেশন জলা নদী হাইওয়ে পাড়া বেপাড়া এদেশ বিদেশ জুড়ে সাঁতলানো হল, অল্প আঁচের নীল আগুনে কষানো সেই ভয়ঙ্কর সমাধান যা জমির শিয়াল, আসমানের চাঁদ, গাছের ভাম, রাস্তার কুত্তা, মশারির ভিতরের মানুষেরা পাক ঘরের দরজার চৌকাঠে বসে বসে দেখল, লক লক করে উঠল, বিষম খেল, কিম্বা খুব হেসে ঠোঁট মুছল, সেই বিপুল সমাধান এক মুঠা বেপর্দা বিনিময়ে মুহূর্তে চুরচুর হতে পারে। বিগত ৪৫ মিনিট ধরে, দুই কিলোমিটার জুড়ে দুটা ভিন্ন মানুষ বেঁচে থাকার ধান্দাবাজ লোভে, কিম্বা মরে যাওয়ার নির্লজ্জ ভয়ে যে এক-নাগরিক, এক-ভয়, এক-ঘেন্না, এক-আনুগত্যের পৃথিবী ফুলাল, যেই পৃথিবীতে ঝগড়ার জন্য ভিন্ন পক্ষ নাই, পিটানির জন্য ভিন্ন শরীর নাই, খুনের জন্য ভিন্ন প্রাণ নাই, তা খুব বিভৎস শব্দে টুকরা হয়ে নিজের সাথেই নিজে ঝগড়া শুরু করতে পারে, নিজের হাতে নিজের চোয়াল ভাঙতে পারে, নিজের দাঁত নিজেরই নলি খুঁজে নিতে পারে ছিঁড়ে নেওয়ার জন্য।
তাই সেই ছোট্ট চিলতা সমাধান কে পিছায় দেওয়ার জন্য এক টোটোড্রাইভার আর এক প্যাসেঞ্জার রাত দেড়টায় চুপচাপ দাঁড়ায় থাকে রাস্তায়। ডান দিকে দেখে বাঁ দিকে দেখে। বন্ধ দোকানের ভিতরে আলো জ্বলে কিনা দেখে। মাঝে মাঝে 'ইশ ইশ' করে। 'আগে বলতে হইত ' বলে। ফের পকেট হাতড়ায়, টর্চ দিয়ে টাকা গোনে। আবার চুপচাপ দাঁড়ায় থাকে।
রাস্তার পাঁচ কুকুর খানিক কৌতূহলী হয়ে ঘাড় তোলে। রাস্তার পাশের টিপ কলে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ার আওয়াজ ঘ্যান ঘ্যানা তালে কিছু একটা ফুরায় যাওয়ার তাড়া দিতে থাকে। ড্রেনের ভিতর কিছু সাঁতরায় যায়।
"আমার নেট পাচ্ছি না। নাইলে জি পে করে দিতাম। আমি ঘরে গিয়ে ওয়াই ফাই অন কইরে করে দিচ্ছি। নাম্বার দিয়েন। কিন্তু দেরি হবে তো। আপনি চইলে যান না হয়। বাড়ি তো দেইখেই গেলেন। "
বাবলু সবুজকে মন দিয়ে দেখে। হাতের তাবিজ দেখে। কোমরের তাগা দেখে। মাথার চুল দেখে। হাতের আঙুল দেখে। মেসের বন্ধ দরজা দেখে। নিজের বাড়ির দিকে বেঁকে যাওয়া রাস্তা দেখে।
"আচ্ছা"।
আরও পশ্চিম দিকে ঝুঁকে পড়া রুপালি আঁচড় তিন তলা বাড়ির কার্নিশে আটকে আর নজরে রাখতে পারে না টোটোড্রাইভার, টোটো প্যাসেঞ্জার আর তার রান্নার আয়োজন। একটু জোরেই উত্তরের রাস্তা ধরে ছুটে যাওয়া টোটোর পিছনের লাল রিফ্লেকটার অনেকক্ষণ পর্যন্ত জ্বলজ্বল করতে দেখে পাড়ার রাত জাগা কুকুর। মেসের তালা খুলে ঘরে ঢুকে ছিটকানি লাগায় সবুজ। ব্যাগ থেকে মাংস বের করে গামলায় ঢালে। বাবলুর ফোন নম্বর জি পে তে টাইপ করে “হ্যাট বাল!” বলে খ্যাঁক করে হাসতে যায়। অনেকক্ষণ জল না খাওয়ার কারণে বুক আর গলার কাছের থেকে দমকটা ঠিক ঠাক উঠে আসার আগেই শুকায় গিয়ে কাশির মতন একটা অদ্ভুত আওয়াজ হয়ে। ঠোঁট আর চোখের নীচের পেশিতে হাসি আরো কিছুক্ষণ থাকার চেষ্টা করে ফুরায় যায়। এখন সবুজের হাসি ফুরানো মুখটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা দেখাত যদি দেখার মতন কেউ থাকত। আধ ঘন্টা পরে এস কে বাবলু আলির মোবাইলে মোঃ সবুজ মিঞার জি পে থেকে ২০০ টাকা ঢোকে। সাথে ছোট মেসেজ "ইদ মুবারক চাচা"।
পড়তি সকালের চড়তে থাকা আলোয় পাক ঘরের চৌকাঠ থেকে কয়লা মানুষকে রান্না করতে দেখে। ঘামে ভেজা পিঠ, ঝাঁঝে জড়িয়ে আসা নাক, ধোঁয়ায় কটকট চোখ আর ঠোঁটে ধাঁধাঁ মিলাতে মিলাতে প্রায় তৃপ্তি তৈরি করে ফেলার সাবধানী আহ্লাদ। এত সব দেখে যে খুব ভিন্ন ভিন্ন করে কয়লা বোঝে এমন না। তবে কয়লাকে আজ মানুষ দেখেও তাড়ায় না। মানে মানুষ খুব মন দিয়ে খাবার রান্না করছে। কয়লা খুব ভালোবাসে মানুষের এমন রান্না করা দেখতে।